অস্তরাগের রঙ পর্ব ১৪
তেজরিন উম্মীদ
ফারাজ ধীরপায়ে বিন-ব্যাগ থেকে উঠে দাঁড়াল। আলমারির পাল্লা খুলে নিজের ইস্ত্রি করা ধবধবে সাদা পাইলট ইউনিফর্মটার ভাঁজ থেকে সযত্নে বের করে আনল একটি কার্ড—তার লাইসেন্স। সেটি রুশদীর দিকে বাড়িয়ে দিতেই কার্ডের নকশা দেখে রুশদীর চোখ জোড়া ছানাবড়া হয়ে গেল—এটা পাইলট লাইসেন্স কার্ড। উপরে নামের জায়গায় স্পষ্ট অক্ষরে লেখা, ‘Sharfaraz Khan’
রুশদী কার্ডটি হাতে নিয়ে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে লাগল। মনের ভেতর খচখচ করছে—আসল তো? নাকি নকল? এই খাম্বা’র মতো লোকটা আবার পাইলট হয় কীভাবে? চেহারা দেখলে তো মনে হয় না পাইলট।ফারাজ এর আজগুবি ক্যারেক্টারের সাথে পাইলট পেশাটা বড্ড বেমানান লাগছে।কার্ডের ওপর ফারাজের নাম আর হাসিখুশি রঙিন ছবিটা জ্বলজ্বল করছে।খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে রুশদীর বিস্ময়ের মাত্রা আরও এক ধাপ বেড়ে গেল যখন তার নজর পড়ল ATPL লেখাটির ওপর। এটি কোনো সাধারণ লাইসেন্স নয়; বাণিজ্যিক বিমান চালানোর সর্বোচ্চ পর্যায়ের স্বীকৃতি, যা কেবল একজন অভিজ্ঞ ‘ক্যাপ্টেন’ হওয়ার যোগ্যতা দেয়। রুশদী পলকহীন চোখে তাকিয়ে রইল সামনে সগর্বে দাঁড়িয়ে থাকা ফারাজের দিকে।
রুশদীর কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা দেখে ফারাজ যেন মনে মনে বেশ মজা পাচ্ছিল। সে কিছুটা ভাব নিয়ে নিজের চুলগুলো কায়দা করে ঠিক করে নিল। রুশদী অস্ফুট স্বরে বিস্ময় ঝরিয়ে বলল,”ক্যাপ্টেন…?”
ফারাজ চুল স্টাইল করে জবাব দিল,”ইয়েস বেপস!”
রুশদীর ঘোর কাটছে না। সে বোকার মতো তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করল,”তাহলে তখন ড্রাইভার বললেন কেন?”
রুশদীর মুখের ভঙ্গি তখন দেখার মতো; যেন চোখের সামনে আস্ত একটা অষ্টম আশ্চর্য উদয় হয়েছে। তার এমন ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া চেহারা দেখে ফারাজের পিত্তি ফেটে হাসি আসছিল। হাসিটা কোনোমতে চেপে রেখে কৃত্রিম গাম্ভীর্য নিয়ে সে বলল,”হ্যাঁ, ড্রাইভারই তো। প্লেনের ড্রাইভার, ঠিক না শের?”
বাবার কথায় তাল মেলাতে শের বিন-ব্যাগের ওপর লাফালাফি শুরু করে দিল। সে তার নিজস্ব যুক্তিতে বলে উঠল,”ইয়াপ পাপা! যে নৌকা চালায় সে হলো নৌকার পাইলট, আর যে বিমান চালায় সে হলো বিমানের ড্রাইভার। আর যে রিক্সা চালায়? সে হলো ঢাকা সিটির সুপারম্যান! ঠিক বলেছি না পাপা?”
ছেলের এই অদ্ভুত কিন্তু মজার যুক্তি শুনে ফারাজ ঝুকে গিয়ে তার সাথে হাই-ফাইভ করল। ফারাজ ছেলের এই ভুলভাল কথাতেই বেশি খুশি হলো, সেটা তাকে দেখে মনে হলো।সে হাসিমুখে সায় দিয়ে বলল,”একদম ঠিক বলেছ পাপা, একদম রাইট!”
