তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ১৬
ঐশী আফরিন
ভাঙা বিল্ডিং এর বদ্ধ রুম জুড়ে বারি খাচ্ছে জীবন ভিক্ষা চাওয়া এক অপরাধীর চিৎকার।জীবন বাঁচানোর তাগিদে অনবরত ক্ষমা চেয়ে যাচ্ছে।কিন্ত সামনে বসা অগ্নিমূর্তির কানে কিছুই যেন ঢুকছে না।একদমই নির্বিকার ভাবে সে নিজের কাজ করে যাচ্ছে।তার সামনে এক শত বছর পুরনো মাথার খুলি।বার বার সেই বিধ্বংসী অগ্নিমূর্তি সেই খুলির উপর হাত কাত করে থাপ্পড় দিচ্ছে সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রাণ ভিক্ষা চাওয়া অপরাধী জান ছেড়ে চিৎকার করছে।আশেপাশে জ্বলছে চারটা মোমবাতি।মোমগুলোর মাঝে তাঁরার মত কিছু একটা আঁকা।পুরো জায়গাটা বিদ্ধস্ত।এক নিঃশ্বাসে কি যেন মাথা ঝাকিয়ে বিরবির করে যাচ্ছে অগ্নিমূর্তি।পুরো দেয়ালজুড়ে প্রদীপ ঝুলানো।সামনে আবার আগুন জ্বলছে।মোটকথা পুরো ঘরটাই আগুনে জ্বলজ্বল করছে।
এক সময় সেই অগ্নিমূর্তি উঠে দাঁড়ায়।ঘাড়ে হাত রেখে মাথা বাঁকা করে কয়েকপলক তাকিয়ে থাকে মাটিতে শুয়ে কাতরানো লোকটার দিকে।তারপর নিঃশ্বব্দে তার চুলের মুঠি ধরে বলে,
” ভাবিস না তোকে ছেড়ে দিচ্ছে।আমি কাওকে মেরে ফেলি না।মেরে ফেললে সেটা শাস্তি হয় না বরং মুক্তি দেওয়া হয়।আর তুই যে ভুল করেছিস সেটার শাস্তি হিসেবে তুই সারাজীবন আমার বন্দিদশায় বন্দি হয়ে থাকবি।জানোয়ারের বাচ্চা।তোকে মৃত্যুর দ্বার প্রান্ত থেকে ঘুরিয়ে আনবো তবুও মৃত্যুর মুক্তি নামক স্বাদ পেতে দেব না ”
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
সকাল সকাল মাধবী আরিয়ান কে সাথে নিয়ে রাজ্য ভ্রমণে বের হয়।অজয় তাদের পেছনের ঘোড়ায়।দু পাশে সারি সারি মানুষ দাঁড়িয়ে সালাম করছে তাদের রাণী মাকে।মাধবীর বোরখা আর নিকাব বাতাসের সাথে তাল মিলিয়ে উঁড়ছে।আরিয়ান তা একটু পর পর আড় চোখে দেখছে।মাধবী নিখুঁত হাতে ঘোড়ার লাগাম টানা দেখছে তার সমবয়সী সহপাঠীরা।মাধবীর চোখে এক কঠিন দৃড়তা।তার চোখের তীক্ষ্ণতাই বুঝিয়ে দিচ্ছে তার অসাধারণ ব্যক্তিত্ব।অপর দিকে আরিয়ানের সুঠাম দেহি শ্যামবর্ণের লাবণ্যও তাদের চোখে খেলছে।কিন্ত মাধবীর তীক্ষ্ণ চোখ তাদের দিকে তাঁক করা দেখে থতমত খেয়ে সঙ্গে সঙ্গেই চোখ সরিয়ে নিলো।
দীর্ঘ পথের পর তারা ঘোড়া থামালো রাজবাড়ির বিশাল মাঠের সামনের রাস্তায়।এক সময় রাজ্য ভ্রমণের পর মাহফুজ চৌধুরী রাজবাড়ির বিশাল মাঠ টায় থামতো।পুরো গ্রামের মানুষ ঘেরাও দিয়ে দাঁড়াতো সেই তেজস্বী লোকটাকে।আর আজ দাঁড়াল সেই তেজস্বী বাপের তেজস্বী মেয়েকে ঘেরাও করে।তবে আজ আর সেই মাঠে দাঁড়াতে পারলো না।কারণ মানুষ আজ ভয় পায় সেই মাঠকে, ভয় পায় সেই রাজবাড়িকে।মাধবী কিছুক্ষন নিবিড় ভাবে তাঁকিয়ে রইলো শ্যাওলা পরা বিদ্ধস্ত বাড়িটির দিকে।খুব করে মনে পড়লো সেই দিনগুলোর কথা।বাবার কথা মনে হতেই চোখের কণে জমা হলো নিরব অশ্রু।আরিয়ান তা দেখে আস্তে করে ডাকলো,
“মধু…?”
