প্রিয় মোনালিসা পর্ব ২৬
নীতি জাহিদ
চুপচাপ রেডি হয়ে বসে আছে প্রেয়সীর জন্য। ম্যাডাম তৈরি হচ্ছে। গতকাল রাতে তাকে রাজি করাতে বেগ পেতে হয়েছে দুজনের। ইমরান বেশি কথা বলে নি। নয়নই রাজি করিয়েছি তবে ম্যাডামের শর্তের ভান্ডার শুনে যে কর্তামশাই খুশী হন নি তা চেহারা দেখলেই বুঝা যায়। নয়নই গতরাতে কামরাতে ডেকে আনে প্রথমে। সোফায় বসে আছে নির্জনতাকে আপন করে। নয়ন সামনে এসে বসে বললো,
– মোনা তোর সাথে কিছু কথা ছিলো।
মাথা ঝেঁকে সায় দিতেই পুরো ঘটনা খুলে বললো। প্রথমে শক্তপোক্ত ভাবে নাকোচ করে দিলো। ইমরান দূরে বারান্দায় ছিলো। প্রতিটি বাক্য,শব্দ জানালা খোলা থাকায় স্পষ্ট বারান্দায় শোনা যাচ্ছিলো। হাতের সিগারেটটা ফেলে ত্রস্ত পায়ে রুমে এসে মোনা বরাবর বসলো। নয়নের সামনেই অনুরোধ করে বললো,
– মোনালিসা আমাকে ন্যায়-অন্যায়ের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর অনেক সময় আছে। তবে যে প্রজেক্ট টা হাতে নিয়েছি তা তোমাকে ছাড়া অসম্ভব। আইরিন আপাকে শাড়ি পরতে দেখেছি কিন্তু আপা এই কাজের জন্য রাজি হবে না। তোমাকে আমি যতবারই দেখেছি জামদানিতে দেখেছি। তুমি যেভাবে জামদানী আঁকড়ে ধরেছো আমার মনে হয়না এত গভীরে যেয়ে কেউ উপলব্ধি করবে।
নয়ন মুচকি মুচকি হাসছে। কথার মাঝে ইমরান চোখ রাঙাচ্ছে। এদিকে মোনার মাথা নত। নয়নের মনে হলো মোনাকে ইমরান নিজেই বুঝিয়ে নিক। উঠে গেলো ফোন আসার বাহানাতে। ইমরান আরেকটু কাছে এসে বললো,
– তোমার বাবাই বললো তোমাকে এই দায়িত্ব দিতে। এর পরিবর্তে শাস্তির পরিমাণটা আমার জন্য বাড়িয়ে রেখো প্রতিনিয়ত।
বাবার কথা শুনে কিছুটা নরম হলো মোনা। একদম সরাসরি বললো,
– আমার শর্ত আছে।
শর্তের কথা শুনে নয়ন এগিয়ে এলো। ভ্রু কুচকে বললো,
– কিসের শর্ত?
মোনা প্রতিউত্তর দিলো,
– আমি অফিসে ভার্সিটি শেষ করে বসবো, পুরো প্রজেক্টে কাজ করবো আমার সর্বোচ্চ টা দিয়ে তবে মোনাশা ইকবাল হয়ে। কখনোই আমাকে মি. ইমরান শরীফ খানের মিসেস হিসেবে কেউ চিনবেনা। কারণ উনি নিজেই আমাকে স্ত্রী হিসেবে মন থেকে মেনে নেন নি।
নয়ন একটু রেগেই বললো,
– এটা কেমন কথা। সব কিছুর লিমিট আছে মোনা। অফিসে কি তুমি অবিবাহিত হয়ে ঘুরবে নাকি! মিনহাজ ভাই নেই। আমি যতক্ষন থাকি ভালো। নিরাপত্তার একটা ব্যাপার আছে। ইমরানের কথা জানলে সকলের মাঝে শ্রদ্ধা আর ভয় কাজ করবে।
– আমার শ্রদ্ধা আমি অর্জন করতে পারবো। মামী কি তোমার পরিচয়ে ঘুরে?
