Home প্রিয় মোনালিসা প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৪৯

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৪৯

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৪৯
নীতি জাহিদ

রুম জুড়ে পায়চারি করছে। হাতে একটা চকলেট। খেতে খেতে ভাবছে কি করা যায়! এই মুহুর্তে মনের কোণে অস্বাভাবিক ইচ্ছে উঁকি দিচ্ছে। বিয়ের আগে প্রেম করার সাধ ছিলো শখের পুরুষের সাথে, তা পূর্ণ না হওয়াতে আফসোসের সীমা নেই। বারান্দায় দাঁড়িয়ে গেটের কাছে থাকা নিরাপত্তা দেয়ালের উচ্চতা মাপলো। মনে মনে ভাবছে এখান থেকে লাফ দিলে পড়ে ব্যাথা পাওয়ার সম্ভাবনা কত খানি। ক্যালকুলেশন ঠিক করে রুমে ঢুকতেই দরজার সাথে হাত লেগে আওয়াজ হলো। ইমরানের ঘুম বরাবরই নাজুক। আওয়াজ শুনে পাশ ফিরে দেখে স্ত্রী নেই। বেড সাইড ল্যাম্প জ্বালিয়ে দেখে মোনা দাঁড়িয়ে দাঁত দেখিয়ে হাসছে। ঘুমের ঘোরে ভাবছে, বউটার মাথা ঠিক আছে? উঠে দাঁড়িয়ে আছে কেনো? এভাবে হাসছে কেনো? চোখ কচলে চশমাখানা চোখে দিয়ে প্রশ্ন করলো,

– কি হয়েছে মোনালিসা? ঘুমাচ্ছো না।
মোনা বরের পাশে এসে হাত ধরে বলে,
– ও ইমরান সাহেব, আমার প্রেম প্রেম পাচ্ছে। একটু প্রেম করি?
ইমরানের মনে হলো ঘুমের ঘোরে ভুল শুনেছে। টেবিলের বোতলের ছিপি খুলে গ্লাসে পানি ঢেলে পান করে মোনার দিকে তাকালো। মোনার ডাল গালে আলতোভাবে হাত ছোঁয়ালো। পুনরায় প্রশ্ন করলো,
– কি পাচ্ছে?
– প্রেম পাচ্ছে।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখতে পেলো সাড়ে তিনটা। স্ত্রীকে কাছে টেনে বললো,
– আদর লাগবে?
– তা তো লাগবে কিন্তু এখন প্রেম পাচ্ছে।
যতখানি ঘুম চোখে ছিলো পুরোটা ছুটে গিয়েছে। টান টান হয়ে বসে আদুরে গলায় বললো,
– প্রেম পায় কি করে সোনামনি? কি করতে হয় প্রেম পেলে?
– প্রেম করতে হয়।
– আমার কাছে আপাতত প্রেমের সংজ্ঞা হলো তোমাকে বুকে জড়িয়ে ঘুমানো। সকালে নামাজ আছে বউসোনা।
– আমি পুচকুকে বলব আপনি প্রেম করেন নি।
ইমরান কপালে হাত চাপড়ে ভাবছে আচ্ছা বিপদে পড়েছে। অসহায় গলায় বললো,

– আচ্ছা, কি করতে হবে এখন?
– চলুন, বাইরে যাব। আজকে যেহেতু চাঁদ রাত দোকান পার্ট অনেক গুলো খোলা। আমি আর আপনি দেয়াল টপকে রাস্তার ও পাশে যাবো। এরপর কিছুক্ষণ হাত ধরে হাঁটবো। কিছু খোলা পেলে খাবো। সুখ দুঃখের আলাপ সেরে আবার চলে আসবো।
চক্ষুচড়ক গাছ ইমরানের। কি বলবে বুঝতে পারছেনা। সুখ দুঃখের আলাপ করতে রাস্তায় যেতে হবে কেনো? এত রাতে সুস্থ মানুষের মাথায় দেয়াল টপকানোর বুদ্ধি আসে কি করে! বুদ্ধিহীন হয়ে বললো,
– বাইরে যাবে, প্রেম করবে ভালো কথা দেয়াল টপকাতে হবে কেনো। গেট আছে না?
– আরেহ দেয়াল না টপকালে প্রেমের মজা পাব কি করে?
– কাছে আসো।
ইমরান মোনাকে কাছে টেনে কোলে বসিয়ে বললো,

– দেখো সুইটহার্ট কয়টা বাজে? এর মাঝে তুমি কি ভুলে গেলে তুমি একা নও। বেবি আছে না? সিঁড়ি অতিক্রম করাই তো তোমার জন্য বারণ আর আমাদের একেকটা দেয়াল তো মিনিমাম বারো ফিট। আমারো আজকে মাত্র সেলাই খুলে দিলো। পায়ে প্রেশার পড়বেনা? দেয়াল টপকানো দুজনের জন্যই বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। এখন ডিসিশন তোমার, যাওয়া কি ঠিক হবে?
মোনা কিছুক্ষন চুপ করে থেকে এবার কাঁদছে। কান্না দেখে হতবিহ্বল ইমরান। কাঁদতে কাঁদতে শুয়ে পড়লো। হতাশ ইমরান বিছানা থেকে নেমে পায়ে স্লিপার জোড়া পরে বললো,
– চলো যাবো। তাড়াতাড়ি ফিরবো কেমন?
– আপনার তো পায়ে ব্যাথা।
অনুরোধের স্বরে বললো,
– দেয়াল টপকাবো না সোনা। প্লিজ আরেকদিন। তখন আমরা সবাই মিলে দেয়াল টপকাবো।তুমি,আমি,ইশান আর ঔশান কেমন! আজ অন্য ব্যবস্থা করি?
– আচ্ছা।
মোনা হাতে আধ খাওয়া চকলেট নিয়ে বের হলো। ইমরান সেদিকে তাকিয়ে বললো,
– মোনালিসা তোমার চকলেট খাওয়ার ধরন পরিবর্তন করা উচিত।
– কেনো কেনো?
– এজন্যই বাইরে খেতে দিই না। যেভাবে খাও তোমার খাওয়া দেখে আরেক জনের লোভ লাগে।
চকলেট এগিয়ে দিয়ে বললো,

