নিবৃতা পর্ব ২৮
নেহার ছায়ালিপি
ঝলমলে রোদ্দুরের কারনে পরিবেশে স্নিগ্ধ প্রানের সঞ্চার ঘটেছে। দিবাকরের রশ্মি তাপদাহের বদলে মিষ্টি অনুভূতি জোগান দিচ্ছে। বসন্তের এই আরামদায়ক উষ্ণতায় শরীর মন জুড়িয়ে যায়। পড়ন্ত দুপুরে, নিবৃতা বারান্দায় বসেছিল মেয়েকে সাথে নিয়ে। তানহাকে ইদানীং বেশ অলসতায় জেঁকে ধরেছে। সামান্য হাত পা নাড়াতেই মেয়েটা ভীষন অনীহা প্রকাশ করছে, অথচ কাল থেকে তার নিয়মমাফিক জীবন শুরু। ভোর বেলা উঠে, সারাদিনের নামে তৈরি হয়ে, ছুটতে হবে বিদ্যালয়ে। পড়ালেখার স্তুপে মনোনিবেশ করতে হবে। ব্যস্ত জীবনের অংশীদার হয়ে যাবে আবারও! এবার জেএসসি পরীক্ষায়, মুখ উজ্জ্বল করার মতো ফলাফল করেছে সে! তাইতো মেয়েকে নিয়ে তাবিব নিবৃতার আশা, স্বপ্ন এবং প্রত্যাশা একটু বেশিই যেন।
– জানো আম্মু, আপুদের চুলে কি সুন্দর লেয়ার কাট দেওয়া। ভাবছি আমিও তেমন করবো। ভালো হবে না?
বারান্দার মেঝেতে বসা তানহা। ওর ঠিক পেছনেই উঁচুতে বসে নিবৃতা, ওর চুলগুলো যত্ন সমেত আঁচড়ে দিচ্ছিল। এরই মাঝে হঠাৎ এরকম কথা শুনে ভ্রু কুঁচকে চায়। এটা আবার কি? তানহা জানে, তার মা এসব চিনে না। তাইতো ঝটপট পাশ থেকে মোবাইল নিয়ে লেয়ার কাট দেওয়া চুলের বেশ কয়েকটা ছবি দেখালো। নিবৃতা কপালে কতগুলো ভাজ জড়ো করে দেখে গেলো সেগুলো। অতঃপর কালক্ষেপণ না করেই মেয়ের কানটা আস্তে করে চেপে ধরে, চোখ পাকালো! কথা বলার পরিস্থিতিতে থাকলে হয়তো বেশ ক’টা বকাও এতক্ষণে শুনিয়ে দিতো! নিবৃতার সরল মুখটায় যখন মাতৃ সুলভ নরম, মিঠা মিঠা শাসন ভর করে, তখন তাকে দেখতে ভারি মিষ্টি লাগে তানহার নিকট। নিবৃতার এই রূপটা ও বড্ড উপভোগ করে। তাইতো ওকে ভড়কে দিতে এসব উদ্ভট, অপ্রাসঙ্গিক কথা তুলে। পরপর প্রতিক্রিয়া স্বরূপ তৎক্ষনাৎ খিলখিলে হাসির শব্দ, নিস্তব্ধ বেলায় গুঞ্জন ছড়ালো। তানহা জানে, সুস্থ থাকলে ওর মা কি বলতো এখন।
– আমি এতো কষ্ট করে, তোমার চুলগুলো বড় করছি, ওসব আজেবাজে কাট দিয়ে সব চুল ফেলে দেওয়ার জন্য?
