প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৬৫
ইনান হাওলাদার
গতকাল রাত থেকে মে’জাজ চ’টে আছে আহির। সেই রেশ এখনো রয়েছে। যার দরুণ বাড়ি শুদ্ধু সবার সাথে গমগম করছে সে। মে’জাজ হারিয়েছে একজনের উপর।আর রা’গ দেখাচ্ছে সবার উপর। কেউ ভালো কথা বললেও ছ্যাঁত ছ্যাঁত করে উঠছে। এই মুহূর্তে রুমে বসে রাগে মতো ফোঁস ফোঁস করছে। ড্রয়িং রুমে তূর্যের গলা শোনা যাচ্ছে। তার মানে বাড়ি ফিরেছেন জনাব। সে খানিকক্ষণ অপেক্ষা করলো লোকটার রুমে আসার।তবে আসছে না দেখে সে-ই নিচে নামলো।
বাড়ির তিন গিন্নি রান্না ঘরে সকালের নাস্তা তৈরি করছেন। তূর্য এসেই কফি চেয়েছে।ইতোমধ্যে কফি করাও শেষ লতা বেগমের। ছেলেটাকে দেওয়ার জন্যে এগিয়ে যেতেই দেখলেন আহি নিচে নামছে। ওকে দেখে তিনি আর এগিয়ে গেলেন না। মেয়ের হাতে কাপটা ধরিয়ে দিয়ে বললেন তূর্যকে দিতে। কাপ হাতে থমথমে মুখে এগিয়ে গেল সে। গিয়েই তূর্যের মুখের উপর কাপটা ধরলো। তার এগিয়ে দেওয়ার ধরণ দেখে তূর্য একবার ওর মুখের দিকে তাঁকালো। মেয়েটা এখনো রাগে ফুঁসছে দেখে চোখ ছোট ছোট করলো সে। সেভাবেই কয়েক সেকেন্ড প্রেয়সীর মুখের দিকে তাঁকিয়ে থেকে কাপ হাতে নিলো। আহি বিড়বিড় করে অনেক কিছু বলল। তূর্য ভ্রু কুঁচকে পুনরায় ওর মুখের দিকে তাঁকালো। কি কি বলল মেয়েটা কিছুই বোঝেনি সে। কালকে রাতের পর থেকেই এমন করছে। ঘুমাবে বলে কাছে ডেকে একটু নাহয় বাড়াবাড়ি করেই ফেলেছে ,তাতে কি? সে কফির কাপে চুমুক দিয়ে বলল,
” এখনো সাপের মতো ফোঁস ফোঁস করছিস? ”
ছেলেটার কথা মাটিতে পড়ার আগেই খপ করে ধরলো আহি। ঝগড়ুটে গলায় বলল,
” আপনার সাথে আমি কথা বলতে চাচ্ছি না তূর্য ভাই ”
এহেন কন্ঠে চোখ কপালে উঠে গেল তূর্যের।চোখ বড়বড় করে দেখলো সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দুই ফুটের মেয়েকে। আবারো কিছু বিড়বিড় করছে আহি। তূর্য এবারে কফির কাপটাকে সামনে থাকা টি – টেবলের উপর রাখলো। সাবলীল গলায় বলল,
” বিড়বিড় যে করতেই আছিস। বোঝা যায় না তো কিছু।আদেও কিছু বলছিস তো? ”
” কেন ? শুনতে পাচ্ছেন না? বলছি তো ! আপনার ক্যারেকটারে সমস্যা আছে তূর্য ভাই। মেয়ে মানুষ দেখলেই … দেখলেই ….” বাক্যটা সম্পন্ন করতে গিয়ে বারবার বাঁধা পাচ্ছে আহি। মুখে আনতেই পারছে না। তূর্য সম্পন্ন করলো ওর কথা। খুব সাবধানে মৃদু কন্ঠে বলল,
” মেয়ে মানুষ না ,শুধু বউ দেখলেই ……” বলেই বাম চোখ টিপলো সে। এতক্ষণ ক্যুল সেজে বসে থাকলেও এবারে গম্ভীর গলায় বলল,
” বেড রুমের ঝগড়া ড্রয়িং রুম পর্যন্ত নিয়ে এসেছিস আহি? ”
” কিয়ামত পর্যন্ত সঙ্গে করে নিয়ে যাব ” দাঁত কিড়মিড় করে বলে উঠল আহি।
” সেই মাঝ রাত থেকে শুরু করেছিস। এখন তো একটু চুপ কর। আম্মুরা শুনে নিবে জা’ন ” প্রথমে উচ্চ কন্ঠে কথাগুলো শুরু করলেও আস্তে আস্তে নমনীয় হলো তূর্যের গলা।
আহি থমথমে গলায় বলল,
” শুনুক ”
” কারণ জিজ্ঞেস করলে কি বলবি ই’ডিয়ট? ” এবারে কিছুটা মেজাজ নিয়ে বলল সে। পরপর আবার মৃদু গলায় বলল,
” তাছাড়া তোকে আমি টাইম দিয়েছিলাম।ঘুমাসনি কেন?”