– নিন আপনিও খান।
ইমরান ঠোঁট কামড়ে হেসে বলে,
– সময় হলে আমি খাব। এখন তুমি খাও।
সিঁড়ি দিয়ে কোলে তুলে নামাতেই মোনা বললো,
– আপনি বাড়িতে না থাকলে কে নামাবে?
– ব্যবস্থা হবে।
মোনা জানে কোনো না কোনো ব্যবস্থা ইমরান করে নিবে। যদিও বাড়ির সিঁড়ি সমতল। খাড়া নয়। মোনা নিজেই পারবে তবুও মুহুর্ত টা উপভোগ করতে চায়।
বাড়ির সদর দরজা খুলে দেখলো গেটের সামনে লাইট টা জ্বলছে। চারদিকে অন্ধকার। এত রাতে বউয়ের উদ্ভট খায়েশ মেটাতে ইমরান শরীফ সাহায্য করছে। কি দিনকাল এসেছে! গেটের সামনে দেখলো তিনজন কেয়ারটেকার গল্প করছে। এরা কি ঘুমায় নি! ইমরানকে দেখে তিনজনই লাফিয়ে উঠলো। সাথে ম্যাডাম ও আছে। মোনা এদের দেখে বড় ঘোমটা টানলো। সালাম দিতেই ইমরান জানালো,

– গেট খুলো জোয়াদ্দার। আমি একটু বাইরে যাচ্ছি। কিছুক্ষনের মাঝেই ফিরবো।
জোয়াদ্দার কাঁচুমাচু করে বললো,
– স্যার এত রাইতে?
– সমস্যা নেই। আল্লাহ ভরসা। তোমরা পালা বদল করে ঘুমাও। এভাবে তিনজন জেগে থাকলে কাল শরীর খারাপ করবে তো।
– স্যার আমরা ঘুম থেইকা উঠছি।
– ঠিক আছে।
– কোনো সমস্যা হলে কল দিয়েন স্যার।
– ঠিক আছে।
মোনার হাত ধরে ইমরান বের হলো। শিরশিরে বাতাস। মন ছুঁয়ে দেয়া শীতল আবহাওয়া। রাস্তার পাশে মাথা উঁচিয়ে থাকা জারুল গাছ গুলো নড়ছে। পাতা উড়ছে। মার্চ মাসটাকে সেলিব্রেট করতে ইচ্ছে করছে গান গেয়ে। মোনার হাতটা মুঠোয় পুরে হাঁটতে হাঁটতে বললো,

– লিটল ফেইরী গান শুনবে?
মোনা লাফিয়ে উঠলো,
– একশো বার।
– আস্তে। আগের মত লাফালাফি করোনা প্রিয়। মন যেন খারাপ নাহয় ঘুরতে বের হলাম। হাসিখুশি থাকো। আমার ভয় হয় যেভাবে তিড়িং বিড়িং করো, কখন কি অঘটন ঘটাও। ভেবেছিলাম বড় হয়েছো৷ না আমি ভুল ভেবেছি এখনো আগের মতোই আছো।
– স্যরি স্যরি আর লাফাবোনা। আপনি গান গেয়ে শোনান প্লিজ।
খালি গলায় গেয়ে উঠলো,
– রুপের ঝলক দেইখা তার আমি হইলাম ফানা
সে অবধি লাগলো আমার শ্যাম পিরিতের টানা
সোনা বন্ধে
ও সোনা বন্ধে আমারে
দিওয়ানা বানাইলো
সোনা বন্ধে আমারে পাগল করিলো।।
নিজে কত শত বার গেয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। রাস্তা ঘাটে,অফিসে-রেস্টুরেন্টে বহুবার গাওয়া হয়েছে। অথচ আজ লজ্জা পেলো মানুষটার মুখে গানটা শুনে। ইমরান মোনার দিকে তাকিয়ে গাইছে। ভেবেছিলো হাঁটার রাস্তাটুকু ইমরানের দিকে তাকিয়েই গান শুনবে। এখন যে মাথা তুলতেই লজ্জা লাগছে। এই গান গেয়ে যে মানুষটাকে বিরক্ত করতো আজ মানুষটা এত বছর পর সেই গান শুনাচ্ছে। গানটা শেষ করে মোনার থুতনী ধরে ইমরান মুখখানা তুলে বললো,

