প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৫৫
নীতি জাহিদ
ইতু, মোনার খাটে বসে মা এবং বড়আম্মুর নাচ দেখছে। এদিকে আইরিন, রাবিয়া,মতিয়া ও রুবিনা দর্শকের মতো বসে আছে গালে হাত দিয়ে। ভর সন্ধ্যা বেলা নাস্তার পর এই দুইজনের মাথায় ভূত চেপেছে। হাঁটতে যার কষ্ট সে কি সুন্দর আস্তে করে ওড়না উড়িয়ে নাচের স্টেপ দিচ্ছে। ইশান টেবিলকে তবলা বাজিয়ে গান ধরেছে,
– শায়দ মেরি জান কা সাদকা মাঙ্গে তেরি জুদাই
তু বলে তো বানজাউ ম্যে বুল্লে শা সওদাই
ম্যে ভি নাচ্যুঁ…
গাইতে গাইতে ইশান ও নাচতে শুরু করলো। মোনা যদিও কয়েকবার ওড়না উড়িয়ে মুদ্রা দিচ্ছে তবে ইশান আর তুশি নেচে বেড়াচ্ছে। ইতু খুশিতে খাটেই লাফাচ্ছে। মোনার মন রাখতে যা যা করা দরকার সব কিছুতেই সায় দেয় বাড়ির লোকজন। মাঝে মাঝে সবাই বাচ্চাদের মত আচরণ করে। এদিকে মোনাকে পেয়ে তুশির আনন্দ ও দ্বিগুন হয়েছে।
আইরিন বলে, ”আমি দুইটা ভাইয়ের বউ পাই নাই, আরো দুইটা পুচকি পালছি। সাথে পুচকিদের ছানা পোনা।”
ওদের নাচ শেষ হওয়ার আগে ইমরান,ইশতিয়াক ও সোহান একসাথে রুমে ঢুকছিলো। বাড়ির এই আয়োজন, মেহফিল দেখে ছেলে গুলা তব্ধা খেয়ে জায়গায় দাঁড়িয়ে গেলো। হাতের ওড়না গায়ে পেঁচিয়ে মোনা একপাশে দাঁড়িয়ে পড়লো পুরুষদের দেখে। ইশান নেচেই যাচ্ছে। কারো নজরে পড়ার আগেই ইমরান সবাইকে আনন্দ করতে দেখে মুখ ঘুরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলো, মোনাকে চালিয়ে যাওয়ার ইশারা দিয়ে। মোনা পাটির সব কটা দাঁত দেখিয়ে পুনরায় আনন্দ করতে ব্যস্ত হয়ে গেলো।
ডাইনিংয়ে ভাগ্নে এবং ভাইকে নিয়ে বসে বিষদ আলোচনা জুড়ে দিলো নির্বাচন, রাজনীতি নিয়ে। প্রায় ত্রিশ মিনিটের মাথায় উপর থেকে মেয়েরা নেমে আসলে যে যার যার কামরায় চলে যায়। ইশান কামরা গুছিয়ে দিচ্ছে। মোনা চকলেট খেতে খেতে ক্যাম্পাসের গল্প জুড়িয়ে দিয়েছে। এক্সাম শেষ হয়েছে। সেমিস্টার ব্রেক চলছে মোনার। মা-ছেলের গল্পের মাঝে ইমরান রুমে ঢুকলো। ইশান বাবাকে দেখে বললো,
– পাপা কখন এলে?
– এইতো কিছুক্ষন।
– পাপা জানো আজ আমরা নেচেছি অনেক।
– ভেরি গুড।
– তুমি নাচতে পারো পাপা?
– না বাবা৷
অকস্মাৎ মোনার চোখে উল্লাস। উৎকর্ষ নিয়ে বললো,
– ইমরান সাহেব একদিন আপনার নাচ দেখবো।
তোয়ালে দিয়ে ভেজা মুখ মুচতে গিয়ে থমকে গেলো। চক্ষু কোটর থেকে বহিরাগত প্রায়। এইদিন ও দেখার বাকি ছিলো? ইশান মাথা চুলকে ভ্রু উঁচু করে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে,
– মা কিভাবে সম্ভব? পাপা এই বয়সে নাচলে কেমন লাগবে?
