অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫০
তোনিমা খান
যেই দেশ কেবল ছিনিয়ে নিতে জানে, সে দেশে দ্বিতীয়বার পা রাখার সাহস কখনোই হয়ে ওঠেনি এরোজের। যদি অবশিষ্ট স্মৃতিটুকুও কেউ কেড়ে নেয়?
এই শঙ্কা থেকেই গত পাঁচ বছরে বিদেশের মাটিতেই সে নিজের স্থায়ী ঠিকানা গড়ে তোলে। আজন্ম আভিজাত্যের মাঝে বেড়ে ওঠায় জীবন থেকে সেই শান-শওকত আজও পিছু ছাড়েনি। তাই, স্থায়ী নাগরিকত্ব পাওয়ার পরপরই, একা মানুষের জন্য যতটুকু প্রয়োজন, তার চেয়েও কয়েকগুণ বেশি বিলাসবহুল এক বাড়ি কিনে।
টরন্টোর ডাউনটাউনের জনপ্রিয় একটি আবাসিক এলাকা ‘পালমারস্টন লিটল ইতালি’ যেখানে নিশাত ও তার স্বামীর নিজস্ব আবাস।
সেখান থেকে এরোজের কর্মস্থল খুব নিকট হওয়ায় সেও সেখানেই দুই তলার ডিটাচড একটি বাড়ি কেনে।
আর ভাইয়ের এইসকল চাহিদায় তপোবন স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাহায্য করেছে।
নিজেদের ভুলের প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে ছেলেটা যখন যা করতে চেয়েছে তাতে সঙ্গ দিয়েছে। তবুও ছেলেটা ভালো থাকুক!
কিন্তু কে জানত সৃষ্টিকর্তার মর্জি! যেই বাড়িটির কোনায় কোনায় শুধু একাকীত্ব আর অযত্ন ছিল, আজ সেই বাড়িটি একটু একটু করে সেজে উঠছে প্রিয় মানুষগুলোর জন্য।
বাড়িটির সবচেয়ে সুন্দর কামরাটির অবয়ব আজ আমূল বদলে গেছে। যে ক্যাবিনেটে একসময় সারিবদ্ধভাবে মদের বোতল সাজানো থাকতো, সেখানে আজ জায়গা করে নিয়েছে প্রসাধন আর নারীদের প্রাত্যহিক প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ। ঘরজুড়ে এখন চুলের তৈজসপত্রের আধিক্য। ফুলদানিতে সগৌরবে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে সতেজ ল্যাভেন্ডার। আলমারিতে পুরুষালি পোশাকের রাজত্ব ঘুচিয়ে স্থান করে নিয়েছে মিহি সুতোর মেয়েলি পোশাক।
তার ঠিক পাশের ঘরটিতে সেজে আছে এক ঝাঁক ডল, প্রিন্সেস ড্রেস, চকলেট, ড্রাই ফ্রুটস আর একটা ছোট্ট বাই সাইকেল।
দীর্ঘ দুই ঘন্টার পরিশ্রম শেষে নিশান্ত, নিভা আর এরোজ কোমরে হাত চেপে উষ্ণ নিঃশ্বাস ফেলল।
তিনজনের দীর্ঘশ্বাসের শব্দে ভিডিও কলে থাকা তপোবন বিমর্ষ মুখে স্মিত হাসি ফুটে উঠল। বলল,
–“এই মুহূর্তে জবে জয়েন করাটা খুব জরুরী, এরোজ?”
অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুলো ঘাঁটতে ঘাঁটতেই এরোজ ব্যস্ত কণ্ঠে বলল,
–“পনেরো দিনের বিল এসেছে পঁয়তাল্লিশ লক্ষ্য টাকা সেটাও আনুষাঙ্গিক খরচ বাদে। এতে করে আমি বড়জোর ছয়-সাত মাস চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারব। এরপর?”
ছেলের কথায় বিছানায় বসা তকদির সিকদার কঠিন চোখে তাকালেন বড় ছেলের দিকে। তপোবন ইশারায় পুনরায় আশ্বস্ত করে বাবাকে। ভাইয়ের উদ্দেশ্যে নম্র স্বরে বলে,
–“ভাইজান আছি তো, এরোজ। টাকা নিয়ে কেন দুশ্চিন্তা করতে হবে?”
এরোজের মুখশ্রী থমথমে হয়ে গেল। কঠিন গলায় বলল,
–“তাকে ভরণপোষণের জন্য আমিই যথেষ্ট। তোমাদের কারোর সাহায্যের প্রয়োজন নেই।”
–“এখানে সাহায্যের কথা আসছে না, এরোজ। আমি মৌনতা আর নায়েলের কথা ভেবে বলছি। নায়েল এখনো নিশান্ত, নিভার সাথে পুরোপুরি মিশতে পারেনি। ও কি করে তোকে ছাড়া থাকবে?”
কর্মে ব্যস্ত হাত দুটো থেমে যায় এরোজের। ইদানিং নায়েল তার উপর ভরসা করতে শিখছে, এতটাই ভরসা করছে যে ঘুমের ঘোরেও তাকে ছাড়তে চায় না।
পরিস্থিতির জটিলতায় ধূসর নেত্রদ্বয় টলটল করে উঠল।
তবুও বুকে পাথর চেপে বলল,
-“তিন ঘন্টার জন্য নায়েল ওর নানুর কাছে থাকতে পারবে।”
–“আর মৌনতা? ডাক্তার তো বলেছে এই সাতদিন ওর সাথে সবসময় কেউ থাকতে পারবে। এই মুহূর্তে ওর সাথে একজন থাকাটা কত জরুরী! ওর সাথে কে থাকবে?”
–“সে বেশিরভাগ সময় ঘুমেই থাকে। তিন ঘন্টা খুব বেশি সময় না।”
এরোজের ত্যাড়া কণ্ঠে তপোবন বিতৃষ্ণা ভরা কণ্ঠে বলল,
–“এর থেকে ভালো হতো রোজকেও সাথে করে নিয়ে গেলে।”
এরোজ বিরক্ত হয়ে গেল।
–“রোজ শুধু শুধু কেন ইয়ার লস দেবে?”
সোফায় ঝিমাতে থাকা রোজ সরব খলবলিয়ে উঠল। ক্ষোভে ফেটে পড়ে বলল,
–“আমার পড়াশুনা চাই না, আমার মৌন বউকে চাই। আমি যাবো মৌন বউয়ের কাছে।”
এরোজ অসন্তোষের দৃষ্টি ফেলল বোনের দিকে। একই সোফায় বসা তপোবন হাত বাড়িয়ে বোনকে বুকে আগলে নেয়। আদুরে গলায় বলল,
–“আর তো চার মাস রোজ, এরপর পরীক্ষা। তখন যাবে মৌনর কাছে।”
–“চার মাস অনেক সময়, ভাইজান। প্রিয় মানুষগুলো হারিয়ে গেলে আমি পড়াশুনা দিয়ে কি করব?” রোজের চোখ চিকচিক করছে। তপোবন নিরুত্তর! রোজ এবার বাবার দিকে তাকায়। অনুনয় করে বলে,
–“আব্বু, প্লিজ। আমি যাই, পরীক্ষা আগামী বছর দেবো।”
ঘরের মেয়েরা তকদির সিকদারের খুব কাছের। তারা ঘরে থাকলে ঘরকে ঘর মনে হয়। এই ঘরের প্রাণ যে এই বাড়ির মেয়ে, বউ আর নাতি নাতনিরা। দু’জন তো এমনিতেই নেই, মেয়েকে দূরে যাওয়ার অনুমতি দেয়ার সাহস আর হলো না তকদির সিকদারের।
সে মৃদু হেসে স্নেহের কণ্ঠে বললেন,
–“চার মাস চোখের পলকে কেটে যাবে, আম্মিজান। তার পরে যেও, বাবা কিছু বলব না।”
রোজ আহত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রেগে বেরিয়ে গেল কক্ষ থেকে। তকদির সিকদার সে পথে চেয়ে চাপা নিঃশ্বাস ফেললেন। সবাইকে ছাড়া এই বৃদ্ধ কি করে থাকবে তা কেউ বোঝে না!
