নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৫৪
নাজনীন নেছা নাবিলা
আজ কলেজে আমার রেগ ডে, আবার এডমিট কার্ড আনতে হবে ঝামেলা। তাই ছোট পর্ব। হতাশ হয়ে কমেন্ট করে আমরা কষ্ট করে দেওয়া গল্পের অভিযোগ করে আমার মন মানসিকতা নষ্ট করলে হয়তো কয়েক দিন নাও দিতে পারি। আশা করি যতটুকু দিলাম খুশি হয়ে পড়বেন।
নীলা যে কখন ক্লান্ত শরীর আর মন নিয়ে ঘুমের দেশে তলিয়ে গেল, তা সে নিজেও টের পেল না। মিহাল খাওয়ার পর্ব শেষ করে যখন রুমে ফিরে এলো, দেখল পুরো ঘর একদম ঘুটঘুটে অন্ধকারে ডুবে আছে। তার আর বুঝতে বাকি রইল না যে তার অভিমানী নীলাঞ্জনা গভীর ঘুমে মগ্ন। সে কোনো শব্দ না করে অন্ধকারের মাঝেই নিঃশব্দে এসে নীলার পাশে বিছানায় শুয়ে পড়ল। কিন্তু মিহালের চোখে তখন ঘুমের লেশমাত্র নেই। বিছানায় শুয়ে কিছুক্ষণ এপাশ-ওপাশ করল সে। তীব্র এক ব্যাকুলতা নিয়ে ভাবল, একবার নীলাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু পরক্ষণেই কী একটা ভেবে সে নিজেকে সামলে নিল, হয়তো ভাবল ঘুমন্ত মেয়েটাকে আর বিরক্ত না করাই ভালো। শেষমেশ অন্য পাশে ফিরে, নীলার দিকে পিঠ দিয়ে সে চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইল। চোখ বন্ধ থাকলেও সে কিন্তু একটুও ঘুমায়নি। বরং আজ সারাদিনে ক্যাম্পাসে যা যা ঝড় বয়ে গেল, সেসব নিয়ে তার মাথায় চিন্তার চাকা ঘুরছিল। লিসার শেষ রক্ষা পাওয়ার কোনো সুযোগই সে রাখবে না। তার পবিত্রা নীলাঞ্জনাকে এই লিসা সবার সামনে এভাবে অপমান করেছে, তার চরিত্র নিয়ে নোংরা আঙুল তুলেছে এত সহজে সেই অপরাধীকে সে কিছুতেই ছেড়ে দেবে না। প্রিন্সিপাল তাকে দেশছাড়া করলেও, মিহাল আড়ালে থেকে লিসাকে এমন এক শিক্ষা দেবে যা সে কোনোদিন ভুলবে না।
ঘড়ির কাঁটা যখন প্রায় মধ্যরাত বারোটা ছুঁইছুঁই, তখন নীলার ঘুমটা কিছুটা হালকা হয়ে এলো। অবিন্যস্তভাবে চোখ মেলতেই সে তীব্র এক অস্বস্তি বোধ করল, তার গলাটা একদম শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। সেই সন্ধ্যার আগে খাবার খাওয়ার সময় এক গ্লাস পানি খেয়েছিল, তারপর আর এক ফোঁটা পানিও তার পেটে পড়েনি। সে আলতো করে পাশে ফিরে দেখল মিহাল নিশ্চল হয়ে শুয়ে আছে। তার পিঠ ছড়ানো অবয়ব দেখে নীলা ভাবল লোকটা হয়তো সারাদিনের ক্লান্তিতে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছে। মিহালের ঘুম যাতে ভেঙে না যায়, তাই সে অত্যন্ত সাবধানে, বিড়ালের মতো নিঃশব্দে বিছানা থেকে নামল। তারপর চটি জোড়া পায়ে গলিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেল নিচে ডাইনিংয়ের ফ্রিজ থেকে একটু ঠান্ডা পানি খেয়ে গলাটা ভেজানোর উদ্দেশ্যে। কিন্তু সে জানত না, তার এই সামান্য নড়াচড়াও মিহালের সজাগ দৃষ্টি এড়াতে পারেনি। নীলা ধীরপায়ে নিচে নেমে এসে ড্রয়িংরুমের ফ্রিজটা খুলল এবং ভেতর থেকে বড় এক বোতল ঠান্ডা পানি বের করল। সেখানে দুটো বড় বোতল রাখা ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, ঠান্ডা পানি জমে থাকার কারণে বোতলের মুখটা এমনভাবে আটকে ছিল যে সে আপ্রাণ চেষ্টা করেও তা খুলতে পারল না। তবুও জেদ ধরে সে বারবার নিজের সবটুকু শক্তি দিয়ে বোতলের মুখ খোলার চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগল।
ঠিক তখনই অন্ধকারের মাঝ থেকে আচমকা কেউ একজন তার হাত থেকে বোতলটি কেড়ে নিল। মধ্যরাতের এই নির্জনতায় হুট করে এমন এক কাণ্ড ঘটায় নীলা বুকের ভেতর একটা তীব্র মোচড় অনুভব করল, কিছুটা ভয়ও পেয়ে গেল সে। ড্রয়িংরুমে তখন একটা হালকা হলদে রঙের নাইট বাল্ব জ্বলছিল। সেই আবছা আলোয় ভালো করে তাকাতেই সে দেখতে পেল সামনে আর কেউ নয়, স্বয়ং মিহাল দাঁড়িয়ে আছে। মিহালকে দেখেও নীলা নিজের মুখে কুলুপ এঁটে রইল, কোনো কথা বলল না। মিহাল কোনো বাড়তি শক্তি না খাটিয়েই, খুব অনায়াসে এক মোচড়ে বোতলের মুখটা খুলে ফেলল। মুখটা খুলে সে বোতলটি নীলার