সে অন্যমনষ্ক থেকেই জবাব দিলো “হুমমম”
“মানুষ অপেক্ষা করছে।কিছু বলবি না?”
মাধবী নিরবে অশ্রু মুছে ফিরে গেল আগের রুপে।তখনই ভিড়ের মধ্যে থেকে বেরিয়ে আশে এক বৃদ্ধ মহিলা।চোখ ওনার জলে চিকচিক।মাধবী তা লক্ষ্য করে জিজ্ঞেস করলো,
“কী হয়েছে আপনার?কান্নার কারণ কী?”
বৃদ্ধ মহিলা চোখের পানি মুছে মিইয়ে যাওয়া কন্ঠে বলতে শুরু করলো “রাণী মা।আমার ছেলেটা কাল আপনাদের ছোট বাড়ির পেছন দিয়ে কোথায় যেন গিয়েছিল।ছেলেটা আমার আর ফেরেনি।আমাদের গ্রামের কুদ্দুস আলী সেখানে ছেলেটার চিৎকার শুনেছিল।ভয়ে আর সেখানে যায়নি।এখন আমার ছেলেটার কোন খোঁজ পাচ্ছি না।জমিদার সাহেব থাকা কালীন কখনো এরকম হয়নি।এখন বিগত ৪-৫ যাবৎ গ্রামের মানুষ নাই হয়ে যাচ্ছে।যে হাড়াচ্ছে তার চিহ্নটা পর্যন্ত পাওয়া যায় না।বেশিরভাগ মানুষ নিখোঁজ হচ্ছে রাজবাড়ির কাছে এলেই।এভাবে চলতে থাকলে আমরা কীভাবে থাকবো এই গ্রামে ”
ক্রোধে মাধবীর চোয়াল শক্ত হয়।বড় করে নিঃশ্বাস ছেড়ে চিবিয়ে চিবিয়ে সুধায় “এত দিন বলেন নি কেন আপনারা?”
বৃদ্ধ মহিলাটি কাঁপা কন্ঠে উত্তর দেয় “এতদিন কম হাড়াচ্ছিলো।এখন বেশি হয়ে গেছে”
মাধবী চিৎকার করে বলে “এটা আপনাদের কম মনে হচ্ছে।পুরো আস্ত মানুষগুলো হাড়িয়ে যাচ্ছে আর আপনারা এটাকে কম বলছেন?”
সবাই চুপ করে শুধু শুনে যায় রাণী মায়ের ঝাঁঝালো মধুর কন্ঠস্বর।ঝাঁঝালো কন্ঠে বললেও তার আকর্ষণীয় গলার টোন সবাইকে মুগ্ধ করে।তার নির্বিশেষে তাকিয়ে থাকে সেই মায়াবী চোখজোরায়।ভুলে যায় তারা কথা বলতে।মাধবী আরো কিছুক্ষণ সকলের কথা শুনলো।সবার একটাই অভিযোগ গ্রাম থেকে মানুষ হাড়াচ্ছে।কিছু একটা ভেবে
“আমি দেখছি” বলেই সে ঘোড়ার লাগাম ঘোরায়।
আরিয়ান সবাইকে চলে যেতে বলে মাধবীর পিছু নেয়।মাঝ রাস্তায় ডাকে তার ব্যাক্তিগত শ্রেয়সীকে,
“মধু…?”
“হুমমম”
“কী করবি?”
“ভেবে বলবো”
“সন্দেহ হয় কাউকে?”
মাধবী তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে বলে “প্রথমত চৌধুরী বংশ,দ্বিতীয়ত গ্রামের মানুষ।যেই হোক তবে চাল একজনই চালছে।কে হতে পারে এত দুঃস্বাহসী!কত বড় কলিজা হলে এত সাহস দেখাতে পারে।খুঁজে তো আমি বের করবই।আর যখন পাবো ঐ শুয়োরের বাচ্চার কলিজাটা বের করে আনবো”
আরিয়ান মনোযোগ সহকারে সবটা শুনে গেল।তারপর প্রসঙ্গ পাল্টে হঠাৎ বললো “দু বছর আগে যে মাঝ রাতে তোকে একটা বড় ব্যাগ দিয়েছিলাম মনে আছে?”
“ব্যাগ?”
“হ্যা।যেদিন তোকে বি….
বলতে বলতে সে থেমে যায়।
মানে ঠিক কত বড় বোকামি করছিল ভাবা যায়!তৎক্ষণাৎ সে জিভে কাঁমোর দেয়।
” যেদিন ‘বি’ পরে কী?”