– ভালো হয়নি,মোনালিসা?
– অনেক।
– চুপ করে যে…
– আশা করিনি এই গান গাইবেন।
– যতগুলো চ্যালেঞ্জ ছুঁড়েছিলে সব কটা বাস্তবায়ন করে ছাড়লে, চকলেট খাইয়ে ছাড়লে, প্রেমে পড়তে বাধ্য করলে, বিয়েটাও আলহামদুলিল্লাহ হয়ে গেলো।এখন সন্তানের বাবাও বানিয়ে ফেলছো ইনশাআল্লাহ। এতটুকু করতে পারবো না তোমার জন্য? উর্দু শের শুনাই,
ওয়াহ মোনালিসা ওয়াহ!
জিন্দেগী জিনা তো এ্যয়সে জিনা,
না পাছান্দ মারদ কো ভি
পাছান্দদিদা মারদ ম্যে তাফদিল হোনা থা
জিসকি জান
আপক্যে কি শান ম্যে কুরবান।
ম্যে নে প্যেয়ার কিয়া, লোগ মুঝে গুনাহ কেহতি হ্যেয়,
ইসমে মেরা কুসুর কেয়া হ্যেয়!
উনে ভি তো পুছনা চাহিয়ে, মোহতারমা, আপ ইতনা খুব সুরাত কিয়্যু হ্যেয়!!

মোনার মুখে হাত। এভাবে প্রেম নিবেদন এই মানুষটার কাছে আশাই করে নি কখনো। যখন তোলপাড় করে তখন কথা বলতে ভয় লাগে, অথচ মাঝে মাঝে নিজের মন খুলে সামনে রেখে দেয়। মনে হয় যেন একটা খোলা বই, যে পাতা ইচ্ছে পড়া যাবে নির্দ্ধিধায়।
– মজা করছেন নাতো! এভাবে আপনি কখনো কথা বলেন না।
মোনার হাতদুটো শক্ত করে ধরে বললো,
– একদম না। যে কটা দিন বেঁচে আছি এই হাত দুটো যেন সবসময় আমার চলার পথে পাই। এই টুকুই তো চাওয়া আল্লাহর কাছে। আর হ্যাঁ মজা নয়, এটাই আমি।
বাতাস ও যেন আজ সায় দিচ্ছে কপোত-কপোতীর বৈধ প্রেমের।

বাসায় ফিরতে ফিরতে ভোর। ফিরেই দুজন ফজরের সালাত আদায় করে নিলো। মোনাকে ঘুম পাড়িয়ে ঘন্টা খানেক ইমরান নিজে ও ঘুমিয়ে নিলো। এর মাঝে ইশান এসে দরজায় কড়া নাড়তেই ঘুম ছুটে গেলো। ছেলে পুরোপুরি তৈরি। ঘড়িতে সাতটা। ইমরান তড়িঘড়ি করে উঠে ফ্রেশ হতে চলে গেলো। সাদা পাঞ্জাবিতে বাবা ছেলেকে দেখতে চমৎকার লাগছে। ইশান মাকে জাগায় নি, অপেক্ষা করছে মা উঠার।
বাবা বলে উঠলো,
– প্রিন্স মা ঘুমাক, আমরা এসে কথা বলে নিব। সারা রাত ঘুমায় নি।
ইশান বাবার দিকে তাকিয়ে বললো,
– তোমার অনেক কাজ পাপা। এখন থেকে অফিসের কাজে সময় কম দিও। আমি যতক্ষণ বাসায় থাকি মাকে দেখবো। তোমার কাছে আসলে একটু কম বকবে৷ জানোই তো মা একটু যত্ন চায়।
ইমরান হাতে ঘড়ি লাগাতে লাগাতে কিঞ্চিৎ হেসে ছেলেকে বলে,

– তুমি সামলে নিও। আমি তো সময় পাইনা।
– উফ পাপা আর ঠিক হলে না। আমিই তো সামলাই। কতখানি সময় দাও মাকে? তুমি হাসবেন্ড হিসেবে খুবই পঁচা।
– আর পাপা হিসেবে?
– পাপা হিসেবে বেস্ট হলেই হবে না, হাসবেন্ড হিসেবেও হতে হবে। আমি চাইনা আমার বোন কষ্ট পাক।
– বোন যে বুঝলে কি করে?
– মন বলছে।
– ভাই হলে?
– তাতেও সমস্যা নেই। দুজন মিলে তোমাকে আর মাকে জ্বালাবো।
ইমরান হাসছে ছেলের বাচ্চামো দেখে। দুজন সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে কথা বলছে। নিচে সকলে অপেক্ষারত। হালকা সেমাই খেয়ে মিষ্টিমুখ করে বেরিয়ে পড়লো ঈদের জামাতের উদ্দেশ্যে। মুসলিম জাহানের তাৎপর্যপূর্ণ দুটি উৎসব। ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আযহা। এক মাস সংযমের পর আসে ইদুল ফিতর। সালাতের মধ্যে দিয়ে শুরু হয় উৎসবের আয়োজন। মসজিদ থেকে বের হয়ে সকলে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো। মিনহাজ ইমরানের সাথে কথা বলতে বলতে প্রশ্ন করলো,