তানহার হাসিতে নিবৃতা হতাশায় মাথা নাড়ায়। একয়দিনে কি কি প্রসঙ্গ টেনে আনছে এই মেয়ে। একেক দিন একেক আবদার! নিবৃতা ওকে অতিমাত্রায় প্রশ্রয় দেয়, এ কথা সত্য। আদরে বাদর বানাচ্ছে এটাও অস্বীকার করা যাবে না। মাথায় তুলে নাচে, এটাও মিথ্যে নয়। তাহলে কি এখন একটু কঠোর হওয়া প্রয়োজন? মাকে এরূপ ভাবুক বনে চুপ হয়ে যেতে দেখে তানহা হাত নাড়িয়ে বললো,
– আরে আমার আম্মুজান! মজা করছি তো! অতিরিক্ত ভেবে টেবে এখনই অস্থির হয়ে যেয়ো না।
নিবৃতার বেশি চিন্তা করার অভ্যাস। এটাও ভুল নয়। ও সন্তর্পনে শ্বাস লুকালো। এই জীবনের মূল উদ্দেশ্যই হলো তার মেয়েকে ভালো রাখা। শক্ত, সামর্থ্য এক ব্যক্তিত্ব হিসেবে গড়ে তোলা। ওকে নিয়ে কোনপ্রকার ঝুঁকিতে পরতে চায় না নিবৃতা। একটু কষ্ট না হয় করবে এখন, তবে প্রয়োজনের সময় সেটাই দারুণ উপকারে আসবে। ওর মাথায় এক ভাবনা সেই কবে থেকে ঘুরেফিরে চলছে। তাবিবকে বলা উচিত, তবে সেই সুযোগই হচ্ছে না। কাজটা আরও আগে করার প্রয়োজন ছিল। তবে দেরী হোক, তবুও অন্তত তার মেয়ের শেখা উচিত। নিবৃতা নিশ্চিত, তাবিবের কাছে অনুমতি চাইলে, সে কখনও মানা করবে না। লোকটা যে ভীষন বুঝদার ও যৌক্তিক।
মেয়ে বড় হওয়ার সাথে সাথে, চিন্তা বহুগুণে বেড়েছে নিবৃতার। সব ঠিক থাকলেও, পরিস্থিতি হাতের বাহিরে যেতে সময় লাগে না। তাইতো ও এতোটা সোচ্চার থাকে। তাবিবের কথায়, তানহাকে একবার একা ছাড়লেও আগামীতে যে আর কখনও ওকে চোখের আড়াল হতে দিবে না, এ বিষয়ে নিবৃতা দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। তাতে কারও আপত্তি থাকলেও সে গ্রাহ্য করবে না। এসব চিন্তা ভাবনার মাঝেই ওরা বারান্দা থেকে বেরিয়ে এলো। ঘরে এসে, শেষ অবসর দিনটা কাটানোর জন্য, বাবার শেল্ফ থেকে খুঁজে খুঁজে কিছু বই বের করলো তানহা৷ যদিও সবই কঠিন ভাষায় ব্যাখা করা নানান অসুস্থতার বিবরণ ও চিকিৎসা পদ্ধতির বর্ণনা। তবুও ইদানীং এসব বিষয়বস্তু ওকে বেশ আকর্ষিত করছে, অথচ এর আগে দু চোখের কোনে পর্যন্ত এসব ওর সহ্য হতো না! শত্রুর মতো লাগতো। কে জানে কিসের আগাম সংকেত এগুলো? হয়তো বাবার পথ অনুসরণ করে তানহাও ডাক্তারি পেশাকেই বেছে নিবে একদিন। তানহা বইয়ের মাঝে বুদ হতেই, কলিং বেল বেজে উঠলো। তবে সেই শব্দ, এই বাসা জুড়ে ছড়িয়ে পরলেও, নিবৃতার মনে এক ভিন্ন ঝংকার তুললো। প্রবল আড়ষ্টতা ও অস্বস্তি ওকে আবারও আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নিলো।