রুশদী লাইসেন্সটা হাতে নিয়ে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে দুই বাপ-ছেলের আজগুবি কথোপকথন শুনতে লাগল। তার মনে প্রশ্ন জাগল—নেশা কি সে করেছে নাকি ওরা? এসব কী আবোল-তাবোল বকছে! নৌকার পাইলট আর বিমানের ড্রাইভার! দুনিয়ার সমস্ত ভুলভাল যুক্তিবোধ হয় এদের কাছেই আছে। এটা বোধহয় বাংলাদেশের সেকেন্ড পাগলা গারদ,এমনটাই মনে হলো রুশদীর কাছে। সে চরম বিরক্তি নিয়ে ফারাজের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুড়ে দিল,
“আপনি ওকে এসব আজেবাজে জিনিস শিখিয়েছেন?”
ফারাজ কোনো হেলদোল না দেখিয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে উত্তর দিল, “কেন, খারাপ কিছু তো শেখাইনি।”
“ভালো কিছুও শেখাননি! আচ্ছা এসব থাক, আপনি পাইলট হলেন কী করে?”
ফারাজ যেন এই প্রশ্নটার জন্যই অপেক্ষা করছিল। সে একটু গুছিয়ে বসে বলল, “শোনো, প্রথমে মন দিয়ে পড়াশোনা করেছি, তারপর কঠিন সব ট্রেনিং নিয়েছি, এরপর লাইসেন্স পেলাম আর এখন আকাশে বিমান ওড়াই। এভাবেই আমি পাইলট হয়ে গিয়েছি। সিম্পল!”
রুশদী আড়চোখে ফারাজকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত একবার মেপে নিল। তারপর মুখ বাঁকিয়ে বিড়বিড় করে বলল, “আপনাকে দেখলে কোনো দিক থেকেই তো পাইলট মনে হয় না। পাইলটদের একটা আলাদা ব্যক্তিত্ব থাকে,যার ছিটেফোঁটাও আপনার মধ্যে নেই।”
ফারাজ এবার নিজের গেঞ্জির কলারটা একটু টেনে ঠিক করে একটু ভাব নিয়ে বলল, “আমি একটু অন্যরকম। শারফারাজ খান কাউকে কপি করে না, বরং সবাই শারফারাজ খানের মতো হতে চায়।”
রুশদী তড়িৎ উত্তর দিল, “যে হতে চায়, বুঝতে হবে তার রুচির চরম দুর্ভিক্ষ চলছে।”
লাইসেন্সটা আবার নেড়েচেড়ে দেখে রুশদী খুব করুণ গলায় শেষবারের মতো জানতে চাইল, “আচ্ছা, আপনি কি সত্যিই পাইলট?”
“উঁহু, আমি পাইলট না। তোমার সাথে স্রেফ মজা করছি,” ফারাজের গলায় তখন কৌতুক।
এই কথা শুনে রুশদী যেন হাফ ছেড়ে বাঁচল। তার চোখেমুখে স্বস্তির আভা ফুটে উঠল।ফারাজ কিছু করে না এটা মেনে নিতে পারবে রুশদী, কিন্তু ফারাজ একজন পাইলট এটাই কেন যেন মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে রুশদীর। সে উৎফুল্ল হয়ে বলল, “সত্যি তো?”
কিন্তু তার সেই হাসি বেশিক্ষণ টিকতে দিল না ফারাজ। নিমিষেই মুখের ভঙ্গি পাল্টে গম্ভীর হয়ে সে বলল, “নাহ! আরে ভাই, আমি সত্যিই পাইলট। এটা মানতে তোমার এত কষ্ট হচ্ছে কেন?”
রুশদী তবুও যেন বিশ্বাস করে উঠতে পারছে না। সে নিজের হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “আমাকে একটু চিমটি কাটুন তো! আমার মনে হচ্ছে আমি কোনো আজব স্বপ্ন দেখছি।”
সুযোগ পেয়ে ফারাজ মোটেও ছাড়ল না। সে বেশ জোরেশোরে রুশদীর হাতে একটা চিমটি কাটল। ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠল রুশদী, “আউচ!”
মুহূর্তেই তার ফর্সা হাতের কব্জির কাছের জায়গাটা লাল হয়ে উঠল। চিমটিটা যে বেশ কড়া ছিল, তা লালচে দাগটাই বলে দিচ্ছে। রুশদী জায়গাটা ডলতে ডলতে ক্ষোভ নিয়ে বলল, “এত জোরে চিমটি কাটতে কে বলেছিল আপনাকে?”
