Home নিবৃতা নিবৃতা পর্ব ১৯

নিবৃতা পর্ব ১৯

নিবৃতা পর্ব ১৯
নেহার ছায়ালিপি

যথা সময়ে ঘুম হালকা হতেই, আজ আর অকস্মাৎ নড়েচড়ে উঠলো না তাবিব। মন মস্তিষ্কে গেঁথে গিয়েছে একজনের উপস্থিতি। নাসারন্ধ্রে তার সুবাস জড়িয়ে নিয়েছে। ত্বকের প্রতিটি লোমকূপ চিনে নিয়েছে তার স্পর্শ। স্মরণে আছে, প্রিয় নারীকে আপন সান্নিধ্যে রেখে, যত্ন করে বাহুডোরে আগলে নেওয়ার ক্ষন টুকুন। বিস্তৃত হাসির স্রোত বয়ে যায় পুরুষালি পাতলা ওষ্ট যুগলে। তার নিবেদিতা! এই সম্বোধনখানি ওর অন্তঃকরণ সুখের দোলায় ভাসিয়ে দেয়। কিন্তু সুখকর চিন্তার এই মুহুর্ত গড়াতেই খুশির ঝলকটুকুন মলিন হয়ে আসে। যাকে আলিঙ্গনে বেঁধে ছিল সে বাঁধন ছুটে পালিয়েছে বহু আগে। আবারও কি তার লুকোচুরির খেলা শুরু হবে, নাকি তাবিবের সামনে দুর্বোধ্য আচরণ থেকে বেরিয়ে নিজেকে খোলা বইয়ের মতোন মেলে ধরবে? এ বিষয়ে তাবিব যথেষ্ট সন্দিহান। ও কি তাড়াহুড়ো করে ফেললো? বুঝতে পারছে না ঠিক। ম্লান বদনে ও উঠে বসলো। তবে চিত্ত মনোবল হারায়নি। ভালোবাসার মানুষকে ভালো রাখাই তো সবকিছু। সেজন্য এর প্রচেষ্টায় কোন কমতি ও কখনোই রাখবে না।

মসজিদ থেকে ফিরতেই, রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা শব্দ কর্ণকুহরে লাগলো। কয়েক পল তাবিব স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো, অতঃপর চললো সে পথেই।
– আসসালামু আলাইকুম।
চুলায় পানি বসিয়ে তা ফুটার অপেক্ষায় ছিল নিবৃতা। পরিচিত গলা শুনতেই আজ আর ভড়কালো না, জড়তায় গাঁট হয়ে এলো না বদন। বেশ সাবলীলভাবেই ঘুরে সালামের প্রত্যুত্তর করলো।
– ওয়া আলাই কুমুসসালাম।
– কি হচ্ছে?
আপাতত তো কিছুই হচ্ছে না৷ কি জবাব দেবে ও? বিভ্রান্তের ন্যায় নিস্তেজ চোখে চেয়ে রইলো। পাঞ্জাবির আস্তিন গোটাতে গোটাতে তাবিব এগিয়ে এসে বললো,
– কাটা হাতে আজ আবার কি কার্যকলাপ ঘটাচ্ছিলেন আপনি?
বাধ্যগত নিবৃতার কি আর সাহস, লোকটাকে রাগিয়ে আবারও নিজের কর্মদক্ষতা প্রমান করতে যাবে? কখনোও না। ও মিনমিনে স্বরে বললো,
– শুধু চা বানাচ্ছিলাম। আর কিছু না।
– আর কিছু করতে চাও?
কন্ঠ থমথমে। নিবৃতা তড়িৎ সবেগে মাথা নাড়িয়ে বোঝায় যে, ওর সেই ক্ষমতা নেই। এহেন প্রতিক্রিয়ায় তাবিব আলগোছে হাসে। আরেক চুলোয় পানি বসাতে বসাতে বলে,
– আজ আমি নাশতা তৈরি করি আর তুমি টুকটাক সাহায্য করো। চলবে না?
– চলবে।