– আমি ওভাবে বলিনি মা। আমি বুঝাতে চাইছি তুমি ছোট…
কথা কেড়ে নিয়ে কাট কাট উত্তর দিলো,
– তাতে কি, এমনিতেই তো সবাই বুঝবে বাবার ফেভারে যাচ্ছি। বাবার এমন অফিস আছে বলেই তো আমি অগ্রাধিকার পাচ্ছি তাহলে আর এই পরিচয়ের প্রয়োজন নেই।
নয়ন আর মোনার মাঝে হালকা স্নায়ুযুদ্ধ চলছে। ইমরান দুজনকে থামিয়ে বললো,
– ঠিক আছে আমার সমস্যা নেই। তোমার মতামতের উপর অবশ্যই গুরুত্ব দেয়া হবে। তুমি যেভাবে চাইছো তাই হবে।
– ধন্যবাদ।
নয়ন চিন্তিত মুখ করে বেরিয়ে গেলো। ইমরান আশ্বাস দিলো সে সবসময় তৎপর থাকবে। মোনার অভিসন্ধি ইমরানের কাছে স্পষ্ট। ইমরান যেই পরিচয় দিতে নারাজ ছিলো, নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেনি আজ মোনা সেই পরিচয়ে নিজ থেকে পরিচিত হতে অসম্মতি জানালো।
রুমে জিনিসপত্র নাড়ার শব্দে রাতের ভাবনা থেকে বেরিয়ে এলো। ইশান বেরিয়েছে সকাল আটটায়। মোনা রুমে ঢুকে ইমরানকে প্রস্তুত দেখে বললো,
– বসে আছেন কেনো? আমি আপনার সাথে যাচ্ছিনা। বাবার গাড়ি আসলে ওটাতে যাবো। অফিস টাইম নয়টায় জানি। আমি সাড়ে নয়টায় অফিসে থাকবো। প্রথম দিন একটু দেরি হবে।
ইমরান মুখে একটি শব্দ উচ্চারণ না করে মাথা ঝেঁকে উঠে গেলো। সিড়ি দিয়ে নামতে নামতে ভাবছে, মেয়েটা এভাবেই কষ্ট দিবে! অন্যমনস্ক হয়ে বেরিয়ে গেলো। গ্যারেজের সামনে দাঁড়িয়ে আছে গাড়ির জন্য। রবিন গাড়ি বের করছে। দূর থেকে বারান্দার দিকে তাকিয়ে দেখলো মোনা গাছে পানি দিচ্ছে। ভেতর থেকে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে গেলো। গাড়িতে বসে গুরুত্বপূর্ণ কল রিসিভ করলো৷ লক স্ক্রিনে ইশানের ছবি। ইশান বাবার ফোনে গতকাল বাবা-মায়ের বিয়ের দিনের ছবি পাঠিয়েছে। তা স্ক্রিনে সেট করা। ছবিটির দিকে তাকিয়ে এক দৃষ্টিতে ভাবছে,
– যদি তুমি জানতে মোনালিসা, কত রাত নির্ঘুম কাটিয়েছি তোমায় দেখে তবে তুমি বাকী জীবনের প্রতিটি রাত আমার নামে করে দিতে।
সঠিক সাড়ে নয়টায় নয়নের সাথে মোনা অফিসে ঢুকেছে। বেশ কিছু মাস পর অফিসে আসাতে সকলে মোনাকে দেখে খুশি হলো। তবে মোনা ওর প্রিয় সাদাফ ভাইয়াদের দলটাতে আগের মত উচ্ছ্বাস পেলো না। তামান্না আপু এবং চৈতি আপু এগিয়ে এসে ধরলেও রিমি আপু হালকা হাসি দিলো। বেশ দূর থেকে। বাকিরা সাদর সম্ভাষণ জানালো। বুঝালো কাজ শেষ করে