Home নিবৃতা নিবৃতা পর্ব ১

নিবৃতা পর্ব ১

নিবৃতা পর্ব ১
নেহার ছায়ালিপি

– তালাকপ্রাপ্ত এক বাচ্চার বাবা হয়ে, অবিবাহিত এক মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব দিতে ভীষন সংকোচবোধ হয়েছিল আমার। তবে পরবর্তীতে, অপরপক্ষও বেশ কিছু কথা জানিয়েছে আমাকে।
– যেমন?
– মেয়েটার ভবিষ্যতে কখনো মা হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। তবে এ নিয়ে আমার কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু!
পুরুষালী কণ্ঠটা থেমে এলো সহসা। যেন আগত শব্দগুচ্ছ উচ্চারণ করতে তার বেশ জড়তা। ভর্ৎসনায় উঁচু নাক কেমন কুঁচকে গেলো। কলের অপর প্রান্তে থাকা নারীটির ভ্রু গুটিয়ে নিলেন। সন্দিগ্ন গলায় জানতে চেয়ে বললেন,
– কিন্তু কি?
এক দীর্ঘশ্বাসের গুমোট শব্দ মিলল পরপর। মানুষটা বড্ড তিক্ত গলায় বলল,

– আমাকে জানানো হয়েছে তার একটা অতীত আছে। বাজে অতীত! সেটা থেকেই নাকি আজ তার এই দশা হয়েছে। সব মানা যায়, তাই বলে এরকম চরিত্রহীন ও আত্ম নিয়ন্ত্রণহীন কাওকে কিভাবে মেনে নিবো? আবারো কিভাবে এমন জীবনে জড়িয়ে পরি আমি? তালাকপ্রাপ্তা কিংবা বিধবা হলে তাও ভালো হতো।
নারীটি এবার একটু থমকে গেলেন। ইচ্ছে করলো মেয়েটিকে নিয়ে কিছু একটা বিরূপ মন্তব্য করে বসতে কিন্তু জীবন ও অভিজ্ঞতা তাকে শিখিয়েছে, কখনো কারও পরিস্থিতি সম্পর্কে না জেনে তাকে কটাক্ষ না করতে। তাই ভাইয়ের জন্য নিজেকে সামলে নিলো সে। প্রশ্ন করে বললেন,
– প্রেমের বিয়ে তো তোরও ছিল।
এ কথায় পুরুষটি এবার ক্ষোভ নিয়ে বলল,
– আমার সাথে তুলনা করছো তুমি? আমি সবার বিপক্ষে গিয়ে ওকে বিয়ে করেছিলাম। সসম্মানে আমার সংসারে এনেছি। আর এখানে ওই মেয়ে অবিবাহিত ছিল।
ভাই তার ভুল কিছু বলে নি। তাকরিমা এক দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। বিষয়টা এতো জটিল হয়ে গেলো কেন? তার ভাইয়ের জীবনটা কেন অন্য দশজনের মত স্বাভাবিক হচ্ছে না? উনি না পারতে বললেন,

– তাহলে এখন উপায় কি? তোর মেয়ে কি মানবে?
মেয়ের প্রসঙ্গ আসতেই মানুষটা চুপ হয়ে গেলো। তার শান্ত শিষ্ট, লক্ষিমতন মেয়েটা কখনো কোন বিষয় নিয়ে জেদ করে নি। বাবাই তাকে একলা হাতে বড় করেছে। তাইতো একান্ত বাধ্যগত সে। বাবা যা বলেছে, যেভাবে বলেছে, ঠিক পইপই করে সেটাই করেছে। তবে আজ কেন যেন এই গুরুতর বিষয়ে এসেই সে বেঁকে বসেছে। কোনভাবেই মানছে না। সে শক্ত গলায় বলে,
– আমার তো দ্বিতীয় বার বিয়ে করার কোন ইচ্ছেই ছিল না। নারী জাতির প্রতি আমার আর কোন অনুভূতি কাজ করে না। আমি তার সাথে কথা বলে দেখবো। যদি মনে হয়, সে আমার মেয়ের একজন সঙ্গী হতেই পারে তাহলে সেটুকুই।
– তাবিব, তুই যে এভাবে বলছিস, তোর সন্তানও কিন্তু একজন মেয়েই।
তাবিব এ বারে ঠোট এলিয়ে হাসল। দর্প নিয়ে বলল,

