প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৩৭
নীতি জাহিদ
পরদিন সকালে হতেই সবাই ঘুরতে যাবে সুগন্ধা বীচ। যদিও ইমরানের পছন্দ নয় ওই গিজগিজ করা বীচ তবুও ছেলে এবং বউয়ের মন রক্ষার্থে ছুটলো। হুড খোলা জিপ ছুটছে। সুগন্ধা পয়েন্টে এসে দেখলো পুরো টিম এখানে। জহির হেসে এগিয়ে এসে বললো,
– মোটেও কাকতালীয় নয়। ইশানকে পটিয়ে তোকে এখানে এনেছি।
ইমরান মুখ গোমড়া গম্ভীর স্বরে বললো,
– দিস ইজ নট ফেয়ার।
হাসিব, রঞ্জন, শফিক, তৌসিফ এগিয়ে এসে বললো,
– কথা কম বল, চল বীচে নামবো।
ইমরান এক পাশে দাঁড়িয়ে বলে,
– আমার নামার ইচ্ছে নেই।
ইশান মোনাকে ঠেলছে। মোনা এবার ইমরানকে সবার সামনেই বলে উঠলো,
– আপনি কি ঘুরতে এসে রাগ অভিমান পুষবেন। এঞ্জয় করেন।
ইমরান আঙুল তুলে বললো,
– একদম আমার নানীর মতো আচরণ করবেনা। আমি ও ভিজবোনা, তোমরা দুজন ও ভিজবেনা। অন্য বীচে ভিজবো।
বন্ধুরা হাসতে হাসতে মাটিতে গড়াগড়ি খাওয়ার অবস্থা। মোনার দিকে তাকিয়ে বলে,
– ভাবী আপনার উপর ও ছড়ি ঘুরায়। ছ্যাহ মানুষ হলো না ছেলেটা।
মোনার জেদ চাপলো। অন্য ভাবীরা এগিয়ে এসে বললো,
– ভাবী চলুনতো। সবাই ভিজবো। সুগন্ধাতে এসে না ভিজলে হয়?
ইমরান আগ বাড়িয়ে বলে,
– ভাবী ঠান্ডা লাগবে। দুজনেরই সমস্যা। কেউ এক্সট্রা ড্রেস আনেনি।
মোনা তৎক্ষনাৎ বলে উঠলো,
– অবশ্যই এনেছি। আমার,আপনার আর ছেলের।
ইমরান চোখ পাকিয়ে বলে,
– আমাকে জানিয়েছো?
মোনা গাল ভেঙচি দিয়ে বললো,
– জানাতে হবে কেনো? ইশান বাবা চলো তো আমরা প্যাশন ফ্রুট খাবো।
ইমরান বন্ধুদের দিকে কটমট চোখে তাকিয়ে বলে,
– তোদের পাল্লায় পড়ে আমার বউ ছেলে দুটোই অবাধ্য হয়েছে। দেখে নিব আমি তোদের।
জহির বলে উঠলো,
– একদম তোরে শায়েস্তা করার মত বউ পাইছিস।
ইমরান মোনা আর ইশানের পিছু নিলো। এদিকে অন্য বন্ধুদের স্ত্রীদের একজন বলে উঠলো,
– ভাইয়া তোমাদের এত অপছন্দ কেনো করে?
