অস্তরাগের রঙ পর্ব ২৪
তেজরিন উম্মীদ
নিস্তব্ধ রাত। টেবিল ল্যাম্পের ম্লান আলোয় রুশদীর পড়ার টেবিলটা যেন একখণ্ড বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি তাকে ঘুমাতে দেয় না ঠিকঠাক; চোখের পাতায় ক্লান্তি থাকলেও মনে জেদ পাবলিক ভার্সিটিতে চান্স পেতে হবে। ঘড়ির কাঁটা নিঃশব্দে চারটের ঘর ছুঁল। হঠাৎ নজর যেতেই রুশদীর মনে পড়ল—আজ ফারাজের ফ্লাইট। আর মাত্র ঘণ্টা দুয়েক পর তাকে বের হতে হবে।
রুশদী চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। আধো-অন্ধকার ঘরে ফারাজ তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। বিছানার পাশে গিয়ে আলতো করে ডাকল ও, “এই যে শুনছেন? উঠুন, আপনার না আজকে ফ্লাইট আছে?”
কোনো সাড়া নেই। রুশদী এবার একটু গলা চড়িয়ে বলল, “এই ফারাজ, উঠুন না!”
তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় ফারাজ আড়মোড়া ভেঙে চোখ মেলল। ঘুমের ঘোর তখনও কাটেনি, চোখের পাতায় লেগে আছে একরাশ আলস্য। ও একটু নড়েচড়ে শুয়ে ভাঙা গলায় অভিযোগ করল, “এটা কেমন ধরনর স্বামীকে ঘুম থেকে জাগানো? স্বামীকে একটু সুন্দর করে ডাকতে পারো না?”
রুশদী কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকাল, “স্বামীকে আবার সুন্দর করে কীভাবে ডাকব?”
ফারাজ একটা বাঁকা হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে বলল, “কেন? ওগো শুনছ… প্রাণনাথ! ঘুম থেকে ওঠো গো—এভাবে বলতে পারো না?”
রুশদী এবার কপট গম্ভীর হয়ে সপাটে উত্তর দিল, “অসম্ভব! আমি এত ঢং করে কথা বলতে পারি না।”
বিছানা ছেড়ে নামল ফারাজ। ওর লম্বা অবয়বটা রুশদীর সামনে দঁাড়াল। ফারাজ বলল, “সব বিষয়ে ঢং করতে পারো, কাজের বেলাতেই পারো না।”
“আমি কোন বিষয়ে ঢং করি শুনি?”
ফারাজ এবার রুশদীর খুব কাছে এসে দাঁড়াল। ওর চোখের গভীরে চোখ রেখে বলল, “বাচ্চা নেওয়ার কথা বললেই তো তোমার ঢং শুরু হয়ে যায়। প্রমাণ দেখবে? বলো, আমরা বাচ্চা নিচ্ছি কবে।”
প্রশ্নের অতর্কিত আক্রমণে রুশদী আমতা আমতা শুরু করল। নজর সরিয়ে নিয়ে ক্ষীণ স্বরে বলল, “আমি কি না করেছি নাকি? সময় আসলে নিব”
“সেই সময়টা কবে আসবে শুনি?” ফারাজের কণ্ঠে এবার খানিকটা তাচ্ছিল্য।
“আরে, আমি নিজেই তো এখনও বাচ্চা। আবার বাচ্চা দিয়ে কী হবে? আমাদের শের তো আছেই। আগে ও বড় হোক, তারপর দেখা যাবে।”
ফারাজ আর কথা বাড়াল না। শুধু একটা চাপা রাগ ছেড়ে বলল, “হয়েছে রাখো তোমার ঢং এর কথা। ”
ভারী পায়ে ফারাজ ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াল। রুশদী স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। ও বুঝতে পারল, ফারাজের মনে কোথাও একটা বিরক্তি বা অভিমান দানা বাঁধছে। কিন্তু রুশদী এই মুহূর্তে প্রস্তুত নয়। অন্তত আগামী দুটো বছর ও নিজেকে গুছিয়ে নিতে চায়, নিজের একটা পরিচয় গড়তে চায়।
মূহূর্তের সেই অস্বস্তি ঝেড়ে ফেলে রুশদী আবার পড়ার টেবিলে গিয়ে বসল।
ফারাজ নিজেকে প্রস্তুত করে নিল। ইউনিফর্মের প্রতিটি ভাঁজ যেন তার ব্যক্তিত্বকে আরও ধারালো করে তুলেছে। রুশদী পড়ার টেবিলে একাগ্র ছিল, কিন্তু অচিরেই সে অনুভব করল পেছনে কেউ একজন দাঁড়িয়েছে। ঘাড় ফিরিয়ে তাকাতেই তার চোখে বিস্ময় আর মুগ্ধতা খেলে গেল। সামনে দাঁড়িয়ে ‘ক্যাপ্টেন শারফারাজ খান’। পাইলটের এই পোশাকে ফারাজকে তার কাছে সবসময়ই পৃথিবীর সবথেকে আকর্ষণীয় পুরুষ মনে হয়। রুশদী যেন পলক ফেলতে ভুলে গেল।
মুগ্ধতা সামলে রুশদী মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করল, “ট্রিপ কয়দিনের?”