আসছে। নয়ন মোনাকে নিয়ে ইমরানের কক্ষে ঢুকতেই ইমরান মনোযোগ দিয়ে একবার দেখে চোখ সরিয়ে ফেললো। বাসন্তী রঙা জামদানী পরেছে, সাথে পরেছে কমলা রঙা চাঁদর। আজ বেশ বড় লাগছে। হিজাব পেঁচিয়েছে। চলনে আভিজাত্য ফুটে উঠেছে। মামা- ভাগ্নী দুজনই বসলো। ইমরান দুজনের জন্য কফি অর্ডার করলো। এরপর মূল কথা বললো,
– আমরা এখান থেকে রূপগঞ্জ যাচ্ছি। তাঁতীর সাথে আমার কথা হয়েছে। অনেক কিছুই বুঝেছি বাকি টুকু ওখানে গিয়ে মোনালিসা বুঝে নিবে।
কফি খাওয়া শেষে তিনজন বেরিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। এমন সময় রিমি প্রবেশ করলো। রিমির হাতে জামদানী শাড়ির প্রজেক্টের একটা ফাইল। ইমরান ফাইলটা দেখে মোনার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,
– চেক করোতো ঠিক আছে কিনা?
মোনা ফাইল হাতে নিতেই রিমির চেহারা বিমর্ষ হলো। মোনা কেনো চেক করবে? মোনা ডিটেইলস দেখে বললো,
– এখানে শুধু ৪০ কাউন্ট এবং ৬০ কাউন্টের বিবরণ ও লিস্ট আছে।
– আর কি কি লাগবে?
– ৮০,৮৪,১০০, ১২০ কাউন্ট। এছাড়া হাফ সিল্ক,কটন,এবং ফুল সিল্কের ডিটেইলস লাগবে।
ইমরান রিমির দিকে তাকিয়ে বললো,
– শুনেছেন এগুলোর ডিটেইলস ও লাগবে।
রিমি চুপচাপ মাথা দুলালেও প্রশ্ন করলো,
– স্যার আপনারা কি বের হবেন?
ইমরান এমন প্রশ্নে বিরক্ত হলো। কড়া উত্তর দিবে ভেবেছিলো কিন্তু নয়ন উত্তর দিলো,
– হ্যাঁ কেনো কাজ আছে?
– না কিন্তু মোনা আসলো তো অফিসে তাই ভাবলাম।
– মোনা আমাদের সাথেই যাচ্ছে। বাইরে যান আসছি আমরা। গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে সকলের সাথে।
রিমির অপমানে লাগলো বেশ। মুখ ফুলিয়েই বেরিয়ে গেলো। প্রতিটি মুহুর্ত পর্যবেক্ষন করলো মোনা। বেরিয়ে এসে ইমরান সকলকে জানান দিলো,
– মোনাশা ইকবাল আজ থেকে মিনহাজ ইকবালের অবর্তমানে অফিসে বসবে এবং জামদানী প্রজেক্টের হেড হিসেবে কাজ করবে। জামদানীর ব্যাপারে মোনার দক্ষতা অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি।
মেয়েদের মাঝে অনেকে এর সাথে একাত্বতা প্রকাশ করেছে কারণ এরা প্রত্যেকে জানে মোনার শাড়ির প্রতি ঝোঁক বেশি এবং বেশির সময় মোনাকে জামদানীতেই দেখা গিয়েছে। যেমন আজো বাসন্তী জামদানীতে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে। নিজেই যেখানে নিজের প্রোডাক্টের এম্বাসেডর হিসেবে কাজ করছে।