হাসিব আর রঞ্জন দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলে,
– পরিস্থিতি তখন তেমন ছিলো। ওর দূর্দিনে তৌসিফ আর জহির ছাড়া কেউ ওর পাশে ছিলোনা। আমরা তো না ই। ভুলেনি সেসব। মানুষের বিকাশ ঘটে ধীরে ধীরে। তখন ভাবতাম ইমরান খুব বাজে ছেলে। পালিয়ে বিয়ে করেছে, সেই বিয়েও টেকেনি। ওই বয়সে ছেলে সামলায়। সংসার করে, রিটেক খেয়েছে। তেমন মিশতাম না। ওকে নোট দিয়েও হেল্প করিনি কেউ। এমন ও হয়েছে ও অনুরোধ করে বলতো, নোট টা দিবি,আমি তো নিয়মিত ক্লাস করতে পারিনা, ছেলেটা ছোট। আমরা হাবি জাবি বুঝিয়ে চলে যেতাম। ভাবতাম ওর সঙ্গ খারাপ। ছেলে নিয়ে পরীক্ষা দিতে আসতো মাঝে মাঝে। কিছু স্যার খুব সাপোর্ট করতো। কিছু স্যার অপছন্দ করতো। বাকিদের যেন ডিস্টার্ব না হয় দুবছরের ছেলে নিয়ে একা বারান্দায় কত পরীক্ষা দিয়েছে। পরীক্ষার সময় যদি হত আড়াই ঘন্টা। ও একঘন্টা ছেলেকে খাওয়াতো। টেক কেয়ার করতো। বাকি দেড় ঘন্টা পরীক্ষা দিয়েছে। তখন ভীষণ মজা করেছি। আড়ালে, আবডালে কত কথা বলেছি ওকে ঘিরে। এখন জানো এসব ভাবলে বুকের ভেতর টা ফেটে যায়। কত বড় অমানুষ ছিলাম আমরা। জহির বা তৌসিফ নিজেদের পরীক্ষা শেষ করে ইশানকে রাখতো। ওর রিটেকের সময় গুলাতে জহির,তৌসিফ অথবা নয়ন দেখতো । নয়নের সাথে ইমরানের স্কেজেউল একদম মিলতোনা। মূলত ইশান মানুষ হয়েছে ভাই, চাচাদের কাছে বেশি। ইমরানের বোনের তখন সদ্য স্বামী মারা যায়। বাবা, মা দুজনই গত হয়েছে বছর ঘুরতে। আপা কি ইশানকে দেখবে না নিজের মানসিক অবস্থা সামলাবে? ওই দুইটা বছর ইমরান পুরা পাথর ছিলো। মাঝে মাঝে মনে হয় সৃষ্টিকর্তা কষ্ট যা দেন তার পরিবর্তে বহু গুণ সুখ বাড়িয়ে দেন। এখন ইমরানকে দেখো?
রয়া বিস্মিত হলো এই মানুষগুলোর আচরনে। বললো,
– ভাইয়া তো আপনাদের সাথে কথা বলে। আমি হলে কখনোই বলতাম না।
জহির হেসে বলে, সেন্টিমেন্টাল লেডি। বাই দ্য ওয়ে তোদের একটা মজার কথা বলি,
– এই হাসিব ভাবী বিশেষ করে আপনাকে। মোনার আরো একটা পরিচয় আছে। নয়নকে তো চিনেন, আপনার ডিপার্ট্মেন্টের সিনিয়র। আমাদের ফ্রেন্ড।
ভদ্র মহিলা মাথা ঝাঁকালেন।
– এই যে ইমরানের মিসেস মোনা। নয়নের আপন ভাগ্নী।
সবাই থতমত খেয়ে গেলো। জহির হেসে বলে,
– জ্বি। আর এই মেয়ে ইমরানকে নাকানিচুবানি খাইয়ে বিয়ে করেছে। তাহলে বুঝেন ইমরান কি জিনিস? এতটুকু মোনাও ইমরানের জন্য অস্থির।
রয়া হেসে বলে,
– না তোমরা যাই বলো। দুজনকে বেশ মানিয়েছে। আর ইশান বেশি জোস। আগে পিছে সারাক্ষন মা মা করে। দেখতে বেশ সুইট লাগে।
– ওদের পরিবারটাই এমন। চলো সবাই। বেটাকে পানিতে চুবাই। নাহলে এই জন্মেও নামবেনা।