ওড়না দিয়ে ঘোমটা টানা, মাঝে উদ্ভাসিত শুভ্র ত্বকের এক স্নিগ্ধ মুখ। অবয়বে কিছুটা ক্লান্তি ছড়ানো থাকলেও বেশ উজ্জ্বল লাগছে আজ৷ কিয়ৎক্ষণ এই রূপের মোহে সময় জলাঞ্জলি দিয়ে তাবিব এক দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। মেয়েটার মায়া ওর পুরো অস্তিত্ব কেমন গ্রাস করে নিচ্ছে দিনকে দিন। ও কয়েক পা বাড়িয়ে নিবৃতার কাছাকাছি যায়।
লোকটার গাঢ় সান্নিধ্যে এসে, নিবৃতা নিজেকে শান্ত রাখার প্রয়াস চালায়। কোনরূপ অস্বাভাবিকতা প্রকাশ থেকে নিজেকে বিরত রাখে। এই এক নীরব যুদ্ধে ওকে এখন থেকে একচ্ছত্র বিজয়ী থাকতে হবে। ও অনুভব করে লোকটা ওর মাথার ঘোমটাটা খুব কৌশলে নামিয়ে নিলো। পরপর পেশিবহুল হাতটি নিয়ে গেলো মাথায়, চুলের পেছনে।
– ভেজা চুল বেধে রাখলে ঠান্ডা লেগে যাবে তো। এখনও এতো সংকোচ কেনো আমার সামনে? হুম?
তাবিব বল খাটিয়ে খুলে দিলো মোটা, পোক্ত খোপার প্যাচটি। সঙ্গে সঙ্গেই ঝরঝর করে গড়িয়ে পরলো দীঘল কেশরাশি। গত এক রাতেই এই কুন্তল গুচ্ছ তাবিবের বেশ পছন্দের হয়ে উঠেছে। ও কোমল হাতে সেগুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে, ভাজ খুলে পীঠময় ছড়িয়ে দিলো। ক্ষনে ক্ষনে হৃদয়ে প্রেমের বাম ছলকে উঠছে, অথচ সম্মুখের অবস্থানরত মানবী কেমন নিস্পৃহ। নিজেকে সামলে নিলো তাবিব।

– এভাবে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছো কেনো? পীঠে ব্যাথা হচ্ছে?
চমকে তাকালো নিবৃতা। মানুষটা বুঝলো কিভাবে? ও তো নিজের সকল ক্লেশ, পীড়া লুকিয়ে রাখতে জানে। মা’য়ের চোখও যে কতবার ফাঁকি দিলো, তার হিসেব নেই। অথচ এই লোকটার থেকে ওর নিস্তার মিলে না কখনও। কিভাবে যেন বুঝে যায়। এই যে বাহ্যিক সমস্যাগুলো না বললেও ধরে ফেলে, একদিন কি কখনো আসবে যে সে, নিবৃতার মনের খবর গুলোও পইপই করে বুঝে নিবে? ওর সকল অস্বাভাবিকতাগুলো সুন্দর মতন সমাধান করে দিবে? নিবৃতা জানে, ও যদি নিজ থেকে সব খুলে বলে, মানসিক এই ট্রমাগুলো থেকে মুক্তি চায়, তাহলে সেই দিনটাও খুব বেশি দুরে নেই। মানুষটা ওকে আগলো নিবে পরম আদরে। তবুও ভয়। হীনমন্যতা যে ওকে ছাড়ে না! এই অসাধ্য সাধন ওর পক্ষে সম্ভব নয়।