– তোর কি শরীর খারাপ?
ইমরান অন্যমনস্ক ছিলো। ধ্যান ফিরে বললো,
– নাতো ঠিক আছি আমি।
– ঘুমাস নি সারা রাত? চোখ মুখ শুকনো লাগছে।
– দুশ্চিন্তা হচ্ছে। মোনালিসা এখনো ছোট। সব সামলে উঠতে পারবে কিনা? আমি ঠিক কতখানি যত্ন নিতে পারবো।
মিনহাজ হেসে বলে,
– আমার মেয়েকে আমি চিনি। ও দিব্যি সব সামলে ঘর মাতিয়ে রাখবে।
– নেক্সট ডেট কখন তোমার কেমোর?
– নেক্সট উইক। আর ভালো লাগেনারে। খুব কষ্ট হয়। কদিন থাকব এভাবে?
– আল্লাহ ভরসা। কষ্টের পর আল্লাহ স্বস্তি দেন।

চারদিকে তোলপাড়, ভাঙচুর। ঢাকার আবাসিক হোটেল রেস্ট ইনের দশম তলার ৯০৪ নাম্বার কক্ষে রক্তের গড়াগড়ি। একজন প্রাপ্ত বয়স্কা নারীর হাত জখমী এবং সেই সাথে অল্প বয়স্ক ছেলের মাথা ফাটানো। অঝোরে ঝরছে রক্ত। এদের হাসপাতালে নেয়ার সাহস কারো নেই। বার বার হাত করজোড়ে মাফ চাইছে। অথচ মনিবের হৃদয় প্রস্তরখন্ডের দ্বারা তৈরি। তন্ন তন্ন করে খুঁজেও যখন নিজের বাচ্চা মেয়েটাকে পেলো না তখন স্বাভাবিক মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে হিংস্র জাদুঘর ড্যানিয়েল ওরফে দস্তগীরের। হোটেলের সি সি টিভি ক্যামেরা চেক করে যা বুঝলো সিস্টার এডামেরী মেয়েকে নিয়ে লনে হাঁটছিলো। এরপর তারা গেইটের বাইরে গেলো। ফিরলো এডামেরী একা। সাথে মেয়ে নেই। এডামেরী এবং ড্রাইভার রড্রিগেজ এর ভাষ্যমতে মেয়ে রোজলিপ কে চোখের সামনে দিয়ে উঠিয়ে নিয়ে গিয়েছে কারা যেন। সেই অভিনব মুহুর্তের কোনো প্রমাণ মিললো না ড্যানিয়েলের। সন্দেহের তীরটা যার দিকে তাকে ঠিকভাবে সন্দেহ করা যাচ্ছেনা। আজ ঈদ। মেয়ের অপহরণ হয়েছে গত রাতে, অথচ সে জেনেছে কিছুক্ষন আগে। যাকে সন্দেহ করবে সে জানেই না ড্যানিয়েলের মেয়ের সন্ধান এবং আসল পরিচয়। তবে কে করেছে এই কাজ! এই মেয়েই তার শেষ সম্বল। প্রথমদিকে মেয়ের জন্মের পর তার মায়ের সাথে যোগাযোগ বন্ধ করেছিলো। যেদিন মেয়ের মুখ দেখলো সেদিন থেকে আর ভুলে থাকতে পারেনি ছোট্ট পাখিকে। বেশি বাড় বেড়েছিলো মারিয়া। তাই চিরতরে শেষ করে মেয়েকে নিজের করে নিয়েছে ড্যানিয়েল। হুড়মুড় করে বেরিয়ে পরলো হোটেল কামরা থেকে। ম্যানেজারের সাথে কিছুক্ষন আগে খারাপ ব্যবহার করেছে। অথোরিটিকে জানিয়েছে। সকলের এক কথা, হারিয়েছে তার মেয়ের গভর্নেসের কাছ থেকে। হোটেল থেকে নয়। এই দায়িত্ব হোটেল নেবেনা। মেয়ের উপর জাদুবিদ্যা খাটাতে পারছেনা। এর একটাই কারণ তার বন্ধু বা শত্রু কেউই জানেনা মেয়ের কথা। এদিকে আধ্যাত্মিক শক্তি খাটাতে গেলে মেয়ের জীবন বিপদগ্রস্ত হতে পারে। রাস্তায় ছুটছে পাগলের মতো। জীবনে কোনো সম্পর্কের ভ্যালু দেয় নি। কিন্তু এই এক জায়গায় আসলে নিজেকে নিজের রূপে রাখতে পারেনা। ভালোবাসার পিতা হতে বাধ্য হয়। কি খেয়েছে মেয়েটা রাত থেকে! মেয়েটা কি বেঁচে আছে! বাবাকে স্মরণ করছে না!

খান বাড়ির লিভিং এরিয়াতে উৎসব লেগেছে। গল্প আড্ডায় মাতোয়ারা। হাম্মাদ এসেছে কিছু সময় আগে। সাথে নিয়ে এসেছে দস্তগীরের অবুঝ কন্যা রোজলিপকে। সকলে ভেবে নিয়েছে ইমরানের বন্ধু হাম্মাদের মেয়ে। মেয়েটা চেয়ে চেয়ে দেখছে। ইমরান মেয়েকে দেখেই কোলে তুলে নিলো। পাশে বসিয়ে নিজ হাতে খাইয়ে দিচ্ছে। মেয়েটা কেমন শান্ত। কোনো হৈ-হল্লা নেই। ইমরান মুখে তুলে একটু করে পায়েস দিচ্ছে টুকটুক করে খাচ্ছে। ইশান,সোহান সবাই আদর করছে। মোনা উপর থেকে নেমে এই মেয়েকে দেখে এগিয়ে এলো। কোলে নেয়ার জন্য হাত বাড়াতেই চোখের পলক ফেলে মেয়ে দেখছে। যতটুকু ধারণা করা যাচ্ছে এই মেয়ে মানুষ চিনে না। যেখানে আদর পায় সেখানেই ঘেষে। এই যে এতক্ষন ইমরানের হাতে অনায়াসে খেয়ে নিলো। এখন মোনার কোল ঘেষে মোনার গাল ছুঁয়ে দিচ্ছে, চূড়ি ধরছে, শাড়ি ধরছে। সবাই দেখছে ব্যাপার। মোনা প্রশ্ন করলো,