এতটা সময় অনন্যা টু শব্দ বের করেনি মুখ দিয়ে। পুরো ব্যাপার পর্যবেক্ষন শেষে এক পর্যায়ে বলে উঠলো,
– যে পরিবারের মেয়েই হোক এত আদিখ্যেতা ভালোনা। ইমরান পরে পস্তাবে। এই মেয়ে সুযোগ সন্ধানী।
তৌসিফ থামিয়ে বলে,
– তোর কপালে দুঃখই ছিলো যদি ইমরান শুনতো।
– ছোট মেয়ে পেয়ে ইমরান ও মাথায় তুলছে।
পেছন থেকে রূঢ় স্বর,
– যোগ্যতার বাছবিচার ছোট বড় দিয়ে হয়না অনন্যা । বড়রা বেশি বুঝে, কুটিলতাপূর্ণ অভিজ্ঞতার তো জুড়ি নেই এছাড়া এদের লোভ ও বেশি থাকে। দে আর একচুয়েলি ফিশ ওয়াইফ। ক্যাম্পাসের কথা মনে নেই? তোমরা মেয়েরা আমাকে পছন্দ করেছো ভিপি হওয়ার পর। এর আগে তো আমি ছিলাম বখে যাওয়া ছেলে, এক বাচ্চার বাপ। বাদ দাও সেসব। ইউ ডোন্ট নো এনিথিং এবাউট মাই মোনালিসা, সো ডোন্ট জাজ হার ইট’স মাই হাম্বল রিকুয়েষ্ট। আদার ওয়াইজ আই থিংক ইট উইল হার্ট মাই হার্ট। ত্যাংকিউ।
তৌসিফ এবং জহিরকে ডেকে নিয়ে গেলো গুরুত্বপূর্ণ কাজে। প্রকৃতপক্ষে এদের ডাকতে এসেই অনন্যার কথা গুলোতে মেজাজ খারাপ হয়েছে। এজন্যই এদের থেকে দূরে থাকতে চায়৷
শব্দের যত্ন পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর যত্ন। কিছুতেই পানিতে নামবে না বলা মানুষটা অনায়াসে আজ বন্ধুদের সাথে পানিতে নেমে আনন্দ করছে। বাচ্চা গুলো ঝাপাচ্ছে। মোনা একপাশে দাঁড়িয়ে দেখছে। হঠাৎ মনে হলো ওর নামার প্রয়োজন নেই। দূর থেকে ইশান ডাকছে। মোনা হাত দিয়ে না করে দিলো। কিটকট চেয়ারে বসে আছে। সকালের রোদটা গায়ে লাগছে। বেশ আরাম বোধ করছে।
জহির ইমরানকে বললো,
– সবাই মজা করছি। ভাবী চুপচাপ বসে আছে। তোকে ও রাজি করালো। মেয়েটা কি জাদু জানে।
– শব্দের যত্ন বুঝিস। পৃথিবীতে কাউকে খুশি করতে খুব বেশি কিছু লাগেনা। কখনো কখনো কিছু শব্দ এমন ভাবে মন ছুয়ে যায় তখন মনে হবে ওই মানুষটা তোর কম্ফোর্ট জোন। এত সুন্দর তার বাচন ভঙ্গি তোকে যখন দুটো ভালো কথা বলবে তোর মনে হবে সারাদিন শুনি। জড়িয়ে ধরাটাকে আমরা শারীরিক অনুভূতি ভাবি। কিন্তু সাহস দিয়ে আলিঙ্গন করে কখনো বলতে দেখেছিস- ইমরান সাহেব আপনি এতটাই যত্নবান মানুষ যে সহজে সম্পর্ক নষ্ট করতেই পারবেন না। গিয়ে বন্ধুদের বুকে টেনে নিন। সব ভুলে যান। মনে রাখবেন সব ভালো অনুভূতি গুলো। দেখবেন আজ থেকে পুরো পৃথিবীটা আপনার। তোর অনুভুতি কেমন হবে এমন কথা শুনলে?
রঞ্জন বলে উঠলো,
– ভাই মা/রাত্মক কথা। তোরা আসলে একে অন্যের জন্য। কিভাবে বুঝালো। আমার বাপের জন্মের সাধ্যি নাই কাউরে এমনে বুঝামু।
ইমরান বললো,
– তোরা এঞ্জয় কর। আমি জিজ্ঞেস করে আসি নামবে কিনা?