” ওইটুকু সময়ে কে ঘুমাতে পারে তূর্য ভাই? মাত্র তিন মিনিট!”
” পারবি না বলেই তো দিয়েছি ” বিড়বিড় করলো তূর্য।পরপর নিজেকে নির্দোষ সাজিয়ে বলল,
” পারিসনি সেটা তোর ব্যর্থতা। হোয়াট’স মাই ফল্ট ইন দ্যাট? ”
” না,না আপনার কি দোষ হবে? আপনি তো সাধু সন্ন্যাসী ”
এরমধ্যে আকবর চৌধুরী নিচে নামলেন। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে খেয়াল করেছেন দুইজনে কিছু একটা নিয়ে তর্কাতর্কি করছে। ওদের এই খুনসুঁটি গুলো ওনার বরাবরই পছন্দ। একটা সম্পর্কে শুধু ভালোবাসা থাকাই যথেষ্ট নয়। কিছুটা মান-অভিমান, খুনসুঁটি থাকা আবশ্যক। এতে ভালোবাসার কদর বাড়ে। তবুও ওদের সামনে গম্ভীর হয়ে থাকেন।এমন যেন এসব ওনার পছন্দ নয়।তিনি নিজের জন্যে বরাদ্দ আসন খানায় বসতে বসতে বললেন,
” কি নিয়ে এত কথা কাঁটা-কাঁটি চলছে ? ”
আহিকে দিয়ে বিশ্বাস নেই তূর্যের। তালে তালে সত্যি কথাটা না বলে ফেলে । ঘটে তো বুদ্ধির ‘ব’ও নেই। তারপর নিজে লজ্জায় পড়বে তার সাথে তাকেও ফেলবে। তাই তড়িঘড়ি করে বললো,
” কিছু না ”
অপরদিকে হতে আহি উঁচ্চ কন্ঠে বিরোধিতা করলো।বলল,
” কি ‘ কিছু না ‘ ? বড় আব্বু আপনার ছেলে …..” পরপর নিজেও থেমে গেল। কি বলতে যাচ্ছিল ভেবেই নিজের মাথায় একটা চাটি মা’রল। আকবর চৌধুরী খবরের কাগজ তুলে নিয়ে বললেন,
” হ্যাঁ ,আমার ছেলে? কি করেছে মা? ”
” কিছু না,বড় আব্বু ” মিনমিন করে বলল সে। তূর্য ওকে ঠেস দিলো,
” কি ‘ কিছু না ‘? বল ! ”
” হ্যাঁ, বলো মামনি। তূর্য ব’কেছে তোমাকে?” খবরের কাগজের পাতা উল্টাতে উল্টাতে বললেন তিনি। আহি কি বলবে ভেবে পেল না। সে তো আর প্রত্যুৎপন্যমতি নয়। তার উপস্থিত বুদ্ধি নেই বললেই চলে।অসহায় মুখ করে তূর্যের দিকে তাঁকালো। চাহুনি বলছে ‘ এই যাত্রায় বাঁচিয়ে দিন তূর্য ভাই। ‘ কিন্তু তূর্য তো সেটা করবে না বলে ঠিক করে নিয়েছে।বোকামির সাজা ভোগ করুক এবার। মেয়েটা বুক ভরা আশা নিয়ে কয়েক সেকেন্ড ওর দিকে তাকিয়ে রইলো।তারপর কিছু একটা ভেবে রহস্যময়ী হাসি দিলো।গিয়ে বড় আব্বুর পাশটায় বসলো। আহ্লাদী কন্ঠে বললো,
” আসলে বড় আব্বু,বিয়ের পর মেয়েরা দুইদিন শ্বশুরবাড়ি থেকে আবার বাবার বাড়ি আসে না? আমিও আসতে চাই।কিন্ত তূর্য ভাই চান না। হয়তো খরচের কথা ভাবছেন। “বলে আড় চোখে তূর্যের দিকে তাঁকালো। ছেলেটা আশ্চর্য হয়ে ওর দিকে তাঁকিয়ে আছে।
তূর্য চাইলো না ওর মিথ্যে ধরিয়ে দিতে। বিনিমনে তারও মান সম্মানের ফালুদা হবে। কিন্তু এত বড় গজব কথা মানুষ কীভাবে বলে? সে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন করলো,
