ছায়াস্পর্শ পর্ব ৪৮
জান্নাত চৌধুরী
.. ২১শে ডিসেম্বর
সেদিন আগুন লেগেছিলো মীর বাড়িতে।
ভোরের দিকে নামাজ পড়তে উঠেছেন অরুনিমা। আরাধ্যের থানায় থাকার খবর ইতোমধ্যে তার কানে গিয়েছে। ছেলের চিন্তায় অসুস্থ শরীরটা আরো খানিক দুর্বল হয়ে পড়ছে। ফজরের নাম শেষে ছাদের এসে দাঁড়ালেন তিনি। ডিসেম্বর শেষের দিকে শিরশির হাওয়া গায়ে লাগছে। পরসু নির্বাচন। তবে এ বছর নির্বাচন হবে না মীরপাড়াতে আরো পাঁচ বছর চেয়ারম্যান থাকবেন মীর আহনাফ। প্রতিপক্ষ নেই, খন্দকার নিখোঁজ ইতোমধ্যে, সে পরিবারে কারো চেয়ারম্যান হবার মন মানসিকতা নেই বললেই চলে। ছাদ বাগানের চন্দ্রমল্লিকা ফুটেছে মৃদু বাতাসে কেমনে জানি মাথা দোলাচ্ছে। অরুনিমা খানিকক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে থেকে বাহির পানে তাকালো। এদিক ওদিক একটু খানি চোখবুলাতেই জঙ্গলে পথ কাউকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলো। মেয়েটার গরন ঠিক যেন মানহা। চশমা ছাড়া দূরের জিনিস ঝাপসা দেখে অরুনিমা। মাথায় উঠিয়ে রাখা চশমা চোখে দিতেই স্পষ্ট হলো মানহার অবয়। এতো সকালে এই মেয়ে জঙ্গলে কী করে?
অরুনিমার মনে প্রশ্ন জাগলো , সে সন্দেহ চোখে খানিক তাকিয়ে থাকতেই আতকে উঠলো। মানহা এক ছেলের সাথে দাঁড়িয়ে আলাপ চারিতা করছে তবে ছেলেটা তার চেনা লাগছে। চোখ ঘষে আরো একটু তাকাতেই ছেলের চেহারা পরিষ্কার হলো। খন্দকারের ছোট ছেলে, অরুনিমা দাঁতে দাঁত চেপে ধরলো। বেইমান কি সে ঘরেই পুষছে? তার সন্দেহ লাগলো আরাধ্যে জেলে যাওয়ার পিছনে নিশ্চয়ই এই মেয়ে গাঢ় হাত রয়েছে। অরুনিমা অধিক সময় তাকিয়ে থাকলো তাদের দিকে। ঠিক যতক্ষণ না কথা শেষ করে মানহা বাসার দিকে আসে।
হলো তাই কথা শেষ করেই মানহা মাথায় লম্বা একটা ঘোমটা টেনে বাড়ির দিকে এলো। অরুনিমা তখনো ছাদের দাঁড়িয়ে- সকলের সূর্য রশ্মির দেখা মিলছে প্রকৃতির ধীরে ধীরে আরো বেশি আলোকিত হচ্ছে। রোজ নিয়ম করে সকাল হয় , আবার সূর্য অস্ত যায়। এইটাই তো প্রকৃতির নিয়ম।
অরুনিমা ছাদ থেকে নামলো যখন, তখন বাজে সকাল ৭টা। আজ রন্ধনে যায় নি সে। মন শরীর ভালো না থাকলে কাজে মন বসে না। রেণুর মা টেবিলে খাবার দিয়েছে। অরুনিমা প্রথমে ইফরাহর ঘরে গেলো ইফরাহ তখন বেলকনিতে পাতানো দোল খাওয়া চেয়ারে বসে ঘুমাচ্ছে। বুকের ওপর একটা ডাইরি। অরুনিমা ডাকল , বউরানী
ইফরাহ গভীর ঘুমে , বেশ কয়েকবার ডেকেও সাড়া এলো না। উপায় না পেয়ে অরুনিমা একটু ঝাকুনি দিলো তার শরীরে। ইফরাহ চমকে উঠল, অরুনিমা দ্রুত বলল – “ আমি .. আমি বউরানী!”