তপোবন দীর্ঘশ্বাস ফেলে কর্মরত এরোজকে শুধায়,
–“নায়েল কোথায়?”
–“খালামনি আর ওর নানুর কাছে। রাতের খাবার খাচ্ছে। আমি এর মধ্যে হাতের জরুরী কাজগুলো শেষ করছি।”
তপোবনের চোখেমুখে বিমুগ্ধতা। চাপা স্বরে বলল,
–“এই ঘরটা তো তোর ছিল।”
এরোজ ব্যস্ত কণ্ঠে বলল,
–“হুঁ, কিন্তু উনি আসলে ওনার জন্য এই ঘরটা ভালো হবে। বড় বারান্দা থাকায় এই ঘরে আলো বাতাস বেশি।”
তকদির সিকদার আড়চোখে চেয়ে শোনেন ছেলেটির দুশ্চিন্তাভরা কণ্ঠ। এত দায়িত্ব, এত দুশ্চিন্তা, এত যত্ন করতে পারা ছেলেটা কি করে ছয় বছর যাবৎ মৃত মানুষের মতো বেঁচে ছিল? চোখেমুখে আর সেই উদাসীনতা নেই বরং দায়িত্ববোধের গুরুগম্ভীর ছায়া।
তকদির সিকদার গাম্ভীর্যতা ভেঙে উঁচু গলায় বললেন,
–“তোমার ভাইকে বলো, সব বিষয় নিয়ে ত্যাড়ামো না করতে। আমি আমার মেয়েকে গাঙের জলে ভাসিয়ে দিয়ে তার উপর ছেঁড়ে দেইনি। মৌনতা আমার মেয়ে ,আমার দায়িত্ব! ওর যেখানে যা প্রয়োজন তা আমি দেবো। তুমি এত অধিকার দেখাতে পারো না।”
বাবার কথায় এরোজের কর্মব্যস্ততা রুখে গেল ক্ষিপ্র বেগে। সে ল্যাপটপের দিকে ঝুঁকে গিয়ে হিসহিসিয়ে বলল,
–“মৌনতা আপনার মেয়ে এটা আপনার আগে মনে পড়েনি? যখন আপনার ঘরে বসে, আপনার চোখের সামনে আপনার ছেলে তাকে তিলে তিলে মারছিল তখন খেয়াল হয়নি? একবার ও নিজের মেয়ের চেহারা দেখেও মনে হয়নি, সে ভালো নেই? এখন এসেছেন মরার আগে করুনা দেখাতে? প্রয়োজন নেই আপনার করুনার, আমি তাকে যেভাবে পারি সেভাবে সুস্থ করে তুলব। কিন্তু তার উপর আপনাদের আর কারোর ছায়াও পড়তে দেবো না।”
–“এরোজ!”, তপোবন গুরুগম্ভীর কণ্ঠে শাসায় ভাইকে। এরোজ ফুঁসতে ফুঁসতে রেগে কল কেটে দিল।
তকদির সিকদার তেতে উঠলেন বড় ছেলের উপর।
–“দেখলে? ওই ছেলে কেমন করলো? আমি কি করে স্বামী স্ত্রীর মধ্যকার ব্যক্তিগত সমস্যা বুঝবো? আর আমরা যদি নেওয়াজ সাহেবকে না রাজী করতাম, তবে কি সে মৌনতাকে কানাডাতে নিতে পারত? আর না দেখাতে পারত এত অধিকার! সে কি করে আমিও দেখব। কিন্তু মৌনতার একটুও কোথাও সমস্যা হলে তাকে আমি ছেড়ে কথা বলব না। তার জেদের কারণে আমি মৌনতার কিছু হতে দেখতে পারব না।”
তপোবন অতিষ্ট হয়ে বলল,
–“শুধু শুধু চিৎকার করে কেন মেজাজ খারাপ করছো, আব্বু? আমি তো আছি। সমস্যায় পড়লে ও নিজেই ছুটে আসবে, আমাদের বলা লাগবে না। তুমি জানো না ও কত পাগল! যেই মানুষটা একটা মেয়ের জন্য নিজের সারাজীবন নষ্ট করতে রাজী, সে কি করে সেই মেয়েটিকে চোখের সামনে অনাদরে মরতে দেবে? মৌনতার যা প্রয়োজন ও যেকোনো মূল্যে হাজির করবে।”
তপোবনের কণ্ঠে দৃঢ় বিশ্বাস! আর তার দৃঢ় বিশ্বাসকে সর্বদাই নিদারুণভাবে জিতিয়ে দেয় তার রগত্যাড়া ভাইটি।
ভোরের আলো ফোটার আগে হাসপাতালে হাজির হওয়া মানুষ তিনজনকে দেখে মৌনতা ম্লান হাসল। চোখেমুখে খানিক প্রসন্নতা। ডক্টর এই সাতদিন চব্বিশ ঘন্টা তার পাশে কাউকে থাকার অনুমতি দিয়েছে। বক্ষস্থলে জমা অজস্র ব্যথারা খানিক ফিকে পড়ে কারোর সান্নিধ্যে। নয়তো অলস মস্তিস্ক ভীষণ পীড়া দেয় সদ্য ফেলে আসা জীবনের পাশবিকতা।
কেমো শুরু করার ঠিক পনেরো মিনিট আগে এরোজকে ডক্টর জরুরী তলবে ডাকলো।
ইদানিং জীবনের প্রতিটা সেকেন্ড ওর কাছে এক-একটি মৃত্যুযন্ত্রণার ন্যায় লাগে। প্রতিটি টিক-টিক শব্দে যেন সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আর্তনাদ! সময়ের এই নিষ্ঠুর চাকা অবিরত ঘুরছে, আর প্রতিটি মুহুর্তে যেন ওই মায়াবী মুখটি দুবার গতিতে অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
এরোজ কক্ষে ঢুকে চিন্তিত কণ্ঠে শুধাল,
–“কোনো সমস্যা ডক্টর? চিকিৎসা এখনো শুরু করছেন না কেন?”
ডক্টর ভীষণ গুরুগম্ভীর গলায় নিজ ভাষায় বললেন,
–“গতকাল মিটিং এ তোমায় একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানানো হয়নি, এরোজ। চিকিৎসা শুরু করার আগে তোমায় বিষয়টা জানানো প্রয়োজন।”
–“জি ডক্টর, বলুন।”
ডক্টর এক পল থামলেন। চোখে চোখ রেখে শুধালেন,
–“কাগজপত্র অনুযায়ী মৌনতা তো ডিভোর্সী। তবে তুমি ওর কি হও?”