এতোদিনে তাবিবের সাথে যতটুকু সহজ হতে পেরেছিলো, মনে হচ্ছে সেগুলো সব কর্পূরের মতো উবে গিয়েছে এক মুহুর্তে। যখন বুঝতে পারলো তাবিব কিছুই জানে না, তখন ওর যে কি অনুভব হয়েছিল, সেটা কোনরূপ ভাষায় প্রকাশ করাও নিবৃতার জন্য কষ্টসাধ্য। শুধু মনে হচ্ছে, ও লোকটার সম্মুখে ছোট হয়ে গেলো। ওর অবস্থান, হঠাৎ করেই ধপ করে অনেক নিচুতে গিয়ে পরে গিয়েছে। কিভাবে তার সম্মুখীন হবে, এ চিন্তায় এখনই ওর হাতের তালু ঘামতে শুরু করলো৷ ওকে কি কোন তিক্ত বাণী শুনতে হবে? লাঞ্ছিত হতে হবে মানুষটার কাছে? নাকি এ চরম সত্য লুকিয়ে যাওয়ার অপরাধে কোন দূর্ভোগ পোহাতে হবে, পেতে হবে ভয়ংকর শাস্তি! বিচলিত সকল ভাবনার মাঝে আবারও কলিং বেলের আওয়াজ হলো। নিবৃতার ধ্যান ছুটতেই চোখে পরলো, তানহা ছুটে এসেছে, এবং মুহুর্তের মাঝে দরজাও খুলে দিলো। ওপাশে তাবিবই দাড়িয়ে ছিল।
মাথা তার নত। তবে সম্মুখে তানহাকে দেখে, ওর ভুলটা ভাঙলো। মেয়ের মুখে ফুটে ওঠা চওড়া হাসির প্রত্যুত্তরে মৃদু হেসে তাবিব অন্দরে এলো। নিবৃতা তখন দৃষ্টি লুকিয়ে মেঝেতে নিবদ্ধ রেখেছে। তাবিব ওকে স্পষ্ট দেখলো তখন। সে পথে এগিয়ে যেতেই নিবৃতা চোখ তুলে চাইলো সামান্য, তবে সর্বদার ন্যায় আজ আর কিছুই বলল না তাবিব, এমনকি যে ন্যূনতম মুচকি হাসিটুকু অন্তত নিবৃতার জন্য বরাদ্দ থাকে, আজ সেটুকুও মিললো না। কেমন যেন ওকে অদৃশ্যের ন্যায় উপেক্ষা করে পা বাড়ালো নিজ ঘরের উদ্দশ্যে। তানহাও ততক্ষণে নিজ কক্ষে ফেরত গিয়েছে। তড়িৎ নিবৃতার মুখটা ওমনি শুকিয়ে এলো। অনড় দৃষ্টিতে, তাকিয়ে থেকে দেখলো, পর্দা টেনে দেওয়া থাকা সত্বেও তাবিব ঘরের দরজাটা লাগিয়ে দিচ্ছে আস্তে আস্তে করে। অথচ বিয়ের পর থেকে আজ পর্যন্ত ওকে দরজা সামান্য ভিড়িয়ে দিতে পর্যন্ত দেখে নি ও৷ নিবৃতার মনে হলো, এটা সাধারণ, কোন দরজা লাগানোর মতো বিষয় নয়, বরঞ্চ খুবই কৌশলে, নীরব কর্মকান্ডে, তাবিব নিবৃতার ওমুখো হওয়ার রাস্তা রোধ করে ফেললো। নিবৃতা থেকে সে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো সম্পূর্ণভাবে। ওর মতো এক মেয়ের মুখোমুখি হতে ওর রুচিতে বাধছে হয়তো।
দুপুরে খাওয়ার টেবিলে, খেতেই খেতেই তাবিব গম্ভীর স্বরে বললো,
– বিকালে তৈরী থাকবে নিবেদিতা। হসপিটালে নিয়ে যাবো।
নিবৃতা তৎক্ষনাৎ মাথা নাড়িয়ে না’ বোঝায়৷ সে হাসপাতালে যেতে মোটেও ইচ্ছুক নয়৷ এমনিতেই সুস্থ হয়ে যাবে। গলা ব্যথাতো কমেই গিয়েছে তাবিবের দেওয়া ঔষধে। আরেকটু সময় গড়ালে, কথা বলতেও নিশ্চয়ই কষ্ট হবে না। কিন্তু রোজকার ন্যায় তাবিবের মনোযোগ নেই নিবৃতার পানে৷ তাই ওর এই অনিচ্ছা প্রকাশ, প্রথমেই দেখতে পেলো না তাবিব। নিবৃতা অসহায় দৃষ্টি মেয়ের দিকে তাক করতেই তানহা ঠোঁট উল্টে বলে,
– বাবা, আম্মু যেতে চাইছে না হসপিটালে।
– আমি তো কারও অনুমতি চাই নি৷ এক কথায় আদেশ দিয়েছি।
তাবিবের আপোষহীন স্বরে, খাবার প্লেটে চলমান হাত থমকে গেলো নিবৃতার। এরকম কঠোর, নিরেট কথা বলার ভঙ্গিমা কি সত্যিই তাবিব ওর জন্যই ব্যবহার করেছে? অনমীয় কন্ঠস্বর! অন্ন দানাগুলো আর গলা দিয়ে নামতে চাইলো না ওর। নিজেকে ভীষন করে অসহায় লাগলো।
– তানহা!
বাবার অভিব্যক্তি আজ অত্যন্ত শীতল। তাই তো তানহা অবিলম্বে জবাব দিলো,
– জ্বি?