“একটু জোরেই দিলাম যাতে তোমার দিবাস্বপ্নটা ঠিকমতো ভেঙে যায়। তো, ভাঙল স্বপ্ন?” ফারাজ শয়তানি হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করল।
“ভেঙেছে!” মুখ বাকিয়ে বলল রুশদী।আবার প্রশংসা করে বলল, “জীবনে অন্তত একটা কাজের কাজ করেছেন। আপনাকে দেখতে তো একদম অকর্মার ঢেঁকির মতো লাগে, এখন দেখছি পাইলট হিসেবে লাইফে ভালো কিছুই অর্জন করেছেন।”
ফারাজ বাঁকা চোখে তাকিয়ে পালটা প্রশ্ন করল, “এটা কি প্রশংসা করলে নাকি দুর্নাম?”
রুশদী লাইসেন্স কার্ডটি ফারাজের হাতে ফিরিয়ে দিল। মুখে হাসি ঝুলিয়ে বলল
“দুটোই… ক্যাপ্টেন।”
ফারাজ কার্ডটা হাতে নিয়ে একটু নাটকীয় ঢঙে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর বাঁকা হেসে বলল, “যাক! এ জীবনে এই খাটো পটলের কাছ থেকে অন্তত এটুকু প্রশংসা পেয়েও নিজেকে ধন্য মনে করছি। আপনি যখন বলছেন, তার মানে সত্যিই জীবনে কিছু একটা হতে পেরেছি। থ্যাংক ইউ, মিস খাটো পটল!”
রুশদী দুই হাত বগলদাবা করে বেশ উদাসীন ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইল। পাল্টা জবাব দিতে দেরি করল না সে, “ওয়েলকাম, মিস্টার ম্যানারলেস খা..ম..বা!”
ছোট্ট শের এতক্ষণ চুপচাপ সব শুনছিল। সে ‘খাম্বা’ শব্দটা আগে শুনলেও ‘খাটো পটল’ শব্দটা তার কাছে একেবারেই নতুন। কৌতূহল সামলাতে না পেরে সে পাপার হাত ধরে টেনে জিজ্ঞেস করল, “হোয়াট ইজ খাটো পটল, পাপা?”
ফারাজ লাইসেন্সটা আলমারিতে রাখার জন্য পা বাড়িয়েছিল। মাঝপথে ছেলের প্রশ্নে ঘাড় ঘুরিয়ে উত্তর দিল, “তোর মম যেটা, সেটাই হলো খাটো পটল।”
পুঁচকে শের উৎসুক চোখে রুশদীর দিকে তাকাল। দেখল মম খুব রাগী দৃষ্টিতে পাপা’র দিকে তাকিয়ে আছে। শেরের মনে হলো—মম কি পাপা’র ওপর রেগে আছে? তবুও সে বড় বড় নিষ্পাপ চোখ করে রুশদীর দিকে তাকিয়ে নিশ্চিত হতে চাইল, “মম, তুমি খাটো পটল?”
রুশদী ভ্রু কুঁচকে একবার শেরের দিকে, আবার ফারাজের দিকে বিরক্তি নিয়ে তাকাল। লোকটা এইটুকু বাচ্চাকে যা তা শেখাচ্ছে! সে শেরের দিকে ফিরে একপ্রকার রিবেনস নিতে শান্ত স্বরে বলল, “শোনো শের, তোমার এই পাপাকে আজ থেকে তুমি ‘খাম্বা পাপা’ বলে ডাকবে, ঠিক আছে?”
শের মাথা নেড়ে তৎক্ষণাৎ সায় দিল, “তুমি বলেছ যখন, তাহলে একদম ঠিক আছে!”
ফারাজ আলমারি থেকে ফিরে আসতেই শের খুশিতে ডগমগ হয়ে ডাকল, “হেই খাম্বা পাপা!”
ছেলের মুখে এমন সম্বোধন শুনে ফারাজের চোখ কপালে উঠল। সে রাগে কোমরে হাত দিয়ে দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরল। তারপর রুশদীর দিকে তাকিয়ে ফুঁসে উঠে বলল, “আমার ছেলেকে এসব ফালতু জিনিস কেন শেখাচ্ছ তুমি?”
রুশদী যেন কিছুই হয়নি—এমন এক গা-ঝাড়া ভাব নিয়ে চুল ঠিক করতে করতে বলল, “একটু আগে ওকে ‘খাটো পটল’ নামটা কে শিখিয়েছে শুনি? এটা স্রেফ একটা রিভেঞ্জ। ইট মারলে পাটকেল তো খেতেই হবে, মিস্টার!”
