Home প্রিয় মোনালিসা প্রিয় মোনালিসা পর্ব ১৫

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ১৫

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ১৫
নীতি জাহিদ

এইচএসসি পরীক্ষা শেষ পর্যায়ে। পরশু উচ্চতর গণিত দ্বিতীয় পত্র পরীক্ষা। সব ধরনের প্রস্তুতি শেষ। এই পত্র শেষ হলেই উচ্চ মাধ্যমিকের গন্ডি পেরিয়ে যাবে। কিছু নোট আজ সংগ্রহ করেছে তাই দুজন দেখা করতে এসেছে। পরীক্ষার সময়টাতে ব্যস্ত থাকে। বাসায় মন বসছিলোনা দুজনের কারোই। তাই মোনা কলাকৌশলে চয়নকে বের করে এনেছে। দু বান্ধবী ধানমন্ডি লেকে এসেছে খেতে। এখানকার চাপ দুজন খুব পছন্দ করে সাথে পুদিনা,লেবুর শরবত যাকে ইংরেজিতে লেমন মিন্ট হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়েছে। ঠান্ডা ঠান্ডা বরফ কুচি দিয়ে খেতে বেশ লাগে। মোনা অর্ডার দিয়ে ছুটে এসে সাজেশন নিয়ে বসেছে। চয়ন ও দাগিয়ে নিচ্ছে কোনটা কোনটা বারংবার রিভিশন করতে হবে।

– ক্যালকুলাসে কোনো সমস্যা আছে?
পুরুষালী ভারী আওয়াজে দু বান্ধবী মাথা তুলে হতবাক। মোনার মুখে মিটমিট হাসি। চয়ন চমকে গিয়ে দু অধর আলগা করে ফেলেছে। কাকে দেখছে! বাক্য হারিয়ে দিশেহারা।
– অর্ডার কি নিজেদের জন্য দিয়েছেন নাকি আমার জন্য ও দেয়া হয়েছে?
মোনা লাফিয়ে উঠে ছুটে গিয়ে আরেক প্লেট অর্ডার করে আসলো। চেয়ার টেনে বসে চয়নের দিকে তাকিয়ে বলে,
– কেমন দিলাম বন্ধু? পরীক্ষার আগেই ভালো রেজাল্টের গিফট পেয়ে গিয়েছিস? আমারটা পরেই দিস।
এহসান মুখে হাসি রেখে বলে,
– ম্যাডাম চয়নিকা মুখের হা টা দয়া করে বন্ধ করুন। আপনার মুখে হাসি দেখতে সুদূর রাজশাহী থেকে সেই ভোরের ট্রেন ধরে এসেছি।
চয়ন লজ্জা পেয়ে মাথা নোয়ালো। এহসান হেসে মোনাকে বললো,

– তা শালিকা ম্যাথ সব পারেন?
মোনা চকমকে লোচনে টেনে টেনে বলে,
– ওয়াও স্যার, শালি কা আ আ?
– ইয়েস। বিয়ের পর তো আপনি আমার শালিকাই হবেন। আপাতত ছাত্রী। বলুন আপনাদের কোথায় কি সমস্যা। খেতে খেতে ওসব সলভ করে দিই।
– বিয়েও ঠিক?
– সন্দেহ আছে নাকি?
– তা থাকবে কেনো? বান্ধবী আমার এমন ভান করে যেন সে বড্ড অবুঝ তাই তো কিছু ব্যাপারে অজ্ঞ আমি।
এহসান হাসছে। মেয়েটার দুষ্টুমি আর গেলো না। মোনা উঠে দাঁড়ায়। বললো,
– আমি একটু ওদিক থেকে ঘুরে আসি। আপনারা কথা বলুন।
এহসান চোখের পলক ঝাপটে সাঁয় দিলো। চয়ন মোনার দিকে তাকাতেই মোনা ইশারা দিলো কথা বলার জন্য। ধানমন্ডি লেকের পানিতে শাপলা ফুটেছে। শাপলার দিকে তাকিয়ে স্মৃতিচারণ করছে শাপলা বিলের। ঘাড় ঘুরাতেই দেখতে পেলো পাশে একটা ছেলে মাথায় হাত দিয়ে চুপচাপ বসে আছে। মোনা বুঝার চেষ্টা করলো ছেলেটা কি করছে? চেহারায় মায়া আছে। শ্যাম বর্ণ। পানির দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে আছে। বেশ কিছুক্ষন পর খেয়াল করলো চোখ হাত দিয়ে কচলাচ্ছে। মোনা উদ্বিগ্ন হয়ে কাছে গিয়ে প্রশ্ন করলো,