– আমি আমার মেয়েকে এভাবে বড় করবো, যেন যে দেখে সেই অবাক হয়ে যায়। আমি ওকে নারী হিসেবে নয় কিংবা পুরুষের সাথে প্রতিযোগিতা করেও নয়, শুধুই একজন মানুষের মত মানুষ গড়ে তুলবো।
– তোর মনোবাসনা যেন পূর্ণ হয়।
– আমিন।
– তুই সময় নিয়ে, বুঝে শুনে সিদ্ধান্ত নিস।
ওর জন্য যেহেতু মা লাগবেই তাহলে যার প্রতি ওর মন টানে তাকেই অগ্রাধিকার দিস। ও তো এখন বড় হচ্ছে। এ বয়সে বাচ্চারা নিজ অনুভূতি ও পছন্দ নিয়ে কিন্তু অনেক বেশি সোচ্চার থাকে। তাই তুই বেশি বাড়াবাড়ি করতে গিয়ে আবার হিতে বিপরীত করে ফেলিস না।
তাবিব গম্ভীর মুখে সায় জানিয়ে বলে,
– আচ্ছা। ভালো থেকো আপু।
– তুইও নিজের যত্ন নিস।
– আসসালামু আলাইকুম।
– ওয়া আলাইকুমুস সালাম।

কল রেখে দিয়ে গম্ভীর মুখে বসে রয় তাবিব। এই নিঃসঙ্গ জীবনে পুনরায় কাওকে জরাতে চায় নি ও। মাঝে মাঝে একাকীত্ব আমাদের দৃশ্যমান কোন সঙ্গীর চাইতে অধিকতর শান্তি দেয়। চেয়ারে পীঠ এলিয়ে দেয় ও। ঠিক সম্মুখে নিকষ কালো আধার। বারান্দায় বসে আছে তাবিব। বাংলাদেশে এ সময়ে রাত হলেও সুদূর আমেরিকায় এখন দিনের বেলা। সেখানে বসবাসরত বড় বোনের সাথে কথা বলছিল তাবিব। বোনের কথাগুলো মাথায় ঘুরছে। গহন তমসা পানে গভীর নয়ন নিমজ্জিত করতেই কখন যে ভাবনায় পুরোপুরি ডুবে গেলো সে! হঠাৎ পাশের চেয়ারে মৃদু শব্দ হতেই তাবিবের ধ্যান ছুটে। ও জানে, এখানে কে এসে বসেছে। এ সময়ে তারা দুজন ছাড়া এই বাড়িটিতে দ্বিতীয় কারও অস্তিত্ব থাকে না। তাবিব নিজেকে সামলে নিলো। মেয়েকে বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে সে ধারনা পেতে দিতে চায় না। তাই হাসি মুখেই সে ঘুরে চাইলো। এগারো বছর বয়সী তানহা। এবার ষষ্ঠ শ্রেণীতে উঠেছে। বাবার মতোই পড়ালেখায় সে ভীষণ মেধাবী। তবে তাকে আরও বিশেষ একজন বেশ সাহায্য করে থাকে, যার জন্যই দিনে তানহার অত্যন্ত ভালো একটা সময় কাটে। সে যখন শুনল বাবা অবশেষে বিয়ের কথা ভাবছে, তখনই সে নাছোড়বান্দা হয়ে উঠলো। অনুগত সে হয়ে উঠলো অবাধ্য! চেয়ে বসলো অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু। এখন মেয়ের এই ইচ্ছেটা পূরণ করতেই, না চাওয়া সত্ত্বেও তাবিবকে অপর পক্ষের সাথে কথা বাড়াতে হয়েছে। এবং এর বিপরীতে ও যা শুনতে পেলো, তারপর থেকেই এখন মনটা তেতো হয়ে আছে।