কঠিন এক প্রশ্ন! তবুও হাতে সময় খুব কম। তাই সে বিনা দ্বিধায় বলল,
–“আমি তার কি হই জানি না, কিন্তু সে আমার সবকিছু। আপনি বলুন কি বলবেন।”
ডক্টর মৃদু হাসলেন। বললেন,
–“আমি তোমার কনসার্ন দেখেই এমনকিছু বুঝেছিলাম। তাই তোমাকেই ডাকলাম। তোমার জানার কথা, মৌনতা যেহেতু একাধিক শক্তিশালী কেমোথেরাপি নেবে, সেক্ষেত্রে তার প্রজনন ক্ষমতা অনেক কমে যাবে। যদি সুস্থ হয়েও যায় ভবিষ্যতে তার মা হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে না। আবার হতেও পারে কিন্তু বিষয়টা অনেক অনেক সময়সাপেক্ষ আর বিরল।”
বদনের সবটুকু অস্থিরতা এক মুহুর্তের জন্য থমকে গেল। চোখের সামনে অজস্র রঙিন স্বপ্নগুলো বিবর্ণ হয়ে গেল। কিন্তু ঠিক পর মুহুর্তেই নায়েলের আদুরে মুখটি ভেসে উঠল, ভেসে উঠল সুস্থ সবল মৌনতার হাসিমাখা মুখটি। অনতিবিলম্বে ছেলেটির কঠিন মুখে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। এই মানুষ দু’টো পাওয়া মানেই তো গোটা দুনিয়া জিতে যাওয়া।
সে তৎক্ষণাৎ দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
–“উই অলরেডি হ্যাভ আ চাইল্ড, ডক্টর! নো প্রবলেম! জাস্ট গিভ মি মাই লাইফ ব্যাক, দ্যা ওয়ে শি ওয়াজ। আই ডোন্ট নিড এনিথিং!”
ডক্টর মৃদু হেসে বলল,
–“ওকে! আই উইল ট্রাই মাই বেস্ট। জাস্ট প্রে ফর হার।”
এরোজ কঠিন মুখে বেরিয়ে আসে। চোখেমুখে অজস্র স্বপ্ন ভঙ্গের ক্লেশ নয় বরং দৃঢ়তা। ছেলেটা যে স্বপ্ন ভাঙার বিদঘুটে অভিজ্ঞতায় অভিজ্ঞ! তাই আজ আর স্বপ্ন দেখে না সে বরং জেদ করে। এ জীবনে মানুষটাকে ফিরে পাওয়াই যে তার একমাত্র জেদ। ঐ রবের দুয়ারে বুকভরা জেদ নিয়ে প্রতিবার দাঁড়ায় এবং রব কি করে ফিরিয়ে দেয় সেও দেখতে চায়।
চিকিৎসা শুরু হয় নির্দিষ্ট সময়ে। একজন ব্যতীত কক্ষে কেউ ঢোকার অনুমতি পায় না। নিশাত আর এরোজ ভেতরে ঢুকলো না। মাসুমাকে সম্পূর্ণ জীবানুমুক্ত করে ভেতরে ঢোকনো হয়।
সেন্ট্রাল লাইনের মাধ্যমে ডনোরুবিসিন নামক লাল এক তরল পদার্থ আর সাইটারাবিন নামক স্বচ্ছ এক তরল পদার্থ তখন মন্থর গতিতে মৌনতার দেহে প্রবেশ করছে। আর ঠিক ততটাই মন্থর গতিতে মৌনতার দেহ নিস্তেজ হতে শুরু করে শারীরিক অক্ষমতায়।
কিউবিক কাঁচের গ্লাসটি থেকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা এরোজ ফিসফিসিয়ে বলল,
–“স্যরি!”
‘স্যরি’ বাতাবরণ ও বোধহয় প্রশ্নবিদ্ধ হলো। কেন এই স্যরি? অন্যদিকে কেমো’র অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় নিজের শারীরিক শক্তি হারাতে থাকা মেয়েটির বুকে তখনো বুকভরা শক্তি, আশা আর প্রতীক্ষা।
এইতো আর একটু কষ্ট! সপ্তাহ কাটলো বলে! তারপরই তার ছুটি, আর নায়েল তার বুকে থাকবে। মৌনতা হাসিমুখেই শরীরের বিরূপ প্রতিক্রিয়াগুলো সহ্য করতে লাগল।
এরোজ হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আসে দ্রুত। দশটা নাগাদ তাকে অফিসে থাকতে হবে। পেশায় একজন এরোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হওয়ায় বিমানের আধুনিক নকশা এবং এর নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে তাকে কাজ করতে হয়। তার মূল কাজ, উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে বিমানের জ্বালানি সাশ্রয় করা এবং কানাডার প্রতিকূল আবহাওয়াতেও বিমানের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা। ঠিক এই কারণেই চাইলেও তার ঘরে বসে কাজ করার কোনো সুযোগ নেই। যতটুকু সময় কাজ করতে হয়, স্বশরীরে কাজ করতে হয়।
নায়েল আর মাসুমাকে এখনো নিজের বাড়িতে নেয়নি এরোজ। নিশাত যেতে দেয়নি। সে থাকতে কেন শুধু শুধু ঐ বাড়িতে একা একা রান্না করে খাবে! এরোজ নাকচ করেনি অন্তত নায়েলকে খাপ খাওয়াতে হবে। মৌনতা যখন ফিরবে তখনি সবাইকে একসাথে নেবে।
যদিও নায়েল পোরশু রাতে তার সাথে গিয়েছিল তার বাড়িতে, কিন্তু ঘুমন্ত অবস্থায়।
নিশাত আর এরোজ বাড়ি ফিরতেই দেখলো নিশান্ত আর নিভার মাঝে নায়েল থম মেরে শুয়ে আছে। সদ্য ঘুম থেকে ওঠার অলসতা চোখেমুখে। এরোজ রুমে ঢুকতেই নায়েল ঘাড় কাত করে তাকায়। ঘুম জড়ানো নেত্রে চেয়ে বলে,
–“নটি বয়! আমায় লেখে কোথায় গিয়েছিলে?”
এরোজ জবাব দেয়ার আগেই নিভা উচ্ছ্বসিত কন্ঠে হড়বড়িয়ে বলল,
–“ব্রো, তোমায় আজ আমি যেই খবর দেবো তুমি খুশিতে আমায় দশ ডলার দিয়ে দেবে।”
এরোজ নায়েলের কাছে এগিয়ে যেতে যেতে শুধায়,
–“কি?”
