প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ৩২
Sadiya Jahan Simi
গাড়ির ভেতরে নীরবতা বিরাজ করছে। ডিসেম্বরের রাতের শহরে তত একটা শীত পড়ছে না আজ। শপিং মলের রাস্তা ছেড়ে অন্য রাস্তায় গাড়ির মোড় নিতেই ভ্রু কুচকালো রাফসা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বুঝতে পারল শপিংমলের রাস্তা ক্রস করে চলছে তাদের গাড়িটি। রাফসা তড়িঘড়ি করে জিজ্ঞেস করল এ কে কোথায় যাচ্ছেন আপনি শপিংমলের রাস্তা আমরা পেছনে ফেলে এসেছি
উদ্যান ড্রাইভিং এর মাঝে এক পলক তাকাল রাফসার পানে। উত্তরের আশায় চেয়ে আছে সে।উদ্যান পাত্তা দিল না । ফের সামনের দিকে তাকিয়ে ড্রাইভিং এ মনোযোগ দিল।উদ্যান কে কথা বলতে না দেখে রাফসার মেজাজ মুহূর্তে হারিয়ে গেল। রেগে বলল, ”সমস্যা কি?কথা বলছেন না কেন! কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন!”
”চুপ করে বসে থাক। তোর একশোটা বোরকা চাই না? তাহলে এত কথা বলছিস কেন! বলেছিলাম তো একশোটা টা বোরকা দিব যদি একটা শর্ত মানিস।”
” বোরকা কিনে দিতে তো শপিং মলে যেতে হবে আপনি ওদিকে কোথায় যাচ্ছেন বুঝলাম না আপনার কাহিনী বলবেন আপনি কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন
উদ্যান এবার ঠান্ডা স্বরে বলল, বিয়ে করতে।
উদ্যানের কথা শুনে হতভম্ব হয়ে তাকালো রাফসা । বিয়ে করতে মানে ? কার বিয়ে,কিসের বিয়ে!কাকেই বা বিয়ে করতে যাচ্ছে! ওর মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লো। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
”ফাজলামো করছেন আমার সাথে! কিসের বিয়ে করতে যাচ্ছেন আপনি? একবার করে হয়নি! নাকি আর একটা বউ লাগবে? কয়টা লাগে আপনার! অসভ্য পুরুষ কোথাকার।”
রাফসার রাগি কথাগুলো শুনে উদ্যান ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো খানিক। মেয়ে মানুষের এই এক সমস্যা। পুরো কথা না শুনে লাফাবে। বুঝে কম চিল্লায় বেশি। হুদাই চেঁচাচ্ছে। আর রাফসা রাগে ফেটে পড়ার উপক্রম। মন চাচ্ছে এই লোকটার মাথায় একটা বাড়ি মেরে বিয়ের ভূত তাড়িয়ে দিতে। কত বড় খারাপ লোক একটা। শর্তে বোরকা কিনে দিবে আর শর্তটা হচ্ছে সে আরেকটা বিয়ে করবে! তাহলে ওকে এভাবে বিয়ে করেছিল কেন ? উদ্যান কতটা ভালোবাসা ওকে সেটা তো জানে।তাহলে এখন এসব কথা বলছে কেন। উদ্যান আড়চোখে তাকায় বউয়ের দিকে। রাগে ঠোঁট কামড়ে ধরে রেখেছে। চোখজোড়া বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। যেন এক্ষুনি খেয়ে ফেলবে তাকে।
” কথা বলছেন না কেন! আপনি আমাকে রেখে আবার বিয়ে করবেন? এতো বড় সাহস আপনাকে কে দিল!”
