প্রিয় মোনালিসা পর্ব ২৪
নীতি জাহিদ
দেখতে দেখতে সপ্তাহ পেরোলো। সন্ধ্যার নাস্তা সেরে ইশান এবং মোনা দুজনই ড্রইং রুমে ক্যারাম খেলছে। সামান্তা আজ শ্বশুর বাড়ি ফিরে গিয়েছে। কদিন পর আসবে।মা ফোনে জানানোর পর হঠাৎ করেই চলে এসেছিলো মামার বিয়ের কথা শুনে। ইশান ফ্রেঞ্চ ফ্রাই খেতে বায়না ধরলে রাবিয়া ইশানের হাতে দিয়ে বললো,
– ভাইয়া, খালাম্মা কইছে মাস্টর রে আইজকা আইতে মানা কইরা দিতে।
আটটায় ইশানের ম্যাথ স্যার আসার কথা। এক্সাম চলছে। নিষেধ কেন করতে হবে? এই সময়টা স্যার না আসলে ম্যাথের ওয়ার্ড প্রবলেম নিয়ে ঝামেলা হবে। এমনিতেই জিওমেট্রি কঠিন লাগে। ইশান খেলা থেকে উঠে দাঁড়ায়। মোনার দিকে তাকিয়ে বললো,
– মা উপরে যাবে? ফুফির কাছে যাবো। স্যার সুস্থ আছে কিনা একবার জিজ্ঞেস করবো। হঠাৎ নিষেধ করতে বলছে কেনো?
মোনা মাথা ঝাকাতেই দুজন সিড়ির কাছে এলো। আইরিন সিড়ি দিয়ে নামতে নামতে বললো,
– বাবা আমি তোমার টিচারকে নিষেধ করতে চাচ্ছিলাম। কাল থেকে পড়ো। আজ তো মা একা। তোমার সামান্তা আপু নেই, চাচী আম্মু নেই। বোর লাগবে না মায়ের?
ইশান ততক্ষনে বুঝতে পারলো। তার ও মাথায় এলো যে, ইশ! কেনো যে এই কথা নিজ থেকে ভাবনায় আসেনি। জিহবায় কামড় দিয়ে বললো,
– আচ্ছা ফুফি।
তখন জোরালো স্বর কানে আসলো,
– না ইশান টিচার আসুক। আমি মায়ের কাছে আসি। তুমি পড়তে যাও। জিওমেট্রিতে তোমার প্রবলেম। রিভিশন প্রয়োজন।
বাবাকে দেখে ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরলো। বলে উঠলো,
– গুড ইভিনিং পাপা।
– গুড ইভিনিং বাচ্চা। যাও পড়তে যাও। নাস্তা করেছো?
– জ্বি পাপা।
ইমরান মাথা নেড়ে মোনার দিকে তাকিয়ে বললো,
– শুভ সন্ধ্যা মোনালিসা।
মোনা ঘাড় কাত করে সৌজন্যতামূলক হাসলো। সোফায় বসে হাল্কা নাস্তা সেরে আইরিনের সাথে কিছু ঘরোয়া আলাপ করে সিড়ি বেয়ে ইমরান উপরে চলে গেলো। আইরিন জোর করে মোনাকে ইমরানের পিছু পিছু পাঠালো। দরজার সামনে এসে মোনা দাঁড়িয়ে আছে। ভেতর থেকে দরজা আটকানো। দ্বিধা থেকে দরজা ঠকঠক করতেই ভেতর থেকে খুলে গেলো। দরজা খুলে ফোনে কথা বলতে বলতে ইমরান বারান্দায় চলে গেলো। মোনা চুপচাপ সোফার কাছে বসে আছে। এর মাঝে চয়ন ফোন করেছে। ফোন কেটে দিয়ে মেসেজ দিয়ে জানালো, পরে কথা বলবে। এক সপ্তাহে কত পরিবর্তন জীবনে। এভাবে সেভাবে দিন গুলো কেটে গেলেও এখন বাবার জন্য মন খারাপ হচ্ছে, অতীতের সব মনে পড়ছে। বারান্দায় দাঁড়ানো মানুষ টা সম্পর্কে তার স্বামী হলেও বড্ড অবহেলা করেছে। গত সাতদিনেও পরিবেশের সাথে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারেনি মোনা। ইশানের সাথে একেবারে মিশে গেলেও ইমরানের সাথে আছে ক্রোশ দূরত্ব। মোনার আবেগের বয়সটাকে অপমানে, অভিমানে, তিক্ত অভিজ্ঞতায় ভরিয়ে তুলেছে। এসব ভাবতে ভাবতে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু। আচমকা ভারিক্কি গলা শুনে মাথা তুললো,
– নাও তোমার বাবা ফোন দিয়েছে, কথা বলো।
মোনা বাবার ফোন পেয়ে খুশিতে নেচে উঠলো। ভিডিও কলে বাবাকে দেখে কেঁদে দিলো। মিনহাজ হাসছে ওপার থেকে। কেমো শুরু করার আগে মেয়ের সাথে কথা বলে নিক। এরপর কি থেকে কি হবে তাতো অজানা। মিনহাজ মেয়েকে বললো,
– আমার শাহজাদীর কি মন খারাপ?