–“আগে বলো দশ ডলার দেবে।”
–“দেবো।”
এরোজের কথায় নিশান্ত চোখ বড় বড় করে চেয়ে বলল,
–“তাহলে আমি বলছি ব্রো, আমায় দশ ডলার দাও। নায়েল ঘুম থেকে উঠে তোমায় পাপা পাপা বলে ডেকেছে আর খুঁজেছে।”
নিভা রাগে দুঃখে চেঁচিয়ে উঠল,
–“ভাইয়া, আমি ব্রো’র থেকে দশ ডলার আগে চেয়েছি। তুমি কেন বললে? ব্রো ডলার আমায় দেবে। ওকে দেবে না।”
তাদের ডলারে পানি ঢেলে দিয়ে এরোজ থমথমে মুখে বলল,
–“ও ঘুমের মধ্যে এমন অনেকবার আমায় পাপা বলে ডাকে। কিন্তু ও আমায় না, ইমরোজকে খোঁজে! দু’টো ব্যবসায়ী সর এখান থেকে।”
ভাইয়ের কথায় নিভা হতাশ হয়ে ধুপধাপ পা ফেলে বেরিয়ে গেল। এরোজ নায়েলকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে আদুরে গলায় বলল,
–“আমার মা উঠে গিয়েছে? ঘুম ভালো হয়েছে?”
নিশান্ত ফোড়ন কেটে বলল,
–“আজ সানি ডে ব্রো! ঘুম ভালো না হলেও, দিন ভালো কাটবে।”
সানি ডে ইদানিং কিছুটা বিরল টরেন্টোতে। টানা কদিন বরফ পড়ার পর আজ রোদ দেখা যাচ্ছে। নায়েল আলগোছে এরোজের কাঁধে মাথা এলিয়ে দিল। অলস কণ্ঠে বলল,
–“মাম্মা কোথায়? মাম্মা যাবো।”
এরোজ মলিন মুখে বলল,
–“তোমায় বলেছিলাম না, মাম্মা একটু অসুস্থ তাই কিছুদিন তাকে হাসপাতালে থাকতে হবে? আবার কদিন পর সুস্থ হয়ে চলে আসবে।”
–“কখন আসবে?”
–“খুব শিঘ্রই, মা। চলো আমরা ব্রাশ করি তারপর মজার কাস্টার্ড, বেরি আর চকলেট খাবো।”
পছন্দের খাবার গুলোর নাম শুনে নায়েল কিয়ৎকাল ভুলল মাকে। এরোজ তাকে খাইয়ে অফিসের জন্য তৈরি হতেই নায়েল বুঝে যায় সে বাইরে যাচ্ছে। সহসা সে গলা ফাটিয়ে কান্না জুড়ে দিল। শক্ত করে এরোজের গলা জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলল,
–“আমি এখানে থাকব না। আমাল ভয় কলে। ভালো লাগে না। ফুফি কোথায়? তানছান ভাইজান কোথায়?”
ক্রন্দনরত আর্তনাদটুকু কর্নকুহরে বিদঘুটে প্রদাহ সৃষ্টি করলো। মা ব্যতীত মেয়েটির চোখের পানি এফোঁড়ওফোঁড় করে দেয় এরোজের বক্ষস্থল। আর এক মুহুর্ত কাল বিলম্ব না করে একদম পুতুলের আপাদমস্তক তাকে শীতের কাপড়ে মুড়িয়ে বিছানায় বসায়। হাঁটু গেড়ে বসে জুতা পড়িয়ে দিতে দিতে হাসিমুখে বলল,
–“আমার মাকে রেখে কোথায় যাবো? আমার মাও যাবে আমার সাথে। ছোট পাপা কাজ করব আর তুমি তা দেখবে, ওকে?”
নায়েল ভদ্র বাচ্চার মতো ঘাড় দুলিয়ে বলল,
–“ওকে।”
এরোজ তার হাতে পায়ে, মুখে পর্যাপ্ত পরিমাণে ময়েশ্চারাইজার লাগিয়ে বের হয়। দুজনকে একদম তৈরি দেখে নিশাত হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
–“আমার কাছে রাখা যাবে না তোর মেয়েকে? আমি মারব?”
এরোজ ম্লান হেসে বলল,
–“কান্না করবে। এখনো এখানে খাপ খাওয়াতে পারেনি। তুমি তো জানো এদের চোখের পানি আমার সহ্য হয় না। চিন্তা করো না, ওখানে অনেক সুযোগ রয়েছে ওকে রাখার। আমার এক মেয়ে কলিগ আছে, ও নিজের বাচ্চা নিয়েই আসে। ওকেও ওর সাথে রাখব।”
–“আচ্ছা যা। কিন্তু ওর জন্য সাথে করে কিছু খাবার নিয়ে যা।”
নিশাত কিছু বেরি আর চকলেট দিয়ে দিল। এরোজ বহুদিন পর কাজে গিয়ে নিজের কলিগকে আর কলিগের তিন বছরের ছেলেটাকে পেল। কিন্তু নায়েল তার সাথেও খেলবে না।
অগত্যা সে নিজের অফিস কক্ষে ঢুকে তাকে ল্যাপটপে নায়েলকে কার্টুন ছেড়ে দিয়ে নিজের কাজের মগ্ন হয়।
ডেস্কে জমা তিন চারটা অসম্পূর্ণ ডিজাইনের ফাইল
সে কাজ শুরু করতেই তার বস আসল। গত রাতে এরোজের পাঠানো মেইলের বিস্মিত প্রতিক্রিয়া তার মাঝে। এরোজ খানিক বিরক্ত হলো বসের চাহনি দেখে।
ভদ্রলোক চেয়ারে বসতে বসতে বিস্ময় নিয়ে বলল,
–“তুমি প্রতিদিন তিন ঘন্টা করে কাজ করবে, এরোজ? এটা কি করে সম্ভব? সত্যি করবে তো? দেখো আমি তোমার ইমেইল একসেপ্ট করেছি কিন্তু রেগুলার না করলে কিন্তু আমি এবার কঠোর হবো।”
এরোজ গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বলল,
–“রেগুলার না করতে পারলে রিজাইন নিয়ে নেবো।”
বস ক্ষেপে গেল!
–“কথায় কথায় রিজাইন রিজাইন করো কেন? তুমিই একমাত্র ইমপ্লয়ী যার হুমকিতে কি-না বস ওঠাবসা করে। নেহাৎ তুমি আমার লাকি চার্ম, না হলে আমি তোমায় দেখে নিতাম!”
বস নামক এই মানুষটি এরোজের কাছে আসলেই খানিক নরম হয়। কারণ টানা তিনবার বড় বড় বিমানের দূর্ঘটনা থেকে সে বেঁচে গিয়েছে শুধু এরোজের কারণে। এর জন্যই এরোজ তার কাছে খুব লাকি! হাতছাড়া করতে ভয় পায়।
এমনকি তার সাথে খুব ভালো বন্ধুত্বপূর্ণ একটা সম্পর্ক! প্রায়শই বারে দু’জনকে মদ্যপানে নিমগ্ন দেখা যেতো।
বসের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এরোজের পাশের চেয়ারে বসা ছোট্ট একটা পুতুলের ন্যায় বাচ্চা। সে শুধায়,
–“বেবিটা কে?”
–“মেয়ে।”, এরোজ কর্মরত অবস্থায় জবাব দিল। বসের চোখ বেরিয়ে আসার উপক্রম! সে অবাক কণ্ঠে শুধায়,
–“তুমি না বলতে, তুমি সিঙ্গেল?”