রূপগঞ্জের রাস্তা কাদা মাখা। নারায়ণগঞ্জ জেলার একটি উপজেলা এই রূপগঞ্জ। তাঁতীদের বাসস্থান, পল্লী, কারখানা সব এখানে৷ ভৌগোলিক পরিবেশের জন্যই এখানে তাঁত পল্লী গড়ে উঠেছে। জমির আইল ধরে হাঁটতে হচ্ছে। এত ভেতরের রাস্তায় গাড়ি আসেনা। হিল জুতা খুলে হাতে নিলো। ইমরান হাত বাড়িয়ে দিলো শক্ত করে ধরার জন্য। মোনা ধরলো না। নিজের মত করে হাঁটছে। দিন যত চাচ্ছে মোনার প্রতিটি উপেক্ষা ইমরানের জন্য কষ্টকর হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
তাঁতীর বাসায় ঢুকে মোনা বেশ কিছুক্ষন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব তথ্য জেনে নিলো। কিছু জামদানী কিনে নিলো স্যাম্পল হিসেবে। সবাইকে বুঝানোর উদ্দেশ্যে। আরেকটা জামদানীর এক্সক্লুসিভ ডিজাইনের কাজ ধরবে বলে জানালো। এদিকের কাজ শেষ করে ক্লান্ত হয়ে সবাই বাসায় ফিরে গেলো।
বাসায় ফিরে এসে অপ্রীতিকর ঘটনার সম্মুখীন হলো সকলে। ড্রইং রুমে কাঁকন বসে আছে। সামনে ইশান বসা। প্রতিটি মেয়ের মাঝে স্বামীর প্রাক্তন দেখলে হিংসা জাগে তেমনি মোনার ও ভেতরটা ফুটন্ত গরম পানির মতো টগবগিয়ে উঠলো। ইশান মোনাকে দেখে সালাম দিলো। আইরিন, ভাই এবং মোনাকে দেখে কিচেন থেকে বের হলো। কাঁকন আসার পর ওর সামনে ইশানকে বসিয়ে নিজে চলে গেলো। ইশান বেশ ইতস্তত বোধ করছিলো। ইমরান সামনে এসেই সালাম দিলো। মোনা এক নজর কাঁকনের দিকে তাকাতেই লজ্জা লেগে উঠলো। পাতলা জর্জেট কাপড়, পেট স্পষ্ট সাদৃশ্যমান, স্লিভলেস ব্লাউজ। গলাটা বেশ বড়, বুকের ভাঁজ দৃষ্টিকটু ঠেকছে । চুল গুলো বাদামী লাল। নায়িকার মতোই লাগছে। তবে ভদ্র সমাজের ভাষায় বেশ অশ্লীল। ইমরানের দিকে তাকিয়ে বললো,
– বাহ নিউলি ম্যারেড কাপল কি বাইরে ঘুরতে গিয়েছিলে?
ইমরানের নজর ফোনে সীমাবদ্ধ ছিলো, এমন প্রশ্নে উত্তর দিলো,
– কেনো এসেছো?
একটা ফুলের বুকে এগিয়ে দিলো মোনা এবং ইমরানের দিকে। জানালো,
– অভিনন্দন। নতুন জীবনের জন্য শুভকামনা।
মোনা বুকে না ধরলেও ইমরান এক পাশে রেখে দিলো। কাঁকন মোনাকে প্রশ্ন করলো,
– বয়সে আমার চেয়ে অনেক ছোট। তুমি করেই বললাম। স্বামীর ঘর কেমন লাগছে? অবশ্য তুমি তো রাজ্য আর রাজা উভয়ই পেলে। নিশ্চয়ই এঞ্জয় করছো?
এতক্ষন মোনা চুপ থাকলেও এবার জবাব দিলো,
– কেনো আপনার বুঝি হিংসে হচ্ছে?