– কি হলো? ব্যাথা হচ্ছে?
আড়াল করার চেষ্টা বৃথা। নিবৃতা মিহি গলায় স্বিকার করে নেয় নিজের সমস্যা।
– একটু হচ্ছে।
– এই একটু’ টা যে ঠিক কতখানি, সেটা বুঝতে পারছি আমি।
ইতস্তত দৃষ্টি ঘুরেবেড়ায় চারপাশে, কিন্ত যার উপর নিবদ্ধ হওয়ার প্রয়োজন ছিল, শুধুমাত্র তাকেই উপেক্ষা করে গেলো। তাবিব স্মিত হাসে। গভীর চোখে তাকিয়ে বলে,
– পরের বার থেকে আমি আরও সাবধানে থাকবো। চলবে না?
লাজে রাঙা হয়ে উঠলো কপোল জোড়া। যদিও নিবৃতা বেশ শুকনো, তবুও গাল দুটো তাবিবের কাছে ঠিক লাল আপেলের মতো লাগলো দেখলো। একদম চোখে লাগার মতো। অত্যন্ত সফেদ ত্বকে জ্বলজ্বল করছে যেন। না পারতে তাবিব, বেশ সময় নিয়ে, মুখ দাবিয়ে চুমু খেলো কোমল গালের মধ্যিখানে। চোখের পাতা বুজে এলো নিবৃতার। ভেতরটা কাপছে আবারও। তবে ওকে রেহাই দিয়ে তাবিব সরে এলো পরপরই। প্রশস্ত হাসি উপহার দিয়ে লেগে পরলো কাজে। নিজেকে সামলে নিবৃতাও এগিয়ে গেলো। ওরও চেষ্টা করা উচিত সব কিছু জটিলতা বিহীন রাখার। গিয়ে একদম তাবিবের কাছাকাছিই দাঁড়ালো। এবং বরাবরের মতো সেটাও খেয়াল করলো তাবিব। খুশিও হলো ভেতর ভেতর৷ থাক, জড়তা কমে তো আসছে। কাজে ব্যস্ত তাবিবই হঠাৎই প্রশ্ন করে বসে,

– পীঠে ব্যথার সমস্যাটা কবে থেকে এবং ঠিক কি কারণে শুরু হয়েছিল? বললে সুবিধা হতো, সেই হিসেবে ঔষধ দিবো আমি।
ডান হাতটা তৎক্ষনাৎ কেঁপে উঠলো ওর। মাথায় গিয়ে আঘাত করলো প্রশ্নটি৷ পাথরের ঘটনাটা জানা নেই? মা কি বলে নি তাকে? তাহলে নিবৃতাকে কেন জিজ্ঞাসা করে? ও বলতে পারলে তো আজ সবকিছু এতোটা কঠিন হতো না ওর কাছে! উজ্জ্বল মুখে আঁধার নামে অকস্মাৎ। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে।
– কি হ…
তাবিবের কথা থেমে গেলো মোবাইলের শব্দে। ওর পকেটে সেটা কম্পন তুলে বেজে চলেছে। হাতে আটা থাকায় ও পারলো না হাত দিতে।
– পকেট থেকে মোবাইলটা বের করো তো নিবেদিতা।
নিবৃতা চুপচাপ বের করে মোবাইলটা। স্ক্রিনে ভাসছে তানহার নাম। এক্ষেত্রে আর তাবিবের অনুমতির অপেক্ষায় সে থাকে নি। সরাসরি কল রিসিভ করে নেয় তৎক্ষনাৎ। ঠোঁট ছাড়িয়ে হেসে উঠে। এই প্রথম, প্রথম মেয়ের প্রতি কিঞ্চিৎ হিংসে হয় তাবিবের। কোথায় তার সাথে তো এভাবে কখনোই হাসে না নিবৃতা। চোখদুটো ওমন স্বচ্ছ কাঁচের ন্যায় জ্বলজ্বল করেও উঠে না৷ তাবিব প্রশ্ন না করলে, মুখ তালাবদ্ধ করে বসে থাকে। এই উচ্ছ্বসিত নিবৃতার এক চতুর্থাংশও তাবিবের কপালে জুটলে ও নিজেকে ভীষন সৌভাগ্যবান মনে করবে।

– আজকেও দু’জন শেফ একত্রে! আমাকে ছাড়া একা একা খাবে। এটা কিন্তু মোটেও ঠিক হচ্ছে না!
– আমাদের ছেড়ে গেলে কেন তাহলে? এটা শাস্তি!
নিবৃতা মুচকি হেসে জবাব দিতেই তাবিব অবাক বনে চাইলো। সে এভাবেও জবাব দিতে জানে? আগে কেন দেখেনি এরূপ দৃশ্য!
– বড্ড পাষাণ তোমরা!
নাক টেনে কান্নার ভান করে তানহা বলতেই নিবৃতা মিষ্টি করে হাসলো। এই প্রাণবন্ত বাচ্চাটাই ওকে বাঁচতে শিখিয়েছে।
– তোমার গুনধর আম্মু, নিজের হাত কেটে বসে আছেন। তাই তো, না পারতে, আমাকে তার সেবায় নামতে হলো।
রুটি বেলতে বেলতে তাবিব রসিক সুরে কথাটি বলতেই তানহা চিন্তিত হলো। অস্থির কন্ঠে তাড়া দিয়ে বললো,
– কিভাবে কাটলো? কতখানি কেটেছে? তুমি কি একটু সাবধানে থাকতে পারলে না। নিজের প্রতি এতো অবহেলা কেন?