এরোজ শান্ত দৃষ্টি ফেলল বসের দিকে। গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
–“আমরা এখন বারে নেই, স্যার। অফিসে আছি। যদি আজকের গুরুত্বপূর্ণ শিডিউলটা পাঠাতেন তবে আমার সুবিধা হতো কাজগুলো শেষ করতে। আমার হাতে সময় খুব কম।”
বস কথা বাড়ালেন না। ছেলেটা তো নেশার ঘোরে না থাকলে, পারতে সই কোনো কথা বলে না। সে গিয়ে শিডিউল মেইল করলেন।
প্রথমদিন শিডিউল খুব একটা টাফ হলো না। কাজগুলো তিন ঘন্টায় কমপ্লিট করতে পারবে। এরোজ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে এক পলক ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় নিজের বাহুতে। নায়েল বাহুতে মাথা ঠেকিয়ে মনোযোগ সহকারে কার্টুন দেখছে আর প্রিঙ্গেল খাচ্ছে।
এরোজ স্মিত হেসে ছোট্ট ললাট বরাবর ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়ে আবার কাজে মনোযোগ দেয়।
চোখ খুলতেই অক্ষীপটে ভেসে ওঠে নিত্য দিনকার অফ হোয়াইট রঙা দেয়াল, ইনফিউশন পাম্পের একঘেয়ে যান্ত্রিক শব্দ, কেমোর অদ্ভুত রাসায়নিক গন্ধ আর বড় একটি জানালা। যেখান থেকে সিএন টাওয়ারের শির ঝাপসা দেখা যায়। কিন্তু জানালার কাঁচগুলো এতটাই পুরু এবং বায়ুরোধী যে সবসময় একটি হালকা কৃত্রিম আলো জ্বলে থাকে। যা দিন আর রাতের পার্থক্য ঘুচিয়ে দেয়।
রোজকার ন্যায় একই বিদঘুটে দৃশ্য আর সামনে বিদঘুটে স্বাদের দুপুরের খাবার দেখতেই মৌনতা চোখমুখ কুঁচকে নিলো।
একটা শুকনো টোস্টের উপর আভোকাডো আর কাঁচা মাইক্রোগ্রিন আর এক প্লেটে বিট রুট আর কিছু অদ্ভুত স্বাদের সবজি, সাথে একটা অরেঞ্জ জুস। মৌনতা অসহায় দৃষ্টিতে তাকায় নার্সের দিকে আর মায়ের দিকে। নার্স নিরুদ্বেগ!
মাসুমা ম্লান কণ্ঠে বলল,
–“এগুলো না খেলে শরীরে শক্তি পাবি না তো।”
কেমোর কেবল অল্পকিছু ঘন্টা। তন্মধ্যেই শরীর অদ্ভূত প্রতিক্রিয়া দিতে শুরু করেছে। দেহ আস্তে আস্তে নিস্তেজ বলহীন হচ্ছে। যদিও এগুলো মৌনতাকে এখনো একটুও কষ্ট দিতে পারেনি। আর না মৌনতা পরিবর্তন গুলো বুঝতে পারছে। কারণ ভেতরে থাকা শক্ত সত্ত্বাটি ঘোরগ্রস্ত তার সন্তানের সাথে দেখা করার জন্য। তার জন্য হলেও তাকে শক্তভাবে লড়তে হবে।
মৌনতা নিজের উপর জোর করে হলেও খেতে লাগল। কিন্তু তিন চার লোকমা খেতেই অনুভব করল সে মুখে কোনো স্বাদ পাচ্ছে না। সে জোরপূর্বক খেতে নিলেও পেট উগড়ে সব বেরিয়ে এলো।
নার্স ছুটে এলো। চার দফায় বমি করে মৌনতার দেহ ধপ করে বেডে পড়ে যায়। নার্স নিজ ভাষায় জানালেন,
–“কেমোর প্রতিক্রিয়া শুরু হচ্ছে। মুখে স্বাদ পাবে না, বমি হবে তবুও খেতে হবে।”
কী যন্ত্রনাদ্বায়ক জোরজবরদস্তি! নার্সের কড়া আদেশে মৌনতাকে আবারও সেগুলো মুখে নিতে হলো। পানি দিয়ে গিলে গিলে খেতে খেতেই একটাসময় আবার বমি করে সব ফেলে দিল। সেবার আর ওঠার শক্তি অর্জন করতে পারল না দেহ।
অতলে ঢুকে যাওয়া আঁখিদ্বয় ঠিকরে অশ্রুরা বেরিয়ে আসে। এক একটা মুহুর্ত ভীষণ ভারী মনে হয়। মাসুমা বেগম মৌনতার গলা থেকে বমি মাখা টিস্যু গুলো ফেলে আসে।
মৌনতা ঘাড় কাত করে তাকায় পাশেই রাখা পান্ডাটির দিকে। নার্স গতকাল এটা ফেলে দিতে চেয়েছিল কিন্তু সে ফেলে দিতে দেয়নি। বরং এটাকেও স্যানিটাইজ করে রাখা হয় প্রতিদিন।
সে এরোজের কথা বিশ্বাস করেনি সেদিন। তবুও ফেলে দিতে মন মানেনি।
মৌনতা দূর্বল হাত বাড়িয়ে পুতুলটি হাতে নেয়। নেড়েচেড়ে দেখে ক্ষীণ স্বরে বলে,
–“এই পান্ডা! তুমি নাকি ম্যাজিক জানো? আমায় একটু মজার খাবার এনে দাও তো। না না আমায় একটু ফুচকা খাওয়াও তো।”
মাসুমা হাসল মেয়ের কান্ডে। শুধায়,
–“এটা ম্যাজিক জানে?”
মৌনতা দূর্বল কণ্ঠে বলল,
–“কে জানে! নায়েলের চাচু তো বলল, এটা ম্যাজিকাল পান্ডা। যা চাইব তাই দেবে।”
মাসুমা হেসে পান্ডাটিকে নেড়েচেড়ে দেখে।
কানের এয়ারপডটি চেপে ধরা এরোজের নেত্রদ্বয় সরু হয়ে আসে। অস্ফুট স্বরে আওড়ায়,
–“ফুচকা?”
সময়ের দিক থেকে টরেন্টো এগারো ঘন্টা পিছিয়ে বাংলাদেশ থেকে। তখন রাত প্রায় এগারোটা। তপোবন ছেলের ঘর থেকে নিজের ঘরে ঢুকতেই দেখলো রোজ রূপকথাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে বিছানায় আর রূপকথা বই পড়ছে। সোফায় শুয়ে থাকা জবা স্প্রিং এর মতো সোজা হয়ে গেল তপোবনকে দেখতে।
তপোবন নত শির ঢুকতে ঢুকতে বলল,
–“উঠিস না, ঘুমা। আমি চলে যাবো এখুনি।”
–“ক্যান ঘুমাইবেন না?”