ফারাজ এবার সত্যিই দমে গেল। যুক্তিতে হার মেনে কথা গুছিয়ে উঠতে পারল না সে। কোনোমতে তোতলামি করে বলল, “ত…তোমার কিন্তু খবর আছে কিন্তু”
রুশদী তার কথায় বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে হেলেদুলে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে শুরু করল। যাওয়ার আগে দরজার পাশ থেকে শাসিয়ে গেল, “যদি আরেকবার আমাকে ওই নামে ডেকেছেন, তবে শেরকে আমি আরও ভয়ানক কোনো নাম শিখিয়ে দেব। মনে থাকে যেন!”
রুশদী চলে যাওয়ার পর শের বাবার হাত ধরে টানল। এতক্ষণ এই বড়দের তর্কাতর্কির আগামাথা সে কিছুই বোঝেনি। সে অবুঝের মতো বাবার দিকে তাকিয়ে করুণ সুরে প্রশ্ন করল, “মম তোমাকে ‘খাম্বা’ ডাকতে বলল কেন, পাপা?”
ছেলের এই সরল প্রশ্নের কী ব্যাখ্যা দেবে, ভেবে ফারাজের এবার সত্যিই কান্না পেয়ে গেল। সে অসহায়ের মতো ছেলের দিকে তাকিয়ে দাড়িয়ে রইল, কোন উত্তর না দিয়ে।
শান গত কয়েকদিন সিফাতদের বাড়িতেই আস্তানা গেড়েছিল। আজ ফেরার সময় সিফাতকেও সঙ্গে নিয়ে এসেছে। ফারাজের সাথে তাদের দু’জনের আজ অনেক কথা—স্বপ্ন আর ফুটবলকে ঘিরে যে আশার জাল তারা বুনেছে, তা নিয়ে চূড়ান্ত আলাপ করতে হবে। ফারাজকে রাজি করাতে পারলেই কেল্লাফতে, বাকিটা ফারাজ সামলে নিতে পারবে। উত্তেজনায় গত রাতে দুজনের চোখের পাতা এক হয়নি। সিফাত ক্লান্তিতে শানের রুমে এসেই অঘোরে ঘুমাচ্ছে, আর শান অস্থিরতা কাটাতে বেরিয়ে পড়েছে কলেজ রোডের দিকে।
পুরো মুখ মাস্ক, ক্যাপ আর কালো সানগ্লাসে ঢেকে রেখেছে সে। পরিচিত কেউ সামনে পড়লেও চেনার উপায় নেই। প্রখর রোদে পুড়েই সে রাস্তার এক কোণে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। এদিক দিয়েই তিথি কলেজ থেকে ফেরে। অপেক্ষার প্রহর শেষে অবশেষে সেই কাঙ্ক্ষিত মুখটির দেখা মিলল। তিথি যখন তার স্বভাবজাত চঞ্চলতায় হেঁটে যাচ্ছিল, শান নিঃশব্দে তার পাশে গিয়ে পা মেলাল।
হঠাৎ করে এমনভাবে কাউকে পাশে হাঁটতে দেখে তিথি প্রথমে কিছুটা অস্বস্তি বোধ করলেও পরক্ষণেই সানগ্লাস আর ক্যাপের আড়ালে শানকে চিনতে পেরে শান্ত হলো। শান বেশ খানিকটা দূরত্ব বজায় রেখেই হাঁটছে। এই নিস্তব্ধ পথচলায় একসময় তিথিই প্রথম কথা বলে উঠল,
“তো, আপনি তাহলে বসুন্ধরা কিংস এর হয়ে খেলছেন?”
শান মাস্কের আড়াল থেকেই মৃদু হেসে মাথা নাড়ল। “হ্যাঁ, কিংস-এর হয়েও মাঠে নামা হয়। আমাকে নিয়ে বেশ ভালোই খোঁজখবর নিয়েছেন দেখছি!”
তিথি একটু লাজুক কিন্তু সাবলীল ভঙ্গিতে বলল, “সেদিন কলেজের সবার স্টোরিতে আপনার আর ওই ছেলেটার ছবি ছিল। তাই একটু আগ্রহ হলো আপনাদের ব্যাপারে। দেখতে চেয়েছিলাম, আপনারা আসলে কেমন মানুষ—যাদের দেখে সবাই এত মাতোয়ারা!”