ফুফিয়ে উঠলো মোনা। বুকের ভেতর কেমন যেন করছে। অজানা ব্যাথা। এর আগেও তো বাবা বাইরে গিয়েছে এমন তো লাগেনি। মিনহাজ মন খারাপ করে বললো,
– এভাবে কাঁদলে আর ফোন দিব না।
– না আমি আর কাঁদবোনা। কথা বলবো। বাবা কখন আসবে তুমি?
– সময় হলে আসবো মা।
মোনা কিছু একটা ভেবে বললো,
– আমাকে এখান থেকে নিয়ে যাবে?
মিনহাজ চমকে গেলো। খাটে বসা ইমরান নিষ্পলক তাকিয়ে আছে মোনার দিকে। এমনটা তো আশা করেনি। মিনহাজ স্বাভাবিক থেকে বললো,
– হ্যাঁ আমি আসলে বেড়াবে তুমি আমার কাছে দুদিন।
– না বেড়ানো না।
– তবে?
– একেবারে।
– আম্মা কি বলো এসব। এখন ওটাই তোমার বাড়ি। আল্লাহ পাপ দিবে মা।
– বাবা ফুফি কষ্ট পাচ্ছে, আমি উনার সাথে থাকলে ঝামেলা বাড়বে। জোর করে সংসার হয়না বাবা।
খাট থেকে দাঁড়িয়ে পড়েছে ইমরান। বাবা মেয়ের মাঝে আলাপ চলুক। এদের মধ্যে থেকে বাঁধা হওয়ার ইচ্ছে নেই। তার উপস্থিতিতে হয়তো নিজেদের আলোচনা বাধাপ্রাপ্ত হতে পারে। ইমরান দরজা পর্যন্ত যেতেই মোনা বলে উঠলো,
– দাঁড়ান ইমরান সাহেব।
থমকে গেলো ইমরান। মিনহাজ কলে। সে ভেবেছিলো ইমরান অনুপস্থিত। লজ্জা পেলো ভীষণ। মোনা বলে উঠলো,
– আপনার আমার প্রতি কোনো অনুভূতি নেই সেকথা বহুবার বলেছেন। বাবাকে কেনো জানান নি বিয়ের আগে? তাহলে তো বাবা জোর করে আমাদের বিয়ে দিতেন না।
মিনহাজ ফোনে মেয়েকে বুঝাতে গেলো,
– মোনা তুমি এভাবে কথা বলছো কেনো?
– কিভাবে বলছি বাবা? তুমি হয়তো জানোনা বাবা, তোমার ছোট্ট মোনার জীবনে প্রথম প্রেম আসে ইমরান সাহেবকে দেখে। তোমাদের এই ভদ্র, সভ্য ইমরান সাহেব বহুবার সমাজের খাতিরে আমাকে নাকোচ করেছে। তাতে আমার দুঃখ নেই। সবারই মান সম্মানের ভয় থাকে। তবে তিনি কি জানেন তার অপমানের ভার নিতে না পেরে আমি মোনা হাসপাতালের বেডে কটা মাস ছিলাম? তিনি কি জানেন সেই এক্সিডেন্টের দাগ আজো আমি বয়ে বেড়াচ্ছি? বাবা আমি ছটফট করেছি তোমার কাছে যেয়ে এই মানুষ টার জন্য। তুমি বুঝতে পারোনি। ঠিক কতটা অপমান করেছিলো আমায় তা যদি আমি তোমাকে বলতে পারতাম তবে তুমি কখনোই তাকে মেয়ের জামাই বানাতে না।
মিনহাজ এক্সিডেন্টের কারণ শুনে কিছুটা থমকে গেলেও পরিস্থিতি সামলে বললো,
– সবই বুঝলাম। ভুলকে তোমার বাবা চিরজীবন ভুল বলেছে। অন্যায় তোমার। নিজের বয়সের দ্বিগুন কাউকে পছন্দ করেছো। সেই মানুষটা তোমাকে দূরে সরিয়ে দেয়াটা তার বুদ্ধিমত্তা। নতুবা আজ দুজনই কলঙ্কিত হতে। তখন সম্পর্ক ঘটলে তা হতো অসম্মানজনক। ইমরান তো তোমাকে বিপদে ফেলেনি। ওটা তোমার ভাগ্য। ওর জায়গায় সৎ যেকোনো পুরুষ থাকলে তাই করতো। সেই পরিস্থিতিতে তুমি যেভাবে বলছো, ইমরান অপমান করেছে, তোমার কি মনে হয় ওর কি করা উচিত ছিলো? সে যদি অপমান না করে