দিকে বাড়িয়ে দিল পানি খাওয়ার জন্য। কিন্তু নীলা সেই বোতলটি ছুঁয়েও দেখল না। বরং মিহালকে উপেক্ষা করে সে ফ্রিজ থেকে দ্বিতীয় পানির বোতলটি বের করল এবং আবারও নিজের মতো করে সেটির মুখ খোলার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু এইবারও নীলা পুরোপুরি ব্যর্থ হলো। নীলার এই অবুঝ ব্যর্থতা দেখে মিহালের ঠোঁটের কোণে এক টুকরো বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। সে আর কোনো কথা না বাড়িয়ে নীলার হাত থেকে সেই দ্বিতীয় বোতলটিও প্রায় কেড়ে নিল এবং এইবার বোতলটির মুখ সরাসরি নিজের দাঁত দিয়ে চেপে এক টানে খুলে ফেলল। এখন মিহালের দুই হাতেই দুটো খোলা পানির বোতল।
সে দুটো বোতলই নীলার মুখের সামনে এগিয়ে দিল। কিন্তু নীলার জেদ তখন চিলতে আকাশের চেয়েও বড় সে দুটো বোতলের একটিও গ্রহণ করল না। বরং এক বুক দেমাক আর ভাব দেখিয়ে গটগট করে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল। প্রয়োজনের তীব্র তৃষ্ণায় বুক ফেটে যাবে, তবুও সে এই লোকের হাত থেকে কোনো সাহায্য নেবে না, এটাই যেন তার শেষ কথা। মিহাল স্তম্ভিত হয়ে নীলার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল। এইবার তার নিজের ভেতরেও তীব্র রাগ আর জেদ চড়ে বসল। সে মনে মনে এক রোখা সিদ্ধান্ত নিল, যতক্ষণ না পর্যন্ত নীলা নিজে হেঁটে এসে তার হাত থেকে বোতল নিয়ে পানি খাচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত সে এই ড্রয়িংরুমের ঠান্ডা মেঝেতে এভাবেই দুটো বোতল হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে। অন্যদিকে নীলা নিজের রুমে ফিরে গিয়ে ধপাস করে বিছানায় শুয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ বিছানায় এপাশ-ওপাশ করতেই সারাদিনের মানসিক ও শারীরিক ক্লান্তির কারণে সে আবার গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। ঘুমের ঘোরে সে সম্পূর্ণ ভুলেই গেল যে মিহাল এখনো রুমে ফিরে আসেনি।
সকাল সাতটার দিকে ঘড়ির অ্যালার্ম বাজতেই ঘড়িতে একটা শব্দ হলো। জানালার পর্দার ফাঁক গলে সকালের নরম সোনাঝরা রোদ এসে পড়েছে নীলার চোখে-মুখে। চোখ-মুখ কুঁচকে, হাত-পায়ের আঙুল ফুটিয়ে সে ধীরে ধীরে বিছানায় উঠে বসল। রাতের ঘুমটা বেশ চমৎকার হয়েছে। চোখ থেকে ঘুমের রেশটুকু পুরোপুরি কেটে যেতেই সে অভ্যাসবশত নিজের পাশে তাকালো, কিন্তু বিছানার ওপাশটা একদম খালি, সেখানে কেউ নেই। এত সকালে মিহাল কোথায় যেতে পারে, সে কিছুই বুঝতে পারল না। ঠিক তখনই মস্তিস্কের কোনো এক কোণে গত রাতের ড্রয়িংরুমের সেই জেদের ঘটনাটি হুড়মুড় করে মনে পড়ে গেল। মনে পড়া মাত্রই নীলা এক ঝটকায় বিছানা ছেড়ে নেমে পড়ল। পুরো বেডরুম তন্নতন্ন করে খুঁজল, এমনকি বারান্দায় গিয়েও উঁকি দিল, কিন্তু মিহালের কোনো হদিস পেল না। হঠাৎ মনে এক তীব্র আশঙ্কার জন্ম নিতেই সে এক দৌড়ে রুম থেকে বের হয়ে সিঁড়ির মুখে এসে থমকে দাঁড়াল। সিঁড়ির ওপর থেকে নিচের দিকে তাকাতেই তার চোখ দুটো ছানাবড়া হয়ে গেল।
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৫৩
সে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে ড্রয়িংরুমের ফ্রিজের সামনে মিহাল ঠিক আগের মতোই দুই হাতে দুটো পানির বোতল নিয়ে পাথরের মূর্তির মতো ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। এই অবিশ্বাস্য দৃশ্য দেখে নীলার মাথা যেমন গরম হলো, তেমনি তার বিস্ময়ের আর সীমা রইল না। লোকটা কি পাগল? সারারাত এভাবে দাঁড়িয়ে আছে। সে এক দৌড়ে সিঁড়ি ভেঙে নিচে নেমে সোজা মিহালের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কোনো কথা না বাড়িয়ে সে এক ঝটকায় মিহালের হাত থেকে বোতল দুটো কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু মিহালের হাতের বাঁধন তখন লোহার চেয়েও শক্ত, সে এত শক্ত করে বোতল দুটো ধরে রেখেছে যে নীলা টেনেও তা এক চুল নড়াতে পারল না।