– মা তোমার আমাকে পছন্দ হয়েছে?
ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে এক দৃষ্টিতে। হাম্মাদ বলে উঠলো,
– ভাবী জি, শী ডাজেন্ট এওয়্যার অফ দিজ এক্সেন্ট?
মোনা জিভে কামড় দিয়ে বললো,
– স্যরি স্যরি।
পুনরায় বললো,
– ডু ইউ লাইক মি, সুইটহার্ট?
এবার বোধ হয় বাচ্চাটা বুঝলো। উপর নিচ মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিয়ে বললো,
– বিউটিফুল।
আইরিন হেসে বলে উঠলো,
– ভাবা যায়, বিউটিফুল সবাই চেনে। শুধু এই আহাম্মক, আমার ভাইটা চিনলোনা। আসতে যেতে বিউটিফুলটাকে বকে।
নয়ন সেই কথা মাটিতে পড়তে না দিয়ে সাথে সাথে বললো,
– কি যে বলো না আপা, আহাম্মক যদি বিউটিফুল না চিনে তো আহাম্মকের ঘরে কিভাবে নতুন ওয়ান্ডারফুল আসছে! আহাম্মক বিউটিফুলকে বশ করার মন্ত্র জানে। ভং ধরে থাকে আর কি না চেনার।
ইমরান নয়নের দিকে ক্ষীপ্ত চোখে তাকাতেই লিভিং এরিয়া নিস্তব্ধ। মানে এতক্ষনে ঘটনা ছড়িয়েছে। ইমরানের দীর্ঘ শ্বাস। একদিকে মনে হলো ভালোই হলো। মোনার যত্নে ঘাটতি হবে না। তবে নয়নের কথায় বিরক্ত হয়ে শান্ত স্বরে বললো,

– তোর এইজ প্রবাবলি আমার মতো। কথাবার্তা কেনো এখনো টিনেজদের মতো? সেন্সলেস টাইপ। বিব্রতকর কথাবার্তা কম বলবি।
নয়ন মুখটা পেঁচার মত করে চুপসে গেলো। ইমরান উঠে দাঁড়ায় ঠিক তখনই নয়ন বলে উঠলো,
– ইশ তুমি ভাবছো এভাবে ধমকাইয়া আমাকে থামাইতে পারবা? আমি থামবোনা। যা যা এখান থেকে। তুই এখানে থাকলেই পরিবেশ নষ্ট। হেড মাস্টারের মতো এটা করা যাবেনা, ওটা করা ঠিক নয় এসব চলে।
ইমরান উঠে আসতেই মিনহাজ ডাকলো,
– বস তো ও মজা করছে। সিরিয়াস হচ্ছিস কেনো?
– মাথা ব্যাথা করছে। তোমরা গল্প করো আমি আসছি।
– আমি চলে যাবো। বাসায় গেস্ট আসছে। আম্মা ফোন দিচ্ছে। তোরা বাসায় আয় সবাই। আব্বা-আম্মা দুজনই অপেক্ষা করছে তোদের একসাথে দেখার।

– ইনশাআল্লাহ আসবো।
ইমরান হাম্মাদকে বললো,
– হাম্মাদ ভাই তুমি একটু বিশ্রাম নাও। রোজ থাকুক সবার কাছে, খেলা করুক।
মোনা উঠে দাঁড়াতেই ফুফু শাশুড়ী বলে উঠলো,
– ও বৌ সাবধানে যা। ইমন ওরে ধর।
ইমরান ঘাড় ঘুরিয়ে মোনার দিকে তাকাতেই মোনা লজ্জা পেলো। এর মাঝে খালা বলে উঠলো,
– শুইনা রাখ বৌ, একটু সাবধানে চলবি। আর ইমরান বউরে কটা মাস জালাইস না বাপ, রাইতে সোহাগ করা লাগবোনা এই ক’মাস। তোর বাপ ভালা ছিলো। আপারে জালায় নাই। উফ তোর খালু এক্কেরে নাছোড়বান্দা ছিলো। বৌ হুন, এই বংশের পোলারা বহুত চালাক। পেটের ভিত্রে মায়েরে জ্বালায়। আগে আগেই লাত্থি মা*রে। ইমন আর ইশতু ও আপারে জ্বালাইছে। আইরিন জ্বালায় নাই। একটু খানা দানা ঠিক মত করিস।
উপস্থিত সকলের মুখ লটকে গিয়েছে। ইমরান স্তব্ধ হয়ে খালার দিকে চেয়ে আছে। নাকের গোড়া ফুলে উঠেছে। দাঁতে দাঁত লেগেছে। চোখ উঠিয়ে বোনের দিকে তাকিয়ে আছে ক্ষীপ্ত চোখে। নয়ন ঢোক গিলছে। এসব কথা বলার স্পর্ধা ইহজনমেও এই বাড়ির কারো হবেনা। এর মাঝে সোহান বলে উঠলো,