– তোমার কি হয়েছে?
মোনাকে দেখে তাকিয়ে আবার মুখ ঘুরিয়ে শক্ত গলায় বললো,
– কিছুনা।
– কাঁদছো কেনো?
– কাঁদবো কেনো?
– তবে যে চোখ লাল।
– তাতে আপনার কি?
– এভাবে কথা বলছো কেনো? আমার মনে হলো তোমার মন খারাপ তাই জিজ্ঞেস করলাম।
– হুম, মন খারাপ।
কথা বাড়াচ্ছে না ছেলেটা। ধ্যান ধরে বসে আছে। মোনা পুনরায় প্রশ্ন করলো,
– স্কুল থেকে এসেছো? একা?
– হুম।
– তুমি কিন্তু অনেক কিউট।
মোনা ছেলেটার গাল টেনে দিলো। মুখ ভার করে বিরক্ত হয়ে মোনার দিকে তাকিয়ে বললো,
– গালে হাত দেয়া আমার পছন্দ নয়।
– ওকে স্যরি তোমার নাম কি?
– ইশান।
– আমি মোনা।
– সুন্দর নাম।
ইশান উঠে দাঁড়ায়। মোনা হা করে ইশানের দিকে তাকিয়ে আছে। কিভাবে মোনাকে উপেক্ষা করলো! মোনার এভাবে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা দেখে বিব্রত হয় ইশান। ইশান কাঁধে ব্যাগ নিয়ে আশপাশটা দেখছে। মুখে বিরক্তির ছাপ। মোনা উঠে দাঁড়ায়। জামা ঝেড়ে বলে,

– তোমার হাইট কত?
– পাঁচ ফিট আট।
– বয়স?
– এত কথা বলেন কেনো? জানেন না বয়স জিজ্ঞেস করতে নেই।
– কোন ক্লাসে পড়?
– ক্লাস সিক্সে।
– মাশা আল্লাহ। আমি এমনি জিজ্ঞেস করলাম। আসলে কথা বলার জন্য কাউকে খুঁজে পেলাম না তাই তোমাকে বিরক্ত করলাম।
ইশান এবার কিছুটা নমনীয় হয়ে বললো,
– আপনি একা?
– না? বান্ধবী এসেছে। এমনি হাঁটতে আসলাম। বান্ধবী কাজে ব্যস্ত।
– ওহ।
কিছু একটা ভেবে বললো,
– একটা হেল্প করবেন?
– কিহ?
– একটা ফোন করবো বাসায়।
– অবশ্যই। চলো আমার সাথে। আমার ব্যাগে ফোন আছে।
মোনাকে অনুসরণ করে ইশান পিছু পিছু এলো। চয়ন আর স্যারকে নিজেদের মাঝে আলাপ করতে দেখে মোনা হেসে বললো,

– কথা শেষ হয়েছে? আমরা কি বসতে পারি?
চয়ন এবং এহসান দুজনই অবাক হলো। সাথে করে কাকে নিয়ে এসেছে এই মেয়ে? ইশান সালাম দিলো। এহসান হাসি মুখে নিজের পাশে বসালো। মোনা ব্যাগ থেকে ফোন বের করে ইশানকে দিলো। ইশান স্কুল ব্যাগ থেকে ডায়েরী বের করে নাম্বার ডায়াল করে কল দিলো। না ধরাতে আরেকটা নাম্বারে কল দিলো।
ও পাশ থেকে প্রশ্ন করতেই সালাম দিয়ে উত্তর দিলো,
– চাচ্চু, আমি ধানমন্ডি লেকে। সোহান ভাইয়া ফোন ধরছে না। আমাকে নিয়ে যাও।
এরপর এহসানের দিকে ফোন বাড়িয়ে বললো,
– আংকেল আপনি কি এক্সেক্ট লোকেশনটা ফোনে বলতে পারবেন?
এহসান ঘটনা আন্দাজ করতে পেরে ফোনের অপরপাশের ব্যক্তিকে লোকেশন বুঝিয়ে বললো। কথা শেষে ইশান চুপ করে আছে এদিকে ওদের খাবার চলে এসেছে। ইশানকে এহসান প্রশ্ন করলো,