– ফুপ্পির সাথে কথা বললে এতক্ষণ?
তানহার কথায় তাবিব মুচকি হেসে চায়। মেয়ের কপালে এলোমেলো হয়ে পরে থাকা ছোট ছোট চুলগুলো গুছিয়ে দিয়ে বলে,
– হ্যাঁ মা। বললাম তো।
ছোট্ট তার চোখ দুটো কৌতূহলে চিকচিক করে উঠলো। বাবার বাহু জড়িয়ে ধরে বলল,
– কি বলল ফুপ্পি?
মেয়ের এই মায়া মায়া মুখটাতেই তাবিব সবসময় আটকে যায়। শ্যাম বর্ণের গোলগাল ছোট্ট একটা মুখ। মাঝে খাঁড়া একটা নাক। নিজের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠে তাবিবের চোখের সামনে। সেই অন্যজন ওকে নিষ্ঠুরভাবে এড়িয়ে গেলেও ও কখনো পারে নি। আর নাইবা পারবে। মেয়েকে ভালো রাখার জন্যই তো ওর সকল সংগ্রাম ও সংযম। এখন আরেকটু মানিয়ে নিয়ে, নিজেকে এক পাশে রেখে, মেয়ের খুশির জন্য যদি এইটুকু করতে হয় তাহলে ও তাই করবে।
তাবিব খানিকটা নাটকীয় ভঙ্গিতে ভ্রু উঁচিয়ে হুশিয়ারি স্বরে আঙ্গুল তুলে বলে,

– ফুপ্পি বললেন যে, আমার তানহা মামুনি যা চায় তাই করো। খবরদার ওর মন খারাপ করে দিবে না একদম। বলে রাখলাম কিন্ত। হুম!
এরুপ ভঙ্গিমায় তানহা খিলখিল করে হেসে উঠে! সে হাসলে যেন ফুল ঝরে! প্রকৃতি কেমন নেচে উঠে তার সাথে! কি সরল এক বাচ্চা সে। মায়ের নজরের মতো কি বাবার নজর বলেও কিছু আছে? যদি থাকে? সে ভয়ে তাবিব চোখ সরিয়ে নিলো তৎক্ষনাৎ। হাসি হাসি মুখটা এবারে গম্ভীর করে বলল,
– শেষবার বাবা জিজ্ঞাসা করছি। তুমি কি সত্যিই নিজের পছন্দে অটল? পরে গিয়ে যদি আফসোস হয়? তাকে আর ভালো না লাগে? মাঝে মাঝে প্রিয় মানুষদের দূর থেকেই অজানা কারণে আপন লাগে, কিন্তু কাছে এলে তাদের চমক কমে যায়।
তানহা বুঝল বাবার কথা। বয়স খুব বেশি না হলেও সে বেশ বুঝদার। মা ছাড়া বড় হওয়া বাচ্চাগুলো বোধহয় প্রকৃতিগত ভাবেই এই দেনটা পেয়ে যায়। ও বাবার কাঁধে মাথা এলিয়ে বলল,

– তাকে যখন জড়িয়ে ধরি, তখন আমার চোখ একাকিই আরামে বুজে আসে। তার গায়ের মিষ্টি সেই ঘ্রাণটা আমার এতো ভালো লাগে, মনে হয় কি যে শান্তি! সবাই যেমন বলে না ‘ মা মা’ ঘ্রাণ। সেটাই বোধহয়। অন্যদের যখন বলি তোমরা ম্যামকে জড়িয়ে ধরলে কি কোন ঘ্রাণ পাও? তারা সরাসরি মানা করে দেয়। আমি অবাক হই। তাই তো বারংবার তাকে সুযোগ পেলেই জড়িয়ে ধরি। কিন্তু কোন বারই সেই ঘ্রাণটা হারিয়ে যায় না। কেন এমনটা হয়, বল তো?
তাবিব থমকে যায়। মন গহীনে সূচের মত ফুটে! কিন্তু মুখ দিয়ে কোন শব্দ আসে না। তানহা আবারো বলে,