তোমার সাথে সায় দিয়ে এমন অন্যায় করতো তবে আই মাস্ট সে, আই মেনশনড হিম এজ পারভার্ট। অথচ এখনের সম্পর্ক আমার সম্মতিতে, আমার উপস্তিতিতে হয়েছে যা ঝকঝকে কাচের মত স্বচ্ছ। আমি ইমরানকে শ্রদ্ধা করি তার বিচক্ষণতার জন্য। তোমার উচিত স্বামীর কথা মেনে চলা, তাকে উচ্চাসনে, সর্বোচ্চ সম্মানে অধিষ্ঠিত করা। যেভাবে কথা বলছো খুবই অসম্মানজনক, অসৌজন্যমূলক।
ইসলাম বলে,
“আল্লাহ যদি উনার পরে কাউকে সিজদাহ করতে বলতেন তাহলে হয়ত স্ত্রীদেরকে তাদের স্বামীকে সিজদাহ করার অনুমতি দিতেন।”
তবে আমার শিক্ষায় কি ঘাটতি ছিলো?
মোনা কাঁদছে। বাবাও আজ এই মানুষটার পক্ষ নিলেন। মোনাকে কেউ বুঝলোনা। ইমরান কাছে এসে মোনার কাছ থেকে ফোনটা নিয়ে মিনহাজকে বললো,
– মেয়ের সাথে কথা বলবে জানালে, তাই কথা বলতে দিলাম। বকা দিতে তো দিই নি। ব্যাপারটা যেহেতু আমাদের দুজনের, আমরাই সামলে নেব ইনশাআল্লাহ। দুশ্চিন্তা করোনা মিনহাজ ভাই। বিশ্রাম নাও।
– আমি তোর শ্বশুর, ভাই কি? এতক্ষন অপেক্ষা করছিলাম তুই একবার ভাই বলবি আর তোর জ্ঞাতিগুষ্টি উদ্ধার করবো। কাল থেকে কিছু সম্বোধন করে ডাকিস নি।
– আচ্ছা আর বলবোনা। পরে কথা হবে। আমার ঘরের ব্যাপার আমি সামলে নেব।
মোনাকে রুমে কান্নারত রেখেই ইমরান ফোন নিয়ে বারান্দায় যেয়ে বললো,
– ওর এক্সিডেন্ট আমার জন্য হয়েছিলো তা তুমি জানতে?
– না আজ জানলাম। জানলে সেদিন তোকে খু*ন করতাম, বিয়ে না দিয়ে। মেয়েকে বুঝ দিচ্ছি। কিন্তু কি এমন করেছিস যে আমার মেয়ে ম*রতে বসেছে।
– দেখছি আমি। অনেক রাগ তোমার মেয়ের আমার উপর। দেখি কতটুকু মান ভাঙাতে পারি। রাখছি। চিন্তা করোনা।
– আব্বা ডাক।
– কিসব বলো? সুস্থ হয়ে এসো ডাকবো ইনশাআল্লাহ।
– নয়নকে মিস করছি। ও থাকলে ঠিকই তোর মুখ থেকে আব্বা ডাক বের করতো। সাথে দু লাইন কালা মানিক নিয়ে গান ও গেয়ে দিত।
ইমরান এবং মিনহাজ দুজনই হেসে দিলো। কিছু মুহুর্ত প্রকৃতপক্ষে সুন্দর, অতুলনীয়। একবার হা রালে আর ফিরে আসেনা।
নিরবে আকাশের দিকে তাকিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। এক্সিডেন্টের কারণ ইমরান ছিলো! আগে ব্যাপারটা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। নয়ন জানিয়েছে মোনার এক্সিডেন্ট হয়েছে, ইমরান দায়ী তা কেনো জানায় নি? ঘটনা জানতে হবে।
নিরবে নিভৃতে মোনার পাশে এসে বসলো। মেয়েটা চুপচাপ চোখের পানি ফেলছে। তুলতুলে নরম মেয়েলী ডান হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিলো। অর্ধাঙ্গীনির কষ্ট কমাতে পারবে না এতটুকু সহজে উপলব্ধি করতে পারছে তবে কষ্টের ভাগীদার হয়ে নাহয় মেয়েটার মুখে হাসি ফুটানো হোক। ধীর গলায় ভেবে প্রশ্ন করলো,
– এক্সিডেন্ট কখন হয়েছিলো?