ইদানিং রোজ আর জবাকে এখানেই ঝিমাতে দেখা যায় বেশি। তপোবন কাবার্ড থেকে একটা কম্ফোর্টার আর নিজের টিশার্ট ট্রাউজার নিতে নিতে বলল,
–“আমি তানশানের সাথে ঘুমাবো, তোরা সবাই এখানেই ঘুমা।”
পরপরই রোজের উদ্দেশ্যে বলল,
–“রোজ, ঝিমিয়ে না থেকে একটু পড়াশুনা তো করতে পারো।”
–“ইচ্ছে করছে না ভাইজান।”, রোজের ত্যাড়া কণ্ঠ। তপোবন গম্ভীর গলায় বলল,
–“পরীক্ষা ভালো না হলে কিন্তু কানাডায় যেতে পারবে না, রোজ। কথাটা মাথায় ঢুকিয়ে রাখো।”
রোজ অভিমানী চোখে তাকায়। রেগে বলল,
–“আমি একাই চলে যেতে পারব। তোমাদের কারোর অনুমতি আর সাহায্যের প্রয়োজন নেই আমার।”
–“হাউ ফানি! তুমি তো একা খুলনা থেকে ঢাকাই যেতে পারো না।”
ভাইয়ের কথায় রোজ জেদ চেপে চুপ করে বসে রইল। তপোবন এগিয়ে গিয়ে রাগান্বিত বোনের চুলগুলো এলোমেলো করে দিল।
রোজ তেতে উঠল,
–“মজা করবে না, ভাইজান।”
তপোবন হেসে তার নাক চেপে ধরে বলল,
–“সারাদিন এমন মন খারাপ করে পড়ে থেকো না। ভাইজানের ভালো লাগে না তোমায় এভাবে দেখতে। পড়াশুনা করো, নিজের যত্ন নাও, ব্যস্ত থাকো হাসিখুশি থাকো দেখবে সময় কেটে গিয়েছে। আর তখন আমরা সবাই মিলে একসাথে কানডায় যাবো।”
রোজের চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে গেল। সে চকিতে শুধায়,
–“সত্যি?”
–“তিন সত্যি। রূপকথার ও পাসপোর্ট করতে দিচ্ছি। আমরা সবাই একসাথে কানডায় যাবো এখন একটু হাসিখুশি থাকো।”
রোজ আনন্দে রূপকথাকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে উঠল।
–“ওহ্ ভাবিজান, আমরা সবাই একসাথে কানডায় যাবো। কি মজা!”
রূপকথা মৃদু হাসল। স্বামীর দিকে চেয়ে বলল,
–“আমার যাওয়ার প্রয়োজন নেই। আপনারা যান, আমি গেলে আব্বু আম্মার দেখাশোনা কে করবে?”
–“জবা আর মাজেদা চাচি করবে। এখন এই চিন্তা সবাই বাদ দাও আর পড়াশুনায় মনোযোগী হও।”
তবে এহেন কথায় জবার মুখ পাণ্ডুর হয়ে গেল। তপোবন হেসে ওঠে তার মুখ দেখে। বলে,
–“তুই ও যাবি জবা?”
জবা না বোধক মাথা নাড়ল! তপোবন তার মাথায় হাত রেখে বলল,
–“মৌনতা শিঘ্রই আবার চলে আসবে, তখন তুই সারাদিন ওর সাথে লেগে বসে থাকিস। আমি তোকে কাজ থেকে এক মাসের ছুটি দিয়ে দেবো তখন।”
জবা মন ভুলানো কথায় কান দেয় না। আবার ধপ করে শুয়ে পড়ে। তপোবন স্ত্রীর পানে এক পলক চেয়ে বলল,
–“বায়োলজির ওই অধ্যায় শেষ করেই ঘুমাবে।”
রূপকথা মৃদু হেসে মাথা নেড়ে সায় জানায়। মন বোঝা মানুষগুলো একটু বেশিই সুন্দর আর প্রেমময় হয়। মানুষটা কেমন করে বুঝেগেল, আজ রোজ আর জবা আপা তার সাথে ঘুমাতে চেয়েছিল!
তপোবন বেরিয়ে যেতে নিলে রোজ হাস্যোজ্জ্বল কণ্ঠে বলল,
–“থ্যাংক ইউ ভাইজান।”
তপোবন ফিরে তাকায়।
–“কেন?”
–“আমার একা একা ভালো লাগছিল না, তাই ভাবির কাছে ঘুমাতেই এসেছিলাম। তুমি বুঝে গেলে কি করে?”
তপোবন স্মিত হেসে বলল,
–“এর জন্যই তো আমি ভাইজান! ভাইজানরা সব বোঝে!”
রোজ মুগ্ধ চিত্তে হাসল। তার ভাইজান সবার থেকে আলাদা। না বলতেই সব বুঝে যায়! তপোবন যেতে যেতে বলল,
–“জবা, তুই আবার নিচে ঘুমাস না। উপড়েই ঘুমাস।”
–“আইচ্ছা ভাইজান।”, জবা গাল ভরে হেসে বলল। আগে যখনি ইমরোজ ভাইজান বাড়িতে না আসতো সে, মৌনতা ভাবি, রোজ আর নায়েল একসাথে ঘুমাতো। এই বাড়ির কেউ তাকে কাজের মেয়ে বলে অবজ্ঞা করে না। সম্মান করে, বোনের মতোই ভালোবাসে। রোজ মৌনতা নিজেদের জন্য যা কিনবে, তার জন্য ও একটা কিনবে।
নিশাতের কিচেনে ধুপধাপ শব্দ হচ্ছে। সে তড়িঘড়ি করে কিচেনে ছুটে এসে ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলল। সামনে এরোজ আর নিজের দুই ছেলে-মেয়েকে দেখে অসন্তোষের সাথে বলল,
–“তোরা কি ফুচকা বানাচ্ছিস নাকি লোহা পিটাচ্ছিস?”
মনোযোগ দিয়ে ফুচকা বানানোর ভিডিও দেখতে থাকা এরোজ তৃতীয়বারের মতো হতাশ হলো। বিরক্ত হয়ে বলল,
–“খালামনি, ফুচকা ফুলছে না কেন? প্লিজ কিছু একটা করো, আমার হাতে সময় খুব কম।”
নায়েল তখন এরোজের একগোছা চুল ধরে তার কাঁধে চুপটি করে বসে আছে। মাঝেমধ্যে এটা-ওটা নির্দেশ দিচ্ছে; সে বেশ আনন্দিত যে আজ ফুচকা খাবে!
নিশাত এগিয়ে এসে বলল,
–“ফুচকা কেন ফুলবে না? দে আমার কাছে। এতক্ষণ বসে তিনটা ফুচকাও বানাতে পারলি না? সর এখান থেকে, আমি বানাচ্ছি। তোরা গিয়ে আলু আর ডালগুলো ম্যাশ কর।”
খালার ধমক খেয়ে এরোজ আলু ভর্তা তৈরিতে লেগে পড়ল। নিশান্ত শসা ও লেবু কাটছে আর নিভা টক বানাতে ব্যস্ত। বিদেশে বড় হওয়ায় তারা নিজেদের সব কাজ নিজেরাই করতে অভ্যস্ত।
এরোজের ঘনিষ্ঠ এক সহকর্মীর বড় বোন লিরা। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হওয়ায় তাদের বেড়ে ওঠার পথটা ছিল কণ্টকাকীর্ণ। তবে সব বাধা পেরিয়ে দুই ভাই-বোন আজ প্রতিষ্ঠিত। প্রিন্সেস মার্গারেট ক্যান্সার সেন্টারের মতো প্রসিদ্ধ হাসপাতালের নার্স হিসেবে লিরা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।
একবার মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালিয়ে গুরুতর আহত হওয়ায় সেই সহকর্মীর মাধ্যমেই লিরার সাথে এরোজের পরিচয়। সেই থেকে দু’জনের মধ্যে এক অদ্ভুত স্নেহময় সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
এরোজ এবার লিরার হাত আঁকড়ে ধরল। চাপা স্বরে অনুনয় করে বলল,
– “প্লিজ, প্লিজ, প্লিজ লিরা, হেল্প মি। ইউ নো, আই লাভ ইউ সো মাচ ডিয়ার।”
লিরা রাগান্বিত স্বরে বলে উঠল,
– “তুমি আমাকে এভাবে ব্ল্যাকমেইল করতে পারো না, এরোজ। আমি তোমাকে মোটেই ভালোবাসি না। এসব করে তুমি কিছুই হাসিল করতে পারবে না; উল্টো আমার চাকরিটা হুমকির মুখে পড়বে।”
– “দরকার পড়লে আমি তোমায় সারাজীবন বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াব। প্লিজ লিরা, সাহায্য করো। তুমি তো সব জানো!”