শান্ত অবুঝের চোখে তাকালো ইফরাহ। গালে পানি শুকানোর দাগ !
অরুনিমা ব্যপারটা লক্ষ্য করে বলল , “ কেঁদেছো মেয়ে।”
ক্ষত স্থানে যেন লবণ পড়লো। ইফরাহ তবুও নিজেকে সামনে বলল,
“ আমায় ডাকছেন আম্মা কিছু প্রয়োজন?”
অরুনিমা মলিন কন্ঠে বলল , “ খাবে চলো। এসময় শরীরের অযত্ন করতে নেই যে।”
-কিন্তু আমার যে খিদে নাই আম্মা।
অরুনিমা বলল , “ ফাইয়াজ শুনলে কি হবে ভেবেছো। তার সন্তানের অযত্নে তোমাকে শুলে চড়াবে।”
ইফরাহ পেটে হাত রাখলো। সবে মাত্র জেনেছে সে মা হবে অথচ কত মায়া মায়া লাগছে নিজের জন্য। কিন্তু ওই লোক তো জানে না সে বাবা হবে। ইফরাহ উঠে দাড়াল , “ চলুন তবে।”
দুজনে মিলে অন্দরে এলো , অরুনিমা রুটি আর সবজির বাটি এগিয়ে দিলো। প্লেটে একটা সিদ্ধ ডিম। ইফরাহ রুটির এক কোণ ছিড়ে মুখে দিতে চোখ থেকে টুপটুপ করে পানি ঝড়লো। রেণু মা আরো দুটো রুটি এনে রাখলো টেবিলে ইফরাহ শুকনো মুখটার দিকে তাকিয়ে বলল , “কাঁদবেন না বউরানী, আমাগো ছোট নবাব ভালো মানুষ আল্লাহ হের ভালো করবো।”
ইফরাহ শুধুই ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে সব শুনলো। কতখানি অসহায় লাগছে তার। কিছু হারানোর বেদনায় আকড়ে ধরছে তাকে-
বেলা দশটায় থানায় এলো ইফরাহ ,সাথে এলো মানহা। রেজা আরাধ্য কে একই জায়গায় রাখা হয়েছে। ইফরাহ দেখলো রেজা খানিক শুকিয়ে গেছে। খাবার নিয়ে পুলিশের সাথে ঘোর তর্ক করেছে খানিক সময়। লোকটা জেলের খাবার খেতে পারবে না। ইফরাহ বাসা থেকে খাবার এনেছে অথচ জেলে তা গ্রহণযোগ্য নয়। তাদের ভাষ্যমতে যদি খাবার খাইয়ে আরাধ্য সে মেরে দেয়। ইফরাহ অবাক হয়েছিল নিজের স্বামীকে নাকি সে মারবে বাহ। কি যুক্তি , কাব্য এলো তাদের সাথে। ইফরাহ দুচোখ ভরে উঠছে বারবার। জেলের খুব কাছে এসে দাঁড়ালো আরাধ্য হাঁটুতে মাথা ঠেকিয়ে বসা। লোকটার পড়নে গত কালের কালো গেঞ্জিটা। ইফরাহ আগমনে রেজা ডাকলো আরাধ্য , “ ছোট নবাব।”
ডাকটা ভীষণ ক্ষিণ তবুও আরাধ্য শুনলো বসা ছেড়ে উঠে এগিয়ে এলো। চোখ দুটো লাল হয়ে আছে। আরাধ্য মেয়েটাকে দেখে নিয়ে প্রশ্ন করল , কেনো এসেছো ইরা ; তোমার পাপি কে দেখতে !
ইফরাহ দীর্ঘশ্বাস ফেলল, “ এভাবে বলছেন কেনো?”
-ঘৃণা লাগছে না?
আরাধ্য জিহ্ব দিয়ে মারি আটকালো। ইফরাহ জিজ্ঞেস করলো ,
“ কপালে কাটলো কি করে ওরা আপনাকে মেরেছে?”
-শরীর কেমন তোমার ?
ইফরাহ চোখ বুজে নিজেকে শান্ত রাখলো । খানিক চুপ থেকে বলল ,
“ এড়িয়ে যাচ্ছেন ?”