ঢাকার ব্যস্ত ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে একজোড়া তরুণ-তরুণী। এক অদ্ভুত দৃশ্য! যাদের সম্পর্কের এখনো কোনো নির্দিষ্ট নাম নেই, পরিচয়েও নেই কোনো মিল। অথচ এই অসম মুহূর্তগুলোই যেন এক অদৃশ্য সুতোয় তাদের বেঁধে ফেলছে। তাদের চারপাশের কোলাহল ছাপিয়ে এক নীরবতা খেলা করছে তাদের মাঝে।শান হুট করেই প্রশ্ন করে বসল, “তোমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিলে কি রাজি হবে?”
এমন অকস্মাৎ প্রশ্নে তিথি থমকে দাঁড়াল। বিভ্রান্ত হয়ে বলল, “কীহ!”
ফুটপাতের ধারে এক বৃদ্ধ তাজা গোলাপ বিক্রি করছিলেন। শান ঝটপট সেখান থেকে একটি রক্তলাল গোলাপ কিনে নিল। এই কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে তিথি অনেকটা পথ এগিয়ে গেছে। শান দৌড়ে গিয়ে তার সামনে দাঁড়াল। সরাসরি গোলাপটি বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“উইল ইউ ম্যারি মি?”
তিথি বাঁকা হেসে বিদ্রূপের সুরে বলল, “আপনি বড্ড বেশি ডিরেক্ট! এই নিয়ে আমাকে কতবার প্রপোজ করলেন বলুন তো? আর আমিই বা কতবার এক্সেপ্ট করেছি?”
শান কিছুটা দমে গিয়ে হাসিমুখে স্বীকার করল, “প্রপোজ তো করেছি অগণিত! তাই হিসেব মনে নেই। তবে হ্যাঁ, এক্সেপ্ট একবারও করোনি।”
“তাহলে এবার আমি রাজি হবো, এমনটা ভাবলেন কী করে?”
“কে বলেছে ভেবেছি? একদম ভাবিনি,” শানের সাবলীল উত্তর।
তিথি এবার একটু গম্ভীর হয়ে বলল, “তবে অযথা এই প্রপোজ করা বন্ধ করুন! কথাগুলো জমিয়ে রাখুন কোনো এক নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। সেদিন আপনিও নিশ্চিত থাকবেন যে আমি রাজি হবো।”
শান এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে তিথির চোখের দিকে তাকাল। তারপর আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল, “ঠিক আছে! কথা দিলাম, যেদিন তুমি নিজে আমাকে প্রপোজ করবে, আমি এক কথায় রাজি হয়ে যাব।”
তিথি ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল, “ওভার কনফিডেন্ট!”
শান গোলাপটা হাতে নিয়ে মৃদু হেসে বলল, “মাঝে মাঝে আত্মবিশ্বাস থাকাটা ভালো, বিশেষ করে তোমার ক্ষেত্রে।”
আজকে শের-এর সেকেন্ড সেমিস্টার পরীক্ষার রেজাল্ট কার্ডটা হাতে পাওয়া মাত্রই ফারাজের মস্তিষ্কের শিরাগুলো রাগে ধকধক করে উঠল। যে ছেলে সবসময় প্রথম সারিতে থাকে, সে এবার সোজা ছিটকে গিয়ে পঁচিশ নম্বর পজিশনে ঠাঁই পেয়েছে! এমন অভাবনীয় রেজাল্ট ফারাজ মেনে নিতে পারছে না।
বেডরুমের বিছানার ওপর অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে বসে আছে ছোট্ট শের। ফারাজ তার সামনে রেজাল্ট কার্ডটা নিয়ে পায়চারি করছে আর রণমূর্তি ধারণ করে কড়া শাসন শুরু করেছে। শেরে’র থেকে কিছুটা দূরত্বে মুখ ফুলিয়ে বসে আছে রুশদী। শিশুদের ওপর এমন চিল চিৎকার তার দু-চোখের বিষ; বিশেষ করে ফারাজ যখন শেরকে বকছে, তখন তার প্রতিটা কথা রুশদীর কানে তপ্ত সীসার মতো বিঁধছে। তাই সে রাগে অন্যদিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে প্রতিবাদ জানাচ্ছে।
ফারাজ রেজাল্ট কার্ডের প্রতিটি বিষয়ের নম্বরের ওপর চোখ বুলিয়ে হঠাৎ ধমকে উঠল,”তোমার রেজাল্ট কার্ডের এই দশা কেন শের? আর একটু হলে তো ফেলই করে বসতে! আমি তোমার প্রশ্নপত্র দেখেছি, একদম ইজি-ফিজি সব প্রশ্ন। এসব তো আমি নিজে তোমাকে পড়িয়েছি, তারপরও এমন রেজাল্ট কেন? আর তোমার অ্যাটেনডেন্স এত কম কেন? তুমি তো রোজ স্কুলে গিয়েছো, তবে ক্লাসে উপস্থিত থাকোনি কেন?”