– ম্যামকে সবসময় তেমন একটা হাসতে দেখা যায় না। চুপ করে থাকেন, কথা কম বলেন। কিন্তু ক্লাস শেষে নানান বাহানা খুঁজে যখন আমি তার কাছে যাই, তখন আমরা এতো কথা বলি। মাঝে মাঝে ম্যাম এতো সুন্দর করে হাসেন! তুমি বলো যে, আমার হাসি নাকি সবচেয়ে সুন্দর। কিন্তু আমার কাছে তার হাসিটাই সবচেয়ে ভালো লাগে।
তাবিব ভাবে নি, মেয়ে তার ম্যামকে এতোটা পছন্দ করে। এতো গভীরভাবে তাকে মনে ধারণ করেছে।
– মা কি জিনিস সেটা আমি পুরোপুরি বুঝি না। কিন্তু ম্যামকে আমি অনুভব করতে পারি। আমি তো মা চাই নি তোমার কাছে। ম্যামকে চেয়েছি। যদি পারো তাহলে এনে দাও। না সম্ভব হলে, এটা ঠিক যে, আমি কষ্ট পাবো কিন্তু কয়দিন পর আবার ঠিকও হয়ে যাবো। আমাদের বাসায় না এলেও ম্যাম তো আর স্কুল ছেড়ে কোথাও যাবেন না।
তাবিবের মনে আর কোন প্রশ্ন জাগল না। মেয়ের অনুভূতি সম্পর্কে ওর যা জানার ছিল ও জেনে নিয়েছে। এখন সেটা বাস্তবে রূপ দেওয়ার পালা। ও মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে,
– বাবা তার তানহাকে কখনো কষ্ট পেতে দিবে না।

সময় দুপুর বারোটা গড়িয়ে গিয়েছে ইতিমধ্যে। রান্নাঘরে কাজে ব্যস্ত ছিলেন শিউলি। তার আজ একটু তাড়া আছে। বিশেষ আয়োজন করতে হচ্ছে যে! সাথেই পুত্র বধু হাতে হাতে সব সাহায্য করছে। দুজনের মাঝেই এক চাপা উত্তেজনা রয়েছে। তবে দুশ্চিন্তা সেই অনুভূতিকে ছাপিয়ে গিয়েছে। এই যেমন, ভীষন যত্ন নিয়েই সবসময় রান্না করেন শিউলি। তার হাতের স্বাদ বেশ জনপ্রিয় আত্মীয়দের মাঝে। কিন্তু আজ এই বিশেষ দিনটিতেই তার বারংবার গড়মিল হচ্ছে। একবার মনে হচ্ছে মাংসের তরকারিতে হলুদ কম হচ্ছে তো আবার দিলে বেশি হয়ে যাচ্ছে। পায়েশে অতিরিক্ত মিষ্টি হয়ে গিয়েছে। এখন সেই মিষ্টতার প্রখরতা কমাতেই তার কপালের ঘাম ছুটে গিয়েছে। ফরসা মুখটা লাল হয়ে আছে। শাড়ির আঁচলে আবারও চেহারাটা মুছতেই রত্না চিন্তিত গলায় বলে,
– মা, আপনি বেশি ঘামছেন। একটু বিশ্রাম নিয়ে আসুন।
– না, না। একদমই সময় নেই। তারা চলে আসবে, আর এখনও কত কিছু করা বাকি।
– আমি সামলে নিতে পারবো তো।
শিউলি এ বারে স্মিত হাসেন। রত্নার গালে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে,
– সেটা তো তুমি পারবেই৷ কিন্তু এই প্রথমবার মেয়ের হয়ে কোন আয়োজন করছি। আমি কোন কমতি রাখতে চাই না।
– সব ভালোই হবে। আপনি শুধু শুধু অতিরিক্ত চিন্তা করে এখন প্রেসার বাড়াচ্ছেন।
শিউলি প্রতিবাদে কিছু বলবেন তার আগেই কলিং বেল বাজে। আজ বৃহস্পতিবার। হাফ টাইম থাকায় স্কুল আগেই ছুটি হয়৷ জানা আছে, এখন কে এসেছে। শিউলি হার মেনে নিয়ে বলেন,
– তুমিই তাহলে দেখো একটু। আমি ওর সাথে কথা বলে আসছি।
– আচ্ছা।