ইমরান উঠে মোনার কাছে এসে বললো,
– ভিজবেনা?
– উঁহু
– কেনো? তুমি না ড্রেস এনেছো?
– শরীর ভালো লাগছেনা। এছাড়া যদি ভিজি তবে চেঞ্জ করবো কোথায়? আপনারা তো তোয়ালে পরেই চেঞ্জ করতে পারবেন।
– চেঞ্জ করে আসি আমি, ফিরে যাব এরপর।
– আচ্ছা।
ইমরান মাথা নেড়ে সম্মতি পোষন করলো । মোনা পুনরায় বললো,
– আপনার সাথেই একান্তে ভিজবো। আমাদের সী বীচে। রাতে।
– মনে আছে সব আমার। আপনি যে বীচে নেমে আবার কাদঁবেন না তার গ্যারান্টি কি?
– সেদিন তো লজ্জা ও পেয়েছি।
– তাই!
মোনা উপর নিচ মাথা নাড়ে। ইমরান মাথা নেড়ে হেসে বললো,
– আচ্ছা পরে ব্যবস্থা করছি লজ্জার। আমার ড্রেস দিন, চেঞ্জ করে নিই।
– আড়ালে গিয়ে চেঞ্জ করুন। আপনার বডি দেখলে সব ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকবে।
– আমার বডি ?
– অফকোর্স। আমি চোখ ফেরাতে পারিনা। যতবার চোখ পড়ে। দোয়া পরে উড়ন্ত ফুঁ দি যেন কারো নজর না লাগে। এখানে তো অনন্যাও আছে।
ইমরান হো হো করে হাসছে। ইশান উঠে চলে এসেছে। বাবা ছেলে ব্যাগ নিয়ে ট্যান্ট থেকে চেঞ্জ করে এসে মোনার সাথে রোদে বসলো। আস্তে আস্তে সবাই উঠলো। মোনা আরেকটা প্যাশন ফ্রুট নিয়ে মুখে দিতেই বাবা ছেলে দুজনকে খাওয়াচ্ছে। ইশানের আগেই মজা লেগেছে। তবে ইমরান টেস্ট করেনি। তার প্রতিক্রিয়া দেখতে মোনা এবং ইশান তাকিয়ে আছে।
টেস্ট করে বললো,
– দ্য টেস্ট ইজ ফ্যান্টাসটিক। কি ফল এটা?
ইশান খুশিতে বললো,
– প্যাশন ফ্রুট। মজা না পাপা?
– ঢাকা নিয়ে চলো। সবাইকে খাওয়াবে।
মোনা উত্তর দিলো,
– ওকে যাওয়ার সময় নিয়ে যাবো।
বাচ্চারা ফুটবল নিয়ে খেলছে। বড়রা একপাশে কথা বলছে। মহিলারা মোনার পাশে এসে বসলো। বেশকিছুক্ষন মোনা একজনকে ইশান এবং ইমরানের আশেপাশে ঘুরতে দেখছে। প্রথমে সন্দেহ করেনি এখন বেশ সন্দেহ হচ্ছে। রবিনকে আশপাশে খুঁজে বেড়াচ্ছে। দূরে দেখতে পেয়ে ইশারায় ডেকে উঠে গেলো। রবিন কাছে আসতেই বললো,
– কিছু হয়েছে ভাবী?