– সালমান খান,শাহরুখ খান বা হৃত্তিক রোশন নাচতে পারলে তোমার পাপাও পারবে।
ইমরান তোয়ালে কাঁধে নিয়ে মোনার দিকে দাঁত খিচিয়ে অনিচ্ছুক হাসি দিয়ে বলে,
– আমি ইমরান। সালমান, শাহরুখ বা হৃত্তিক কেউ নই।
– তাই তো বললাম। ওরা তো বুড়ো আপনি আরো ইয়াং।
ইশান মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে,
– থাক মা। পাপার হয়ে আমি নেচে দিব। প্রয়োজন হলে সোহান ভাইয়াকে একদিনের জন্য ভাড়া করবো। তবুও পাপাকে নাচাতে হবেনা।
ইমরান খাটে বসে বলে,
– ইশান, তোমার মা আমাকে নিজের মত কচি খোকা ভাবে। নাহয় কেউ এই বয়সে আমাকে নাচানোর আগ্রহ কিভাবে প্রকাশ করে? মিডিয়া জগৎ আলাদা। আমি খেটে খাওয়া মানুষ। মাঝে মাঝে জিম বা জগিং করি নিজের সুস্থতার জন্য তার মানে এই না যে এখন নাচবো। আরো যে কি কি ভবিষ্যতে আমাকে দেখতে হবে আল্লাহ জানে।
মোনা ঠোঁট চেপে হাসছে। মাঝে মাঝে নিজেও বুঝতে পারে এই সময়টাতে মানুষটাকে প্রচুর বিরক্ত করছে। হাসি মুখে মেনে নিচ্ছে মানুষটা। জীবনের এই সন্ধিক্ষণে এসে সুখের দেখাটা হয়তো মিলেই গেলো।
জামদানী, কাতান ও দেশীয় শাড়ির এক্সিবিশন চলছে। আসতে তো হবেই। শাড়ি পরা মোনার পক্ষে কঠিন এখন। সময় প্রায় কাছাকাছি। জামদানী ফিউশনে গাউন বানিয়ে তার উপর শ্রাগ পরেছে। ঘড়িতে সন্ধ্যা সাতটা। ইশানের হাত ধরে গাড়ি থেকে বের হলো। ইমরান, নয়ন এবং মিনহাজ হলের ভেতর আছে। দেশী, বিদেশী বায়াররা এসেছে। হলের দরজা দিয়ে ঢুকতে দেখে ইমরান মোনাকে আগলে নিলো। ইশানের এক হাত শক্ত করে ধরা অন্য হাত ইমরান ধরেছে। নিজের শাড়ি গুলো দেখে প্রশান্তি লাগছে। অফিসের সবাই এসেছে। মোনাকে দেখে হাসি মুখে এগিয়ে এলো। সাজিয়ে রাখা প্রতিটি শাড়ি দেখছে। কোথাও হলুদ জামদানী, তো কোথাও লাল টুকটুকে জামদানী। একেকটা শাড়ির কাউন্ট একেক রকম। কোনোটি চল্লিশ তো কোনোটি চুরাশি। সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ছে কর্ণারে ঝুলানো দুটো শাড়ি। একটি একশো অন্যটি একশো বিশ। কালো জামদানীতে কারচুপি কাজ যার কাউন্ট একশো এবং অন্যটি একশো বিশ। যার রঙ সোনালী সবুজ। বায়ারদের প্রশ্নের উত্তর অনবরত দিয়ে যাচ্ছে, সাদাফ,তিহান ও চৈতি। তামান্না শাড়ি খুলে দেখাচ্ছে। জোবাইদা ক্লায়েন্ট ঘুরিয়ে স্টল দেখাচ্ছে। সবাই ব্যস্ত। মিনহাজ শাড়ির দিকে তাকিয়ে মেয়েকে উদ্দেশ্য করে বললো,
– তুমি সাকসেস ফুল ইমরানের মোনালিসা।
মোনা বাবার দিকে তাকিয়ে বললো,
– আগে আমি মিনহাজ কন্যা মোনাশা এরপর মোনালিসা।
মিনহাজ মৃদু হাসে। মোনা পুনরায় বাবাকে বললো,
বাবা সোনালী সবুজ জামদানীটা চিনতে পারছো?