“কিছু না।আগে মনে কর”
মাধবী মনে করে বলে “হুম মনে পড়েছে”
“ভেতরে কি আছে খুলে দেখিছিলি?”
“না।সময়,সুযোগ,মনে থাকা, কোনটাই হয়ে উঠেনি”
থেমে আবার আগ্রহী হয়ে বলে “কেন কী ছিল ঐ ব্যাগে?”
“প্রথমে দেখিসনি সেটা তোর ব্যর্থতা।এখন আমি কিছু বলতে পারবো না”
“বলুন না পাঞ্জাবিওয়ালা”
আরিয়ান অবাক চোখে তাকায় অতিব সুন্দরী রমনীর মুখে নিজেকে এরকম ডাকতে শুনে।অবিশ্বাস্য সুরে জিজ্ঞেস করে “কে পাঞ্জাবিওয়ালা?”
“যে সর্বক্ষণ সাদা রঙের পাঞ্জাবি পরে থাকে।যার মাথায় ঘাড় ছুঁই ছুঁই বাবরী চুল।যার চোখের নিচে একটা কাটা দাগ আছে”
রুপসীর মুখে নিজের বর্ণনা শুনে এখন পাঞ্জাবিওয়ালার নিজেকে ধন্যবাদ দিতে করছে সবসময় পাঞ্জাবি পরার জন্য।
” আমার এত বর্ণনা কীভাবে জানিস?”
“কেন আপনি কি আমার সাথে অদৃশ্য অবস্থায় চলেন!”
আরিয়ান মুচকি হাসলো।আবারও মধুমতীর মনের কোণে উঁকি দিচ্ছে সেই গান,
” রসিক তেলকা জ্বালা
ঐ লাল কূর্তাওয়ালা
দিলে বড় জ্বালা রে…
পাঞ্জাবিওয়ালা
দিলে বড় জ্বালারে…
পাঞ্জাবিওয়ালা ”
আরিয়ান শস্থির নিশ্বাস ফেললো মাধবী ব্যাগের বিষয়টা ভুলে যাওয়াতে।সেই ব্যাগটা যদি মেয়েটা একবার খুলতো তাহলে হয়তো তাদের সম্পর্কটা এত সহজ থাকতো না।ধ্বংস অনিবার্য ছিল ইশান এবং চৌধুরী বংশের সকলের।আজ চৌধুরীদের সাথে সকলেই সারে তিন হাত মাটির নিচে থাকতো।এসব ভেবে সে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।
শুকনো পাতার শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে রাজবাড়ির সামনের বিশাল মাঠ জুড়ে।এক রূপকথার সুন্দরী হেঁটে যাচ্ছে তার উপর দিয়ে।হাতে তীর, পিঠে ধনুক।চলায় এক নিরবিঘ্ন আকর্ষণীয়তা।গায়ের ওড়নাটা দিয়ে মুখ ঢেকে রেখেছে।রাত বেশি হওয়ায় বোরখা পরেনি।বড় গাউন পরে ওড়না দিয়ে মুখ ঢেখেছে।
মাধবী এই রাতের বেলা পালিয়ে এসেছে ছোট বাড়ি থেকে।আরিয়ান, অজয়, বাড়ির কাজের মেয়েগুলো সবাই গভীর ঘুমে মগ্ন।তার সন্দেহ গারো হয় বাড়ির পেছনের জঙ্গলের সেই বড় বট গাছটার প্রতি।সেখানেই তো পরে থাকে মানুষের মাথার খুলি,কাটা হাত পা।তবে আগে গ্রামের মানুষ নিখোঁজ হতো না।এখন নিখোঁজ হয়।কোথা থেকে আসবে এসব?যদি কেউ না ফেলে।সেই সন্দেহের বসেই তার এই রাত বিরাতে এই অভিশপ্ত বাড়িতে আসা।সাথে রাজবাড়িটা একবার ঘুড়ে দেখার ইচ্ছা।
তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ১৫
এসব ভাবতে ভাবতে সে বড় ফটকের সামনে দাঁড়ায়।যেখানে দিনের বেলাতেও কেউ রাজবাড়ির আশপাশও মারায় না সেখানে সে একা একটা মেয়ে এটার ভেতরে ঢোকার চিন্তা করছে।দূর থেকে কেউ যদি দেখে মাঝ রাতে এই অভিশপ্ত বাড়ির সামনে লম্বা গাউন পরে মুখ ঢেকে কোন মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।নিশ্চিত হার্ট এটাক করবে।আর যদি চোখ ঝলসে যাওয়া চেহারাটা দেখতে পারে তাহলে তো কথাই নেই।কোন জ্বীন পরি ভেবে জায়গাতেই মারা যাবে।