দরজা খুলতেই আপাদমস্তক কালোতে আবৃত একজন নারী অবয়বকে দেখা গেলো। হাতে একটি ভারি ব্যাগ। বাহির থেকে অনেকগুলো সফেদ কাগজ দেখা যাচ্ছে। নিশ্চয়ই পরীক্ষার খাতা। শিউলি বেগম হাত বাড়িয়ে ব্যাগটি ধরে বলেন,
– দারোয়ানের ছেলেটাকে বলতে পারলি না, ব্যাগটা উপরে উঠিয়ে দিয়ে যেতে? কয় টাকা নাহয় দিয়ে দিতি।
মেয়েটা ব্যাগ পুরোপুরি ছাড়লো না। মায়ের হাতে একটি হ্যান্ডেল দিয়ে নিজে আরেকটি ধরে রাখলো। পায়ে পায়ে ঘরের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে খুবই সুক্ষ্ম গলায় বললো,
– এতোটুকু তো করাই যায়।
– হ্যা, তারপর পীঠ ব্যথায় রাতে চুপচাপ চোখের পানি ফেলবি।
মায়ের কথা অনেকটাই সত্য। তাই সে আর কথা বাড়ালো না। ঘরে গিয়ে টেবিলে ব্যাগটি রেখেই বিছানায় হাঁপ ছেড়ে বসলো। নিকাব তুলতেই উদ্ভাসিত হলো সুন্দর একটি মুখশ্রী। তবে মনে হলো, এতে যেন প্রাণের বড্ড অভাব। বড় বড়, গোল গোল চোখ দুটোর নিচে কালির আস্তরণ জমেছে। পেলব ঠোঁট শুষ্ক, খসখসে। রোগাটে তার অবয়ব। ধবধবে ফর্সা বরণ কেমন নির্জীব! শিউলি মেয়ের চেহারার দিকে একবার তাকিয়েই নজর সরিয়ে নেন। আস্তে ধীরে পাশে বসে বলে,

– তুই কি নিশ্চিত নিবু?
কিছুক্ষণের নিরবতা। উত্তর আসে না। কিন্তু শিউলিও তো মা। তার পক্ষে যে চুপ থাকা মানায় না।
– তোর মত না থাকলে মানা করে দে। আমি জোর করবো না।
নিস্তেজ চোখে সে মায়ের দিকে তাকিয়ে উঠে পরলো। বোরখা খুলতে খুলতে বললো,
– বাবার ইচ্ছের কথা বাদ দিয়ে বলো, তুমি কি চাও?
শিউলি এক দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন।
– তোর বাবা যতদিন বেঁচে ছিলেন ততদিন তোকে আগলে রেখেছেন। মেয়ের জন্য পারলে জানটাও দিয়ে দিতেন। কিন্তু এখন আর মাথার উপর তার ছায়া নেই। তোর এক বড় ভাই আছে, সেও বিদেশ থাকে। আমার পর তোর আর কেই বা থাকবে? আমি তো ম/রে গিয়েও শান্তি পাবো না।
কথা বলতে বলতে তার গলাটা ভিজে এলো। চোখ ছাপিয়ে জল গড়ালো মুহুর্তে। মেয়ে তার পাশে বসে তখনই। রুগ্ন হাত বাড়িয়ে অশ্রু কণা মুছিয়ে দিয়ে বলে,