টুপটুপ করে মোটা অশ্রু পড়ছে ইমরানের হাতে৷ অপেক্ষা করছে মোনার মুখ থেকে বেরিয়ে আসা প্রতিউত্তরের। নাক টানছে মোনা। নিষ্পলক তাকিয়ে আছে ইমরান। টেবিলের উপর থেকে ফোন নিয়ে নয়নকে কল দিয়ে ফোন লাউডে রাখলো।
– আসসালামু আলাইকুম।
– ওয়ালাইকুমুস সালাম। নয়ন স্পষ্ট উত্তর দিবি। মোনালিসার এক্সিডেন্ট কখন হয়েছে?
পুরোপুরি নিস্তব্ধতা গ্রাস করেছে চারপাশে। নয়ন ক্ষনিক বাদে উত্তর দিলো,
– তুই যেদিন ফোনে অপমান করে বলেছিলি ওর প্রতি কোনো ইন্টারেস্ট নেই, তামান্নার বিয়ের দিনের ঝামেলার প্রসঙ্গ উঠিয়েছিলি সেদিন। তোর কথা নিতে না পেরে পাগলের মত অফিস থেকে ছুটে নেমেছিলো। আমি নিচে ছিলাম। রাস্তা ক্রস করতে গিয়ে একটা গাড়ি এসে প্রচন্ড জোরে ধাক্কা দেয়। ছিটকে পড়ে রাস্তার আইল্যান্ডের উপর। মাথায়, বুকে এবং পেটের কাছে গভীর করে সেই কাটা দাগ গুলো পড়ে আছে। এখনো সেই কাটা দাগ বয়ে বেড়ায়। তোকে তো ছবি দিয়েছিলাম। যদিও যখন ছবি দিয়েছি বুঝার উপায় ছিলোনা আঘাত কোথায় লেগেছে। মিনহাজ ভাইয়ের ফোন থেকে যে ছবিগুলো তোর ফোনে পাঠিয়েছিলো সেগুলো ওর এক্সিডেন্টেরই ঘা। সেদিন মিথ্যা বলেছিলাম আগের ক্ষত বলে। কি করেছিস নিজেই দেখে নিস। যদি সেই অধিকার টুকু আমার মেয়েটা তোকে দেয়? রাখছি।
সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলো। জমে প্রস্তরের মত অনড় হয়ে আছে। ভেতরে কি চলছে। নয়নের পাঠানো প্রতিটি ছবি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছে। এতটাই রক্তাক্ত ছিলো চেনার উপায় ছিলোনা। মুখমন্ডল জুড়ে লোহিত রক্তের ধারা সেদিন চুইয়ে পড়েছিলো। সেই ভিডিও দেখে নিজেই স্বাভাবিক ছিলোনা। সে রাতের কথা ইমরানের স্মৃতির পাতায় স্পষ্ট মনে আছে। নয়ন বেশ কয়েক বছর পর অকস্মাৎ একদিন ছবি আর ভিডিও গুলো ইমরানকে রাতে পাঠায়। অফিস থেকেই ক্লান্ত হয়ে ফিরেছে। জানালার পাশে লাইট জালিয়ে বসেই ছবি গুলো দেখছিলো। এসব ছবি দেখে নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলো। এরপর কিছুই মনে নেই।
হাতের উপরিভাগ মোনার চোখের জলে একদম ভিজে ছুপছুপা। হাঁটুগেড়ে বসলো মোনার পায়ের কাছে। দুহাত জড়িয়ে ধরে বললো,
– নিজের ক্ষতি করে আমাকে অপরাধী বানালে? সত্যি কি আমি দোষী ছিলাম? সেদিন কথাগুলো না বললে তো জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় গুলো আমার নামে নষ্ট করতে। সব ভাবে বুঝানোর চেষ্টা করেছি। কেনো বুঝোনি আগে, তোমাকে আমি সেভাবে নিজের করে সম্মান দিতে পারতাম না। এর চেয়ে জঘন্য ভাবে আমি কোনো মেয়েকে অপমান করিনি মোনালিসা। তোমাকে এভাবে কথা শুনাতে আমার খারাপ লাগেনি ভেবেছো? সোসাইটি আমাদের মেনে নিতোনা। আর কিভাবে বুঝাতাম,কি উপায়ে বুঝাতাম আমি তোমাকে? জীবনের এই সন্ধিক্ষণে এসে আমি নিজের কাছেই বড্ড অপরাধী হয়ে গেলাম মোনা। মাফ চাওয়ার ভাষা নেই।