মিনহাজ মাথা নেড়ে বললো,
– আমি ভাবতে পারিনি এতটা তাজা করে দিবে আমার স্মৃতি।
মোনা এগিয়ে গিয়ে তামান্নাকে বললো,
– আপু শাড়িটা দাও আমাকে।
তামান্না এগিয়ে দিলে মোনা গায়ে জড়িয়ে নিলো। ইমরান দেখছে। ইশান প্রশ্ন করলো,
– শাড়িটা খুব সুন্দর কিন্তু মা এতটা আবেগে জড়িয়ে নিলো কেনো পাপা?
ইমরান ব্যাপারটা অজানা তা জানালো। নয়ন হেসে মোনাকে বললো,
– আজ বোন থাকলে হয়তো তোকে নিয়ে খুব গর্ব করতো।
মোনা শাড়িটা ভাঁজ করিয়ে গিফট বাক্সে মুড়িয়ে বাবার হাতে তুলে দিয়ে বললো,
– নাও এই শাড়িটা মোনা তোমাকে দিলো। মোনার মায়ের বিয়ের স্মৃতি।
মিনহাজ হেসে সাদরে গ্রহণ করে মেয়ের উপহার। মায়ের বিয়ের শাড়িটা ছবি দেখে পুনরায় বানিয়েছে মোনা। আগের শাড়িটা নষ্ট হয়ে যাওয়াতে প্রায় বাবা মেয়েকে বলতো সেই শাড়িতে মাকে কত সুন্দর লাগতো! মাকে মোনা ফিরে পাবেনা, তবে মায়ের শাড়ির আরেকটা কপি তৈরি করতে সফল মোনা। বায়ারদের সাথে টুকটাক কথা বলছে। অন্যদের স্টল দেখছে।
মুগ্ধ হয়ে কিছুক্ষণ পর পর স্ত্রীকে দেখছে । আগে থেকে কিছুটা নাদুসনুদুস হয়েছে। সাজ পোশাক সবকিছুতেই এই মেয়ে অনন্য। গর্ভবতী মায়েরা এত রূপ কোথায় পায়! কই এর আগে তো কাউকে এতটা আকর্ষণীয় লাগেনি। নাকি মোনালিসা তার মনের গহীনে বাস করা একান্ত ব্যক্তিগত নারী তাই এতটা মোহনীয় লাগছে। চারপাশটাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। বাবা কথা বলতে ব্যস্ত হওয়াতে মোনা দু পা এগিয়ে এসে ইমরানের বাহু জড়িয়ে ধরলো। ইমরান মুচকি হেসে বললো,
– এতক্ষন নিসঃঙ্গতায় কেটেছে। শূন্য হাত পূর্ণ করার মানুষটার ভীষণভাবে অভাববোধ করছিলাম।
মোনা আরেকটু শক্ত করে ধরে বললো,
– আর এখন?
সামনে চোখ রেখে হেসে ধীর গলায় কানের কাছে মাথাটা কাত করে বললো,
– পরিপূর্ণতা পেলো অতি সাধারণ হস্ত। হয়ে উঠলো অমূল্যবান রত্ন।
মোনা খিলখিল করে হেসে উঠলো। সেই হাসিতে ইমরান স্নিগ্ধতা খুঁজে পায়, তন্ময় হয়ে ডুব দেয়। এই বয়সেও বউয়ের প্রেমে বার বার আছড়ে পড়ে। হয়তো পুরোটাই স্রষ্টার ইশারা। বৈধ সম্পর্ক গুলোতে বরকত, রহমতে ভরপুর থাকে। তারই বহিঃপ্রকাশ এই মুগ্ধতা।
ইমরানের পরিচিত একজন বায়ারের সাথে দেখা। মোনার সাথে বেশ আন্তরিকতা নিয়ে পরিচিত হলো। পেছন থেকে পুরুষালি স্বরে সালাম কানে এলো। ইমরান ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলো জুয়েল। পাশেই অপছন্দের মহিলা দেখে মোনা ভ্রু কুঁচকে নিলো। অনন্যা বিরক্ত হয়ে চলে যাবে তখন নয়ন এলো। জুয়েলের সাথে হ্যান্ড শেক করে অনন্যাকে দেখেই প্রশ্ন ছুড়লো,
– কিরে কি খবর? কেমন আছো?