ফারাজ কয়েক পা এগিয়ে এসে আবার বলে উঠল, “আমি শুনেছি তুমি নাকি নিজের ক্লাস ফাঁকি দিয়ে তোমার মমের ক্লাসে গিয়ে বসে থাকতে! ঘটনা কি সত্যি? এই কারণেই কি আজ তোমার এই অবস্থা? কী হলো, উত্তর দিচ্ছ না কেন? কথা বলো!”
[বিদ্র:এটুকু বাচ্চাকে পড়ার জন্য বকছে অবাক হচ্ছেন নাকি?যারা ইংলিশ ভার্সন বা ইংলিশ মিডিয়াম অথবা বড় বড় স্কুলগুলোতে পড়ে ওখানকার বাচ্চা গুলো অনেক চালু থাকে।ওরা যেভাবে ইংলিশে পটর পটর করে বা ওদের আইকিউ লেভেল, আমাদের জেনারেল স্কুলের বাচ্চাদের থেকে অনেক বেশি।তাই, বেশি বেশি লিখেছি এমন ভাববেন না। ]
রুশদী আর সহ্য করতে পারল না। আগ্নেয়গিরির লাভার মতো সেও ফেটে পড়ল। সোজা ফারাজের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে বলল,”আপনি এইটুকু একটা বাচ্চাকে এভাবে কেন ধমকাচ্ছেন? কেজি ক্লাসের একটা রেজাল্ট খারাপ হয়েছে বলে দুনিয়া কি রসাতলে গিয়েছে? আপনি ওকে অযথা বকাঝকা করছেন কেন? খবরদার, আর একটা কথাও বলবেন না! অনেক হয়েছে আপনার শাসন।”
ফারাজ তিক্ত হাসিতে মুখ বাঁকিয়ে বলল, “এক চোর তো অন্য চোরকে সঙ্গ দেবেই! তোমরা দুজনই তলে তলে এসব করছ। ও যে নিজের ক্লাস বাদ দিয়ে তোমার ক্লাসে গিয়ে বসে থাকল, তুমি একবারও তাকে বাধা দিলে না কেন? স্কুলের চেয়ারম্যানের ছেলেকে নাকি পাশ করতে নম্বর গুনতে হচ্ছে।আমাদের স্কুলের স্টুডেন্টদের স্টাডি লেভেল তুৃমি জানো, সে ক্ষেত্রে ওর এমন রেজাল্ট…!’
এতক্ষণ চুপ করে থাকলেও এবার শের তার অবুঝ আর কালো হয়ে যাওয়া মুখটা তুলে বাবার দিকে তাকাল। গলায় একরাশ অভিমান আর বিরক্তি মিশিয়ে সে বলল,”তো কী হয়েছে পাপা? আমি তো ফেল করিনি! রেজাল্ট একটু খারাপ হয়েছে বলে তুমি আমাকে এত বকবে? তুমি কি জীবনে কখনো রেজাল্ট খারাপ করোনি?”
ছেলের মুখে এমন সপাট উল্টো প্রশ্ন শুনে ফারাজ এক মুহূর্তের জন্য থমল।ফারাজ নিজের দাপট ধরে রাখতে বলে উঠল, “না! আমি কখনো রেজাল্ট খারাপ করিনি, বুঝেছ? পরীক্ষায় এক নম্বর কম পেলেও ড্যাড আমার ঠ্যাং ভেঙে হাতে ধরিয়ে দিতেন!”
শের পাপার দিকে তাকিয়ে সপাটে উত্তর দিল, “এজন্যই তো বোধহয় বড় হয়ে ড্রাইভার হয়েছ… ওই যে, প্লেনের ড্রাইভার!”
ছেলের মুখে এমন তড়িৎ আর বাঁকা উত্তর শুনে ফারাজের ব্রহ্মতালু জ্বলে উঠল। সে অবিশ্বাসের সুরে চিৎকার করে বলল, “শের! তুমি আমার সাথে তর্ক করার সাহস পাচ্ছ কোথায়? এত বড় সাহস কে দিয়েছে তোমাকে?”
শের অবিচল ভঙ্গিতে উত্তর দিল, “কেন? তোমার কাছ থেকেই পেয়েছি।”
“আবার তর্ক করছ!”