কাঁকন রেগে গিয়ে বললো,
– হিংসা আবার তোমাকে? হা হা হা। সতেরো বছর আগে তোমার রাজাকে ছুঁড়ে ফেলে গিয়েছি।
মোনা কথা মাটিতে পড়তে না দিয়ে পুনরায় প্রতিউত্তর করলো,
– ছুঁড়ে ফেলে গিয়ে তো আফসোস হচ্ছে। তাই বুঝি আবার বর্তমান স্বামীর সাথে ডিভোর্সে যেতে চাইছেন। পুনরায় নজর আমার মানুষটার দিকে। খবরদার মিসেস কাঁকন, আমি মোনাশা ইকবাল সহজে কোনো জিনিস পছন্দ করিনা। একবার যে জিনিস নিজের করে পাই, তা কাউকে দি না কখনো। এর জন্য যদি কাউকে আঘাত করে ভাঙতে হয় তবে আমি খুশীতে আনন্দে মেতে আঘাত করতে এক পা পিছাবোনা। আপনি এখন ভুল ট্র্যাকে আছেন। ‘সোনালী সকাল’ আমার সংসার। আমার রাজ্য। এখানে রানী আমি। আমার কথায় সব হবে। বাকি রইলো রাজা আর রাজপুত্র। এরা দুজনই আমার। আপনি এসেছেন মেহমান হয়ে, ফিরে যাবেন মেহমান হয়ে এটিই আমার অনুরোধ। নতুবা হাতে ভিক্ষার থালা ধরিয়ে দিব।
এমন অপমানে থমথমে মুখ হয়ে গেলো কাঁকনের। ইমরান চুপচাপ মোনার তেজ দেখছে। ইশান মোনার পাশে এসে বসতেই মোনা মিষ্টি হাসি দিয়ে ইশানের দিকে তাকালো। ইশান মোনার দিকে তাকিয়ে বললো,
– মা আমি সবসময় তোমার পাশে থাকবো।
কাঁকনের দিকে তাকিয়ে বললো,
– আপনার চলে যাওয়া উচিত মিসেস কাঁকন। আর আসবেন না এই বাড়িতে।
– ইশান আমি তোমার মা।
– জন্ম তো রাস্তার কুকুর বিড়াল ও দে, জন্ম দিলেই কি মা হওয়া যায়। আমি আপনাকে আর দেখতে চাই না।
ইমরান উঠে ছেলেকে আঁকড়ে ধরে বললো,
– বাবা উপরে যাও।
মোনার দিকে ইশান তাকাতেই মোনা ইশারা দিলো। ইশান উপরে চলে গেলো। এদিকে আইরিন অনবরত কথা শোনাচ্ছে কাঁকনকে। এক পর্যায়ে কাঁকন যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ায়। ছেলের কাছ থেকে এভাবে অপমানিত হবে কখনোই ভাবেনি। দরজা পর্যন্ত গিয়ে ছুটে এসে সকলের সামনে ইমরানকে জড়িয়ে ধরলো। ইশান উপর থেকে দেখছে। ইমরান ঘাড় ঘুরিয়ে ছেলেকে দেখে চরম লজ্জা পেলো। কাঁকন ইমরানকে কিছুতেই ছাড়ছেনা। কান্না করতে করতে বললো,
– ইমরান আমি আর পারছিনা ওই সংসারে। আমাকে প্লিজ নিজের করে নাও। প্রতি মুহুর্তে তোমাকে মিস করি। মোহে ছিলাম তাই ছেড়ে গিয়েছি। তুমি আর ইশান তো আমার সব। ফিরিয়ে নাও আমাকে।
বাড়ির সকলের মাথা নত। ইমরানের বুকের ভেতর কাঁপছে। মোনার চোখের দিকে তাকানোর সাহস পাচ্ছেনা। ইশান উপর থেকে ছুটে আসছে। আচমকা চিৎকার দিয়ে বললো,
– পাপা, মা…
কাঁকনকে এক ঝটকায় সরিয়ে ছুটে গিয়ে মোনাকে ধরলো। ইশান চেঁচিয়ে কাকনকে বললো,
– বেরিয়ে যান আপনি আমাদের বাড়ি থেকে। আপনার জন্য আমার মা অসুস্থ হয়ে পড়েছে। রাবিয়া আন্টি,মতিয়া আন্টি বের করো উনাকে।