মোনা উঠে দাঁড়ায়। রুম থেকে বেরুনোর জন্য পা বাড়ালে ইমরান এক ঝটকায় নিজের কাছে টেনে এনে বলে,
– দেখাও আমার অপরাধের চিহ্ন গুলো।
রেগে মোনা তিক্ত গলায় বললো,
– দিলাম না সেই অধিকার।
মোনা বেরিয়ে যাবার পর মনে হলো বুকের মাঝখানে কেউ ধারলো অস্ত্র বসিয়ে দিয়েছে। সবসময় দোষী ইমরান কেনো হয়? সব দোষের দায় তাকেই কেনো নিতে হবে? নয়ন সব জানিয়েছে। এক্সিডেন্ট হয়েছে তা জানিয়েছে। অথচ কারণ টা যে ইমরান ছিলো তা কেনো জানায় নি এতদিন। তাহলে সেদিন বিয়ে করার আগে আলাদা ভাবে মাফ চেয়ে নিত। বিয়েতে মত না দিলে মিনহাজ ভাইকে বুঝিয়ে বিয়েটাই করতো না। এত বড় দায় মাথায় নিয়ে ঘুরবে? সচরাচর কাউকে এভাবে আঘাত করে নি যে কেউ ম*রতে বসবে? অথচ এমন একজনকে আঘাত করলো যাকে সবার চেয়ে আড়ালে রেখেছিলো তারই ভালোর কথা ভেবে। মাঝে মাঝে প্রকৃতি ও প্রতিকূলে চলে যায়।
ইশানের রুমের দরজায় হালকা টোকা দিলো। ইশান দরজা খুলে মোনাকে দেখে প্রাণবন্ত হাসি দিয়ে ভেতরে আসতে বললো। পড়ার টেবিলে ছিলো ইশান। বইটা রেখে খাটে বসলো মোনার সাথে। গালে কান্নার দাগ দেখে বললো,
– পাপার সাথে ঝগড়া হয়েছে?
মোনা উপর নিচ মাথা নাড়ে। ইশান হেসে বলে,
– আমার পাপা যে ঝগড়া করতে জানে তাই তো জানতাম না।
ওড়নায় চোখ মুছে মোনা বললো,
– কেনো মনে হলো তোমার পাপা ঝগড়া করতে পারে না?
– পাপা তো কথাই কম বলে, ঝগড়া করতে হলে কথা অনেক বেশি বলতে হয়, লজিক দেখাতে হয়। অন্যদিকে পাপাকে বেশিক্ষন কথা বলতে দিলে দেখবে পাপা টপিক ছাড়া কথা বলতে পারেনা। টপিক নিয়ে পাপার যেকোনো বিষয়ে কথা বলা জোস। কিন্তু টপিক ছাড়া পাপা চুপচাপ শুনতে পছন্দ করে। এনিওয়ে তুমি কি চা,কফি কিছু খাবে?
– নাহ।
– আহা মা। মন খারাপ করোনা তো। সারাদিন তুমি অনেক খুশি ছিলে রাতটাকে এভাবে স্পয়েল করোনা। ছাদে যাবে?
মোনা মাথা ঝাঁকাতেই ইশান মোনার হাত ধরে টেনে উঠালো। দুজন মিলে ছাদের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো। ঝিরিঝিরি বাতাস। মোনার গায়ে চাদর ছিলো এরপর ও ঠান্ডা লাগছে। এর মাঝে দুটো হাঁচি সাড়া হলো। ইশান নিজের গায়ের হুডি খুলে বললো,
– তুমি কি আমাদের বাপ বেটার খেয়াল রাখবে মা বলোতো! উলটা তোমাকে দেখে দেখে রাখতে হবে। নাও হুডিটা পরে এর উপর চাদর পরো। এজমা আছে তোমার?