লিরা অসহায় বোধ করে অতিষ্ঠ ভঙ্গিতে তাকাল। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
– “আমি ডাক্তারের থেকে শুনে আসছি আগামী আধা ঘণ্টা তিনি কী করবেন। তারপর বলছি।”
এরোজ খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেল। সবেগে তাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
–“থ্যাংক ইউ সুইটহার্ট!”
লিরা তেড়েফুঁড়ে দূরে সরে গিয়ে বলল,
–“ডোন্ট বোদার মি, এরোজ। আই হ্যাভ আ বয়ফ্রেন্ড!”
এরোজ হেসে রসিকতার সুরে বলল,
–“তাতে কী? আমি তবুও তোমায় ভালোবাসবো লিরা।”
–“আমার বয়ফ্রেন্ড তোমার হাত পা ভেঙে দেবে।”, লিরা রাগান্বিত স্বরে বলল। এরোজ আহত সুরে বলল,
–“ভালোবাসার বদলে আঘাত তোমার মতো কঠোর নার্স ই দিতে পারে, লিরা। যাও তোমায় ভালোবাসলাম না।”
লিরা গটগট করে চলে গেল। এরোজের মুখ থেকে রসিকতা মিলিয়ে গেল মুহূর্তেই। মিনিট দশেক বাদেই লিরা হন্তদন্ত হয়ে ফিরে এসে বলল,
– “তাড়াতাড়ি করো! কাজ শেষে সব প্রমাণ লুকিয়ে ফেলবে কিন্তু।”
এরোজ তাকে আশ্বস্ত করে নিজেকে যথাসম্ভব স্যানিটাইজ করে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল।
কামরায় ঢুকতেই তীব্র রাসায়নিক গন্ধ আর ইনফিউশন পাম্পের ‘বিপ বিপ’ অ্যালার্মের শব্দে এরোজের দৃষ্টি স্থির হলো ধবধবে সাদা বিছানার ওপর।
হাতের ব্যাগটা টেবিলে রাখতেই নার্স ফিরে তাকালেন। কড়া গলায় শুধালেন,
– “ব্যাগটা কি স্যানিটাইজ করা?”
এরোজ মাথা নেড়ে সায় দিল। কেমোর সময়সীমা যতই বাড়বে, মৌনতার রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ততই কমে আসবে। তাই ডাক্তাররা সংক্রমণের বিন্দুমাত্র ঝুঁকি নিতে নারাজ।
এরোজ এগিয়ে গিয়ে বলল,
– “ক্যান আই হ্যান্ডেল হার?”
– “ইয়েস।” নার্স মৌনতার ভার এরোজের হাতে সঁপে দিয়ে কিছু নির্দেশনা দিয়ে দ্রুত বেরিয়ে গেলেন।
বমি আর তীব্র গা-বমি ভাব, শরীর যেন একদমই নিস্তেজ। অসুস্থতার সাথে দীর্ঘক্ষণ লড়াই করে মৌনতা মাথা তুলে তাকাল। শারীরিক যন্ত্রণায় মন ও মস্তিষ্ক এতটাই ভারসাম্যহীন যে অতি নিকটে থাকা পরিচিত মুখটি দেখেও সে কোনো অস্বস্তি বোধ করল না।
মাস্ক ছাপিয়ে ধূসর নেত্রদ্বয়ে দূর্বল দৃষ্টি পড়তেই এরোজ স্মিত হাসল।
ক্ষীণ স্বরে বলল,
–“হাই!”
নারীটির চোখ থেকে অবাধে গড়িয়ে পড়ছে নীরব অশ্রুগুলো। বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলে মৌনতা মৃদু স্বরে বলল,
–“হ্যালো!”
চোখের কার্নিশ বেয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রু গুলো মুছে নেয় এরোজ। রোজকার ন্যায় শুধাল,
–“হাউ আর ইউ?”
মৌনতাও রোজকার অযৌক্তিক প্রশ্নগুলোর অযৌক্তিক জবাব দিয়ে বলল,
–“ফাইন।”
এরোজ অশ্রুসিক্ত নয়নে হাসল। মৌনতা একটু ধাতস্থ হতেই সে ওয়েট টিস্যু দিয়ে মুখ মুছিয়ে তাকে শুইয়ে দিল। ক্যাথেটারগুলো ঠিক করে দিতেই অ্যালার্ম শব্দ বন্ধ হলো। এরোজ পানির গ্লাস এগিয়ে ধরল, কিন্তু মৌনতার হাতটুকু তোলার শক্তিও অবশিষ্ট নেই।
তবুও সে চেষ্টা করল গ্লাসটা ধরার।
থরথর করে কাঁপতে থাকা শীর্ণ হাতটি দেখে এরোজের বুক ব্যথায় সংকুচিত হয়ে এল।
হাতের কাঁপন দেখেই স্পষ্ট বোঝা যায় দৈহিক যন্ত্রণা। এরোজ টলটলে নেত্রে খপ করে আঁকড়ে ধরে সেই হাতটি। শক্ত হাতে মুঠোবন্দী করে নিয়ে বলল,
–“ইটস ওকে, বল প্রয়োগ করতে হবে না।”
সে নিজেই মুখের সামনে পানি ধরে।
মৌনতা ব্যর্থতার ক্লেশ সইতে না পেরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। ক্রন্দনরত গলায় বলল,
–“আমি গায়ে কোনো বল পাচ্ছি না কেন?”
এরোজ শুকনো ঢোক গিলে বলল,
–“ওষুধের প্রভাবে,
হয়তো এমন হচ্ছে, কিছুদিন পরে ঠিক হয়ে যাবে আবার।”
মৌনতা বিশ্বাস করল, সে ঠিক হয়ে যাবে। এরোজ আড়ালে নিজের চোখের জল মুছে মুখে কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে তুলল।
হাস্যোজ্জ্বল কণ্ঠে শুধায়,
–“ফুচকা খাবেন?”
মৌনতা নিভু নিভু চোখে তাকায়। ক্ষীণ স্বরে শুধায়,
–“কিভাবে?”