কিছুটা বিচলিত হলো অনন্যা। ভদ্রতার খাতিরে অনিচ্ছা সত্ত্বেও খানিকটা হেসে জবাব দিলো। কথায় আছে, ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভাণে। যার স্বভাব যা তা সে করবেই। কাঁকনকে দেখে সকলের সামনে ডাক দিলো। শতরূপা শাড়ি’স এর ব্র্যান্ড এম্বাসেডর হিসেবে এসেছে। পরিপূর্ণ সাজে কাঁকন এগিয়ে এলো। আজ সাজ বেশ মার্জিত। একটা কাতান শাড়ি পরনে, ফুল হাতা ব্লাউজ। চুলে বেশ গুছিয়ে খোঁপা। মেক আপ সামান্য। এতেই যেন পরিপাটি লাগছে। নয়ন বিড়বিড় করে বিচ্ছিরি কিছু বললো। ইশান মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে মোটামুটি হাস্যমুখ তবে বাবার মুখের ভাব পরিবর্তন হয়েছে। সবার সামনে এসে কাঁকন সালাম দিতেই অনন্যা অহেতুক জড়িয়ে ধরার নাটক করলো। ইমরান মোনার দিকে তাকিয়ে বললো,
– আমাকে একটু ওদিক টা দেখতে হবে, তুমি ইশানের সাথে এসো। ইশান মাকে নিয়ে এসো।
কারো কথার কোনো জবাব শুনেনি। জায়গা ত্যাগ করলো। কাঁকনের মুখভঙ্গি মলিন হলো। স্বাভাবিক ভাবে মোনার দিকে তাকিয়ে নিজেদের মাঝে আলাপ সারছে। নয়ন ঈগলের মত তীক্ষ্ণ নজরে পাহারা দিচ্ছে। মিনহাজ সামনে এগিয়ে আসতেই কাঁকন বিব্রতবোধ করে সালাম দিলো। নিজ থেকেই আগ বাড়িয়ে বলে দিলো এখানে আসার কারণ। মিনহাজ হেসে বললো,
– কাঁকন বিচলিত হয়োনা। যেহেতু কাজের জন্যই আসা দেখা হওয়াটা স্বাভাবিক। তোমার হাসবেন্ড, শ্বশুরবাড়ির লোকজন কেমন আছেন?
– জ্বি, আলহামদুলিল্লাহ ভালো।
নয়ন মিনহাজ সরে যেতেই কাঁকন ইশানের হাত ধরে মোনাকে নিয়ে বললো,
– মায়ের খেয়াল রেখো। তোমার জন্য এই মা যোগ্য। আর আমাকে মাফ করে দিও।
ইশান কিঞ্চিত হেসে বললো,
– আপনার উপর রাগ নেই আমার।
বেশ অবাক হলো। ছেলে বলছে রাগ নেই! অনন্যা আগ বাড়িয়ে বললো,
– তোকে আগেই বলেছিলাম কাঁকন, সন্তান মায়ের উপর রাগ করে থাকতে পারেনা। দেখলি তো। যতই আউটসাইডার আসুক একজন মা, মাই থাকে।
মোনা সামনে থেকে চলে যেতে চায়। অনন্যার প্রতিটি কথাই আপত্তিকর, সেই সাথে বেশ অপমানজনক। ইচ্ছে করছেনা এসব কথা শুনতে। ইশান মোনার হাত ধরে আটকে দিয়ে অনন্যাকে বললো,
– যেচে কারো পারিবারিক ঝামেলায় সামিল হওয়া কি আদৌ ভদ্রতার মাঝে পড়ে আন্টি? এখানে কথা হচ্ছে আমাদের তিনজনের মাঝে। আপনি যে কথাটি বললেন এতে হয়তো আপনার বান্ধবী খুশি হতে পারে কিন্তু আমার মা কষ্ট পেয়েছে। আমি উনার সাথে ভদ্র ব্যবহার করার কারণ, মা ব্যাপারটা স্বাভাবিক ভাবে নিচ্ছে। নতুবা কথাই বলতাম না। রাগ নেই বলার কারণ হলো, সবারই জীবনকে উপভোগ করার অধিকার আছে। মিসেস কাঁকন ও তাই করছেন। ইশান ওনার জীবনে অযাচিত ছিলো তাই ফেলে চলে গিয়েছেন এতে রাগ করার কিছু তো নেই। এংগার ম্যানেজমেন্ট বলে একটা কথা আছে আন্টি। ওটা জানতে হয়। অহেতুক রাগ কার উপর ঝাড়ছেন? মায়ের উপর। টুকটাক আপনার গল্প আমিও জানি।আপনি পাপার ব্যাচমেট, বেশ অভিজ্ঞ অথচ এটা জানেন না, হাউ কন্ট্রোল এংগার?