– ভাইয়া আপনার স্যার আর ইশানের আশেপাশে আমি ওই লোকটাকে বেশ কিছুক্ষন ঘুর ঘুর করতে দেখছি। কেমন যেন সন্দেহ জনক দেখুন তো একটু।
– আমি দেখছি আপনি বসুন।
মোনা এসে আবার আড্ডায় যোগ দিলো। অনন্যা মোনাকে পর্যবেক্ষন করছে। হাসিবের স্ত্রী কথা কম বলছে। মোনা সবার সামনেই বললো,
– ভাবী আমার গতকালকের কথায় রাগ করবেন না প্লিজ। খুবই খারাপ লাগে ইশানকে নিয়ে কিছু বললে। আমার বিয়ের বেশিদিন না হলেও ইশান আমার ন্যাওটা বেশ কিছু বছর ধরে। মায়া থাকাটা তো স্বাভাবিক…
মোনা এতটুকু বলেই সবার মাঝখান থেকে উঠে দৌঁড় দিলো। বাচ্চাদের সাথে খেলছে একপাশে ইশান। হাত দিয়ে ইশানকে বুঝাচ্ছে সরে যেতে। ছেলেটা বুঝতে পারছেনা। এদিকে রবিন সজীব ওই সন্দেহজনক লোকটার পেছনে ছুটছে। মোনা পিস্তল দেখেছে লোকটার হাত। ইমরান দূর থেকে এসব দেখে ছেলেকে ধরতে ছুটেছে। একদিকে মোনা অন্যদিকে ইমরান। পেছন থেকে রবিন সজীব। কখন যে লোকটা গুলি ছুড়লো কেউ টেরই পেলোনা। ভিড়ের মাঝে সাঁই করে গুলিটা মানব দেহে বিঁধ করলো। ইশান পাথরের মত অটল। হঠাৎ গলা ফাঁটিয়ে চিৎকার দিয়ে উঠলো,
– মা……
ইমরান বালুর মধ্যে ধপ করে বসে গেলো। রবিন সজীব ওই ছেলেকে ধরে ফেলেছে। টিম এর হাতে তুলে দিলো। লোকসম্মুখে গুলি বের করা সম্ভব না। সবাই ছুটে এসে মোনাকে ধরলো। গুলি কাঁধে লেগেছে। জহির,রঞ্জন,হাসিব ইমরানকে ধরলো।
– ইমরান…
সম্বিত ফিরে ইমরান ছুটলো মোনার কাছে। বাম কাঁধ রক্তে ভেসে যাচ্ছে। মোনার ডান গালে হাত রাখলো ইমরান। মেয়েটা ততক্ষনে জ্ঞান হারিয়ে ফেলার মত অবস্থা। বুকের সাথে চেপে ধরলো। ইশান পাথরের মত অনড়।
রবিন জিপ নিয়ে সরাসরি চলে এলো। ইমরান মোনাকে কোলে তুলে জিপে উঠালো। ইশানের চোখে পানি। আড়াল করার চেষ্টায় ছেলেটা ব্যর্থ হচ্ছে। ইমরান তখনো হুঁশে নেই। সবাই ইশানকে বুঝাতে ব্যস্ত,
– সব ঠিক হয়ে যাবে।
জিপ ছুটলো হসপিটালের উদ্দেশ্যে। রবিনের ফোনে কল এলো, প্রোডাক্ট সী পোর্ট ক্রস করেছে। প্রোডাক্ট আটকাতে না পেরে ইমরানের উপর চড়াও হয়ে ইশানকে এটাক করতে চেয়েছিলো প্রতিপক্ষ। তার বলির শিকার মোনা।
হসপিটালের বেডে পড়ে আছে মোনার ঘুমন্ত, নিস্তেজ দেহ। বাইরে দাঁড়িয়ে আছে ইমরান, ইশান ও বন্ধুদের পরিবার। ইশান স্তব্ধ। ছেলেটাও পাথর বনে গিয়েছে। নয়ন ছুটে এসেছে। ঢাকা টু চট্টগ্রাম ফ্লাইট,এরপর কক্সবাজার। কিভাবে, কি উপায়ে ছুটেছে নিজেরই জ্ঞান নেই। দুপুর, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা । কিছুক্ষন আগে মোনাকে কেবিনে শিফট করেছে। ইশানকে নয়ন সামলাচ্ছে। ডাক্তার মোনাকে ভেতরে পর্যবেক্ষন করছে। জহির কথা বলবে ইমরানের সাথে এমন সময় নয়ন বাঁধা দিলো ইশারায়। ইমরান স্ট্রং ট্রমাতে চলে গিয়েছে। মোনার এত রক্ত দেখে মাথা ঠিক নেই। ইমরানের আকাশী টি শার্ট এখনো রক্তে রঞ্জিত। দু হাতে শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগ। হাত দুটোর দিকে তাকিয়ে আছে এক দৃষ্টিতে। কেবিনের বাইরে বেঞ্চিতে বসে দেয়ালে মাথা এলাতেই মনে পড়লো সেই রাতের কথা। মোনা বার বার বলছিলো,
– ইমরান সাহেব ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভালোবাসি
ইমরান প্রশ্ন করেছিলো,
– এত ভালোবাসা আজ?