– তাহলে তো জমজ হলেই ভালো। ছেলেটা দুষ্টুমি করলে মেয়েটা সামলাবে।
ফুফু ধমকায় বলে,
– বৌটার বয়স দেখছোস নাতি! এত অল্প বয়সে চার বাচ্চা কেমনে সামলাইবো।
নয়ন ভ্রু কুচকে বলে,
– ফুফু দুই বাচ্চা, চার বাচ্চা নাতো।
– ইমন আর ইশান আছেনা?
নয়ন তব্ধা খেয়ে বলে,
– ইমন বাচ্চা!
– বউ গো কাছে জামাইরা বাচ্চাগো মতনই সোহাগ পায়।
সকলের মুখে রক্ত যেন গায়েব মুহুর্তেই। ইশান বাবার দিকে তাকিয়ে দেখে বাবার নিরব খাম্বার মতো আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। ছেলে লজ্জা পেয়ে সামনে থেকে চলে গেলো, পিছু নিলো সোহানও। মিনহাজ, মনসুর উঠে দাঁড়ায়। এখান থেকে পালাতে পারলে বাঁচে। এই দুই বুড়ির মুখ গুলো, শুধু মুখ নয়। কামান একেকটা। যাচ্ছে তাই বলে। ফুফু মুখে পান দিয়ে বলে,

– বাপজান মশকরা করতাছি। যা তুই ঘুমাইতে যা। এহন থেইকা তো রাত জাগতে হইবো। বৌডার কখন কি লাগে। এই সময় বৌরে খুশি রাখলে পরে বাচ্চাডা খুশি থাকবে নে।
ইমরান কথা না বাড়িয়ে চলে গেলো। আর কিছুক্ষন দাঁড়ালে মান সম্মান সব হারাবে। মোনা কাতর গলায় বললো,
– ফুফু আপনাদের ছেলে রাগ করেছে।
খালা বলে উঠলো,
– তো কি হইছে। তুই আছোস কেন বৌ? যা সোহাগ কইরা রাগ কমা।
আইরিন ফুফু, খালাকে ধমকে বললো,
– তোমাদের দুইটার জ্বালায় ইমন অতিষ্ঠ। আজ অবধি কেউ এত সাহস পায় নাই এমন লাগাম ছাড়া কথা বলতে। আমি বললেও আতঙ্কে থাকি। এমনি কথা কম বলে। এখন তবুও সবার মাঝে থাকলে কিছুক্ষন বলে অথচ তোমরা যা শুরু করছো। ও দেখবা একেবারেই কথা বলা বন্ধ করে দিবে। পোলাপানদের সামনে ওরে এসব বলো তোমরা। পোলারাও শরম পেয়ে চলে গেছে। কদিন পর পোলা বিয়া করাবে। ওর কি বিয়ে করাটাই দোষের হইলো।
– দোষ তোগো। ও এরম তো ছিলোনা বানাইছিস কেন? কথাবার্তা কইতে চায় না। যা কয় মাইপা মাইপা কয়। কথা কইতে পয়সা লাগে। এত কতা পেডের ভিত্রে জমাইলে একদিন বাস্ট হইবো। বৌ হুন। তুই কতা বেশি কইবি। পেডের বাচ্চাটাও একটু চঞ্চল হউক। ওর ধাঁচ পাইলে গালডা এরম পেঁচার লাহান কইরা রাখবো। দেখতে কেমন লাগে।
নয়ন তাল দিয়ে বলে,
– একদম হক কথা খালা।

হাম্মাদকে পুরো বাড়ি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখালো ইমরান। নিজেদের পরিকল্পনা সাজিয়ে নিলো ইতিমধ্যে। রোজলিপ মোনার বিছানায় ঘুমিয়ে পড়েছে। মেয়েটার মুখে অন্যরকম মায়া। কিছুক্ষনের মাঝে সবার সাথে মিশে গিয়েছে। ওর অসুস্থতার কারণটা হয়তো অল্প বয়সে মা হারানোর ট্রমা থেকে হতে পারে। সব বাচ্চা তো একই রকম হয়না। ইশানের ভাষ্যমতে রোজ খুবই উইক। মোনার রুমে এখন ইশান, সোহান এবং মোনা। তিনজন মিলে কিছু একটা পাকাচ্ছে। ইশানের মাথায় ঘুরছে ড্যানিয়েলকে জব্দ করার ফন্দি। এদিকে সোহানের পরিকল্পনা আরো ভয়ংকর। সোহান চাইছে ড্যানিয়েলকে পুরোপুরি শেষ করতে। মোনা এই দুই ভাইয়ের কথা শুনে গালে হাত দিয়ে বলে,