– তুমিও সাথে যাবে। একা বাসায় থাকার কোন প্রয়োজন নেই।
তানহা ভ্রু কুঁচকায়। জীবনের অধিকাংশ সময় তো বাসায় একাকিই সময় কাটাতো ও। আজ কি হলো? অনীহা প্রকাশ করে বললো,
– আমার হাসপাতালে যেতে একদমই ভালো লাগে না। তোমরাই যাও।
– মুখের উপর কথা বলবে না।
তানহা চোখ মুখ কুঁচকে তাকায়। আবারও তাবিবের আদেশের বিরোধ করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো, তখনই হাতের উপর চাপ প্রয়োগ হয়। ঘাড় বাঁকিয়ে দেখে, নিবৃতা চোখের ইশারায় মানা করছে। বাবার কথার অমান্য করতে নিষেধ করছে। তানহা অসহায় মুখ করে বসে রয়। সে তো কোন অবাধ্য বাচ্চা নয়, কিন্তু ছোট থেকেই তো ওর হাসপাতালের পরিবেশ পছন্দ নয় মোটেও৷ তাই তো তাবিব কখনও জোরও করে না ওকে। আজ কি হলো তাহলে?
– মুখ গোমড়া করে বসে থাকতে হবে না। তোমার রেজাল্টের ট্রিট পাওয়া বাকি আছে। ওটাই নাহয় আজ উসুল করে নিয়ো।
তাবিবের এই কথা টুকুন বলতে দেরী কিন্তু তানহার চোখ মুখ ঝলমলিয়ে উঠতে একটুও বিলম্ব হয় নি। হালকা ভাব দেখাতে প্রত্যুত্তরে কিছু না বললেও, আড় নজরে, মায়ের দিকে তাকিয়ে দন্ত কপাটি মেলে হাসি অবশ্যই দিয়েছে। নিবৃতা মেয়ের খুশিতে খুশি প্রকাশ করলেও, ওর অন্তঃস্থলে যে পীড়ার উদগীরণ হয়েছে, কেমম করে জ্বলছে সেটা। তার নিষ্পত্তি কিভাবে ঘটবে? কেবল ক্রমশই বুকটা ভারি হতে অনুভব করলো ও।
তানহাকে, নিজ কেবিনে বসিয়ে রেখে, নিবৃতাকে নিয়ে ডায়াগনস্টিক সেকশনে চলে এসেছে তাবিব। এখানকার পরিবেশে সে এক জনপ্রিয় মুখ। খ্যাত সিনিয়র ডাক্তার। হাটার পথে নানান মানুষের সাথে দেখা হচ্ছে, তাকে সালাম জানাচ্ছে। স্যার, স্যার’ করে সম্মান দিয়ে সম্বোধন করছে৷ দাড়িয়ে থেকেই একেকজন কুশল বিনিময় করে নিচ্ছে ওর সাথে। এতো মানুষের মনোযোগ পেয়ে অভ্যস্ত নয় নিবৃতা। স্যারের মিসেস জেনে তাকেও যখন সালাম জানালো হলো, তখন ও সর্বোচ্চ পর্যায়ের বিব্রত হলো৷ নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও কিভাবে জবাব দেবে ও? মেঝেতে এলোমেলো চোখে তাকিয়ে আরও সেঁটে গেলো তাবিবের দিকে।
– আপনাদের ম্যাডাম অসুস্থ। গলায় বেশ সমস্যা হচ্ছে। এজন্যই নিয়ে এসেছি তাকে।
নাক, কান, গলা বিশেষজ্ঞ ডাক্তার মোহসিনা, এ পর্যায়ে অবকতা প্রকাশ করলেন। স্যারের ওয়াইফের কি অসুস্থতা হয়েছে, সেটা জানার জন্য তৎক্ষনাৎ উদগ্রীবতা প্রকাশ করলেন। কি কি সমস্যা হয়েছে, সেগুলো নিয়ে আলোচনা করতেই কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা দেওয়া হলো নিবৃতাকে। সেগুলো করিয়ে, পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা ছাড়া আগাম কিছুই বলা যাচ্ছে না এ মুহুর্তে।