“তিন দিন,” ফারাজের গলায় বরফশীতল গাম্ভীর্য।
ফারাজের কণ্ঠস্বরের সেই কাঠিন্য রুশদীর কানে বিঁধল। সে শুধু অস্ফুট স্বরে বলল, “ওহ্!”
ফারাজ আর কথা বাড়াল না।মিনি লাগেজ টা নিয়ে দরজার দিকে পা বাড়াতেই রুশদী পেছন থেকে ডাকল, “এখনই যাচ্ছেন?”
ফারাজ না থেমে ছোট করে উত্তর দিল, “হ্যাঁ।”
“আপনি কি আমার ওপর রেগে আছেন?”
এবার ফারাজ থামল। ধীরপায়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে রুশদীর দিকে তাকিয়ে বলল, “নাহ! কেন?”
“প্রতিদিন যাওয়ার সময় চুমু দিয়ে যান, আজ দিলেন না। এমনকি কিছু না বলেই চলে যাচ্ছিলেন,” রুশদীর কণ্ঠে অভিমানের সুর।
ফারাজ হাতের লাগেজটা ছেড়ে দ্রুত পায়ে রুশদীর সামনে এসে দাঁড়াল। তপ্ত এক চুম্বনে রুশদীর কপাল ছুঁয়ে দিল সে। কিন্তু ফারাজের এই যান্ত্রিকতায় রুশদী সবটা বুঝে নিল। তার বুঝতে বাকি রইল না যে, এই সবটুকু বিরক্তির মূলে রয়েছে সেই বাচ্চা না নেওয়ার প্রসঙ্গটি।
ফারাজ সরে গিয়ে সংক্ষিপ্তভাবে বলল, “হয়েছে তো…!”
“আমি অতটাও নাদান বাচ্চা নই ফারাজ যে আপনার হাবভাব বুঝব না। বাচ্চা নিতে রাজি হইনি বলেই আপনি এমন করছেন।”
“এমন কিছুই না রুশদী। রাতে ঘুম হয়নি, তাই মেজাজটা খিটখিটে হয়ে আছে,” ফারাজ এড়িয়ে যেতে চাইল।
“অযথা মিথ্যা বলছেন কেন?”
“তোমার সঙ্গে তর্কে জড়ানোর সময় এখন আমার নেই। শের-কে দেখে রেখো। আল্লাহ হাফেজ!”
ফারাজ হনহন করে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। রুশদী আর তাকে আটকাল না। সে জানে ফারাজ যতই অস্বীকার করুক, তার ভেতরে অভিমান টাকে সে দেখতে পাচ্ছে। প্রতিদিনের নিয়ম মেনে রুশদী বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। ফারাজ যখন ট্রিপে যায়, রুশদী এখান থেকেই হাত নেড়ে বিদায় জানায় আর ফারাজ ওপরের দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে হাত নাড়ে। কিন্তু আজ দৃশ্যপট ভিন্ন। ফারাজ একবারও ওপরের দিকে তাকাল না। সে খুব ভালো করেই জানে রুশদী বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে, তবুও তাকালো না।
রুশদীর মনটা এক নিমেষেই বিষণ্ণতায় ভরে উঠল। সে তো একবারও বলেনি যে সে বাচ্চা নিতে চায় না, সে শুধু খানিকটা সময় চেয়েছিল। অথচ ফারাজ সেই সামান্য সময়টুকু দিতেও নারাজ!
“হ্যালো আপু!” মিতুর উচ্ছ্বসিত কণ্ঠ।
রুশদী নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “হ্যাঁ, বল।”
“আমি তো ঢাকা এসেছি আপু। তোমার বাসায় আসি একটু?”
রুশদী কিছুটা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “তুই হঠাৎ ঢাকায়? কার সাথে এসেছিস?”
“উজান ভাইয়ার সঙ্গে এসেছিলাম একটা কাজে।”
“উজানকে নিয়ে সরাসরি বাসায় চলে আয় না।”
“না আপু, ভাইয়া যাবে না। ওনার কী যেন জরুরি কাজ আছে, এখান থেকেই চট্টগ্রাম চলে যাবেন। তুমি এসে আমাকে নিয়ে যাও না প্লিজ!”
“কোথায় তোরা এখন?”