– আমি তো রাজি হয়েছিই। তাহলে আবার এতো প্রশ্ন কেন?
শিউলি অস্থির, উদ্বিগ্ন গলায় বলেন,
– তাবিব? ওর সাথে মানিয়ে নিতে পারবি তুই? পুরুষের সংসার! তোর সহ্য হবে?
ভাসা ভাসা চোখের পাতা দুটো কিঞ্চিৎ কেঁপে উঠলো। যেন প্রশ্নটা তীরের মতো বিদ্ধ হয়েছে তার অন্তঃস্থলে। ও মাথা নামিয়ে বলে,
– আমি তানহার জন্য হ্যা’ বলেছি।
– কিন্তু বিয়ে তো তাবিবকেই করতে হবে। ওর সাথেই তো জীবন ভাগাভাগি করে নিতে হবে।
– তাবিব ভালো মানুষ। অন্তত কথা শুনে তো তাই মনে হলো। নিবুর বিষয়ে বেশি ঘেটে জানতে চায় নি। আর তার বয়সই বা কত? বত্রিশ। আমাদের নিবু থেকে মাত্র আট বছরের বড়। দেখবেন সব ভালোই হবে।
ঘরে প্রবেশ করতে করতে কথাটুকু বলে উঠলো রত্না। হাতে ঠান্ডা পানির গ্লাস। সেটি গিয়ে চুপ করে বসে থাকা তার ননদের পাশে রাখলো। মাথায় হাত রেখে বললো,
– ভালো মানুষের সাথে ভালোই হয়।
শিউলি উদাস গলায় বলেন,

– মনটা এখনও দ্বিধায় ভুগছে। তালাকপ্রাপ্ত, বিষয়টা খোঁচাচ্ছে বারবার।
– অতীতকে তো আর অস্বীকার করা যায় না মা। আর কেউ কি যেচে পরে নিজের জীবনে সর্বনাশ ডেকে আনে? আমাদের নিবুরও তো কম সমস্যা নেই।
এহেন কথায় মেয়েটার মাঝে কোন প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য হয় না তবে শিউলি আচমকা শক্ত গলায় বললেন,
– আমার মেয়ের সাথে কিভাবে তুলনা হয়? পরিস্থিতি কি এক?
– সেটাই তো বলছি। পরিস্থিতি কারও হাতে থাকে না।
রত্না কথা না বাড়িয়ে বেরিয়ে গেলো। কোন দ্বন্দ্ব ও চায় না। শিউলিও আর কিছু বললেন না। রত্না ছেলের বৌ হিসেবে যথেষ্ট ভালো। তবে দিনশেষে রক্তের ভিন্নতায় সেই টানটা একটু কমই থাকে। ননদকে স্নেহ করলেও কে নিজের সংসারে আজীবন অবিবাহিত ননদের উপস্থিতি চায়? যদিও সে প্রতিষ্ঠিত, নিজের এবং মায়ের খরচ আরামে চালিয়ে যায়, তবুও প্রকৃতিগত ভাবে মানুষের চাওয়া পাওয়ার শেষ নেই। রত্নাও এ ঝামেলা চায় না। নিজ থেকে ননদের জন্য সম্বন্ধ খোজাও নাকি তার জন্য লজ্জার বিষয়। তাই তো ভাগ্যের জোরে, তাবিবের খবর শোনামাত্র সে তৎক্ষনাৎ জবাব দিয়েছে। ও-ই কথা বলেছে তার সাথে!
মেয়েকে এখনও চুপ থাকতে দেখে শিউলি উঠে দাঁড়ান। রান্নাঘরে কাজ আছে যে। তবে যাওয়ার আগে বলেন,