– এসো আমার সাথে।
অপরিচিত স্থানগুলোতে, তাবিব সবসময়ই শক্ত করে নিবৃতার হাত ধরে থাকে, নিজের একদম কাছে রেখে, সাথে সাথে হাটে। অথচ আজ? দু’জন পাশাপাশি হেটেই করিডোর পেরিয়ে যাচ্ছে। নিবৃতা আড় নজরে তাকিয়ে দেখে তাদের মাঝে থাকা দেড় হাত দুরত্ব টুকুন। লোকটা কথাও বলছে না তেমন। চুপ তো সে গত কাল থেকেই হয়ে আছে। নিবৃতা এবং ওর পরিবারের উপর রেগে ছিল যে। তাহলে, আজ সবটা জানার পরও কি তার রাগ কমে নি? নাকি রাগের বদলে ঘৃনা জন্মে গিয়েছে এখন? যেই মানুষটা ওর সাথে, চোখে চোখ না রেখে কথা বলে না, আজ সে মুখ তুলে চাইছে অবদি না। এতই যেহেতু বিতৃষ্ণা তাহলে ওকে এখানে চিকিৎসা করাতে নিয়ে এসেছে কেন? ওর পরোয়া করারই বা কি প্রয়োজন তার? এবারে নিবৃতার মনে ক্ষোভ জমলো। ওর প্রতি যার কোন খেয়াল নেই, তার এই লোক দেখানো করুণা ওর চাই না। ওর চলন্ত কদম থেমে গেলো সহসা। আর দ্বিতীয় কিছু না ভেবেই, তড়িৎ উল্টো ঘুরে হাটা ধরলো৷ তাবিব নিশ্চুপ থাকলেও নিবৃতা হতে বিচ্ছিন্ন ছিল না। তাই আচমকা এমনটা হওয়াতে ও ভড়কে গেলো। ততক্ষণে নিবৃতা কয়েক হাত দুরে চলে গিয়েছে৷ মেয়েটার পায়ের গতি ক্ষিপ্র। তাবিব দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেলো সেখানেই।
– কি হয়েছে? কোথায় যাচ্ছো? তোমার টেস্টগুলো তো এখনো করানোই হয় নি।
নিবৃতার এমন ভাব যেন ও শুনলোই না তাবিবের কন্ঠস্বর। আসেপাশে তাকাচ্ছেও না। সোজা হেটে যাচ্ছে, অথচ ও জানেই না, বের হওয়ার রাস্তা কোথায়। চারপাশে উদ্ভ্রান্তের ন্যায় তাকাতেই, এক কোনে সিঁড়ি নজরে এলো। ওটা দিয়ে নিচে নেমে গেলে নিশ্চয়ই ‘এক্সিট’ খুজে পাওয়া যাবে? ও ক্ষিপ্ত, ভেজা মনে, সেদিকেই এগোলো। তাবিব আশ্চর্য বনে ওর সাথে সাথেই নামতে লাগলো। এখানে উপস্থিত প্রায় প্রত্যেকেই ওর পরিচিত। তাদের সামনে কোন অপ্রস্তত দৃশ্য স্থাপন করতে চাইলো না ও আপাতত, তাই শান্ত থাকার প্রচেষ্টা। শুধু গলা নামিয়ে বললো,
– কি সমস্যা? এমন করছো কেন?
সিঁড়ি শেষ হতেই, মাঝপথে দাড়িয়ে নিবৃতা জ্বলন্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো তাবিবের পানে। ফ্যাসফ্যাসে গলায়, মৃদু কাঠিন্যতা যোগ করে বললো,
– থাকবো না এখানে আমি।
– আশ্চর্য! কথা বলছো কেন? আমি নিষেধ করেছি না? ক্ষতি হবে তো!
তাবিব চিন্তিত বদনে খেয়াল দেখাতেই নিবৃতা মুখ ঘুড়িয়ে নিলো। বিড়বিড় করে বললো,
– আমার প্রতি এতো দরদ, সহানুভূতি দেখানোর তো কোন প্রয়োজন নেই।
তাবিব হয়তো সামান্য শুনতে পেলো, তবে প্রতিক্রিয় না দেখিয়ে বললো,
– দাঁড়িয়ে আছো কেন এখনও? চলো আমার সাথে!