“বসুন্ধরা মার্কেটে।”
“আচ্ছা ঠিক আছে, তোরা নড়িস না, আমি আসছি।”
উজান ও মিতু ছোটখাটো একটা প্রয়োজনে ঢাকায় এসেছিল। কাজ শেষে মিতুর খুব ইচ্ছে হলো বোনের কাছে কয়েকটা দিন থেকে যাওয়ার। উজান ব্যস্ততার কারণে খান বাড়িতে যেতে রাজি হলো না, তাই রুশদী নিজেই গিয়ে মিতুকে নিয়ে এল।
খান বাড়ির বিশাল গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই ড্রয়িং রুমে শানজানা খান (সিফাতের মা) আর রাইমা খানের মুখোমুখি হলো তারা। দুজনে মিলে জমিয়ে গল্প করছিলেন। রুশদী বিনয়ের সাথে এগিয়ে গিয়ে শানজানা খানকে সালাম দিল, “আসসালামু আলাইকুম ফুপিআম্মু, ভালো আছেন?”
শানজানা খান চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়ে উত্তর দিলেন, “ওয়ালাইকুম আসসালাম। হ্যাঁ, ভালো আছি। তুমি কেমন আছো?”
“আলহামদুলিল্লাহ।”
শানজানা খানের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এবার রুশদীর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মিতুর ওপর পড়ল। অজানা পরিবেশ আর অপরিচিত মানুষদের সামনে মিতু তখন ভয়ে কিছুটা জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শানজানা খান ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করলেন, “এই মেয়েটা কে?”
রুশদী মিতুর কাঁধে হাত রেখে আগলে ধরার ভঙ্গিতে বলল, “আমার ছোট বোন ফুপিআম্মু।”
“ওহ্!”
রুশদী বেশ কয়েকবার ফারাজকে কল করেছে, কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো সাড়া নেই। রুশদীর হিসাব মতে, ফারাজের ফ্লাইট ল্যান্ড করার কথা এবং এখন তার হোটেলেই থাকার কথা। তবে কেন ফোন ধরছে না? হয়তো কোনো জরুরি কাজে ব্যস্ত।ট্রিপে গেলে ফ্রি হওয়া মাত্রই নিজে থেকেই ফোন মেসেজ দেয় ফারাজ। তবে আজ..!
অন্যমনস্ক রুশদী এবার মিতুর গেস্ট রুমের দিকে পা বাড়াল। দেখল মিতু আর শের বেশ আড্ডায় মজেছে। শের এমনিতে অন্যদের সঙ্গে কম কথা বললে পছন্দের মানুষ পেলে বকবক করে ঘর মাতিয়ে রাখে। মিতুর সহজ-সরল আর কিছুটা বোকাসোকা কথাবার্তা শেরের খুব পছন্দ হয়েছে। মিতুর প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে শেরের ভাবসাব এমন যে, সে বুঝি অনেক বড় হয়ে গেছে!
রুশদী ভেতরে ঢুকে জিজ্ঞেস করল, “ঢাকা এসেছিলি কেন তোরা?”
“উজান ভাইয়া একটা কাজে আসছিল আপু। আমিই বায়না করে ওর সাথে এসেছি,” মিতু হাসিমুখে উত্তর দিল।
“বাসায় আসবি সেটা আগে বললেই পারতি।”
মিতু লাজুক হেসে বলল, “এমনি… বলা হয়নি।”
“আচ্ছা ঠিক আছে, তুই এবার একটু রেস্ট নে। শের, চলো আমার সাথে। খালামণি এখন বিশ্রাম নেবে, আর তোমারও পড়ার সময় হয়েছে,” রুশদী বলল।
কিন্তু শেরের এখন পড়ার মুড নেই। সে অনুনয় করে বলল, “মম, আর একটু গল্প করি না খালামণির সাথে? প্লিজ! পরে পড়ব।”
মিতুও তাল মেলাল, “থাক না আপু কিছুক্ষণ, ও থাকলে আমারও ভালো লাগছে।”
রুশদী হাসল, “ঠিক আছে, আর কিছুক্ষণ গল্প করে শের রুমে চলে এসো।”
রুশদী ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই মিতু তার বুকের ভেতর চেপে রাখা সেই প্রশ্নটা আলতো করে বের করল। নিজের চশমাটা নাকের ওপর ঠিকঠাক বসিয়ে অতি সাবধান ভঙ্গিতে শেরকে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা শের, তোমার ওই চাচুটা কোথায়?”
শের ভ্রু কুঁচকে তাকাল, “কোন চাচু?”
“ওই যে… অনেক ফর্সা করে, নাম যেন কী… সিফাত!”