– আমার মাঝে মাঝে মনে হয় আমি কোনো আন্ডার ওয়াল্ডের মাফিয়া ডনের বউ, আর আমার দুইটা মাফিয়া প্রিন্স আছে। আমি এদের দলের কুইন।
সোহান প্রতিবাদ করে বললো,
– আজ থেকে আপনার সদস্য পদ প্রত্যাহার করা হলো বড় মামী। এই অসুস্থ অবস্থায় এসব নিয়ে ভাবার দরকার নেই।
মোনা ধমকে বললো,
– দুজনই চুপ থাকো। অনেক ভেবেছো। এসব ভাবার জন্য তোমাদের মামা, বাবা আছে। নিজেদের ক্যারিয়ার নষ্ট করতে হবে না। মা*রামা*রি আমার পছন্দ না। সোহান বাবা নতুন প্রজেক্ট নিয়ে আগাচ্ছো ওটা নিয়ে থাকো। আর ইশান কলেজ শুরু হবে ঈদের পর। ইন্টার লাইফটা কিন্তু অনেক কঠিন।
ইশান মুখ লটকিয়ে বলে,
– বাদ দাও তো মা, আবার পড়া। ওটা আমার এমনি হয়ে যাবে। ঈদের দিন। এঞ্জয় করো।

অনেকটা মনের সাথে জোর খাটিয়ে এই বাড়িতে পা রেখেছে ইমরান। মোনা নিজেই প্রথমে আসতে চায়নি। মিনহাজ ইমরানকে ফোনে অনুরোধ করাতে সেই অনুরোধ অগ্রাহ্য করে মিনহাজকে অসম্মান করার মতো কাজ ইমরান করতে পারেনি। গাড়ি থেকে নেমে মোনা স্ট্যাচুর মত দাঁড়িয়ে আছে। ইশান এগিয়ে এসে বললো,
– মা চলো।
ইমরান নিজেও থমকে আছে। মিনহাজ বারান্দা দিয়ে অতিথিদের দেখে ছুটে নেমে এলো মনসুর সহ। উপরে এসে চুপচাপ লিভিং রুমে বসেছে সকলে। দাদী,দাদা,চাচী সবাইকে পেয়ে মোনা আজ ভীষণ খুশি। ইমরান নিরবে সব দেখছে। তার আপ্যায়নের ত্রুটি রাখছেনা বাড়ির মানুষজন। এমন সময় কলিংবেল বেজে উঠলো। সালমা দরজা খুলতেই দেখে মায়া দাঁড়িয়ে আছে। কেঁপে উঠলো অন্তরাত্মা। মনে মনে ভাবলো, আজই আসতে হলো ! রাতে আসলেও তো পারতো। তবুও জায়গা থেকে সরে ভেতরে আসতে দিলো। ব্যাগ নিয়ে ঢুকেই লিভিং এরিয়াতে সকলকে হাসি ঠাট্টা করতে দেখলো। নজরে পড়লো ইমরান এবং মোনাকে। মোনা একটা সন্দেশ খেতে খেতে বাবার সাথে গল্প করছিলো বাবার পাশে বসে। মায়াকে দেখে দাঁড়িয়ে পড়লো। চুপচাপ ইমরানের পাশে গিয়ে বসলো। এমন ঘটনায় মিনহাজ, নুরজাহান বেগম এবং মামুন সাহেব অবাক হলেও বাকিরা অবাক হয়নি। মায়া কথা না বলে চলে যাচ্ছে, পেছন থেকে সকলকে অবাক করে ইমরান ডেকে উঠলো,

– মায়া…
থমকে গেলো ডাক শুনে। ঘাড় ঘুরিয়ে সালাম দিলো। ইমরান সালাম নিয়ে বললো,
– কোথায় যাচ্ছো? বসো।
– না মানে… ভাইয়া আপনারা কথা বলেন। আমি একটু ফ্রেশ হই।
ইমরান একটু জোরেই খানিকটা হেসে বললো,
– ভাইয়া!!!
সালমা মুচকি হেসে বলে,
– মায়া এখনো আগের সম্পর্ক থেকে বের হতে পারে নি।
মাথানত মায়ার। নুরজাহান বেগম এবং মামুন সাহেব আতঙ্কে আছেন মেয়ে যদি কোনো কেলেঙ্কারি করে বসে, তবে মান সম্মান আর কিছুই থাকবেনা। ইমরান পরিবেশ সহজ করতে প্রশ্ন করলো,

– তোমার হাসবেন্ড আসেনি?
– জ্বি এসেছে। কি যেন একটা কাজ পড়লো। আমাকে আগে আসতে বললো।
– আচ্ছা। ফ্রেশ হয়ে বিশ্রাম নাও। আমরাও উঠবো। অনেকক্ষন হলো আসলাম। ভালোই হলো দেখা হয়ে গেলো।
ইশান, মনসুর এবং সালমা অবাক হয়ে দেখছে। এত স্বাভাবিক ব্যবহার তো সেদিনের ঘটনার পর করার কথা নয়। মোনা একটি শব্দও উচ্চারণ করেনি। কারণ মোনা জানে ঠান্ডা মাথায় সমস্যা সমাধানে ইমরানের জুড়ি মেলা ভার। অনেকদিন পর ফুফুকে দেখে ইচ্ছে করছে ছুটে যেতে। সাহসে কুলোচ্ছে না। সহসা ইমরান নিজেই বলে দিলো,
– মোনালিসা যাও ফুফি থেকে দোয়া নিয়ে এসো। নতুন একটা স্টেজে পা দিতে যাচ্ছো, বড়দের দোয়া খুব দরকার। তোমার লাইফের খুব বড় অংশ জুড়ে তোমার ফুফি আছে।
মোনা যেন এর জন্যই অপেক্ষা করছিলো। শোনা মাত্র ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরলো মায়াকে। মায়া এতটা আশা করেনি। চোখ বেয়ে জড়িয়ে পড়ছে অশ্রু। নুরজাহান বেগম আঁচলে চোখ মুছলেন। মিনহাজ হাসছে। বোনের মাঝে পরিবর্তন টা সে আসার পরই হয়েছে। মনসুর সব জানিয়েছে। ভাইয়ের অসুস্থতার কথা শুনে সেদিনই মায়ার মনে হয়েছিলো জীবনটা খুব সংক্ষিপ্ত। ভাই ও যদি মেয়েটার জীবন থেকে হারিয়ে যায় বাঁচবে কি করে! সারাদিন ভাইয়ের কাছে বসে কেঁদেছে। নিজের ভুল কতখানি বুঝতে পেরেছে মায়া নিজেও বুঝতে পারছেনা তবে সে চায় ভাইঝি সুখে থাকুক। এখন আর কোনো মোহ তাকে টানেনা। বর মানুষটাও খারাপ না। দেখতে দেখতে বিয়ের চারমাস তো চলেই গেলো। খানিকটা মানিয়ে নেয়ার চেষ্টাও করছে। মোনাকে জড়িয়ে ধরে বললো,