মোনা ইশানের দিকে তাকিয়ে বললো,
– ইশান, এভাবে বলা ঠিক না, বয়সে মিসেস অনন্যা তোমার গুরুজন। এছাড়া তুমি মিসেস কাঁকন সম্বোধন করলে কেনো? তোমার মা হয়।
– আমার মা একজনই। তোমাকেই মা ডেকেছি, তোমাকেই মা হিসেবে চিনি এবং চিনবো। তুমি আর পাপা ছাড়া বাদ বাকি সব আমার জন্য ক্ষণস্থায়ী। ওদিকে চলো। বেরিয়ে পড়তে হবে কিছুক্ষনের মাঝে।
ইমরান থেকে কোনো অংশে কম নয় ইশান। মোনা প্রায়ই বুঝায়। যত যাই হোক মানুষ ভুল করে বুঝলে তাকে মাফ করা উচিত। হয়তো ঝোঁকের বসে একটা কাজ করে বসেছিলো তার মাশুল এভাবে গুণতে হবে জানলে করতোনা। পেটে ধরা ছেলের কাছ থেকে এতটা রূঢ় ব্যবহার মনে আঘাত হানবেই। কাঁকনের দিকে তাকাতেই চোখ ঝাপটে আশ্বাস দিয়ে বললো,
– তোমার শিক্ষা ঠিক আছে মোনা। ইশান ভদ্রতার সাথেই কথা বলেছে। আমার কষ্ট লাগে নি।
মোনার হাত ধরে টেনে নিয়ে এলো ইশান। জবাব টুকু দিতে দিলোনা। হাতের ইশারায় বিদায় জানাতে হলো মোনাকে। অনন্যা রেগে কাঁকনকে বললো,
– তোর ছেলেটাকে আস্ত একটা বেয়াদপ বানিয়েছে। কিসের শিক্ষা দিচ্ছে?
– দোষ তোমার। মোনা তোমাকে কিছুই শুনায় নি। ইশান শুনিয়েছে। তোমাকে আমাদের মাঝে কথা বলতে হলো কেনো? এত হাইপার হও কেনো?
– এখন তো আমাকে ভালো লাগবেনা। প্রয়োজনে কত ব্যবহার করেছিস ক্যাম্পাসে এখন আর চিনিস না।
– আমি তা বলিনি। আর ব্যবহার কই করলাম, ওই সময়টাতে অনেক অন্যায় করেছি। নিজের প্রাক্তন স্বামীকে বিয়ে করানোর জন্য কত ভাবে তোমাকে প্রলুব্ধ করতাম। এই কথা যদি কেউ জানতে পারে, আমার মুখ ও দেখবেনা। তবে এই ক্ষেত্রে আমার চেয়ে দোষী তুমি বেশি অনন্যাদি। তুমি কিন্তু ইমরানকে এখনো পছন্দ করো।
– না করিনা। এখন আমার ইমরানের আচরণ ভালো লাগেনা। বউয়ের কথায় উঠে বসে। এই মেয়ের সুখ দেখলে আমার গা জ্বলে।
– আস্তে বলো। বউয়ের কথায় ওঠাবসা করার মানুষ ইমরান না। বরঞ্চ এমন হয় যে ও যেখানটাতে অবস্থান করে আশপাশটাতে মানুষ গুলো ওর মোহে ডুবে থাকতে ভালোবাসে। তোমার স্বামী পারবে তার বয়সের চেয়ে অর্ধেক নারীকে বশ করতে? পারবেনা। ইমরান কিন্তু করেছে।
– আমার স্বামীর চরিত্র ভালো, ইমরানের চরিত্রে সমস্যা।
কাঁকন হেসে শেষ বাক্যটা উচ্চারণ করলো যা অনন্যার রাগের মাঝে উত্তপ্ত লোহা ঢেলে দিলো,
– চরিত্রে সমস্যা হলে তোমাকে রাতের প্রস্তাবে ফিরিয়ে দিতোনা, বিয়ের জন্য নাকোচ করতোনা। এতদিনে তোমার অবস্থান হয় আমার মতো হত অথবা মোনার মতো। অথচ তুমি এখন তোমার অপছন্দের মানুষের স্ত্রী যাকে বাড়ি থেকে জোর করে বিয়ে দিয়েছে। অনন্যাদি আমরা কেউই ইমরানের জন্য নয়। বাস্তবতা মেনে নাও। তুমিও কিন্তু তোমার ভুড়িওয়ালা স্বামীর টাকা আছে বলেই সংসার করছো। স্বার্থ কিন্তু সবাই দেখি।