মোনা হেসে বললো,
– মাঝে মাঝে। আমার হুডি লাগবেনা।
– প্লিজ পরো।
– তোমার ঠান্ডা লাগবে যে।
– হুডিটা এতই গরম যে চাদর তোমার লাগবেনা। ওটা আমায় দাও।
মোনা ইশানকে চাদর দিয়ে ছাদের কর্ণারে এসে দাঁড়ায়। ইশান আকাশের দিকে তাকিয়ে বললো,
– মা জানো আজ আমি আমার জীবনের সেরা একটি দিন কাটিয়েছি।
– কেনো?
– আমার বয়স আঠারো। এই আঠারো বছরে আমি কাউকে মা বলে ডাকতে পারিনি। তুমি হয়তো খেয়াল করোনি আজ তোমাকে সারাদিন মা মা করেছি। আমি তোমার সাথে সহজ হতে পারলেও তুমি সহজ হওনি। স্বাভাবিক হতে পারছোনা। স্বামীর প্রথম পক্ষের সন্তানকে কেউই নিজের সন্তান ভাববেনা। ইভেন আমার জায়গায় অন্য কেউ হলেও তোমায় মা ডাকতোনা। কিন্তু জানো তো, আমার মা ডাকার বড্ড লোভ। আমি মিসেস কাকনকে মা চাইলেই ডাকতে পারতাম তবে প্রশ্ন হলো ডাকিনি কেনো?
মোনা অবাক চোখে প্রশ্ন করলো,
– কেনো ডাকো নি?
– তুমি কদিন পেয়েছিলে তোমার মাকে?
– চার বছর।
– তার মানে জানো মায়েরা কেমন হয়?
– হুম
– আমার কল্পনায় মায়েরা সন্তানদের কোলে নেয়, আদর করে খাইয়ে দেয়, গল্প শুনায়, গোসল করায়, দুষ্টুমি করলে বকুনি দেয়,পিট্টি লাগায়, ঘুরতে নিয়ে যায় এরচেয়ে বড় কথা মায়ের শরীরে মা মা গন্ধ থাকে। আমি তো এসব কিছুই পাই নি মিসেস কাকন থেকে তবে সে আমার মা হলো কি করে? বায়োলজিক্যাল মা তো যে কেউ হতে পারে। দেখোনা রাস্তায়,ফুটপাতে কত বাচ্চা। কিন্তু মায়ের মত মা কজন হতে পারে? আমি যখন ছোট থাকতে মিসেস কাকনের সাথে একবার দেখা করেছিলাম তার কোলে যেতে চেয়েছিলাম আমাকে কোলে নেয় নি। তখন আমার বয়স পাঁচ। ইতালি যাওয়ার আগে। কষ্ট পেয়েছিলাম। কোলে না নেয়ার কারণ ছিলো ছোট মানুষ সাজ পোশাক নষ্ট করে ফেলি যদি। এরপর তার পাশে বসিয়ে চামচ দিয়ে খেতে দিয়েছিলো রেস্টুরেন্টে। আমি লুকিয়ে তার গন্ধ শুকেছিলাম, মা বিশ্বাস করো উদ্ভট পারফিউমের গন্ধে আমি ওখানে বসে হাঁচি দিতে দিতে অসুস্থ হয়ে পড়েছি। বলো ওই মহিলা মা হওয়ার যোগ্য?
মোনা ইশানের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে শুনতে কখন যে চোখ থেকে গড়িয়ে পানি পড়ছে খেয়ালই করেনি। ইশান মোনার চোখের পানি মুছে বললো,
– প্রশ্ন করো তোমাকে কেনো মা ডাকলাম?
– কেনো?
– প্রথম তোমাকে মা ভেবেছিলাম প্রায় চার বছর আগে। পাপার পেছনে ঘুরে ঘুরে গোয়েন্দা গিরি করে। পাপার ফোনে তোমার ছবি দেখেছি। পাপা পরিবারের বাইরে কোনো মেয়ের ছবি ফোনে রাখেনা। তোমার ছবি দেখে সন্দেহ হলো।
– আমার ছবি?
– হুম পাপার ফোনে প্রথমে গ্যালারিতে থাকতো। এরপর এপস লকে।
মোনা বেশ অবাক হলো। ইমরানের ফোনে মোনার ছবি! কেনো ছিলো? ইশান পুনরায় বলে উঠলো,
– আমার আরো একজন বেস্টফ্রেন্ড আছে। সিক্রেট হোল্ডার। যদি বলো কাউকে বলবেনা তবে তার নাম বলবো। প্রমিজ?