ইশানের চিৎকার বাড়ির দেয়ালে দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। ইমরান মোনাকে ধরে সোফায় বসিয়ে দিলো। একে তো সারাদিন জেদ করে তেমন কিছু খায়নি। এর মাঝে এসব জিনিস সহ্য হলোনা। বুকের ভেতর কেঁপে উঠলো। চোখ বেয়ে ঝরছে অনাহূত অশ্রু। ইমরান রুমে এনে বিছানায় শুইয়ে দিতেই আইরিন বললো,
– মেয়েটার সাথে একান্তে কিছু সময় কাটা।
সবাই রুম থেকে বেরিয়ে যেতেই ইমরান মোনার বালিশের পাশে বসলো। মাথা থেকে হিজাব সরিয়ে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করলো। কপালে হাত দিয়ে চুপচাপ শুয়ে আছে। কথা বলতে পারছে। তখনের ওই চিত্র নিতে পারেনি। শরীর সমস্ত ভর ছেড়ে দিয়েছিলো। জ্ঞান হারায়নি। ইমরান মোনার হাত ধরলো। মোনা হাতের মুষ্টি আরো দৃঢ় করলো। দু চোখ বেয়ে অশ্রুধারা। কপাল থেকে মোনার হাত সরিয়ে গাল দুটো মুছে দিলো। বেশ কিছুক্ষন পর বললো,
– আমি ইশানের সামনে ওর সাথে খারাপ ব্যবহার করতে চাইনি। তাই…
কথা শেষ করতে দেয়নি মোনা। তার আগেই নিজের বাক্য প্রকাশ করলো,
– আমি একটু একা থাকি?
ইমরান মাথা নেড়ে উঠে গেলো। ব্যালকনিতে গিয়ে সিগারেট ধরালো। ভেতরের রাগটা উতরে উঠছে। মোনার ভেতর কি চলছে তার কিছুটা হলেও টের পাচ্ছে স্পষ্ট। হাতের ফোন বের কাঁকনকে ফোন দিলো। কাঁকন রিসিভ করতেই রেগে বললো,
– লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে এমন কাজ টা না করলে হতোনা ছেলে কি ভেবেছে?
– তোমাকে জড়িয়ে ধরতে আমার ভাবতে হবে ইমরান? ছেলেটা তো আমাদেরই।
সমস্ত ক্রোধ ঢেলে বলে উঠলো,
– ডু ইউ থিংক আ’ম আ ম্যানহোর লাইক ইউ? হাউ ক্যুড ইউ থিংক দিস? হোয়াই ডিড ইউ টাচ মি ? হাউ? ডোন্ট ডেয়ার টু টাচ মি? ডোন্ট ডু দিস ফর নেক্সট টাইম। আন্ডারস্ট্যান্ড?
– ডিড ইউ কল মি হোর?
– ডেফিনিটলি। যেই মেয়ে ঘরে ভালোবাসাময় স্বামী, আদরের সন্তান রেখে একটা নিষিদ্ধ ক্যারিয়ারের জন্য একবার ডিরেক্টর, একবার মেল কাস্ট তো আরেকবার টপ পটেনশিয়াল পারসোনদের পেছনে ঘুরে, সময় কাটায় তাকে হোর,স্লাট এর চেয়ে ভালো কিছু বলা যায় না। টু মি ইউ আর আ স্পয়েলড লেডি, জাস্ট নষ্ট। বুঝতে পেরেছো। আমি যথেষ্ট রেসপেক্ট করি বলেই চুপ ছিলাম। ছেলে আজ লজ্জা পেয়ে আমাকে বলেছে, ‘পাপা তুমি অপবিত্র হয়োনা। আমার মাকে ঠকিয়োনা।’ সে ইন্ডিরেক্টলি তোমাকে অপবিত্র বুঝিয়েছে কাঁকন। তুমি কত অভাগা। আমার ছেলেটার মনে ভয় ঢুকেছে আমি যদি তার মাকে ঠকাই। মা বলতে নিজেকে ভেবোনা। মোনাকে বুঝিয়েছে। তুমি একজীবনে যা পারোনি। ছেলেটা মোনার সাথে গত কটাদিনে ততটাই এটাচড হয়ে গিয়েছে। ছিহঃ ঘেন্না হচ্ছে আমার তোমার প্রতি।
– আমিও দেখে নিব তুমি কিভাবে ভালো থাকো?