” আজব কি করলাম! এভাবে রেগে যাচ্ছেন কেন? আপনি নিজেই তো বললেন আমার সাথে সংসার করবেন না। আমি বউ ছাড়া তো আর থাকতে পারি না। তাই আরকি দ্বিতীয় বিয়ে করতে হচ্ছে।”
রাফসা ভ্রু কুঁচকে বলল, ” আমার সাথে ফাজলামি হচ্ছে! নাটক কম করো পিও। কোথায় যাচ্ছেন সেটা বলুন।”
উদ্যান একইভাবে বলল, ” বললামই তো বিয়ে করতে।”
” সেই সাহস আছে আপনার?” জানতে চাই রাফসা। উদ্যান হাসছে মনে মনে প্রচুর।
” হ্যাঁ অবশ্যই আছে। আমার আবার বরাবর সাহস একটু বেশিই। সেটা আপনি খুব ভালো করেই জানেন।”
উদ্যানের কথায় রাফসা শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে নিচু হয়ে জুতো খুলে ফেলল। পা জোড়া উপরে তুলে ঢেলান দিয়ে বসল। তারপর উদ্যানের কোলের উপর পা রেখে গম্ভীর গলায় বলল,
” কি বলছিলেন যেন? আবার বলুন।”
উদ্যান ভ্রু কুঁচকে নিজের কোলে থাকা এক জোড়া পায়ের দিকে তাকিয়ে দৃষ্টি সরিয়ে আনলো রাফসার পানে। কত বড় সাহস হচ্ছে মেয়েটার।
ভ্রু কুঁচকে বলল, ” আপনি তো দেখি ভারী বেয়াদব।”
” আর আপনি তো দেখি ভারী অসভ্য লোক।” রাফসার এহেন কথায় উদ্যান থতমত খেয়ে গেল। শুরু থেকেই অসভ্য তকমা লাগিয়ে আসছে। আজ অব্দি এটাই বহাল ওর জন্য।
” শেষ বার জিজ্ঞেস করছি। কোথায় যাচ্ছেন, বলুন।
” বিয়ে করতে।”
” আপনি করতে যাচ্ছেন বিয়ে! কাকে?”
” তোকে।” সংক্ষিপ্ত উত্তর উদ্যানের। কিন্তু এতে রাফসার চোখ বের হয়ে আসার উপক্রম। এই লোক কি বলছে!
অবাক হয়ে বলল, ” আমাদের তো একবার বিয়ে হয়েছে। তাহলে আবার কিসের বিয়ে!”
” সেটা রেজিস্ট্রি হয়েছে শুধু। ইসলামিক বিয়ে হয়নি এখনও। আজকাল মনটা বেশ অবাধ্য হয়ে যাচ্ছে। পুরোপুরি বৈধতা ছাড়া কিছুই করতে পারছি না। ভেবেছিলাম আনুষ্ঠানিক ভাবে বিয়েটা করব। এখন সেই পরিস্থিতিতে নেই আমি।”
উদ্যানের কথার মানে খুব স্পষ্ট করেই বুঝতে পারল রাফসা। ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
” গাড়ি থামান। আমি করব না আপনাকে বিয়ে।”
উদ্যান হুট করেই গাড়ি থামিয়ে দিল। রাস্তায় গাড়ি সাইড করে বসল। রয়েসে বলল, ” আইনিভাবে আমরা স্বামী-স্ত্রী। তাহলে এখন ইসলাম অনুযায়ী বিয়ে করতে প্রবলেম কি?”
” আমি বোরকা কিনতে এসেছি। বিয়ে করতে নয়।” কথাটা খানিক জোরেই বলল রাফসা। উদ্যান খানিক চুপ থেকে ঠান্ডা স্বরে বলল,
” তার ব্যস্ততাই তো করছি।”
” মানে কিভাবে?”
উদ্যান হাসলো খানিকটা। বুঝানোর মতো করে বলে উঠলো, ” দেখ ,তোর একশো টা বোরকা চাই। তাই না?”
রাফসা উপর নিচ মাথা নাড়ল। মানে একশো টা বোরকা চাই তার।
” ছোট আম্মু তোকে কখনোই এতো গুলো বোরকা নিতে দিবে না। আমি বলেছি যখন নিয়ে দিব। কিন্তু তার একটা শর্ত আছে। আমাদের এখনো ইসলাম অনুযায়ী বিয়ে হয়নি। তুই শুধু তিনবার কবুল বলবি। আর আমার তরফ থেকে তার বিনিময়ে একশো টা বোরকা নিবি। এটা ভালো হবে না?”
রাফসা মুহূর্তেই ভাবতে বসল। উদ্যান আবারো বুঝাতে বলল,
” ভেবে লাভ কি! আমাদের অলরেডি বিয়ে হয়ে গিয়েছে। তিন কবুল বলবি না আমার নামে?”
” তিন কবুল বললে সত্যি সত্যি বোরকা নিয়ে দিবেন এতো গুলো?” খুবই উৎসাহী কন্ঠ শোনালো।
” হ্যাঁ নিয়ে দিব বললাম তো। তোর বার্থডে গিফট হিসেবে আঠারোটা বোরকা দিলে এখন তিন কবুলের বিনিময়ে একশোটা বোরকা দিব না। ভাবলি কি করে?”