” তোর শ্বশুর বাড়ি আর বাপের বাড়ি আলাদা? ”
” হোক এক।কিন্তু আমি আসতে চাই ”
এই বাড়িতে এমন কখনোই হয়নি যে বাড়ির কর্তারা ছেলে-মেয়েদের কোনো আবদার অপূর্ণ রেখেছেন। বিশেষ করে মেয়ে দুটোর! ওরা যখন যা বলে তারা তাই করেন। মেয়েরা যেমন বাবা পাগল হয়, বাবারাও হয়তো মেয়ে পাগল হন।তিনি বললেন,
” আচ্ছা,এসো । তো কখন আসছো? ”
” কখন যাবেন তূর্য ভাই? ” হাস্যোজ্জ্বল মুখ নিয়ে তূর্যের নিকট জিজ্ঞেস করলো মেয়েটা। বিনিময়ে হতাশ জনক উত্তর,
” তোর যখন ইচ্ছা যা। ”
ওমনি পানসুটে মুখ করে ফেললো সে। ঠোঁট উল্টে আকবর চৌধুরীর দিকে তাঁকালো।তিনি মেয়ের মুখের দিকে একবার তাঁকিয়ে ইশারায় আশ্বাস দিলেন। ছেলেকে প্রশ্ন করলেন,
“কেন? তুমি আসবে না? ”
” নাহ। ” সাবলীল কন্ঠস্বর তূর্যের।
” ভয় পেও না,খালি হাতেই এসো।টাকা-পয়সা খরচ করতে হবে না”
আকবর চৌধুরী বুঝেন ছেলেকে।জানেন খোঁচাটা কোথায় দিতে হবে। তবে এবারে আর সেটা কাজে আসলো না। কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না তূর্য। নিরিবিলি ভঙ্গিতে কফির কাপে একের পর এক চুমুক দিয়ে যাচ্ছে।
শান্ত-প্রান্ত-তাহি আরো কিছুক্ষণ আগেই নিচে এসেছে। এতক্ষণ মনোযোগ সহকারে সকলের কথা শুনেছে। তারাও চায় তূর্য ভাই জামাই হিসেবে চৌধুরী বাড়িতে আসুক। কিন্তু ভাইয়ের ভাব গতি দেখে বুঝলো এই চাওয়া পূর্ণ হবার নয়।এদিকে তাহি পড়েছে আরেক চিন্তায়। শুধু যদি তার বোন বাবার বাড়িতে আসে তাহলে ব্যাপারটা কেমন হবে? ভাইয়া কি আহি আপুর বর-ই থাকবে? নাকি তাদের সম্পর্ক বদলে যাবে?সে চিন্তিত হয়ে প্রশ্নটা করেই ফেললো,
” কিন্তু ভাইয়া তুমি না এলে তো ভাবিপুর দেবর.. না..না.. ভাসুর হয়ে যাবে।তাইনা? ”
প্রশ্নটা শুনেই কফি মুখে খুঁক খুক করে কেশে উঠলো তূর্য।
আকবর চৌধুরীর কথায় কোনো কাজ না হলেও এবারে চিন্তিত হলো সে। আহিকে দিয়ে তার মোটেও বিশ্বাস নেই। এমনিতেই ‘তূর্য ভাই’ ‘তূর্য ভাই’ বলে মাথা খেয়ে বেড়াচ্ছে। এর উপর যদি ভাসুরের আসনে বসায়… যদিও শ’য়তানি করেই ওসব করবে।তবুও কথাটা ভাবতেই বুকের মধ্যে মুচড়ে উঠলো ওর। চোখের সামনে ভেসে উঠলো আহির দুষ্টুমি মাখা মুখশ্রী। ওর সামনে গান গাইছে সে ‘ সম্পর্ক বদলে গেল একটি পলকে ‘ আর কল্পনা করতে পারলো না তূর্য। দ্রুত চোখের পলক ফেলে গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করলো আহিকে,
” কখন যাবি তোর বাপের বাড়ি ? ”
আহি তো আশাই ছেড়ে দিয়েছিল।তূর্যের এহেন প্রশ্নে মুখ জ্বলজ্বল করে উঠলো তার।দেরি করা চলবে না। সিদ্ধান্ত বদলানোর আগেই কাজ সারতে হবে।সে হাসিহাসি মুখ করে বলল,