– ঐ যে গত বছর নীল জামাটা কিনলি না? ঐটাই পরিস। ভালে লাগবে।
নিঃশব্দে মাথা দোলালো সে। শিউলি ফিরে যেতে গিয়েও কিছু একটা মনে করে থেমে গেলেন। চেহারায় তার আঁধার নেমেছে অকস্মাৎ। পিছু না ফিরেই নিভু গলায় বলেন,
– থাক ঐটা পরিস না। হাতাটা থ্রি কোয়ার্টার। তার চেয়ে বরং লালটা পর। ফুল হাতা আছে।
মা চলে গিয়েছেন। ধীরে ধীরে ওর স্থবির নয়ন জোড়া নেমে আসে বাম হাতের উপর। কব্জা থেকে কনুইয়ের আগ পর্যন্ত সে নজর বুলালো। দৃষ্টিগোচর হলো অস্বাভাবিক একটি দৃশ্য! কি করুন সেই হাতের দশা! গৌর বর্ণের সেই করতল যেন নিষ্ঠুর সময়ের সাক্ষ্য। শুভ্র ত্বকের উপর ছড়িয়ে রয়েছে ঘন কালসিটে ছায়া। অজস্র আঁচড় ক্ষতবিক্ষত করে ছুঁয়ে গেছে বারংবার। গভীরভাবে নখ গেঁথে করা চিহ্নগুলো যেন কোন তীব্র মুহূর্তের মৌন চিৎকার। একরাশ আকুলতা, না বলা যন্ত্রণার অপ্রকাশিত প্রতিলিপি হিসেবে রয়েছে পাঁচ আঙুলের অবিন্যস্ত ছাপ। একান্ত শরীরে, এক শৈল্পিক নীরব ভাষা খঁচিত হয়েছে সেথায়।

কালো কোট ও প্যান্ট তার পরনে। খোলা বোতামের কারণে ভেতরের সাদা শার্ট দৃশ্যমান। সুস্বাস্থ্য ও বলিষ্ঠ দেহের এক সুপুরুষ। শ্যাম বর্ণের নজরকারা চেহারা। খাঁড়া নাকের উপর রিমলেস চশমা ঠেকানো। একজন প্রতিষ্ঠিত, খ্যাত চিকিৎসক। ডাক্তার তানজিব সারোয়ার তাবিব। এই মুহুর্তে তার অবস্থান একটি ছিমছাম পরিপাটি এপার্টম্যান্ট ফ্ল্যাটে। আসেপাশে নীরবে একবার জহুরি নজর বুলিয়ে নিলো সে। তাদের উচ্চবিত্ত না বলা গেলেও উচ্চ মধ্যবিত্ত অবশ্যই বলা যাবে। যদিও এসবে তার কোন মাথা ব্যাথা নেই তবে বসার ঘরের প্রতিটি কোনেই যত্নের ছাপ স্পষ্ট। বেশ শৌখিন! তানজিবের ভালো লাগলো। সাথে আরও ভালো লাগছে সামনে বসা মা সমান মানুষটি। ভদ্র মহিলা বেশ শালীন। তার কথাবার্তায় বিশেষ এক মাধুর্যতা রয়েছে। হেসে হেসে প্রতিটি শব্দ বলছেন। তাবিবের নিজের মায়ের কথা মনে পরে গেলো।

– বাবা, তুমি তো কিছু নিচ্ছই না।
মৃদু হাসার চেষ্টা করলো তাবিব।
– আপনি এতো ব্যস্ত হবেন না আন্টি।
– আরে ব্যস্ততা কিসের! আমি তো আরও ভেবেছি তানহা আসবে। ওর পছন্দের কত কিছু রান্না করলাম। যাওয়ার সময় ওর জন্য কিছু দিয়ো দিবো। মানা করবে না।
তার মেয়ের জন্য এতোটা স্নেহ দেখে মনটা পুলকিত হলো। বিশাল এক পরিবার থাকতেও তার মেয়েটা একলা একলা বাবার ছত্রছায়ায় বড় হয়েছে। আপন মানুষদের মায়া মমতা পায় নি। এক ক্ষেত্রে হয়তো ভালোই হচ্ছে। তবে তাবিব যে কাজে আজ এসেছে সেটা করতে হবে এখন। যদি সব ঠিকঠাক থাকে তাহলে ও দেরি করবে না। তাই হালকা কেশে বললো,