– বাবা কি হয়েছে বলো তো?
ইশান মলিন মুখে বললো,
– হারিয়ে গিয়েছি। বাসা চিনিনা।
– এখানে এলে কিভাবে?
– লেক চিনি। স্কুল থেকে লেক কাছে। সোহান ভাইয়ার সাথে জগিং করি এখানে৷ আমি তো দেশের বাইরে থেকে এসেছি দু বছর হলো। সব কিছু চেনা হয় নি এখনো।
এহসান কাঁধ আগলে ধরলো,
– কোনো ব্যাপার না এড্রেস দিয়েছি। দেখবে এখনি চলে আসছে নিতে তোমার চাচ্চু।
মোনা নিজের খাবার থেকে লুচি ছিড়ে কাবাব মুড়িয়ে ইশানের দিকে বাড়িয়ে বললো,
– হা করো, একটু খাও আমাদের সাথে। মুখ দেখে তো শুকনো লাগছে।
ইশান এতটা আশা করেনি। বাসার বাইরে কেউ এভাবে খাওয়ায় নি কখনো। ছলছল চোখে হেসে দিলো। হাসতে গেলে গালে খাদ পড়ে। মোনার মনে হলো এই হাসি পরিচিত। মোনার মায়া জন্মালো ছেলেটার উপর। কেউ বাড়তি প্রশ্ন করছেনা। সকলে মজা করছে। তিনটে লুচি ইশানকে খাওয়ানো শেষ। ছেলেটা কি অবলীলায় খেয়ে নিলো। মোনাও খাইয়ে দিলো। সংকোচ বিহীন এমন আচরনে চয়ন অবাক। যে মেয়েকে বাসায় বকে ধমকে খাওয়ায় সে এত বড় একটা ছেলেকে খাইয়ে দিচ্ছে।
মোনা পুনরায় আগের প্রশ্ন করলো,

– ইশান এবার তো বলো তোমার বয়স কতো?
ইশান হেসে বলে,
– নাও আম থার্টিন। অনেক লম্বা তাই না?
চয়ন এবং মোনা বললো,
– হুম
– আমার পাপা লম্বা। গত বছর ও একটু ছোট ছিলাম এই বছর বেশি লম্বা হয়েছি। ইভেন গত বছর পাপা আমাকে কোলে ও নিয়েছে। এবার নিশ্চিত লজ্জা পাবো পাপার কোলে উঠতে। এত লম্বা হয়েছি পাপা তো দেখেই নি।
এহসান হেসে বললো,
– তুমি শুধু লম্বাই নও বেশ হ্যান্ডসাম।
– আমার পাপা আরো হ্যান্ডসাম।
– তোমার পাপা কোথায়?
– এখন রোম।
রবিন লোকেশন খুঁজে বের করে ওদের টেবিলের সামনে এসে হাঁপাচ্ছে। ইশান রবিনকে দেখে জড়িয়ে ধরলো। রবিন মাথায় হাত রেখে বললো,

– চাচ্চু কোথায় হা রা লে? তোমার পাপা অস্থির হয়ে গিয়েছে। পাগল হওয়া বাকি। বারোটা থেকে খুঁজে বেড়াচ্ছি আমরা তোমাকে। পাপাকে একবার জানাও।
রবিনকে দেখে মোনার গলা শুকিয়ে গেলো। রবিন কেনো এখানে? কে এই বাচ্চা? রবিন ফোন বের করে কল দিলো। ও পাশ থেকে কল রিসিভ হতেই ইশান সালাম দিলো। তাদের ফোনালাপ নিজেদের মাঝেই সীমাবদ্ধ। ইশানের বাবা অস্থির হয়ে বললো,
– বাবা কোথায় গিয়েছিলে তুমি? বাবাকে তো আজ মে/রেই ফেলতে।
– পাপা আমি হা রি য়ে গিয়েছিলাম। পথ চিনতে পারছিলাম না। বুঝতে পারছিলাম না কোথায় যাব? লোকজনকে জিজ্ঞেস করতে করতে এখানে এসেছি। সোহান ভাইয়ার সাথে জগিং করতে আসি বলে জায়গা টা চিনি।
ইশান বেদনাদায়ক মুখে বাবাকে বললো,
– পাপা স্যরি আর কখনো এমন হবেনা। আমাকে মাফ করে দাও।
নিস্তব্ধ ও পাশ। চয়ন তাকিয়ে আছে ওদের দিকে। এহসানের মুখে হাসি। যাক ছেলেটি পরিবার ফিরে পেলো। ইমরানের গমগমে আওয়াজ,