” বিকালে ”
জবাবে ‘ হ্যাঁ ‘ বা ‘ না ‘ কিছুই বললো না তূর্য। প্রান্ত ভাইয়ের কষ্ট দেখে বললো,
” তূর্য ভাই একই বাড়িতে বিয়ে করেও আপনার কোনো লাভ হলো না।সেই খরচ করতেই হবে ”
কিন্তু সুবিধা দেখালো শান্ত,
” লাভ নেই মানে? ভাইয়ার বউ রাগ করলেও কখনো বাবার বাড়ি চলে আসতে পারবে না।আর আসলেও একই বাড়ি।তূর্য ভাইয়ের তো শুধু লাভই লাভ। আমাদের হবে জ্বালা। ”
ভাইয়ের এহেন কথায় তূর্যের মনে কিছুটা প্রশান্তির হাওয়া বয়ে গেল। বিয়ের পর থেকে ই’ডিয়টটা যে পরিমাণে ঝগড়া করছে যখন-তখন রাগ করে বাবার বাড়ি চলে আসতে পারে।কোনো বিশ্বাস নেই ওকে দিয়ে।অন্তত একটা সুবিধা তো আছে ! এদিকে শান্তর কথা আহি চিন্তায় পড়লো। সত্যিই তো ! একটু রাগ করেও লাভ নেই।বাবার বাড়ি আসার ভয়ও দেখাতে পারবে না। তার চেয়ে বরং রা’গ করাটা-ই নাহয় ছেড়ে দিলো। নিজের অসহত্বের কথা ভেবে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো মেয়েটা।এসব বিষয় নিয়ে গভীর চিন্তা রান্নাঘরের দিকে হাঁটলো। একটু পর ড্রয়িং রুম ফাঁকা হলো।তূর্য আর আকবর চৌধুরী বসে আছেন।দুজনেই নিশ্চুপ। ভদ্রলোক কিছু একটা নিয়ে ভাবছেন হয়তো।তূর্য বাবার ভাবগতি দেখে বুঝছে তিনি কিছু বলতে চান।সেজন্যেই মূলত সে এখনো ড্রয়িং রুমে বসে আছে। এ পর্যায়ে মুখ খুললেন তিনি। ভারী গলায় বললেন,
” শোন তোমাকে একটা কথা বলে রাখি, এসব বিয়ে টিয়ের চক্করে মেয়েটার পড়ালেখায় অনেক ক্ষ’তি হয়েছে।আর যেন না হয় ”
” সেটা আপনাদের মেয়েকে বলুন। সকালেও বলেছি ভার্সিটি যেতে।সে কাল থেকে যাবে।আমি ওকে পড়তে আটকায়? ”
” আটকাও না,আটকাতে কতক্ষন !” বিড়বিড় করলেন আকবর চৌধুরী।
” এমনভাবে বলছেন যেন ওকে পড়তে দেখলে আমি কাঁন্না শুরু করি ”
” তুমি নাহয় করো না।এমন কিছু যেন না হয় যে, অন্য কেউ শুরু করে দিলো ”
ওনার ইঙ্গিত কোনদিকে এবারে বুঝলো তূর্য। জ্বিভ দিয়ে ঠোঁট ঠেলে উঠে দাঁড়ালো ও। জায়গা ছাড়তে ছাড়তে বলল,
” তেমন কিছু হবে না। মাথায় আছে আমার। ”
সূর্য পশ্চিমাকাশে প্রায় হেলে পড়েছে। আকাশ জুড়ে শুধু লালচে আভার মেলা। রুমের দক্ষিণ দিকের জানলাটার পাশে চেয়ার নিয়ে বসে আছে আহি। জানালার কাঁচ একপাশে টেনে রাখা ।যার দরুণ সূর্যের লালচে আভা তার মুখে এসে পড়েছে।প্রায় আধ ঘণ্টা ধরে একই জায়গা বসে আছে সে। হাতে মোবাইল ধরা। একমাত্র বেস্টফ্রেন্ডের সাথে গল্পের ঝুড়ি নিয়ে বসেছে।