মা মেয়ের ভালোবাসাটা সম্পূর্ণ দ্বিপাক্ষিক। কেউ কাওকে একে ওপরের চেয়ে কম ভালো বাসে না। কম পরোয়া করে না। সারাক্ষণ একসাথে থাকতে থাকতে তাদের গতিও ঠিক একই দিকে প্রবাহিত। তাবিব বুঝে গেলো এখানে ওর নাক আর না গলানোই ভালো৷ ও চুপচাপ কাজ করে চললো এবং মা মেয়ের কথাবার্তা শুনে গেলো। এবং এই প্রথম দেখলো নিবৃতাকে এতো বেশি কথা বলতে। সে যে খুটিনাটি সবই খেয়ালে রাখে সেটাও ভালোমতো বোঝা হয়ে গেলো। তাহলে শেষে গিয়ে যা দাঁড়ায় তা হলো, অবহেলার পাত্র একমাত্র তাবিবই। অন্তত মেয়ের সমকক্ষে তো দাঁড়ানোর যোগ্যতাও ওর নেই। এরপর নিজের এই উদ্ভট খেয়াল, চিন্তায় একসময় নিজেই হাসলো। মেয়ে তার ভালো থাকুক, আদর্শ ও স্নেহময়ী এক মায়ের কোল পাক, সেটাই চেয়েছিল তাবিব, এবং এখন নিশ্চিত হয়ে বলতেই হয়, এই চাওয়া ওর সফলভাবেই পূরণ হয়েছে। একটু বেশিই হয়েছে।

সন্ধ্যায় বাসায় ফেরার পর তাবিবের একটু কাজের চাপ ছিল। সেজন্যই সে ঘরে বসে ল্যাপটপে ব্যস্ত ছিল। কিন্তু মাঝে কিছু প্রয়োজন হতেই, যেই না মোবাইলটা হাতে নিলো ওমনি দেখলো চার্জ ফুরিয়ে এসেছে। পাওয়ার ব্যাংক হাসপাতালে। জরুরি কল এটা। তাবিবের অপেক্ষা করার মতো সময় নেই। আসেপাশে তাকিয়ে ডাকলো নিবৃতাকে।
– নিবেদিতা, নিবেদিতা!
নিবৃতা এক প্রকার ছুটতে ছুটতেই এলো। তাবিব তাকে কখনও এভাবে ডেকে আনে না যে।
– কি হয়েছে?
অস্থির তার প্রশ্নের ভাব। তাবিব ব্যস্ত স্বরে বললো,
– তোমার মোবাইলটা একটু দাও তো। ইম্পর্ট্যান্ট কল করতে হবে।
– আচ্ছা দিচ্ছি।