কথাটি বলেই তাবিব সম্মুখে হাত বাড়ালো। উদ্দেশ্য নিবৃতার কবজি আঁকড়ে ধরা। কিন্তু আর হলো না সেটা। সহসা থমকে গেলো ওর হাত। ছুঁতে গিয়েও ফিরে এলো তৎক্ষনাৎ। ইতস্তত ভঙ্গিতে দৃষ্টি চুরি করে নিলো তাবিব। অথচ স্পষ্ট সেটুকু দেখলো নিবৃতা। আজ তাবিব যদি ওর হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতো ভেতরে, তাহলে কি বোকা, দুর্বল নিবৃতার সাধ্য ছিল সেই বন্ধন অগ্রাহ্য করে চলে আসার? না তো! কখনই ও পারতো না। বরঞ্চ ও খুশিই হতো। কিন্তু এখন? সে তো ওকে স্পর্শ পর্যন্ত করতে চাইছে না। কেন? নিবৃতাকে নোংরা মনে হচ্ছে কি? হয়তো! এতোগুলো দিন তো সে, আড়ালে থাকা, নিবৃতার সত্য সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত ছিল, কিন্তু আজ তো আর নয়। তাই তো এখন আর ওকে ছুঁয়ে দিতে ইচ্ছে হয় না। ওর মতো নিচের উপর অধিকার খাঁটাতেও তার মন সায় দেয় না৷ ক’দিন পর সহ্যও হবে না। রাগে দুঃখে নিবৃতার কান্না পেলো৷ দু-চোখ উপচে জল আসতে নিলেই, আবারও ভারি পায়ে ছুটলো এক্সিটের দিকে৷ তাবিব সেদিকে তাকিয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। মাথা ঝেড়ে, কপালে দু আঙ্গুল ঘষে মিনিট খানিক এদিক ওদিক পায়চারি করলো, কিন্তু পারলো না নিজেকে সামাল দিতে। হাঁপ ছেড়ে, পরাজিত বনে, পিছু নিলো নিবৃতার। রাতের অন্ধকার নেমেছে বাহিরে। এখন কোনভাবেই একা ছাড়া যাবে না ওকে।
অস্থির ভঙ্গিমায় পার্কিং লটে আসতেই তানহার সম্মুখীন হয় নিবৃতা। অপ্রত্যাশিতভাবে মায়ের সাথে দেখা হওয়ায় তানহা ভয় পেয়ে গেলো। এদিকে নিবৃতা তো মেয়েকে দেখে অবাক৷ এই অন্ধকারে, নির্জন পার্কিং লটে কি করছে ও? ভাঙা গলায় তৎক্ষনাৎ ধমকে উঠে বললো,
– কি করছো এখানে?
তানহা এক ভীত ঢোক গলাধঃকরণ করে হাত উচিয়ে একটি ছোট বস্ত দেখিয়ে বলে,
– সময় কাটছিলো না, তাই গাড়ি থেকে এয়ারপড নিতে এসেছিলাম। মোবাইলের ভলিউম সিস্টেমে সমস্যা হচ্ছে কয়দিন যাবত।
ওরা কাজে গিয়েছিল বিধায়, গাড়ির চাবি তাবিবের ডেস্কের ড্রয়ারেই ছিল। তাই তো, সুযোগ বুঝে, এই চটপটে মেয়ে আর থেমে থাকে নি। সেটা নিয়ে নেমে এসেছে নিচে। নিবৃতা ওর হাত থেকে সহসা গাড়ির চাবিটা ছিনিয়ে নিয়ে, কড়া চোখে তাকিয়ে বলে,
– ইদানীং তোমার বেশিই সাহস বেড়েছে!
নত মুখে মিনমিন করে ক্ষমা চায় তানহা।
– সরি।
– চুপচাপ গাড়িতে গিয়ে বসো।
নিবৃতা শাসন করলেও, এতো কর্কশ স্বর কখনই উচ্চারণ করে না। তানহা সংকুচিত মনে আর কিছু বললো না। নীরবে গাড়িতে উঠে বসতেই, ও পাশ থেকে নিবৃতা ড্রাইভিং সিট দখলে নিয়ে নিলো। হাত ঘুড়িয়ে ইঞ্জিন চালু করতেই তানহা ভড়কে গিয়ে বললো,
– বাবা যাবে না?
– তোমার বাবা জান্নাতে যাবেন না জাহান্নামে, সেটা আমার দেখার বিষয় না।
নিবৃতা পর্ব ২৭
সত্যিই কি এ জবাব নিবৃতা দিলো? তানহা কথা বলতেও ভুলে গেলো যেন। হতভম্বে জড়িয়ে মুক হয়ে বসে রইলো। এবং পরপর মুহুর্তের মধ্যে, ধুলো উড়িয়ে, গাড়ি এই জায়গা ত্যাগ করতেই তাবিব দৌড়ে এলো সেথায়। গাড়ির তীব্র গতিতে কি ঝাঝ! এটা কি হলো? তাবিবকে, এখানে একা ফেলে রেখে নিবৃতা ওভাবে চলে গেলো? আসলেই কি গেলো? তাবিব এক রাশ বিস্ময় ও প্রবল অসহায়ত্ব নিয়ে, সেখানেই জড় বস্তুর ন্যায় দাঁড়িয়ে রইলো।