মোনা ভ্রু কুচকে হেসে বললো,
– প্রমিজ।
– নয়ন চাচ্চু। উনাকে তোমার ছবিটা পাঠাতেই উনি বললো তুমি পাপার পছন্দের মানুষ। তবে এটা যেন টপ সিক্রেটই থাকে। জানো মা তোমাকে ছবিতে প্রথমে খুন মন খারাপ হয়েছে। স্টেপ মাদার সম্পর্কে সবার বলা কথা গুলো মনে গেঁথে গিয়েছিলো। কেঁদেছিলাম সেদিন সারা রাত এই ভেবে যে পাপা আমার থেকে দূরে সরে যাবে? তবে তোমাকে দেখে আমার পছন্দ হয়েছে। তুমি একটা সবুজ শাড়ি পরা ছিলে। হয়তো কোনো অনুষ্ঠানে গিয়েছিলে। এরপর দ্বিতীয় বার দেখলাম রবীন্দ্র সরোবরে। আমাকে তুমি সেদিন নিজ হাতে খাওয়ালে। সেদিন বাসায় এসে নয়ন চাচ্চুকে ফোন দিয়ে কেঁদেছি। বলেছিলাম মা হিসেবে আমার তোমাকেই চাই। চাচ্চু বলেছিলো পাপা রাজি হবেনা। এটাও জানালো তুমি চাচ্চুর ভাগ্নি। আমি তো অবাক হলাম তুমি মিনহাজ আংকেলের মেয়ে শুনে। চাচ্চু বললো পাপা যদি কখনো রাজি হয় তবে আমি যেন দ্বিমত না করি। সেদিনের পর থেকে প্রতিদিন দোয়া করতাম। এরপর তো তোমার সাথে আমি লুকিয়ে চুরিয়ে যোগাযোগ করি। তুমি তো অনেক কিছুই জানলে কিন্তু এটা জানলে না আমার মা নেই। এখন তোমাকে আমার হুডি দিয়েছি কেনো জানো?
– কেনো?
– তোমার চাদর পরার লোভ সামলাতে পারিনি। কেমন মায়ের মত উম। আমার একটা মা ভীষণ লাগতো। আমার কাছে সব আছে শুধু ছিলোনা মা। এখন সব আছে। তুমি এডজাস্ট করতে সময় নেবে নাও। কিন্তু আমাকে একটু এঞ্জয় করতে দাও প্লিজ।
মোনা দু হাত বাড়িয়ে দিলো। ইশান এক কদম পিছিয়ে গিয়ে বললো,
– আমি কিন্তু ছোট নেই মা। এডাল্ট। সবার সামনে ধরো। আগে ছেলে হিসেবে পুরোপুরি মেনে নাও আমাকে। যেন বাড়ির প্রত্যেকটা মানুষ বিশ্বাস করে ইশান মোনার সন্তান।
ইশান কাঁদছে আর হাসছে। মোনা কাঁদছে। ইশানের পাপা যেমন তেমন ইশান ছেলে হিসেবে শ্রেষ্ঠ। এত সুন্দর তার শিক্ষা। হয়তো বাস্তবতা থেকে শিখেই ছেলেটা এতটা বুঝদার। ইশান নিজের চোখ মুছে, মোনার চোখ মুছে দিলো। আচানক বললো,
– মা কেমন একটা আওয়াজ হচ্ছেনা।
– হ্যাঁ কেমন যেন পানির আওয়াজ।
– এসো তো। ছাদের দক্ষিন পাশটাতে গিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে দেখে সুইমিংপুলে ইমরান সাতরাচ্ছে।
ইশান চিৎকার দিয়ে উঠলো পাপা বলে। মোনা হকচকিয়ে গেলো। ছুটলো সিড়ির দিকে। মোনাও পিছু ছুটলো। পুরো বাড়ি চেঁচিয়ে মাথায় তুলে ফেলেছে ছেলে,
– ফুফি,চাচ্চু তোমরা দেখোনি পাপা পুলে নেমেছে।
নয়ন এসেছে বেশ কিছুক্ষন। ইমরানের সাথে ফোনে কথা হবার পর মিনহাজ ফোন করে দুশ্চিন্তা করছে। তাই নয়ন ছুটে এসেছে। ইশানের চিৎকারে সকলে ভয় পেয়ে গেলো। ওর পেছন পেছন ছুটলো বাকিরা। পুলের সামনে গিয়ে ইশান চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। ছেলের চিৎকার শুনে মাথা তুলে ছেলেকে দেখে কাছে এগিয়ে এলো। পানির ভেতর ডুবে থাকা পুরনো বদ অভ্যাস। যখন কষ্ট বেশি পায় এই কাজটা সবচেয়ে বেশি করে। পারিবারিক ডাক্তার বেশ কয়েকবার বারণ করেছে এই কাজ না করতে। আজ আবারো একই কাজ করছে। আগে যখন কষ্ট পেত এভাবে পানিতে ডুবে থাকতো। নিউমোনিয়া হলো, এজমা এখন নিয়মিত সঙ্গী এরপরো এই অভ্যাস গেলো না। পুরো বাড়ির সবাই পেছনে দাঁড়িয়ে। ছেলের হাতে তোয়ালে। পানি থেকে উঠে ছেলে থেকে তোয়ালে নিয়ে বললো,
– কি হয়েছে পাপা, এনি প্রবলেম? সবাই এখানে কেনো?