মিনিট খানিকের মধ্যে নিবৃতা এসে ওর মোবাইলটা দিয়ে আবার চলেও গেলো। কেউ কাজে মগ্ন থাকলে তাকে বিরক্ত করার জন্য আসেপাশে থাকতে নেই। এটাই বিশ্বাস করে ও।
নম্বরটা টুকে নিয়ে কল করলো তাবিব। ওপর পাশের ব্যক্তির সাথে চললো লম্বা কথোপকথন। তবে মাঝে বাধ সাধলো মোবাইলে আগত একটি কল। টানা ওয়েটিং এ পেয়েও কে যেনো বারংবার কল করে যাচ্ছে। ও ভ্রু কুঁচকে দেখলো, অপরিচিত নম্বর। নিজের কথা শেষ হতেই আবার কল এলো। কল দাতা ভীষন অধৈর্য ও ছটফটে। নাকি কোন প্রয়োজন আছে? তাবিব মোবাইল হাতে নিয়ে চললো তানহার ঘরে। দেখলো নিবৃতা ওয়াশরুমে আছে। এদিকে অবরিত কল আসতে থাকায় তাবিব রিসিভ করতে বাধ্য হলো। ঘর অভিমুখে হাঁটতে হাঁটতে যেই না কিছু বলবে ওমনি ওপর পাশ থেকে ভেসে এলো গমগমে, তীক্ষ্ণ এক পুরুষ কন্ঠ।
– নিবৃতা! আমি রাগিব! চিনতে পারছো? না কি চিনতে পেরেছ বলেই আমার কল রিসিভ করছো না!
তাবিবের কদম থমকে গেলো। এই লোক আবার কে? এতো অধিকার খাটিয়ে কেন তার নিবেদিতার নাম স্বীয় মুখে উচ্চারণ করছে! ওর ভালো লাগলো না মোটেও। ভারিক্কি গলায় বলে,
– আপনি কে? রাগিব নামে কাওকে তো আমি চিনি না।
অপর পাশ থেকে পুরুষ কন্ঠটা বিভ্রান্ত শোনালো এবার।

– এটা নিবৃতার নম্বর না?
– আমি তার স্বামী ডক্টর তানজীব সারোয়ার তাবিব। আপনার প্রয়োজনটা জানতে পারি?
মুহুর্তে লাইন কেটে গেলো। তাবিবের কপালে কয়েক পরতের ভাজ নেমে এলো তৎক্ষনাৎ। একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ কখনো এমন বাচ্চামো আচরণ করে নাকি? ওর মেজাজ খারাপ হলো। তাবিবের পরিচয় পেয়ে এভাবে কল কেন কেটে দিলো? ও কোন সুরাহা খুঁজে পেলো না। তন্মধ্যে মস্তিষ্কে, নিজের কালো অতীতের পরশ জেগে উঠলো। ভেতরটা কেমন হিংস্র হয়ে উঠলো। এখন তো নিবৃতার উপরও রাগ হচ্ছে। না চাইতেও প্রতারনার শিকার হওয়া মনটাকে সামলাতে পারলো না। চোখ গেলো হাতে থাকা নিবৃতার মোবাইলটার দিকে। এমন তো নয় যে নিবৃতার বাজে অতীতের সূত্র এই রাগিব? এরূপ ভাবনায় পেশীবহুল হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে এলো। গনগনে মেজাজে ও ঘাটতে লাগলো মোবাইলটা। তবে এতে আশ্চর্যই তো হতে হলো বেশ। এখনকার যুগে এসেও নিবৃতা সাধারণই রয়ে গিয়েছে। ফেসবুক থেকে শুরু করে কোন ধরনের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ছিটেফোঁটাও নেই মোবাইলে। এমনকি ইউটিউব পর্যন্ত ডিজেবল করা।

কেবলমাত্র হোয়াটসঅ্যাপ রয়েছে যেটার সাহায্যে সবার সাথে যোগাযোগ করে ও। উপায় না পেয়ে সেখানেই গেলো ও। খুজতে খুঁজতে নিচে কিছু ‘আনরিড ম্যাসেজ’ পেলো। রাগিব নামে পরিচয় দেওয়া নম্বর থেকেই এসেছে ওগুলো। অথচ নিবৃতা একটাও পড়ে দেখে নি। ম্যাসেজ গুলো সব একই রকম। ‘নিবৃতা কেমন আছো, জবাব দিচ্ছো না কেন? আমি রাগিব। চিনতে পেরেছ?’ এরকম বেশ কয়েকটা ম্যাসেজ, এক একদিন পাঠানো হয়েছে। তাবিব কি বলবে, করবে, ভেবে পেলো না। ওর থমকানো অভিব্যক্তির মাঝেই নিবৃতা চা নিয়ে এলো। সেটা সুন্দর মতন তাবিবের সামনে রেখে দিলো। সবসময়ের মতো এবার আর পালিয়ে গেলো না। চুপটি করে বিছানার ধার ঘেঁষে, তাবিবের মুখোমুখি বসে রইলো। লোকটা যেহেতু ওর চোখের আড়ালে থাকা পছন্দ করে না, তাহলে তা-ই সই। নিবৃতা আর এড়িয়ে চলবে না। তাবিব কিছুক্ষণ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে নিবৃতার নত, শান্ত মুখটা পর্যবেক্ষণ করলো। অতঃপর শান্ত কন্ঠে জিজ্ঞাসা করলো,