-এসব খুচরা পাপের প্রায়শ্চিত্ত , এগুলো মাইর বলে না।তবে তোমার খুশি হওয়া উচিত তোমার পাপী শাস্তি পাচ্ছে।
-আমি নিজেও পবিত্র নই !
আরাধ্য ধমকে গর্জে উঠলো হাত বাড়িয়ে চেপে ধরলো ইফরাহর গলা। চিবিয়ে চিবিয়ে বলল , “জানে মেরে দিবো একদম , আর একবার বাজে বকলে। তুই পবিত্র, আমি যখন বলেছি পবিত্র মানে তূই পবিত্র।
কিছুটা ধাক্কা দিয়ে ইফরাহ গলাটা ছাড়লো আরাধ্য। ইফরাহ দু কদম পিছিয়ে গেলো খুক খুক করে কাশি দিয়ে নিজকে সামলে নিলো। তারপর আবারো এগিয়ে এলো আরাধ্য কাছে। আলতো হাত ছুঁই দিলো আরাধ্যে ক্ষত স্থানে। আরাধ্য বলল , “ফিরে যাও ইরা ! আমি ফিরবো খুব শিঘ্রই !
ইফরাহ শুষ্ক ঢোক গিললো , “ জলদি ফিরে আসুন আমি পথ চেয়ে অপেক্ষা করবো আমাকে নিরাশ করবেন না তো !”
আরাধ্য নিষ্পলক চোখে কান্নারত মুখটা দেখলো ইফরাহর , “তোমার সুখ লাগছে না। কষ্ট পাচ্ছো ? ভালোবেসে ফেলেছো তাই না?”
ইফরাহ কঠোর হলো,“ বাসলেই কী ?”
-ভালোবাসো!
-আসছি আমি।
আরাধ্য হাসল, পালাচ্ছো?
-হয়তো !
আরাধ্য আর কথা বাড়ালো না। সব কথা ফেলে জিজ্ঞেস করলো , “সাথে কে এসেছে?”
-মানহা বুবু।
আরাধ্য আশেপাশে একটু খুজলো বোধহয়। ইফরাহ বুঝে বলল ,
“ একজন আসার অনুমতি ছিলো আমিই এসেছি বুবু বাহিরে। আসছি!”
ইফরাহ চলেই যাচ্ছিলো আরাধ্য ডাকল, “ ইরা।”
ইফরাহ থামলো, ঘাড়টা অল্প ঘুরিয়ে বলল , “হু”
-ডাক্তার এসেছিলো।
-”জ্বি!
-“শরীরের যত্ন নিও তোমায় ভীষণ শুকনো লাগছে। আজ সাজোনি কিন্তু!”
ইফরাহ দীর্ঘশ্বাস নিংড়ে বলল , “ জলদি ফিরে আসুন, অনেক কথা বলার আছে।”
ইফরাহ বেড়িয়ে গেলো আরাধ্য তাকিয়ে দেখলো তার চলে যাওয়া। ঠিক যতক্ষণ অবধি না মেয়েটা চোখের আড়াল হয়। নাহিদুল এসে দাড়ালো আরাধ্য কাছে। জেলের দরজা বন্ধ খুলে ভিতরে গিয়ে বসল , রেজা দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে আছে। কয়েকদিন অত্যাচারে শরীরে জ্বর উঠেছে। অথচ তার মুখ থেকে একটা টু শব্দ অবধি বের করতে পারে নি। আরাধ্য এসে বসলো রেজা পাশে , নাহিদুল তখনো বসা। একজন কনস্টেবল এসে তিনপ্লেট ভাত দিলো তিনজনকে। আরাধ্য খাবার দেখে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে বলল , “ বাপরে আসামীর জন্য এতো দামি খাবার কাহিনী কী অফিসার?”
-এটা থানার খাবার নয় ,তোর বউ এনেছে!
আরাধ্য প্লেট হাতে তুলে নিলো তরকারীর ঘ্রাণ হাতে নিয়ে শুকলো। এটা অরুনিমা রান্না নয় , রেণুর মা রান্না। রেণুর মা তরকারিতে পাঁচফোড়ন দেয় সাথে আস্ত জিরা। নাহিদুল হাত ধুয়ে খেতে লাগলো। রেজার দেহ জ্বরে কাবু। আরাধ্য হাত ধুয়ে ভাত মাখালো প্রথম লোকমা ভাত রেজার দিকে দিলো। রেজা আবাক হলো বোধহয় আরাধ্য বলল , “ তাকিয়ে না থেকে খেয়ে নে।”
নাহিদুল দু’জনের মধ্যে বন্ধন দেখলো। খেতে খেতেই নাহিদুল প্রশ্ন করলো , “ তোর বউকে কতটা ভালোবাসিস তুই ?”