শের এবার চিনতে পারল, “ওহ, সিফু ডিলার? ও তো এখন ক্লাবে।”
“উনি কি ওখানেই থাকেন?” মিতুর কণ্ঠস্বর যেন একটু বেশিই কৌতূহলী।
“হুম, ও অনেকদিন পরপর বাসায় আসে। আবার যখন আসবে, তখন দেখবে,” শের বিজ্ঞের মতো উত্তর দিল।
মিতুর মনটা হঠাৎ কেমন উদাস হয়ে গেল। সে শুধু অস্ফুট স্বরে বলল, “ওহ্!”
শের তীক্ষ্ণ চোখে মিতুকে পরখ করল। হুট করে বলে বসল, “কিন্তু তুমি সিফু ডিলারের কথা জিজ্ঞেস করছ কেন খালামণি? তিথি খালামনি যেমন ঝিংকুকে পছন্দ করে, তুমিও কি সিফুকে পছন্দ করো?”
বাচ্চার মুখে এমন প্রশ্ন শুনে মিতু একদম থতমত খেয়ে গেল। তোতলামি করে বলল, “ন..ন..না তো! ও..ওনারা ফুটবল খেলেন তো, তাই আ..আরকি। আমি ওনাদের খে..খেলা দেখি।”
“ওহ, তুমি সিফুর ফ্যান?”
“হ্যাঁ… হ্যাঁ,” মিতু জোর করে মুখে হাসি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করল।
শের এবার সোজা হয়ে বসল।
“কিন্তু তুমি এমন তোতলাচ্ছ কেন? পাপা বলে, মানুষ যখন মিথ্যে বলে তখনই নাকি এভাবে কথা বলে। তুমি কি আমাকে মিথ্যে বলছ খালামণি?”
মিতু ছোট এক বাচ্চার কাছে এভাবে ধরা খেয়ে যাবে সে ভাবেনি। নিজেকে স্বাভাবিক করার আপ্রাণ চেষ্টা করে বলল, “নাহ! আমি মিথ্যে বলতে যাব কেন? আমি একদম মিথ্যে বলি না।”
শের শুধু সন্দেহের চোখে তাকিয়ে মাথা দোলাল, “ওহ্ আচ্ছা!”
রুশদী দীর্ঘক্ষণ চেষ্টা করার পর অবশেষে ওপাশে ফোন বাজল। রিসিভ হতেই রুশদী কোনো ভূমিকা ছাড়াই উতলা হয়ে প্রশ্ন করল, “হ্যালো! কল ধরছেন না কেন আপনি?”
ওপাশ থেকে ফারাজের গম্ভীর ও শীতল কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “ফোন করেছ কেন সেটা বলো।”
ফারাজের এই নিরুত্তাপ স্বরে রুশদীর ভেতরটা জ্বলে উঠল। সে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ল, “প্রশ্ন আগে আমি করেছি, আমার উত্তর দিন।”
“কী?” ফারাজের কণ্ঠে চরম বিরক্তি।
“কল ধরছেন না কেন?”
ফারাজ যেন কথা বলতেও আগ্রহী নয়, সংক্ষিপ্তভাবে বলল, “এ ছাড়া আর কিছু বলবে?”
“আজব তো! আপনি এমন ব্যবহার করছেন কেন?”
রুশদীর গলা এবার কিছুটা চড়ে গেল।
“কেমন করছি?”
“আপনি কি বাচ্চা না নেওয়াকে কেন্দ্র করে আমাকে ইগনোর করছেন?”
ফারাজ এবার তপ্ত গলায় বলল”আমি এখন বিজি আছি, তোমার সঙ্গে পরে কথা বলছি।”
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই ফোনের ওপাশে লাইনটা কেটে গেল। রুশদী হ্যালো হ্যালো করতে থাকল ঠিকই, কিন্তু ওপাশে তখন শুধু যান্ত্রিক নৈঃশব্দ্য। ফারাজ সত্যি সত্যিই ফোনটা কেটে দিয়েছে।
সে হাতের ফোনটা বিছানায় ছুড়ে ফেলে দিয়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। বুকের ভেতরটা অভিমানে ফেটে যাচ্ছে। যে মানুষটা এক সময় তাকে এক পলক না দেখলে অস্থির হয়ে যেত, আজ সেই মানুষটাই তার কণ্ঠস্বর শুনতে নারাজ। সে কি একবারও বলেছিল যে সে কখনো মা হতে চায় না? শুধু একটু সময় চেয়েছিল নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার জন্য। অথচ ফারাজ সেই অধিকারটুকু তাকে দিতেও কুন্ঠিত।