উত্তরে জানিয়েছিলো,
– জানেন হুমায়ুন আহমেদ স্যার কি বলেছেন?
– কি?
আর মনে করতে চায় না ইমরান। আচমকা ইমরান উঠে দাঁড়ায়। নয়ন হুড়মুড় করে ওর সামনে চলে আসে। বাঁধা দিয়ে বললো,
– কই যাস?
– আসছি।
– মোনাকে ফেলে যাস না। মেয়েটা উঠে সবার আগে মিনহাজ ভাইকে না হয় তোকে খুঁজবে সামলাতে পারবোনা।
– আমার মস্তিষ্ক বার বার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে ওর বাক্য। গত কাল রাত থেকে এক কথাই আওড়েছে। কারণ জিজ্ঞেস করার পর বলে, হুমায়ুন আহমেদ স্যার কি বলেছিলেন জানেন? বলেছিলেন –
” কাউকে মনে পড়ছে? ফোন করো। কাউকে দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে? জানাও। ভালোবাসো কাউকে? বলে দাও! আগামী পাঁচ মিনিট বেঁচে থাকবে কিনা জানোনা, অপূর্ণতা নিয়ে দুনিয়া ছাড়তে নেই!’ তাই আজ ভালোবাসি বলতে আমার কোনো মানা নেই। ইমরান সাহেব আমি আপনাকে আকাশ সম ভালোবাসি, এই সমুদ্রের বিশালতা তুচ্ছ আমার ভালোবাসার কাছে।”
ইমরান কথা বলছে বলিষ্ঠ স্বরে অথচ চোখ বেয়ে বেয়ে পড়ছে অশ্রুধারা। ইশান এতক্ষনে বাবার বুকে ঝাপটে এসে বললো,
– পাপা মা ঠিক হবেনা?
ইমরান চুপ করে আছে। ওর ভেতর ক্রোধের আগুন। জহির এগিয়ে এসে ইশানকে সান্ত্বনা দিচ্ছে। হাসিব,রঞ্জন একটু দূরে দাঁড়িয়ে বউদের সাথে আলোচনা করছে। রঞ্জনের বউ বলে উঠলো,
– তোমার বন্ধু যে ভীষণ পটেনশিয়াল এখন বুঝলাম নতুবা কেউ এভাবে এটাক করেনা। আমার তো চিন্তা হচ্ছে ভাবীর কিছু হলে ভাই কি করবে? উনার চোখ দেখছো। পারছেনা সব তুলে উগড়ে ফেলতে।
হাসিব বলে উঠলো,
– ওর রাগ বরাবরই বেশি। একদম ঠান্ডা থাকবে। কিন্তু রাগ উঠলে কেউ ভয়ে সামনে আগায় না।
ডাক্তার ইমরানকে ডাকতেই ভেতরে এসে চুপ করে দাঁড়িয়ে ডাক্তারের সব নির্দেশনা শুনেছে। বের হয়ে নয়নকে বললো,
– এয়ার এম্বুল্যান্সের ব্যবস্থা কর। আমি ঢাকা নিয়ে যাবো মোনালিসাকে। বেস্ট ট্রিটমেন্ট টা পাবে ওখানে।
নয়ন ইমরানকে আশ্বস্ত করে বললো,
– তুই তো এমন করিস না, সবসময় ঠান্ডা মাথায় কাজ করিস আজ কেনো এমন করছিস? ওকে এখানেও বেস্ট ট্রিটমেন্টটাই দিবে।