– রাগিব কে?
নামটা প্রথমবারে ধরতে পারে নি নিবৃতা। বিভ্রম নিয়ে বলে,
– জ্বি?
– রাগিব কে?
কন্ঠস্বর শক্ত হয়ে আসা থেকে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করছে তাবিব। সে না জেনে, না বুঝে কোন পদক্ষেপ নিতে চাইছে না।
নিবৃতা স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করলো। যদিও অন্তরে ঝড় উড়েছে। তবে মা বলেছিল, এ কথা কাও কে না বলতে। তাহলে সম্পর্ক খারাপ হবে। নিবৃতা সেই কথা মেনেছে। মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে এলেও ও গলার জোর হারালো না। স্মিত স্বরে বললো,
– আমার ভাবির ছোট ভাই হন।
এতো কাছের আত্মীয়! তাবিবের গোস্বা বাড়লো।
– সে তোমাকে কেন কল করে?
নিবৃতা অবাক হয়ে চাইলো। রাগিব নামক বদ লোকটা ওকে কল করেছে? নিবৃতার নম্বর কিভাবে পেল? ও সংশয় নিয়ে বলে,

– সেটা তো আমার জানা নেই। উনার সাথে তো আমার কথা হয় না কখনও।
কথা যে হয় না সেটার স্পষ্ট প্রমাণ তো তাবিব মাত্রই পেলো। নিবৃতা যে মিথ্যে বলে নি, সেটাও ওর জানা আছে৷ মিথ্যে স্বীকারোক্তি দেওয়া এই মেয়ের ধাঁচে নেই। তবে যাই হয়ে যাক, এবার সম্পর্ক হারাবে না তাবিব। কোন ফাটল করার অবকাশই রাখবে না। সকল ক্ষতিকর কারণকে শিকড় থেকে টেনে ছিঁড়ে ফেলবে। কোন আপোষ নেই। ও সাবলীল গলায় বলে,
– চা টা ঠান্ডা হয়ে এলো। এটা গরম করে সাথে আরেক কাপও নিয়ে আসবে। একসাথে চা খাবো।
– আচ্ছা।
মাথা নাড়িয়ে চা নিয়ে চলে যেতেই তাবিব নিজের চার্জিংয়ে থাকা মোবাইলের কাছে গেলো। কন্ট্যাক্ট লিস্ট ঘেঁটে একটি নম্বর বের করে কল করলো।
– জরুরি কাজেই কল করেছি। একটা নম্বর পাঠাবো। রাগিব নাম। এর সমস্ত খবরাখবর আমার চাই।
গলার স্বর অত্যন্ত গভীর। চোয়াল নিরেট ও চোখের দৃষ্টি অনমনীয়, ক্ষুরধার। স্বচ্ছ ব্যক্তিত্বের তাবিবকে কখনও এরূপ পাষবিক রূপে দেখা যায় না। নিজের উত্তপ্ত মেজাজকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টায় মত্ত থাকতেই দেখা মিললো নিবৃতার। ট্রে সমেত ফেরত এসেছে। তবে এবার দু’ কাপ চায়ের সাথে নাশতাও রয়েছে। তাবিবের নজর কোমল হয়ে এলো। এই মেয়ের প্রতি কঠোরতা ও কখনোই দেখাতে পারবে না। মোবাইল ছেড়ে চলে গেলো ওর নিবেদিতার কাছে।