আহির বিয়ের দিন হুট করেই শরীর খারাপ করে তারিনের ।তারপর মেহেদী ওকে নিয়ে তড়িঘড়ি করে নিজেদের বাড়িতে ফেরে।মেয়েটাকে বলে যাওয়ারও সময় হয়নি। যার কারণে সে রাগ হয়ে বসে ছিল।এখন অবশ্য সব রাগ-অভিমান হাওয়ায় উড়ে গিয়েছে তারিনের একটা কলে। তাদের কথার ওপাশ থেকে বারবার মেহেদির গলা ভেসে আসছে। একবার আপেল এনে খেতে বলছে,একবার আঙুর তো আরেকবার কমলা। এই মুহূর্তে এক ফানা কলা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। খাওয়ার জন্য শুধু পায়ে ধরছে না মেয়েটার। এদিকে তার গলা পর্যন্ত ভরে আছে। বারবার ছেলেটার অনুনয়-বিনয় শুনে মোবাইলের ওপাশ থেকে মুচকি হাসছে আহি। কত মিষ্টি মিষ্টি নাম ধরে ডেকে খেতে বলছে মেহেদী ভাইয়া।অথচ,তারিন খিটখিট করছে। তূর্য ভাই যদি তাকে একবার ওই মিষ্টি নামগুলোর মধ্যে থেকে যেকোনো একটা নামে একবার ডাকতো তাহলে পুরো দুনিয়া খেয়ে ফেলতো সে।
আহি লক্ষ্য করলো তারিন মেহেদীকে তুমি বলে সম্বোধন করছে। যদিও অনেক দিন ধরেই বলতে শুনছে। কিন্তু মস্তিষ্ক ক্যাচ করতে পারেনি। ও উৎসুক হয়ে জানতে চাইলো,
” তুই মেহেদী ভাইয়াকে তুমি করে বলিস তারিন? ”
কলা হাতে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে দেখলো তারিন । চোখের দিকে তাঁকিয়ে মুচকি হাসলো। মেহেদী ওর কোলের উপর কলাগুলো রেখে সোজা রুমের বাইরে চলে গেল। রাগ দেখিয়ে চলে গেল লোকটা বুঝলো ও। তারিন জানে এসব রাগ একটু পরেই ঠিক হয়ে যাবে তাই ওদিকে খেয়াল না দিয়ে আহিকে বলল,
” হুম ”
” লজ্জা লাগে না তোর?” বোকার মতো প্রশ্ন করে বসলো আহি।তারিন মুখ বাঁকিয়ে বলল,
” এহহহ! আর কয়দিন পর তুমিও তূর্য ভাইয়াকে তুমি করে বলবে দেখে নিও। ”
আহি যেন আসমান ভেঙে পড়ল।তেমন ভাব নিয়েই টেনে টেনে বলল,
” আমিইই? তুমি বলবো? তূর্য ভাইকে? ম’রে গেলেও না ”
ওর ভাই সম্বোধনে কপাল কুঁচকাল তারিন। একটা কলা হাতে নিয়ে খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে বলল,
” এখনও ভাই বলছিস আহি? ”
আহি এবারে কিছুটা বিব্রত হলো। মৃদু গলায় বলল,
” হুউ ”
তারিন ওর কথা ওকেই ফেরত দিলো,
” স্বামীকে ভাই বলতে ল’জ্জা করে না তোর ? ”
” একদম তূর্য ভাইয়ের মতো কথা বলবি না তারিন। উনিও তো আমাকে ‘ তুই ‘ ‘ তুই ‘ করে বলেন। কোন স্বামী তার স্ত্রীকে তুই বলে ? বল ! ” রাগ দেখিয়ে বলল আহি।
” ভাইয়া তোকে ছোটবেলা থেকেই তুই করে বলে আসছেন।এখন হঠাৎ করে তুমি বলবেন কীভাবে বল ? ”
” আমি মনে হয় বুড়ো বেলা থেকে ‘ ভাই ‘ বলে আসছি? জন্মের পর থেকেই তো ভাই বলছি। আর উনি চাইলেই তুমি বলতে পারেন ইচ্ছা করে বলেন না ” শেষ কথাটা গম্ভীর হয়ে বলল আহি।