“তো তুমি প্রশ্ন করলে আমি উত্তর দেব না?” শেরের কণ্ঠে তখন একরোখা জেদ।
ফারাজ এবার সত্যিই মেজাজ হারাল। “আবার মুখে মুখে কথা! শের, তুমি দিন দিন বড্ড বেয়াদব হয়ে যাচ্ছ!”
শের শান্ত গলায় অবুঝের মতো বলল, “উত্তর তো মুখ দিয়েই দিতে হয় পাপা।”
ফারাজের কপালে রাগের শিরাগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠল। সে আঙুল উঁচিয়ে শাসাল, “শের, আর একটাও পাল্টা কথা বলবে না আমার সাথে। আমার কিন্তু এখন প্রচণ্ড রাগ উঠছে!তর্ক বন্ধ করে।”
“আমি তো তর্ক করছি না,” শের বিড়বিড় করল।
ফারাজ আর কথা না বাড়িয়ে হাত বাড়িয়ে বলল, “তোমার ট্যাবটা দাও।”
শের বাধ্য ছেলের মতো হাতের ট্যাবটা পাপার হাতে সঁপে দিল। ফারাজ সেটা একরকম কেড়ে নিয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করল, “আজ থেকে তোমার ভিডিও গেমস খেলা, চকলেট খাওয়া আর টিভি দেখা—সব বন্ধ! কিচ্ছু পাবে না তুমি।”
শেরের বুক ফেটে কান্না আসছিল, কিন্তু সে অভিমানী স্বরে বলল, “ঠিক আছে, খাব না।”
“শের!” ফারাজ আবার ধমক দিল।
“কী হয়েচে?” প্রায় কান্নাভেজা কণ্ঠে ভাঙা ভাঙা গলায় জিজ্ঞেস করল শের। কিন্তু ফারাজের কঠিন মন তাতে গলে যাওয়ার কোনো লক্ষণ দেখাল না। সে উল্টো আরও কঠোর হয়ে বলল, “আজ থেকে তোমার সব দুষ্টুমি বন্ধ। কোনো আবদার নিয়ে আমার কাছে আসবে না একদম!”
শের ভেজা চোখে তাকালে বলল, “ঠিক আছে, আসব না।”
ফারাজ যখন আরও কিছু কড়া কথা শোনাতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই বাঁধা দিল রুশদী। সে আর থাকতে না পেরে ফারাজের সামনে এসে,শের কে আড়াল করে দাঁড়িয়া।
“হয়েছে এবার! আপনি কি এখন বাচ্চাটাকে কাঁদিয়েই ছাড়বেন? সামান্য কেজি ক্লাসের একটা রেজাল্ট নিয়ে কখন থেকে যে ঘোড়ার ডিমের মতো পক পক করে যাচ্ছেন! এখন বকলে কি ওর রেজাল্ট পাল্টে যাবে? অযথা বকে বাচ্চাটার মন ছোট করছেন কেন আপনি? অনেক হয়েছে, এবার যান তো এখান থেকে!”
ফারাজ কিছুক্ষণ রুশদীর দিকে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। তারপর আক্রোশ মেশানো গলায় বলল, “ঠিক আছে!তোমার এইচএসসির রেজাল্ট আসুক, তোমার টাও দেখব।”
রুশদীও কম যায় না। সে একরাশ অবজ্ঞা নিয়ে মুখ বাঁকিয়ে জবাব দিল, “হ্যাঁ, দেখে নিয়েন!”