ঠিক তৃতীয় দিনের মাথায়, রাত যখন একটা, তখন ফারাজ ফিরল। দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে ফারাজকে একপলক দেখেই রুশদীর মনে হলো, কোনো এক তৃষ্ণার্ত পথিক যেন দীর্ঘ মরুভূমি পাড়ি দিয়ে এক চিলতে শান্তির ছায়া খুঁজে পেয়েছে।এই তিনটে দিন তাদের মাঝে কোনো কথা হয়নি বললেই চলে। রুশদী কতবার ফোন করেছে, কিন্তু ফারাজ হয় রিসিভ করেনি, আর ভুল করে ধরলেও গুটিকয়েক যান্ত্রিক কথা বলে লাইন কেটে দিয়েছে। ফারাজের এই পাথরচাপা রাগ রুশদীকে কুরে কুরে খাচ্ছিল। ভালোবাসার মানুষের কাছে অবহেলিত হওয়াটা যেন আয়নার ওপর নিশ্বাস ফেলার মতো—সবটাই ঝাপসা হয়ে যায়, চেনা চেহারাটাও তখন অচেনা লাগে। ফারাজ রুশদীর ওপর অসন্তুষ্ট, এই ভাবনাটাই রুশদীর বুকের ভেতর সূঁচের মতো বিঁধছিল।
শের আজ মিতুর কাছেই ঘুমিয়ে পড়েছে। মিতুর একা ঘুমানোর ভয় কাটাতে শেরের সঙ্গটা বেশ কাজে লেগেছে। এদিকে রুশদী তার পড়ার টেবিলে একাগ্র। ভার্সিটি অ্যাডমিশন প্রিপারেশনের জন্য টেবিল ল্যাম্পের ম্লান আলোয় সে বইয়ের পাতায় ডুবে ছিল। হঠাৎ দরজার কবজা ঘোরার শব্দ আর সেই অতি পরিচিত দামি পারফিউমের ঘ্রাণ! রুশদীর বুঝতে বাকি রইল না কে এসেছে। খুশিতে আর উত্তেজনায় তার মনটা নেচে উঠল। সব অভিমান এক নিমেষে উধাও হয়ে গেল প্রিয়তমের আগমনে।
রুশদী দ্রুত চেয়ার ছেড়ে ঘুরে দাঁড়াল। ফারাজ ততক্ষণে রুমের মেইন লাইট জ্বালিয়ে দিয়েছে। পাইলটের ইউনিফর্মে ক্লান্ত ফারাজকে দেখে রুশদীর মায়া হলো। সে এগিয়ে গিয়ে বলল, “আজকে আসবেন বললেন না কেন!”
কিন্তু ফারাজ যেন কোনো পাথরের মূর্তি। কোনো উত্তর দিল না। রুশদীর উপস্থিতি সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে সে গায়ের কোটটা বিছানায় ছুড়ে ফেলল। এরপর আলমারি থেকে ট্রাউজার আর টি-শার্ট নিয়ে সোজাসুজি ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। রুশদীর ঠোঁটের কোণে থাকা সেই চওড়া হাসিটা নিমেষেই মিলিয়ে গেল। ফারাজের ব্যবহার তাকে কষ্টই দিল। সংসার মানে তো একটা সুতোয় দুজনে চলা; কিন্তু সেই সুতোয় যদি একজন গিঁট পাকিয়ে বসে থাকে, তবে অন্যজনকে তো তা খোলার ধৈর্য ধরতেই হয়। রুশদী নিজেকে সামলে নিল।ফারাজ যখন আগ্নেয়গিরির মতো তপ্ত হবে,তখন তাকে শান্ত করার দায়িত্ব তারই।
কিছুক্ষণ পর ফারাজ ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে লাগল। রুশদী আগের জায়গায় ঠায় দাঁড়িয়ে ছিল। ফারাজ একবার তার দিকে তাকাল, কিন্তু সেই চাহনিতে কোনো প্রেম নেই, বরং এক অদ্ভুত উদাসীনতা। সে সরাসরি বিছানায় গিয়ে বসে চুল মুছতে শুরু করল।
রুশদী ধীরপায়ে কাছে এগিয়ে গেল। নরম স্বরে জিজ্ঞেস করল, “খাবার কি রুমে নিয়ে আসব, নাকি নিচে গিয়ে খাবেন?”
“খাব না,” ফারাজের সংক্ষিপ্ত ও ভোঁতা উত্তর।
“কেন? খেয়ে এসেছেন?”
“নাহ।”
“তবে খাবেন না কেন?” রুশদীর কণ্ঠে এবার উদ্বেগ।
ফারাজ বিছানা ছেড়ে উঠে ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে নির্লিপ্ত গলায় বলল, “ইচ্ছা নেই।”
রুশদী আর নিজেকে সামলাতে পারল না। ফারাজের পিছু পিছু ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল সে। দুই হাত বুকের ওপর ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে দৃঢ় স্বরে জিজ্ঞেস করল, “কেন ইচ্ছা নেই?”