– আন্টি, আপনি তো জানেন, আমাদের বিষয়টা একটু জটিল। অনেক বোঝাপড়ার ব্যাপার আছে। আমি চাচ্ছিলাম কথা আগে বাড়ানোর পূর্বে যদি আপনার মেয়ের সাথে একটু একান্তে কথা বলার সুযোগ হতো।
একান্তে কথাবার্তা? শিউলির মুখটা খানিক শুকিয়ে এলো বুঝি। তার মুখশ্রীর এই আকস্মিক পরিবর্তন ধরতে পেরে তাবিব বললো,
– আপনি দয়া করে বিব্রত হবেন না। আমি আমার লিমিটেশনস্ বুঝি।
রত্নার সাথে একবার চোখাচোখি হতেই সে রাজি হতে বললো। উপায় না পেয়ে শিউলি কাষ্ঠ হেসে বললেন,
– আচ্ছা বাবা। আমার মেয়েটা মানুষের সাথে কম মেশে তো। অতশত কিছু বুঝে না। তাই ওর কোন কথা বা আচরণ ভালো না লাগলে কিছু মনে করো না।
তাবিবের ভ্রু গুটিয়ে এলো সামান্য। শিক্ষক মানুষ আবার অসামাজিক কিভাবে হয়? অদ্ভুত! ও মাথা নেড়ে বললো,
– আচ্ছা।
রত্না এগিয়ে এসে বললো,
– চলুন।

চোখের সম্মুখে সবকিছু কেমন ঘোলাটে হয়ে আসছে। মসৃণ, শুভ্র কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। মায়ের কথা মতো লাল জামা পরা পর্যন্তই তার দৌড়। এর বেশি এক ফোটাও কোন সাজসজ্জা করে নি সে। তবে এতোক্ষণ স্থির থাকলেও কলিং বেলের আওয়াজ পাওয়ার পর থেকে তার সকল স্থবিরতা হারিয়ে গিয়েছে। পেলব ঠোঁট থেকে থেকে প্রকম্পিত হচ্ছে। চোখের মনি উদ্ভ্রান্তের মতো অস্থির, এলোমেলো দৃষ্টি ফেলছে বারংবার। হাপানি রোগীর মতো সে একবার লম্বা শ্বাস টেনে নিজের ডান হাতটা চোখের সম্মুখে তুলে। অস্বাভাবিকভাবে কাঁপছে সেটি। এটি আপাত দৃষ্টিতে স্বাভাবিক না হলেও এই দৃশ্য তার কাছে এখন অতি পরিচিত। এই যে, যেমন হাজার চেয়ে, বল প্রয়োগ করেও সে এই অবস্থাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না। এমনটাই হয় সবসময়। বছরের পর বছর ধরে। কোন পরিবর্তন নেই। হাতটি থপ করে ছেড়ে দিলো সে। সহসা খাট থেকে উঠে পরলো পরপর। গিয়ে দাঁড়ালো খোলা জানালার পাশে। সময়টা এখন দুপুর হলেও মেঘেদের ঘনঘটায় বেশ বাতাস বইছে বাহিরে। তারো মাথার উপর ঘোমটা তোলা থাকলেও, বায়ু এর ভেতর গলিয়ে প্রবেশ করে ছোট ছোট চুলগুলো অবাধ্যের ন্যায় উড়িয়ে দিচ্ছে। প্রকৃতির এই অশান্ত বদন যেন ওর মনের অবস্থার সাথে মিতালী করেছে। ও চোখ বুজে নেয়। কম্পনশীল হাতটি শক্ত করে দেবে যায় বাম হাতের উপর। এভাবেই সময় গড়ায়। অতঃপর হঠাৎই নিস্তব্ধতা চিরে কানে বাজে পুরুষালী গম্ভীর গলার স্বর।
– মিস নিবেদিতা ফারুকী নিবৃতা!

নিবৃতা পর্ব ২