এভাবেই একটু একটু করে পেরিয়ে যেতে লাগলো সময়। তানহা বিহীন নিবৃতার বিষন্ন মনটা অপেক্ষার প্রহর গুনে, কবে মেয়ে তার ঘরে ফিরবে৷ সাথে পালন করা তাবিবের আদর্শ স্ত্রী হওয়ার দায়িত্ব। এই দায়িত্বের মাঝে কর্তব্য ছাড়াও সুপ্ত ভালো লাগা লুকিয়ে আছে, যা হঠাৎ হঠাৎ অনুভুতিতে ধরা দেয়, আবার গহন আঁধারে তলিয়ে যাওয়া কক্ষে, মানুষটার গভীর সান্নিধ্যে হারিয়ে যায়। কিছুটা অভিনয় তো কিছুটা বাস্তবে ভালো থাকার সংমিশ্রণে নিবৃতার দিন কেটে যায়। আর তাবিব? সে নিজের সর্বস্ব দিয়ে তার স্ত্রীকে সুখো রাখার প্রয়াসে। মাঝেমাঝে মনে হয় সে সফল হচ্ছে, আবার হঠাৎ করেই চোখের পলকে মনে হয় কিছু একটা ঠিক নেই। সরাসরি কথা বলার প্রচেষ্টায়ও সে ব্যর্থ! মেয়েটা নাকচ করে সকল উদ্বিগ্নতাকে। ভালো আছে, বলে নাছোড়বান্দার ন্যায় মাথা নাড়ায়। তাবিব হতাশ হয়। ধীরে ধীরে মনে হচ্ছে সে হেরে যাচ্ছে। পরাজিতের খাতায় নাম লেখাতে হবে অতি সত্তর।
কিছু কিছু রাত বড্ড আমোদে পার হয়। তাবিবের স্নিগ্ধ আলিঙ্গনে গভীর ঘুমে মজে, একেবারে সকাল হয়৷ আর আছে এমন কিছু রাত, যে রজনী নিবৃতার নিদ্রাহীন কেটে যায়। এক চিত্তে বসে থেকে, অশ্রু ঝরিয়ে বিলীন করে দেয় অন্তঃকরণে জমা হওয়া সকল বেদনাদের। এই যেমন আজও, চোখের সম্মুখে নিকষ কালো অন্তরীক্ষ, জানালার কাঁচে জমা ঠান্ডা শিশির কনা এবং সাথে নিবৃতার চোখের দৃষ্টি ঝাপসা। মস্তিষ্ক বেখেয়ালে মত্ত। তখনই হঠাৎ পাশ থেকে ভেসে এলো গম্ভীর কন্ঠস্বর।

– এখানে কি করছো তুমি?
বিস্ময়ে হতবিহ্বল হয়ে তাকায় নিবৃতা। লোকটা অবাক হয়ে ওর দিকেই চেয়ে আছে। ঘুম থেকে উঠে আসায় বেশভূষা ভীষন আলুথালু। নিবৃতা ভীত সন্ত্রস্ত হয়। চট করে উঠে দাঁড়ায়। তাড়াহুড়োয় ভুলে যায় চোখের পানি মুছতে। যেগুলো ঘরের বাহির থেকে আসা ম্লান আলোয় চিকচিক করে উঠে গাল জুড়ে। তাবিব নিশ্চুপে ওকে দেখে চলে। কিছু বলে না। সত্যি বলতে, ও কি বলবে সেটাই ওর বোধগম্য হয় না৷
অপরদিকে, নিবৃতা দ্বিধান্বিত হলো। পরিস্থিতি সামালে এই প্রথম মিথ্যা বলার প্রয়াস চালালো ও, যার কারণে কন্ঠনালি পর্যন্ত কেঁপে উঠলো যেন। জ্বিভ হলো নড়োবড়ে।

নিবৃতা পর্ব ১৮

– আ..আসলে… আমি…
– ঘুমাতে এসো।
ভারি গলায় কথা টুকুন বলে চলে আসে তাবিব। ভয়ে কাঠ হয়ে যাওয়া নিবৃতাও আর কোন দ্বিরুক্তি করে না। চুপচাপ গিয়ে শুয়ে পরে। আজ আর ওকে কাছে টেনে নেয় না পাশের মানুষটা। নরম আরামদায়ক বিছানায় পীঠ ঠেকলেও তাবিবের ঘুম হয় না সারা রাত। মস্তিষ্ক দপদপ করে নানান চিন্তায় বিভোর হয়ে, কিন্তু কোন উত্তর মিলে না। শুধু বুক চিরে বেরিয়ে আসা দীর্ঘশ্বাসেরা ওকে ক্লান্ত করে তুলে।

নিবৃতা পর্ব ২০