-আরে শালা, তুমি মাল হঠাৎ আমার বউরে টানো কেন বাল ?
নাহিদুলের রাগ করার কথা অথচ সে রাগলো না। আরাধ্য কে রাগিয়ে, মেরে অন্তত কোনো কাজ হয়না। নাহিদুল বলল , “ ভালোবাসিস না বউকে ?
-বাসি !
-কতটা ?
আরাধ্য এক লোকমা ভাত নিজের মুখে দিয়ে বলল , “ যতখানি মানুষ মরণব্যথি হয়েছে শুনলে নিজেকে ভালোবাসে ততখানি।”
-তারমানে খুন হবি জেনেও খুনির প্রতি ভালোবাসা।
আরাধ্য মাথা ঝাকালো , “ উহু ! নিজকে সমর্পণ করাকে খুন বলে না। তাই সে খুনি নয়। যে শুধু উপমা , ভালোবাসার উপমা। সে স্নিগ্ধ।”
নাহিদুল খাওয়া থামিয়ে দিলো। আরাধ্য বলল, “ কি জানতে চাও অফিসার?”
-চয়ন কে তুই মেরেছিস?
আরাধ্যে খানিক চুপ থেকে এঁটো হাত ধুয়ে নিয়ে বলল , “ মেরেছি।”
রেজা হতবাক হলো। কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলো সে আরাধ্য ইশারায় চুপ করালো। নাহিদুল জিজ্ঞেস করলো , “ কেনো মারলি ?”
-আমার বউকে ছুঁয়েছে সে।
-ব্যাস এই জন্য দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিবি?
রেজা গর্জে উঠলো ,“ ওই বাইনচোদ একটা রেপিস্ট অফিসার। এক মেয়েকে ধর্ষণ করেছে। আর ধর্ষকের শাস্তি মৃত্যই হয়।”
নাহিদুল চমকালো। রেজা খানিক রাগান্বিত গলায় বলল , “ ধর্ষণ ফাইল সরিয়ে দিয়েছে আপনার থানার অফিসার। মাতব্বর সরিয়ে নিয়েছে। মামুন আকন্দ আর জাহানারা আকন্দের মেয়ে মেঘারে এক দল সহ ধর্ষণ করেছে ওই জানোয়ার। তার শাস্তি পেয়েছে সে। রেপিস্টের বেঁচে থাকার অধিকার নেই দুনিয়ার বুকে।
নাহিদুল কিছু চুপ থেকে আবার জিজ্ঞেস করল , “আব্বাস খন্দকার কে খুন করার কারণ?
-ওই আরেক গাদ্দার। গাদ্দারি করেছে চোদন খেয়েছে।
নাহিদুল খাওয়া শেষ করে এক গ্লাস পানি পান করল , “ তোর কী মনে হয়না খুনের জন্য তোর ফাসি হতে পারে।
আরাধ্য গা ছাড়া ভাব ধরলো , ” আপনি যখন বলছেন হতেই পারে।”
নাহিদুল বসা ছেড়ে উঠলো। জেলের বাহারে যাবার আগেই আরাধ্য ডাকল, “ অফিসার।”
নাহিদুল ঘুরলো , আরাধ্য বলল , “পরবর্তীতে কিছু জানতে হলে দুর্বলতা জায়গায় হাত মারবেন না। কারণ সেটা সবসময় কাজে নাও লাগতে পারে।”
নাহিদুল মুসকি হেসে বেড়িয়ে গেলো। আরাধ্য মেঝেতে শুতে শুতে গান ধরলো ,
ছায়াস্পর্শ পর্ব ৪৭ (২)
“ অমার সারা দেহ খেয়ো গো মাটি।
এআ চোখ দুটো খেয়ো না।
আমি মোরে গেলেও তারে দেখার স্বাদ মিটবে না গো মিটবে না।
তারে এক জনমে ভালোবাসে ভরবে না মন , ভরবে না।”