” আচ্ছা বলব। আমাকে বোরকা নিয়ে দিলে।”
ব্যাস কাজ হয়ে গেল। বিজয়ের হাসি ফুটে উঠল উদ্যানের ঠোঁটের কোণে। মনে করেছিল বেশ বেগ পেতে হবে। কিন্তু আজ কোনো কষ্টই করতে পারলো না। উদ্যান জানে রাফসা বোরকার জন্য অনেকটাই পাগল। কিন্তু এতোটা পাগল হবে ভাবতে পারেনি।
গাড়িটি এসে থামল একটি বাড়ির সামনে। এক তোলা বিশিষ্ট বাড়িটি খুব নিপুণ ভাবে যেন তৈরি। উদ্যানের সাথে রাফসা গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো। বলল,
” এখানে এসেছি কেন?”
উদ্যান কিছু বলল না। রাফসার হাত নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরে এগোলো বাড়ির দিকে। কলিং বেল দিতেই একজন ছেলে এসে দরজা খুলল। সালাম দিতেই উদ্যান হাসি মুখে সালামের উত্তর দিয়ে বলল, ” হুজুর বাড়িতেই তো?”
ছেলেটা মাথা নেড়ে বলল, ” হ্যাঁ আব্বু বাড়িতে আছে ভাইয়া।”
ভেতরে বসার পাঁচ মিনিট বাদেই একজন হুজুর এলো। তাকে দেখে দু’জনে সালাম দিল।
” কি অবস্থা বাবা? কত বড় হয়ে গিয়েছো। এই তো সেদিন কায়দা নিয়ে এসে আরবী পড়তে। দেখতে দেখতে কত সময় চলে গেল।”
উদ্যান হাসলো। হুজুর রাফসার দিকে তাকিয়ে বলল, ” এই সে,যার কথা বলেছো ফোনে!”
” হ্যাঁ হুজুর। ছোট আব্বুর মেয়ে।”
হুজুর অবাক হয়ে বলল, ” রাজিবের মেয়ে! মাশাআল্লাহ কত বড় হয়ে গিয়েছে। সেই ছোট্ট একটা বাচ্চা দেখেছিলাম। কিন্তু ফ্যামিলি ছাড়া মানে ঠিক বুঝতে পারলাম না।”
” জ্বী। আমাদের রেজিস্ট্রি হয়েছে আরো তিন বছর আগে। এখন ইসলামিক বিয়ে করতে চাইছি। ফ্যামিলিকে সময় হলে জানাবো।আর আপনাকে তো টুকটাক কিছু বললাম।”
” হ্যাঁ বুঝেছি। তাহলে শুরু করি।” হুজুর যাবতীয় সব কিছু পড়ে রাফসাকে বলল,
” বলো মা কবুল।”
রাফসা কবুল না বলে উদ্যানের দিকে তাকিয়ে বলল, ” সত্যি সত্যি কবুল বললে বোরকা নিয়ে দিবেন তো?” উদ্যানের কপাল চাপড়াতে মন চাইছে।হায় আল্লাহ! রাফসার কথায় হুজুরের দু ছেলে এবং হুজুর অবাক। বলল,
” উদ্যান কি বলছে ও?”
” কিছু না হুজুর। তারপর রাফসার দিকে তাকিয়ে হেসে ধীর কন্ঠে শুধায়, ” কবুল বলে দাও বউ। সত্যি সত্যি নিয়ে দিবো।”
রাফসাকে আর পায় কে? চটপট করে বলে দিল তার শখের পুরুষের নামে তিন কবুল। উদ্যানও বলল।সবশেষে মোনাজাত ধরল তারা কয়েকজন।
” ভাই আমি একটু শপিং মলে যাই?”
রনির কথায় আভিয়ানের মনোযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। রনি বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। আভিয়ান রুমের ভেতরে তার কাজে ব্যস্ত। হুট করে ডিস্টার্ব করাতে মন চাইছে এক্ষুনি বাইরে গিয়ে রনির ঘাড় থেকে মাথাটা নামিয়ে দিতে। কিন্তু এই অবস্থায় এখন বাইরে যেতে পারবে না। চিড়চিড় করে রেগে বলল,
” আমার পার্সোনাল টাইমে এসে বাগড়া দিচ্ছিস তুই?”