ইমরান ফোন কেটে রুমে ঢুকলো। মোনা আগের জায়গা নিঃসাড় হয়ে শুয়ে আছে। চোখ দুটো মাথার উপর দেয়ালে নিবদ্ধ। গালের দু পাশ ভেজা। ভেজা স্বর রমনীর,
– আপনি আমাকে কি ভাবেন? বিয়ে হয়েছে আজ প্রায় পনেরো দিন। আপনার প্রাক্তন স্ত্রীকে আমার উপস্থিতিতে কি করে এলাও করেন এই বাড়িতে?
– তুমি তো মানছোই না তুমি আমার বর্তমান।
– আমার মানা নামানাতে কি এসে যায়, এটাই সত্য। আমি কারো দয়ায় বাঁচতে চাইনা। বাবা এই কাজটা কেনো করেছে আমি জানিনা। তবে এর পেছনেও রহস্য আছে। আমি তা খুঁজে বের করবোই। আপনি যদি ভেবে থাকেন আমার বর্তমানে প্রাক্তন স্ত্রীর সাথে মাখোমাখো সম্পর্ক রাখবেন তবে আমার পক্ষে আপনার সাথে থাকা সম্ভব না।
ইমরান তাচ্ছিল্য নিয়ে হেসে বললো,
– মোনা শী ওয়াজ মাই ওয়াইফ এন্ড মাই চাইল্ড’স মাদার এজ ওয়েল। অসম্মান কখনোই করিনি তাকে আমি। ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখো, আজ আমার অন্যায় কি ছিলো? আমি কাঁকনকে ইনভাইট করেছি? না। আমি ওর সাথে দুটো কথা ভালোভাবে বলেছি? না। আমি ওকে ভরা মজলিসে জড়িয়ে ধরেছি? না। তাহলে আমাকে কেনো আঘাত করছো তোমরা মা ছেলে দুজনই। ইশান কিছুক্ষন আগে বলে গেলো, পাপা মাকে ঠকিয়ো না। আমি তোমাকে ঠকাচ্ছি মোনা? তুমি আমায় পছন্দ করোনা বলে আমি কথা কম বলি তোমার সাথে। আর কিভাবে কি করবো বলোতো?
প্রিয় মোনালিসা পর্ব ২৫
– আমি একা থাকতে চাই।
ইমরান রাগ করে বেরিয়ে গেলো। একাই থাকুক। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে ভালোই রাত। গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেলো। মনে একটু প্রশান্তি প্রয়োজন। সবাইকে দলে দলে ধরে ধরে বুঝাতে হবে ইমরান নির্দোষ। বুঝুক ভুল, কিসের এত ঠেকা। আর কাউকে বুঝানোর দায় ইমরান নিবেনা। যে বুঝার সে বুঝবে, যে বুঝবে না সে দূরেই থাকুক। কাঁকনের কাজের জন্য মন চাচ্ছে গাড়ির নিচে পরে ম*রে যেতে। ছেলেমানষীর বয়স আছে এখন। ছিঃ এই বয়সে ছেলে নোংরামি দেখছে। রাগ টাকে সম্পূর্ণ ঝেড়ে স্টিয়ারিং এর উপর ঝড় তুলেছে।