” তো তুই কীভাবে বুঝলি ভাইয়া চাইলেই তুমি বলতে পারেন ”
” নিজের যখন দরকার পড়ে ঠিকই বলেন ” থমথমে কন্ঠস্বর ওর।
” মানে? কখন বলে? বুঝিয়ে বল বইন ” অধৈর্য কন্ঠস্বর তারিনের।
” যখন….” এইটুকু বলে থেমে গেল আহি। বলতে বলতে কি বলে ফেলে কিছু ঠিক নেই ওর। কখন তুমি বলে এই কথা একবার তার প্রাণ প্রিয় বান্ধবীর কানে গেলে খেঁপাতে খেঁপাতে জীবন শেষ করে ফেলবে।
তারিন উৎসুক হয়ে ফের জানতে চাইলো,
” যখন….? ”
” কিছু না ” কথা এড়াতে হালকা হেসে বলল আহি। অথচ মেয়েটা ব্লাশ করছে।সেটা তারিনের দৃষ্টির অগোচর হলো না।আহি না বললেও বুঝে নিলো তারিন।দুষ্টু হেসে দুই ভ্রু নাচিয়ে বলল,
” ও ..হো..! বুঝেছি । আর কি কি বলেন ভাইয়া? হুমম? বল ,বল ”
” কিছু না তারিন।কি বুঝেছিস তুই? শুধু শুধু উল্টাপাল্টা ভাববি না বলে দিলাম ” কপট গম্ভীরতা দেখলো মেয়েটা। তারিনও কপট মন খারাপের নাটক করলো।বলল,
” থাক,বলিস না। রাখি তাহলে.. ”
কাজ হলো কথায়।আহি তড়িঘড়ি করে আটকালো ওকে।বলল,
” বলছি দাঁড়া,রাগ করিস কেন ? ”
” হ্যাঁ, বল ” এক গাল হেসে বলল তারিন।
আহি থেমে থেমে বলল,
” জা’ন বলেন মাঝে মাঝে । সবসময় না। আর…আর কয়েকবার পাখি, দুইবার জা’নপাখি বলেছিল।কিন্তু মেহেদী ভাইয়ার মতো সবসময় বলে না । ভবিইইষ্যৎ ” শেষ কথাটা তিন আলিফ টান দিলো সে।
” আমাকে বলতেই এত লজ্জা পাচ্ছিস? কই? আমি তো লজ্জা পাই না। বুঝেছি, প্রথম প্রথম তো।” হতাশ হয়ে বলল।পরপর আবারো দুষ্টু হেসে বলল,
” আর ‘ তুমি ‘? ‘ তুমি ‘ কখন বলে? ”
” তারিন ! যাহ, কথাই বলব না আর ” বলে কল কেটে দিলো আহি। লাজুক হেসে পিছন ফিরতেই শিরদাঁড়া সোজা হয়ে গেল মেয়েটার। পকেটে দুই হাত গুঁজে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তূর্য। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। পরনে টিশার্ট-ট্রাউজার। ফরমাল ড্রেস নেই মানে অনেকক্ষণ এসেছেন লোকটা? ও কথায় এতটাই বিভোর হয়ে ছিল মোটেও বুঝতেও পারেনি? তাহলে সব কথা শুনে নিয়েছেন? মেয়েটা তোতলাতে তোতলাতে বলল,
” তূ..তূর্য ভাই আ ..আপনি? কখন এ…এলেন? ”
” অনেকক্ষণ জা’ন, জা’নপাখি , পাখি ” বলতে বলতে ধীর পায়ে এগিয়ে এলো সে। একদম মুখোমুখি দাঁড়ালো। গলা শুকিয়ে এলো মেয়েটার।এর মানে সবটা শুনেছেন তিনি।কয়েকবার শুকনো ঢোক গিলে তূর্যকে পাশ কাটিয়ে যেতে যেতে বলল,
” আ..আমি আসি ? ”
খপ করে ওর হাত টেনে ধরলো তূর্য। এক টানে নিজের সামনে এনে বুকের উপর ফেলল। কন্ঠে আফিম মিশিয়ে বলল,
” জা’ন,জা’নপাখি,পা’খি ছাড়া আর কি কি ডাক শুনতে চাস জা’ন?