ফারাজ আর তর্কে না জড়িয়ে গজগজ করতে করতে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
কালবৈশাখীর মেঘলা আকাশের মতো থমথমে হয়ে আছে ছোট্ট শেরের মুখটা। পাপাট কড়া শাসনে অভিমানে বুকটা যেন কুঁকড়ে ছোট হয়ে গিয়েছে। বাচ্চাদের কান্না বড় অদ্ভুত; তাদের চোখের জল যখন টুপটুপ করে ঝরে, তখন মনে হয় যেন পৃথিবীর সমস্ত নিষ্পাপতা ধুয়ে যাচ্ছে। লাল হয়ে যাওয়া নাক আর ফোলা ফোলা গাল দুটোর দিকে তাকালে যে কারোর বুক মায়ায় হু হু করে উঠবে।
রুশদীর অবস্থাও তথৈবচ। পুচকিটার এই বিষণ্ণ দশা দেখে তার নিজের মনটাও পাথরের মতো ভারী হয়ে আছে। সে আর সইতে না পেরে শেরকে টেনে নিজের কোলে তুলে নিল। আষাঢ়ের ধারাপাতের মতো শেরের চোখ দিয়ে তখন নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে। কান্নার তোড়ে ঠোঁট দুটো কাঁপছে তিরতির করে। রুশদী পরম মমতায় ওর ভেজা গালে হাত রেখে নরম গলায় বলল,
“আরে! বাবা একটু বকুনি দিয়েছে বলে এভাবে কেউ কাঁদে? আমি যখন ছোটবেলায় রেজাল্ট খারাপ করতাম, আমার বাবা তো আরও বেশি বকতেন। আমি তো কক্ষনো কাঁদতাম না! তুমি না আমার স্ট্রং বয়? আমার এই অ্যাংরি বার্ডকে কি কান্নাকাটি করলে মানায়? অ্যাংরি মোডেই তো তোমাকে সবচেয়ে কিউট লাগে। কান্না থামাও তো সোনা!”
শের একটা লম্বা হেঁচকি তুলে ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল, “পাপা সুযোগ পেলেই আমাকে অনেক বকে… অনেক বেশি বকুনি দেয়। অন্যদের পাপা তো এত বকুনি দেয় না!”
রুশদী ওর কপালে লেপ্টে থাকা চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে বলল, “তোমার পাপা কি শুধু বকুনিই দেয়? আদর করে না? এই যে তুমি যা চাও, পাপা কি তা এনে দেয় না? কত ভালোবাসে তোমাকে।বাসে না?”
শের ভেজা চোখে মাথা নেড়ে সায় দিল, “হুম, বাসে।”
“শোনো পাপা, এই দুনিয়ায় যারা যাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে, তাদের ছোট্ট ভুলগুলোতেই ভালোবাসার মানুষগুলো বেশি কষ্ট পায়। তোমার এই রেজাল্ট দেখে পাপার খুব মন খারাপ হয়েছে, তাই হয়তো একটু বকে ফেলেছে। আচ্ছা বলো তো, পাপা কি খুব বড় ভুল করেছে?”
শের এবার দু-পাশে মাথা নেড়ে জানাল—না, পাপা ভুল করেনি। রুশদী ওর কপালে আলতো করে একটা চুমু খেয়ে বলল, “এই তো আমার গুড বয় বুঝে গিয়েছে! এবার একটু হাসো তো দেখি? তোমার হাসিমুখটা খুব মিস করছি। এভাবে মুখ কালো করে রাখলে তোমাকে একদম ‘অ্যাংরি ব্ল্যাক ক্যাট’-এর মতো লাগে। আর আমি তো পছন্দ করি ‘অ্যাংরি বার্ড’। জলদি হাসো এবার!”
বাচ্চাদের মন তো আর এক নিমেষে ভালো হয় না। শেরকে তবুও কিছুটা মনমরা হয়ে বসে থাকতে দেখে রুশদী এবার নতুন এক ফন্দি আঁটল। সে দুষ্টুমিভরা চোখে শেরে’র দিকে তাকিয়ে, নরম গাল দুটো টেনে ধরে চঞ্চল সুরে গান গেয়ে উঠল,
“ফোলা ফোলা ফর্সা গালে,
জমেছে জল বর্ষা গালে।
ফোটা ফোটা মুক্ত দানা,
নানা সোনা আর কাঁদে না।
থাকো যদি গোমরা মুখে,
কাতুকুতু দেবো তোমাকে।”
(শের কে কাতুকুতু দিয়ে গাইলও এটুকু রুশদী)
অস্তরাগের রঙ পর্ব ১৩
মম এর মুখে এমন অদ্ভুত আর মজার গান শুনে শেরের অভিমানী মেঘ এক পলকেই কেটে গেল। সে খিলখিল করে হেসে কুটিপাটি হয়ে রুশদীর ওপর গড়িয়ে পড়ল।গলা জড়িয়ে ধরল রুশদীর।
ঠিক সেই মুহূর্তে দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে ছিল ফারাজ। আড়াল থেকে রুশদী ও ছেলের এই খুনসুটি আর শেরের মুখে ফিরে আসা হাসিটা দেখে ফারাজের পাথরের মতো কঠিন হয়ে থাকা মনটা নিমেষেই গলে জল হয়ে গেল। নিজের অজান্তেই তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চিলতে প্রশান্তির হাসি।