আইরিন ধমকে বললো,
– তুই বাংলাদেশ আসার আগেই তো ডাক্তার দেখিয়েছিস। এজমার সমস্যা কি একেবারে চলে গিয়েছে? শীত আসি আসি করছে। একবার যদি সমস্যা বাড়ে নেবুলাইজার সাথে নিয়ে ঘুরতে হবে। এই বরফ পানিতে কি সুখে সাতরাচ্ছিস? মাঝে মাঝে কোন ধরনের পাগলামি করিস ইমন?
মাথা মুছে মুখ মুছে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে কপালে চুমু দিয়ে বললো,
– এত দুশ্চিন্তা পাপার জন্য। কিচ্ছু হয়নি। মনে হলো একটু সুইমিং করলে ভালো লাগবে তাই পুলে নেমেছি। চলো উপরে। নয়ন কখন এলি? বাকিরা যাও খাবার রেডি করো। একসাথে খাবো। আপা তুমিও ইশান হলে?
– দুশ্চিন্তা হয়না? এত রাতে পুলে কি?
– পুল তো সুইমিং এর জন্যই।
নয়ন বলে উঠলো,
– তুই মনে হয় ভুলে যাচ্ছিস তোর মেডিকেল হিস্ট্রি…
ইমরান চোখ রাঙাতেই নয়ন থেমে গেলো।
আইরিন বিরক্ত নিয়ে নাক মুখ কুচকে বললো,
– তোর মনোরঞ্জনের জন্যই নেমেছিস জানলে তো এভাবে ছুটে এসে নিজের হাঁটু ব্যাথা টা বাড়াতাম না।
নয়ন কথা কেড়ে নিয়ে বললো,
– উলটা হোটেল থেকে তিন চারজন ওয়েটার আনিয়ে বারবি কিউ পার্টি লাগিয়ে দিতাম। তুই সুইমিং পুলে দাঁপিয়ে বেড়াতি আর নাচতি। আমরা বারবি কিউ খেতে খেতে বলতাম,
নাচ মেরি বুলবুল কি পেয়সা মিলে গা
কাহা কাদারদান হাম্যে এয়সা মিলে গা।
ভাই-বোন,তাদের বউ, সোহান,ইশান এবং নিজের সদ্য বিবাহিত স্ত্রীর সামনে এমন অপমানে ইমরান চক্ষু রক্তিম বর্ণ করে বললো,
– বিহেইভ নয়ন। এখানে বাচ্চারা আছে। বাড়ির আরো লোকজন আছে।
নয়ন মুখ ভেঙচি দিয়ে আইরিনকে বললো,
– আপা ক্ষুধা পেয়েছে ভেতরে এসো তো। ইশান, সোহান, মোনা বাচ্চারা ভেতরে আসো। স্যরি আংকেল তোমাদের জন্য ফরমুলা মিল্ক আনতে ভুলে গিয়েছি। আপাতত চকলেট দিয়ে চালিয়ে নাও, চকলেট এনেছি।
কিভাবে ইমরানকে নাস্তানাবুদ করতে হয় তা নয়নের একমাত্র জানা।
সকলের বাড়ির ভেতর গেলেও আইরিন চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। ইমরান বোনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বললো,
প্রিয় মোনালিসা পর্ব ২৩
– আপা যাও নি কেনো?
– মোনার সাথে সহজ হচ্ছিস না কেনো?
বোনকে এড়িয়ে ইমরান সামনে আগাতে আগাতে বললো,
– ওসব নিয়ে পরে কথা বলবো। আমাকে সময় দাও।
পেছনের সিড়ি দিয়ে সরাসরি নিজের রুমে চলে গেলো। সামনে দিয়ে গেলে পুনরায় নয়নের কোন কথার মারপ্যাঁচে পড়বে তার ঠিক নেই। যতই নিজেকে পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নিতে চাইছে ততই যেন ব্যাপারটা আরো ঘোলাটে আকার ধারণ করছে।