মাই লাভ , নাকি বে’ইব? ডা’র্লিং , নাকি সুইটহা’র্ট ? অর হানি ? হুইচ ওয়ান? আ’ল স্যে হোয়াটএভার ইউ ওয়ান্ট। বল কি শুনতে চাও ”
আবার তুমি? মাথা তুলে তাঁকালো মেয়েটা। গলা তো শুকিয়েছে অনেক আগেই।এখন হাত-পা-ও বরফ হয়ে আসছে। আর কথা যেন বের হতেই চাচ্ছে না। মেয়েটা কোনো রকমে টেনে-হেঁচড়ে একটা এলোমেলো বাক্য বের করলো,
” না কিচ্ছু তূর্য ভাই ” পরে আবার নিজেকে শুধরে নিল,
” মানে কিছু না…কিছু না তূর্য ভাই ”
” এখন কিছু না বলছিস। একটুপর আবার বান্ধবীর কাছে অভিযোগ করবি। দিস ইজ নট ফেয়ার ”
” তারিন জানতে না চাইলে বলতাম না। আমি একটু বাইরে যাই? ছাড়ুন তূর্য ভাই ”
বলে নিজের পিছনে হাত নিলো মেয়েটা। পুরুষালি হাত জোড়ার বাঁধন আলগা করতে চাইলো। অথচ, এবারে হাতের স্বাধীনতাটুকুও হারালো সে। সরু ,চিকন হাত জোড়াও এখন তূর্যের দখলে। কোমরের পিছনে ক্রস করে চে’পে ধরে আছে। হাতের ব্যালেন্স ঠিক করে হালকা করে ঝাঁকুনি দিলো তূর্য। ভড়কে গিয়ে কুঁ’কিয়ে উঠলো আহি।সে ওদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে বলল,
” আচ্ছা ,বল তো আমি তোকে তুমি কখন বলি ? না থাক! অতটা বলার দরকার নেই। শুধু বল, তুমি করে ঠিক কি কি বলি? ”
” আমার ভুল হয়ে গিয়েছে। একটু যেতে দিন।আর জীবনেও এসব বলবো না ” মেয়েটার মুখে অসহায়ত্বের ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু ,নির্দয় পুরুষটি তার কথায় দৃঢ়। মেয়েটা ছোটার পাঁয়তারা করতেই পাতলা ওড়নাটা এক কাঁধ খসে পড়ল। তূর্যের নজর পড়ল সেদিকে। তাকিয়ে একটু আ’ফসোস হলো বটে। বিউটিবোনের উপর থাকা বিউটিস্পটটা আর বিউটিস্পট নেই। দেখেই বোঝা যাচ্ছে খুব অ’ত্যাচার হয়েছে তার সাথে। ও সেদিক থেকে নজর সরিয়ে এলোমেলো দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে থাকা রমণীর দিক তাঁকালো। বলল,
” ভুল যখন হয়েছে একটু সাজা তো পেতেই হয়। এবার বলে ফেল ফাস্ট ”
আহি যেন বুঝে ফেললো এই যাত্রায় আর রক্ষে নেই তার। তাই হার মেনে নিল,
প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৬৪
” বলেন…বলেন …”
” হুম, বলি… ?” চারগুণ মনোযোগী হলো তূর্য।
” বলেন ‘ একটু আমার কথা শোনো,প্লিজ ‘ ” বলেই চোখ খিঁচে বন্ধ করে নিল মেয়েটা।
” আর ? ”
” আর কিছু না তূর্য ভাই ” বলেই এবারে তূর্যের হাতের বাঁধন ছিঁড়ে-ভুড়ে পালালো মেয়েটা। যদিও তূর্য না চাইলে সম্ভব ছিল না। সে পিছু ঘুরে হন্যে হয়ে ছুটতে থাকা রমণীকে দেখলো। কিছুক্ষণ ঠোঁ’ট কামড়ে হাসলো। অতঃপর বিড়বিড় করলো,
” স্টু’পিড! এর ল’জ্জা ভাঙবে কবে ”