এরোজ ভীষণ গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বলল,
–“আজ নিভা আর নিশান্ত ফুচকা খেতে চেয়েছিল। তাই খালামনি ফুচকা বানিয়েছে। নিয়ে এসেছি আপনার জন্য। খাবেন?”
মৌনতা ম্যাজিকে বিশ্বাস করে না। কিন্তু তার অসুস্থ দেহে হঠাৎ করেই উল্লাস ছুঁয়ে গেল। সে অসুস্থতা ভুলে হড়বড়িয়ে বলল,
–“আপনি সত্যি ফুচকা এনেছেন? আপনি কি জানতেন আমার ফুচকা খেতে ইচ্ছে করছে?”
এরোজ নিষ্পাপ ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
– “আমি কী করে আপনার মনের কথা জানব? খালামনি বানালেন, তাই নিয়ে এলাম।”
মৌনতা অবাক হয়ে বলল,
– “তারমানে ওই পান্ডাটা তবে সত্যি সত্যিই ম্যাজিক জানে? আমি আজ ওকে বলেছিলাম আমার ফুচকা খেতে ইচ্ছে করছে। আর দেখুন, আমার কাছে ফুচকা চলে এল!”
এরোজ চোখে হাসল। বলল,
– “হুম, আমি জানি তো। সেজন্যই এটা এনেছি। আমার অনেক বন্ধুর কাছে এই পান্ডা আছে, ওরা যা চায় সব পায়।”
– “আপনার কাছে নেই? আপনি কিছু চান না?”
– “চাই তো।”
মৌনতা উৎসুক চোখে তাকিয়ে বলল,
– “তবে আপনি যাকে ভালোবাসেন তাকেও চাইতেন।”
এরোজ স্মিত হেসে বলল,
– “আমি যাকে ভালোবাসি, সে সবসময়ই আমার কাছে ছিল।”
মৌনতা কপাল কুঁচকে তাকাল। মিনমিনে স্বরে বলল,
– “তবে আপনি এমন করেন কেন?”
– “কেমন?” এরোজ ব্যাগ থেকে বাটি বের করতে করতে জিজ্ঞেস করল।
– “ওই যে ছ্যাঁকা খাওয়া মানুষের মতো নেশা করে পড়ে থাকেন!”
মৌনতা বেশ ভয়ে ভয়ে কথাটা বলল। এরোজ মুখ তুলে তাকাতেই সে তড়িঘড়ি করে ভয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিল। এরোজ হেসে ফেলল। মিহি স্বরে বলল,
– “সে আমার কাছে আসে নেশার ঘোরে কিংবা ঘুমের ঘোরে। তাকে একনজর নিজের করে দেখার জন্য আমাকে নেশায় বুঁদ হয়ে থাকতে হয়, নয়তো গভীর ঘুমে। আর স্বাভাবিকভাবে আমার চোখে ঘুম আসে না; ঘুমের ওষুধ কিংবা নেশার আশ্রয় নিতে হয়।”
নিরাগ সহজ-সরল স্বীকারোক্তিতে মৌনতা ভীষণ অবাক হলো। মানুষটা এভাবে খোলামেলা কথা বলে তা তো জানতো না। তার ভয় খানিক কমলো।
এরোজ ফুচকা বের করতেই মৌনতার চোখ চকচক করে উঠল। কিন্তু হাত বাড়াতে গিয়েই টের পেল সে সম্পূর্ণ শক্তিহীন। মুহূর্তেই সব উল্লাস ম্লান হয়ে গেল।
সে ছলছল চোখে এরোজের ধূসর চোখের দিকে তাকাল।
তার অসহায় চাহনি দেখে এরোজ কোনো কথা না বলে টক ভর্তি একটি ফুচকা তার মুখের সামনে ধরল। মৌনতার মুখে কৃতজ্ঞতার হাসি ফুটে উঠল। সে অস্ফুট স্বরে ধন্যবাদ বলে ফুচকাটা গপ করে মুখে পুরে নেয়।
মৃদু কামড়ের আভাসে এরোজ আহ্ করে উঠল। মৌনতা ভয়ার্ত চোখে তাকালো। ফুচকা মুখে নিয়েই অস্ফুট স্বরে ক্ষমা চাইল। এরোজ কুঁচকানো মুখে গা দুলিয়ে হেসে উঠল। বলল,
– “আপনারা মেয়েরা খুব বোকা! আপনারা অনেক ধৈর্য নিয়ে নিজের ক্ষতি করেন, অথচ সুখের জন্য সামান্য কষ্টও সইতে চান না।”
মৌনতা তৃপ্তি সহকারে খাচ্ছে, এরোজের কথাগুলো হয়তো তার কানে পৌঁছাচ্ছে না। খাওয়া শেষ হতেই সে আবার অবোধ শিশুর মতো হাঁ করে রইল। মাস্কের আড়ালে এরোজ সরব শব্দ করে হেসে উঠল সেই দৃশ্য দেখে।
মৌনতা লজ্জা পেল। চোখে জল থাকলেও ঠোঁটের কোণে তখন স্মিত হাসি। সে বলল,
– “আমার ফুচকা খুব প্রিয়। যত অসুস্থই হই না কেন, এটা পেট ভরে খেতে পারি।”
এরোজ আর কিছু বলল না, একে একে ফুচকাগুলো তার মুখে তুলে দিতে লাগল। মৌনতা তৃপ্তি ভরে খেয়ে প্রাণ খুলে হাসল। এরোজ মুগ্ধ হয়ে সেই হাসি দেখল। কিন্তু মৌনতার সেই তৃপ্তি দীর্ঘস্থায়ী হলো না। ঠিক তিন মিনিটের মাথায় সে গল গল করে বমি করে দিল।
একবার করেই খান্ত হলো না, ততক্ষণ করলো যতক্ষণ না পেটের অবশিষ্ট খাবারগুলো বের হলো।
সকল আনন্দ, তৃপ্তি ফের মিলিয়ে গেল শারীরিক যন্ত্রণার কাছে। এরোজ বলহীন দেহে তাকিয়ে রইল নেতিয়ে পড়া দেহটির পানে। এটা তো কেবল শুরু, এর থেকে বিদঘুটে লড়াই যে সামনে অপেক্ষা করছে।
অসুস্থতার ক্লান্তিতে মৌনতা পাঁচ মিনিটের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ল। দীর্ঘক্ষণ পর যখন তার ঘুম ভাঙল, তখষ সে অবাক হয়ে গেল। কেননা ঘুমানোর আগে এরোজকে যেভাবে স্থির নয়নে তাকিয়ে থাকতে দেখেছিল, সে এখনও ঠিক সেভাবেই বসে আছে। মৌনতা পলক ঝাপটে ঘুম জড়ানো কণ্ঠে শুধাল,
অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৪৯
– “আপনি এখনও এখানে? কটা বাজে?”
বুকে হাত বেঁধে বসে থাকা এরোজ মৃদু হেসে বলল,
– “ভোর পাঁচটা।”
– “আপনি ঘুমাননি?”
এরোজ না বোধক মাথা নাড়লো। অস্ফুট স্বরে বলল,
–“যার জীবন তার থেকে পিছু ছুটে যাচ্ছে তার চোখে কি করে ঘুম নামবে?”
মৌনতা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল মানুষটার কথাগুলো কেমন যেন অদ্ভুত!