ফারাজ যেন রুশদীর উপস্থিতি অনুভবই করছে না। ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার থেকে যত্নে ক্রিম বের করে মুখে মাখল সে। এরপর পিছনে ঘুরে রুশদীর দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমার ক্ষুধা লেগেছে? তবে তুমি খেয়ে নাও। দয়া করে আমার মাথা খেয়ো না। তিন দিনের ট্রিপ ছিল, প্রচুর টায়ার্ড আমি, এখন ঘুমাব।”
ফারাজ পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাইলে রুশদী খপ করে তার বাম হাতের বাহু খামচে ধরল। তিন দিন ধরে মনের ভেতর জমে থাকা মেঘগুলো আজ বৃষ্টির মতো ঝরতে চাইছে। রুশদী এতটাই শক্ত করে ধরেছে যে তার বড় বড় নখগুলো ফারাজের চামড়া ভেদ করার উপক্রম।
ফারাজ কুঁচকানো চোখে তাকিয়ে বলল, “রুশদী ছাড়ো আমাকে, ব্যথা লাগছে।”
“ব্যথা আমারও লাগছে ফারাজ, হৃদপিণ্ডে ব্যথা লাগছে!এই তিন দিন ধরে আপনি বিনা কারণে আমার ওপর রাগ করে কথা বলছেন না, এর জন্য ব্যথা আমারও লাগছে। সমস্যাটা কী আপনার, বলবেন আমায়?”
ফারাজ এবার সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে রুশদীর চোখের দিকে তাকাল। বরফশীতল গলায় বলল, “সমস্যাটা আমার নয় রুশদী, তোমার। ছাড়ো এবার, আমি ঘুমাব।”
রুশদী তার পথ আগলে দাঁড়াল। “এমন কেন করছেন আপনি?”
“তোমারই তো আমার থেকে দূরে থাকার ইচ্ছা, তাই না? তাই আমি নিজে থেকেই দূরে থাকছি। তোমার কথা মতো সময় হোক, তখন না হয় কাছে আসব,”
“আপনি কিন্তু ছোট্ট একটা বিষয়কে অনেক বড় করে দেখছেন ফারাজ!”
“এটা মোটেও ছোট্ট বিষয় নয় রুশদী, এটা আমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ অধ্যায় হতে পারত।”
“আপনি শুধু আপনার দিকটা ভাবছেন, আমার দিকটা একবারও দেখছেন না।”
“তোমার দিকটা দেখছি বলেই তো তোমার থেকে দূরে থাকছি। তোমার ওপর জোর করতে চাই না।”
রুশদী এবার কিছুটা নুয়ে পড়ল। তার অভিমানী স্বামীটাকে আর কষ্ট দিতে চাইল না সে। মিনতি করে বলল, “আচ্ছা সরি! আমরা বাচ্চা নেব, কিন্তু আর একটা বছর সময় দিন প্লিজ!”
ফারাজ এবার নিষ্ঠুরভাবে বলে উঠল, “তোমাকে আনলিমিটেড সময় দেওয়া হলো রুশদী। আর কখনো বলব না। এখন পথ ছাড়ো।”
রুশদীর বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল।
“উফ ফারাজ! আপনি এমন করছেন কেন? আপনি কিন্তু আমাকে কষ্ট দিচ্ছেন।”
“তুমিও তো আমাকে কষ্ট দিচ্ছ!”
“আচ্ছা বাবা সরি তো!” রুশদী ফারাজের হাত জড়িয়ে ধরতে চাইল।
ফারাজ হাত সরিয়ে নিল। নির্লিপ্তভাবে বলল, “এখানে সরি বলার কিছু নেই রুশদী। তুমি যা চেয়েছ তাই হবে। এখন আমাকে ঘুমাতে দাও।”
রুশদী আর নরম হতে পারল না। সে ফারাজের একদম কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়াল, পায়ের আঙুলের ডগায় ভর দিয়ে একটু উঁচিয়ে ফারাজের চোখের দিকে চোখ রাখল। খুব মোলায়েম স্বরে বলল, “বলুন কী করলে কাজ হবে? আপনার এই জেদি রাগটা কীভাবে ভাঙবে?”
ফারাজ মুখ ফিরিয়ে নিল, “আমি রেগে নেই। তোমার রাগ ভাঙাতে হবে না।”
“একটা চুমু খাই?” রুশদী মরিয়া হয়ে চাইল একটুখানি আদরে সব বরফ গলিয়ে দিতে।
“নাহ!” ফারাজের ছোট আর কঠোর জবাব।
“প্লিজ…?”
“রুশদী, তুমি কি সরবে?”
“বেবি নেওয়ার জন্যই তো এত রাগ আপনার? ঠিক আছে, আমরা বেবি নেব। এবার নিজের এই রাগটা একটু কমান, প্লিজ… পিল্জ!”