” সরি ভাই। আপনি আপনার কাজ করুন।”
কথাটা বলেই আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালো না রনি। তড়িঘড়ি করে নেমে এলো। ভয়ে বুক কাঁপছে ওর। ভুলেই গিয়েছিল ব্যাপারটা। আভিয়ানকে আজকাল বড্ড অচেনা মনে হয়। একেকবার একেক রুপ তার। রনির মাঝেমধ্যে মনে হয় সব ছেড়ে ছুড়ে বেরিয়ে যেতে। কিন্তু সংসারের টানে পারে না। যে কাজে জড়িয়ে গিয়েছে সেখান থেকে ফিরলেও ফ্যামিলির উপর চাপ পড়বে। বিভিন্ন বিপদ হবে তার মা বাবা বোনের। চোখটা ঝাঁপসা হয়ে এলো বোনের কথা ভাবতেই। নিয়তি এতো খারাপ হলো কেন ওর। এমন এক লোকের নজর কেন পড়েছে তার ছোট্ট বোনটার উপর।উওর খুঁজে পায়না রনি। নিয়তির নির্মম পরিহাস ভেবেই নিয়েছে।
প্রত্যেকটা দোকান ঘুরে ঘুরে শাড়ি, লেহেঙ্গা বিভিন্ন কিছু দেখছে। অবশেষে একটা দোকানে বেগুনি রঙের শাড়ি পছন্দ হয় রাফসার। পাড়ে গোল্ডেন কালার কাজ করা। দরকারি আরো কিছু জিনিস কেনাকাটা শেষ করে রাফসা নিঃশ্বাস ফেলে। এবার উদ্যানের পালা। ছেলেরা গায়ে হলুদে সাদা পাঞ্জাবি পড়বে। সেই অনুযায়ী উদ্যান সাদা পাঞ্জাবি কিনল। তাদের কেনাকাটা সম্পুর্ন শেষ হতেই রাফসা বলল ,
” এইবার বোরকার দোকানে চলুন।”
উদ্যান আড়চোখে তাকায় বউয়ের দিকে। এখন না পুরো শপিং মল মাথায় তুলে। গম্ভীর গলায় বলল,
” তুই কসমেটিকস কি কি নিবি কিনে নে। আমি বোরকা কিনে আনছি।”
রাফসা বাদ সাধে, ” উঁহু আমিও যাবো। আপনি এটা পারবেন না।”
” পারব। তুই যা। আমি আসছি। আর তোর হয়ে গেলে গাড়িতে গিয়ে বসবি। এখানে দাঁড়িয়ে থাকার দরকার নেই।” রাফসাকে আর কিছু বলার সুযোগ দিল না উদ্যান। গটগট পায়ে সামনে এগিয়ে যায়। পেছনে রাফসা রেগে তাকিয়ে আছে। অগ্যতা আর দাঁড়িয়ে না থেকে বাম দিকে লেডিস কর্ণারে ঢুকে ।
রাফসা সেই কখন গাড়িতে এসে বসেছে। তখন প্রায় তিন চারটা দোকানে উদ্যান কে খুঁজল। কিন্তু পায়নি। বিরক্ত হয়েই চলে এসেছিল গাড়িতে। এখন আরো বিরক্ত লাগছে। কেন যে জোর করে গেল না তখন। ধুর ভালো লাগে না। তখনই গাড়ির দরজা খুলে ভেতরে আসে উদ্যান। রাফসা তাকায়। হাত খালি দেখে ভ্রু কুঁচকে বলল,
” বোরকা কোথায়?”
স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে গম্ভীর গলায় বলল, ” ডিকিতে রয়েছে।”
” ওহ। একশো টা এনেছেন তো?”
উদ্যান ভ্রু কুঁচকে বলল, ” কিসের একশো টা!”
আঁতকে উঠল রাফসা। ” মানে? আপনি বলেছেন কবুল বললে সত্যি সত্যি একশো টা বোরকা কিনে দিবেন। তাহলে এসব কি কথা?”
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ৩১
” হুঁ,মগের মুল্লুক তো। বলেছিলাম বোধহয়। একশো টা আনিনি। ওতো টাকা নেই আমার বউ। বাই দ্যা ওয়ে,দশটা এনেছি।”
উদ্যানের কথায় রাফসা স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। কি বলছে এই লোক? তারমানে ওকে ভুলিয়ে ভালিয়ে লোভ দেখিয়ে কবুল বলিয়েছে! আর রাফসা সেই ফাঁদে পা দিয়ে কবুল পড়েছে এই লোকটার নামে!