– মুনিয়া, মা ভালো আছিস?
কান্নার তোড়ে কথা আটকে আসছে মোনার। উপর নিচ মাথা ঝেকে বললো,
– হুম তুমি?
– তোকে দেখে ভালো হয়ে গেলাম? কি স্টেজের কথা বললো ইমরান ভাই?
মোনা ইমরানের দিকে তাকাতেই ইমরান চোখের পলক ঝাপটে ইশারা দিলো। মোনা দুচোখ মুছে হেসে বললো,
– তুমি ফুফু দাদীয়া হবে।
মায়াসহ বাকিরাও অবাক। মিনহাজ হাসছে। দাদী এবং সালমার অজানা ছিলো, জেনে ছুটে এগিয়ে এসে মোনাকে জড়িয়ে ধরলো। এই বাড়িতে গোপন ছিলো। সেটাও ফাঁস হয়ে গেলো। এই দৃশ্যটা বাড়ির পুরুষদের এতটাই ভালো লাগলো সবাই একসাথে বলে উঠলো,
– মাশা আল্লাহ ।
মনসুর টেবিলের উপর থেকে রসমালাইয়ের প্যাকেট খুলে সবার আগে ইমরানের মুখে গুজে বললো,
– আগে আপনি খান।
ইমরান হেসে পুরোটা মুখে নিতেই ইশান বলে উঠলো,
– পাপা ভুলে গেলে তুমি স্যুগার খাও না।
ইমরান টিস্যুতে মুখ মুছতে মুছতে মোনার দিকে তাকিয়ে বললো,
– একদিন খাওয়াই যায়, তাই না মোনালিসা?

একে একে সবাই মিষ্টি মুখ করলো। মায়া আজ প্রাণভরে দোয়া করলো। মনে কোনো কষ্ট রাখেনি। ভাইঝির সুখবর শুনে নিজের মনেও সুপ্তবাসনা জাগ্রত হলো মা হওয়ার। একটা গুছানো সংসার করার। আজ স্বামী আসলে তাকে জানাবে বলে পরিকল্পনা কষে নিলো আপন মনে। নিজের মাঝে এই পরিবর্তন আসা খুব প্রয়োজন ছিলো। সেই সাথে ভাইয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা। মিনহাজ উঠে দাঁড়ায় এবং বোন ও মেয়েকে বুকে জড়িয়ে বলে,
– এমন ভাবে থাকিস সবাই। আমি যদি না ও থাকি আমার আফসোস নেই।
মায়া কান্না বিজড়িত কণ্ঠে বললো,
– কোথাও যেতেই দিবোনা আমরা তোমাকে। আল্লাহ অবশ্যই আমাদের জন্য তোমাকে সুস্থ রাখবেন।
ততক্ষনে মায়ার স্বামী এসেছেন। হাসি আড্ডায় মেতে উঠেছিলো বসার ঘর৷ মোনা সকলকে ও বাড়ির যাওয়ার দাওয়াত দিলো। বাড়ি থেকে বের হয়ে গাড়িতে উঠেই ইশান বললো,
– পাপা আমাদের ঘুরা শেষ?
ইমরান বললো,

– রাত হয়েছে তো! আর কোথাও যেতে চাও নাকি?
মোনা গাল ফুলিয়ে দু গালে হাত দিয়ে বসে আছে। ইশান মুখ ভেঙচি দিয়ে বললো,
– অবশ্যই। তুমি বলেছিলে আমাদের ফুচকা খাওয়াবে।
রবিন বলে উঠলো,
– ঈদের দিন সব বন্ধ না?
– জানতাম চাচ্চু, তোমরা এমন কথাই বলবে।
ইমরান পেছনে বসা স্ত্রী পুত্রের দিকে তাকিয়ে বললো,

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৪৮

– ফুচকাই তো খেতে চাও তাই না?
দুজনই মাথা ঝাঁকায়। ইমরান সাঁয় দিয়ে বললো,
– রবিন বাড়ি চলো। আজকে সবাইকে আমি ফুচকা বানিয়ে খাওয়াবো। চলবে?
ইশান,মোনার চোখ চকচক করে উঠলো। দুজনই একসাথে হাই ফাইভ দিয়ে বলে উঠলো,
– দৌঁড়াবে…

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৫০