ফারাজ এবার সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল, “বিরক্ত করা বন্ধ করো রুশদী।”
কথাটা তীরের মতো বিঁধল রুশদীর বুকে। সে আহত স্বরে বলল, “আমি আপনাকে বিরক্ত করছি?”
“হুম!”
ব্যস, রুশদীর ধৈর্যের বাঁধ এবার ভেঙে গেল। এতক্ষণের সব মিনতি আর ভালোবাসা এক মুহূর্তে অভিমানে রূপ নিল। সে তার আগের তেজি রূপে ফিরে এল। গলাটা একটু চড়িয়ে বলল, “আমি আপনার রাগ ভাঙানোর চেষ্টা করছি আর আপনি বলছেন আমি আপনাকে বিরক্ত করছি? আমি আপনার অভিমানের মূল্য দিচ্ছি বলে আপনি আমাকে এভাবে বলতে পারলেন? তার মানে আমি আপনার কাছে এখন একটা বিরক্তির কারণ, তাই তো?”
ফারাজ কোনো দ্বিধা না করে বলল, “হ্যাঁ, হচ্ছি।”
রুশদীর মেজাজ এবার সপ্তমে চড়ল। সে ঝঝকিয়ে উঠল, “ঠিক আছে! আপনি আপনার আকাশছোঁয়া রাগ নিয়ে থাকুন। আমার থেকে দূরে থাকার ইচ্ছা তো? থাকুন দূরেই থাকুন! আমারও অত ঠেকা পড়েনি আপনার রাগ ভাঙ্গানোর।আমি অত তেল দিয়ে কথা বলতে পারি না। মাঝরাতে অনেক কসরত করেছি, আর পারব না। নিজের রাগ নিজে ভাঙালে ভাঙান, নয়তো আমার থেকে দূরেই থাকুন!”
বলেই রুশদী সপাটে গিয়ে রুমের মেইন লাইটটা অফ করে দিল। পড়ার টেবিলের ল্যাম্পটা জ্বালিয়ে গটগট করে চেয়ারে গিয়ে বসল। অন্ধকারের মাঝে ফারাজের দিকে তাকিয়ে ঝাঁঝালো গলায় বলল, “আপনার না খুব ঘুম পেয়েছে? ঘুমান এখন। দাঁড়িয়ে আছেন কেন এখনো?”
ফারাজ আর কোনো তর্কে গেল না। সে নিঃশব্দে গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল এবং ব্ল্যাঙ্কেটটা একদম মাথা পর্যন্ত মুড়ি দিয়ে নিল। রুশদী মনে মনে ভেবেছিল, সেও যখন উল্টো রাগ দেখাবে, ফারাজ হয়তো এবার একটু নরম হবে বা তাকে মানাতে আসবে। কিন্তু ফারাজ যে সত্যি সত্যিই এভাবে শুয়ে পড়বে, সেটা সে কল্পনাও করেনি।
“ধ্যাত!” রুশদী রাগে গিজগিজ করতে লাগল। রাগে তার হাত-পা কাঁপছে, অথচ এই মানুষটার কোনো হেলদোল নেই! আকাশ ছোঁয়া জেদ আর প্রচণ্ড রাগ মনে চেপে সে পড়ার বইয়ের পাতায় দৃষ্টি দিল। যদিও বইয়ের অক্ষরগুলো এখন তার চোখের সামনে ঝাপসা হয়ে শুধু ফারাজের সেই নির্বিকার মুখটাই ভেসে।
ফারাজ ব্ল্যাঙ্কেট মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকলেও তার সজাগ দৃষ্টি ছিল রুশদীর ওপর। রাগে রুশদীর অবস্থা তখন দেখার মতো। সে কিছুক্ষণ পরপর ঘাড় ঘুরিয়ে দেখছে ফারাজ কী করছে। ফারাজকে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে দেখে রুশদীর রাগ যেন আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়তে চাইছে। খাতার পাতায় কলম দিয়ে হিজিবিজি কাটতে কাটতে কয়েকটা পাতা ছিঁড়ে ফেলল সে, তারপর কলমটা ছুড়ে মারল ঘরের কোণে।
ফারাজ মনে মনে হাসল। গত তিনটে দিন নিজের প্রিয়তমা স্ত্রীকে উপেক্ষা করা তার নিজের জন্যেও সহজ ছিল না।মেয়েরা সবকিছু সহ্য করতে পারলেও প্রিয় মানুষের অবহেলা সইতে পারে না। তার এই ইগনোর করার ট্রিটমেন্ট যে কাজে লেগেছে, তা রুশদীর এই ছটফটানি দেখেই স্পষ্ট।ফারাজ রুশদীর উপর জোর করতে চাই না, তাই এত সব নাটক করা।
আধা ঘণ্টা পর ফারাজ ব্ল্যাঙ্কেট সরিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে রুশদীর পড়ার টেবিলের পাশে দাঁড়াল। গলার স্বরে গাম্ভীর্য ধরে রেখে বলল, “কী পড়ছ?”