– চোখ মোছো। কাঁদতে শিখিয়েছি?
– নো পাপা।
– গুড। কেনো গিয়েছিলে?
ইশান ঢোক গিলে বললো,
– বেশ কিছুদিন আমাকে ফোন দিয়ে ভীষণ বিরক্ত করছিলো। বার বার বলছিলো ওনার কাছে চলে যেতে। আজ আমি শক্ত করে বলে এসেছি জীবনে যেন আমাকে ফোন না দেয়। পাপা কত বড় সাহস আমাকে পাওয়ার জন্য ওই মহিলা নাকি তোমার বিরুদ্ধে কেইস করবে। তুমি দেশে আসো। আমাকে নিয়ে যাও। আমি তোমাকে ছাড়া এখানে নিরাপদ না। ওই মহিলার সাথে আরেকটা বাজে লোক ছিলো। আমাকে ওয়াইন অফার করেছে।
গাম্ভীর্যতায় পরিপূর্ণ কঠিন স্বর,
– পাপা নেক্সট মান্থ আসছি। রবিন চাচ্চুকে দাও।
রবিনকে উদ্দেশ্য করে,
– রবিন আমি আসা পর্যন্ত ইশান বাসায় থাকবে। খেয়াল রাখবে। ইশতিয়াককে বলো ইশানের প্রটোকলের ব্যবস্থা করতে।
– জ্বি স্যার। স্যার আরেকটা কথা…
লাইন কেটে গেলো। মোনার দিকে তাকিয়ে ইশান বললো,

– আন্টি আসি?
মোনা অনুভূতি বিহীন উঠে দাঁড়াতেই ইশান মোনার দিকে হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করে। এতক্ষন বাবা ছেলের কথোপকথনের শুধু ইশানের অংশই শুনেছে। ও পাশে কে কথা বলেছে বুঝতে পারছেনা। ইশানের মুখে আন্টি ডাকটাও কেমন যেন শুনালো। রবিনকে দেখে কিছুটা সন্দেহ হলো। সন্দেহ থেকে ইশানকে প্রশ্ন করলো,
– তোমার বাবার নাম কি?
ইশান দুষ্টু মিষ্টি হাসি দিয়ে বলে,
– ইমরান শরীফ খান।
রবিনের দিকে তাকাতেই রবিন হেসে বলে,
– ধন্যবাদ ম্যাডাম ইশানকে আগলে রাখার জন্য। আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।
মোনা চেয়ারে বসে পড়লো। ইশান যাওয়ার আগে কানের কাছে ফিসফিস করে বললো,
– ওয়েলকাম টু আওয়ার লাইফ।
মোনা চমকে উঠলো। ইশান মিষ্টি হাসি দিয়ে পুনরায় কানে ফিসফিসিয়ে বললো,
– আমি আপনাকে চিনি।
এহসানের সাথে কোলাকুলি করে চয়নকে ধন্যবাদ জানিয়ে চলে গেলো ইশান। রেখে গেলো হতভম্ব তিনজনকে। চয়ন মোনার দিকে তাকিয়ে বললো,
– ছেলেটা কি বললো মোনা?
এহসান অবাক দৃষ্টিতে দেখছে। মোনা জোরে শ্বাস ফেলে বললো,

– তোকে একবার তাচ্ছিল্য করে বলেছিলাম স্যার এর সাথে তোর ডিফারেন্স পনেরো বছর অনেক বেশি। কিন্তু আমি যাকে চেয়েছি তার সাথে আমার পার্থক্য প্রায় বিশ বছর।
চয়ন বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করলো,
– এটাই তোর এত দিনের সকল রোগের কারণ?
মোনা উপর নিচ মাথা ঝাঁকালো।
– এই লোকটা কালো গাড়ির ড্রাইভার না? আংকেল যেদিন আঘাত পেলো সেদিনের ঘটনা।
– হুম।
চয়ন হতচকিত হয়ে চিৎকার করে প্রশ্ন করলো,
– মোনা কোনো ভাবে ব্ল্যাক ডায়মন্ড না তো?
মোনা মুখ মাথা নেড়ে বলে,
– হুম।
চয়ন কপাল চাপড়াতে চাপড়াতে বললো,
– বাচ্চাটা?
– উনার ছেলে। আজই জানলাম।
– শেষমেশ বিবাহিত? কি করলি রে মোনা। সরে আয়।
মোনা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললো,

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ১৪

– কোথায় থেকে? আমি কখনোই জড়াই নি। সরে আসবো কি করে?
চয়ন মোনার চোখে আজ সেই দুঃখ,গ্লানি স্পষ্ট দেখতে পেলো যা বছর দুয়েক আগে নিজের মাঝে দেখেছে। যেমনই হোক অনুভূতি ভুলে যাওয়া যে কতটা দুষ্কর তা সেই দিনগুলোতে উপলব্ধি করতে পেরেছিলো। আজ বন্ধুর এই চরম দিনেও সাহায্য করতে না পারার আক্ষেপ থেকেই যাবে।

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ১৬