ইমরান কথা না বলে ব্যালকনির সামনে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। বেশ কিছুক্ষন এভাবে থেকে সবাইকে জানালো মোনাকে নিয়ে আগামীকাল ঢাকা ব্যাক করবে। কারো কোনো কথা শুনবেনা। কেউ আর দ্বিমত করেনি।
ঢাকায় এসেছে আজ এক সপ্তাহ। হাসপাতালের বেডে ঘিয়া রঙা পোশাকে মেয়েটাকে দেখতে বাড়ির কারো ভালো লাগছেনা। সুস্থ শরীরে গিয়েছে। সংসারে খুটিনাটি ঝামেলা হবে কিন্তু এভাবে জীবন মরণ সমস্যা কেউ নিতে পারছেনা। আজ হাসপাতাল থেকে রিলিজ দেয়ার কথা। পরিবারের মানুষের অর্ধেক দিন কাটে হাসপাতালে বাকি অর্ধেক বাড়িতে। আইরিন মোনার প্রিয় মোরগ পোলাও করে এনেছে। নিজ হাতে খাইয়ে দিচ্ছে। মোনা হেসে হেসে হাত পা নাড়িয়ে কথা বলে যাচ্ছে। ইশান মায়ের সাথে গেম খেলছে। কে বলবে এই মেয়ে এত বড় বিপদ কাটিয়ে উঠেছে। এই কয়েকদিনে ইমরান মোনা ঘুমে থাকা অবস্থায় আসে আবার চলে যায়। পুরো এক সপ্তাহ কথা বলেনি মোনার সাথে। মোনা বেশ কয়েকবার সবাইকে জানিয়েছে সে ইমরানের সাথে কথা বলতে চায়। ইমরান স্পষ্ট বলেছে সুস্থ হয়ে বাসায় এলে কথা বলবে। নয়ন থাইল্যান্ড গিয়েছে। মিনহাজের কেমো চলছে। এই সুযোগে মোনা শান্ত। সে বাবাকে জানাতে চায়না তার অসুস্থতার খবর। বাবার কাজ আরো কিছুদিন থাকুক।
ইশানকে বলেছে নিজে পুরোপুরি সুস্থ না হওয়া অবধি যেন ইমরান সাহেব ওর বাবাকে থাইল্যান্ড থাকতে বলে। মেয়ের এই অবস্থা কোনো বাবাই মেনে নিতে পারবেনা। অদৃষ্টের কি পরিহাস একদিকে মেয়ে হাসপাতালের বেডে তো অন্যদিকে বাবা ক্যান্সারের চিকিৎসায় রত। অফিসের বাইরের সব কাজ ইমরান একা সামলাচ্ছে। সোহান অফিস সামলাচ্ছে। সব মিলিয়ে হাপিয়ে উঠলেও নিজেকে সামলে নিচ্ছে। গত এক সপ্তাহে অফিসে বসেছে মাত্র দুদিন, অল্প কিছুক্ষনের জন্য।
প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৩৬
দুপুরের পর বিকেলে মোনাকে এসে নিয়ে যায় ইশতিয়াক,তুশি এবং আইরিন। নিজের বেডরুমে ডুকে স্বস্তির শ্বাস ফেলে। চারদিকে যেন ইমরান সাহেব গন্ধ। মোনা জানে ইমরানের দেখা না করার কারণ। সেদিন মোনাকে সেই অবস্থায় দেখে ছটফট করার অবস্থা আজো চোখে ভাসে। আইরিন, তুশি সব গুছিয়ে দিয়ে ঘুমাতে বলে গেলো। ক্লান্ত শরীরে চোখ বন্ধ করতেই ঘুমের রাজ্যে হারায় ইমরান জায়া মোনালিসা।