রুশদী মুখ না তুলেই ঝঝকিয়ে উঠল, “আপনাকে বলতে হবে কেন?”
“পড়াশোনায় মন দাও, আওয়াজ করে পড়ো।”
“আপনার সমস্যা কী? আপনি গিয়ে ঘুমান না!” রুশদী এবার চেয়ার ঘুরিয়ে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিল।
ফারাজ আলতো করে রুশদীর থুতনি ধরে নিজের দিকে ফেরাতে চাইল, কিন্তু রুশদী জেদ করে আবার মুখ ঘুরিয়ে নিল। ফারাজ নিচু স্বরে বলল, “তুমি আমাকে রাগ দেখাচ্ছ কেন?”
“আমি রাগ দেখাই আর যাই করি, আপনাকে দেখতে বলেছি? যান আপনি ঘুমান!”
ফারাজ আর কথা বাড়াল না। হুট করেই রুশদীর চেয়ারটা টেনে একটু দূরে সরিয়ে দিল এবং চোখের পলকে রুশদীকে পাঁজাকোলে তুলে নিল। রুশদী হকচকিয়ে গিয়ে পা ছড়াতে লাগল, “নামান আমাকে! দেখছেন না আমি বায়োলজি পড়ছি?”
ফারাজ বিছানার দিকে পা বাড়িয়ে বলল, “চলো তোমাকে প্র্যাকটিক্যালি বায়োলজি শিখিয়ে দিই।”
রুশদীর গাল দুটো মুহূর্তেই লাল হয়ে উঠল। সে ফারাজের বুকে ছোট ছোট কিল মেরে বলল, “ছাড়ুন বলছি! নাহলে কিন্তু আমি আপনাকে কামড় দেব!”
ফারাজ এক চিলতে দুষ্টুমিভরা হাসি দিয়ে বলল, “বিছানায় যাওয়ার পর দিও জান, এখন শান্ত থাকো।”
বিছানায় গা এলিয়ে দেওয়ার পর রুশদীর সব জেদ আর অভিমান যেন ফারাজের তপ্ত নিশ্বাসের কাছে হার মানতে শুরু করল। এতক্ষণের তপ্ত আবহাওয়া নিমেষেই এক মায়াবী ভালোবাসার চাদরে ঢাকা পড়ল। ফারাজের হাতের প্রতিটি স্পর্শে ছিল এতদিনের জমানো তৃষ্ণা আর অধিকারের গভীরতা। রুশদী প্রথমে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও প্রিয় মানুষের সান্নিধ্য তাকে দুর্বল করে দিল। তাদের হৃদস্পন্দন এক সুতোয় মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। অভিমানের মেঘগুলো বৃষ্টির মতো ঝরে গিয়ে সেখানে এখন শুধু ভালোলাগার রোদ্দুর।
রুশদীলজ্জায় ফারাজের প্রশস্ত বুকে মুখ লুকিয়ে রেখেছে। ফারাজ তার এলোমেলো চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে রুশদীর কানের লতি ছুঁয়ে ফিসফিস করে বলল,
“বায়োলজির প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসটা কেমন লাগল প্রফেসর রুশদী? এতোক্ষণ তো খুব খামচা খামচি করছিলে। এখন একদম বিড়ালের মতো লেপ্টে আছ যে?আজ থেকে তোমার শরীরের প্রতিটি ভাঁজে আর মনের প্রতিটি কোণে আমার অধিকারের সিলমোহর পড়ে গেল। যে পূর্ণতার জন্য আমি তিন দিন অপেক্ষা করেছি, তা আজ উশুল করে নিলাম। এখন থেকে পালানোর সব পথ বন্ধ, তুমি এখন আজীবনের জন্য আমার এই বুকের খাঁচায় বন্দী।”
অস্তরাগের রঙ পর্ব ২৩
রুশদী লজ্জায় আরও কুঁকড়ে গিয়ে ফারাজের বুকে একটা মৃদু কিল মারল। ফারাজ হাসল, এক তৃপ্তির হাসি।
*আমার মনে হচ্ছে, এমন সিন লেখা আমার উচিত হয়নি।খুব লজ্জা লাগছে আমার নিজের কাছেই, আপনাদের কাছেও কি তাই?আমি কি এই পার্ট টা ডিলিট দিব?খুব বাজে লাগছে?
আমি একজন মেয়ে, অনলাইনে কিন্তু কেউ আমাকে চিনে না। আমি যা করবো তার মাধ্যমে আমাকে চিনবে।আমি শুধু চাই না আমাকে কেউ খারাপ ভাবে চিনুক।