দৃষ্টি ফোনে আনত। ইচ্ছে করছেনা আশপাশটাকে দেখার। মানুষের মন কত দ্রুত বদলে যায়। মন পরিবর্তনের সাথে সাথে জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি বদলায়। মিনিট পাচেক আগেই কাঁকন এসে দোয়া নিলো, পুনরায় মা হতে চলেছে জানিয়ে। ইমরান নিশ্চুপ ছিলো। কৃতজ্ঞতা জানাতে ভুলেনি কাঁকন আজ। তবে আফসোসের স্বরে বলেছিলো,
– যেই চেষ্টা টুকু জারিফকে সঠিক পথে আনতে করেছি তা যদি ইমরানের পাশে থেকে কষ্টের সময়টাতে করতাম তবে ইমরানের কাঁকন হয়ে থাকতে পারতাম। জীবনটা আফসোসে কেটে যেতোনা। দোয়া করবে আমার সন্তানের জন্য। ইশানকে ধরে রাখতে পারিনি। ওকে যেন আগলে রাখতে পারি।
ইমরান প্রত্যুত্তর করেনি। কাঁকন চলে যাবে তখনই ইমরান তাকিয়ে দুটো শব্দ বললো,
– ভালো থেকো, সন্তানের প্রতি যত্ন নিও।
ছলছল চোখ কাঁকনের। কান্না চাপাতে পারেনি। ইচ্ছে করছে মানুষটাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে অথচ সেই অধিকার নেই। ইমরান এক পলক দেখে চোখ ফিরিয়ে নিলো। পুরোনো স্মৃতি তাড়া করছে। কতটা উচ্ছ্বাস আর খুশি নিয়ে কাঁকন দ্বিতীয় সন্তানের খবর দিলো অথচ ইশানের সময় সেই সন্তান নষ্ট করার জন্য উদগ্রীব ছিলো। আজকের কাঁকন মা এর রোল প্লে করছে, সেদিনের কাঁকন একজন স্বাধীন চেতা নারীর রোল প্লে করেছে যার জীবনে বিয়ে,স্বামী এবং সন্তান মানেই সফল ক্যারিয়ারের পথে একমাত্র বাঁধা।
ফিরে যাবার সময় হয়েছে। ইশান গাড়িতেই ঘুমিয়ে পড়েছে। রাস্তায় বেশ জ্যাম আজ। মোনা দূর থেকে পুরোটাই খেয়াল করেছে ইমরান এবং কাঁকনের আলাপ। কথাগুলো অস্পষ্ট ছিলো। তবে দুজনের চেহারায় ভেসে উঠেছিলো স্মৃতিকাতরতা। আজ ইমরান অন্যমনস্ক। মোনা নিরব। মোনার খুব কাঁদতে মন চাইছে। মেয়েরা স্বভাবতই হিংসুক। নিজেকে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করে বুঝায় প্রতিবার। যতবার স্বামীর প্রাক্তন সামনে আসে ততবার নিজেকে শক্ত খোলসে বুঝায় কিন্তু আর কত। ভেতরের কষ্ট টা কেউ না দেখুক।
– মোনালিসা…
ইমরানের ডাকে সম্বিত ফিরে এলো। কনিষ্ঠা আঙুলের চাপে অশ্রু টুকু মুছে হাসিমুখে উত্তর দিলো,
– জ্বি।
– মন খারাপ করোনা। খুব সাধারণ, নগন্য একজন ভেবেই না হয় মাফ করে দাও আমাকে। মানুষ তো, তাই কিছু অনুভূতি লুকাতে পারছিনা। যতবার তাকে দেখি ভেসে উঠে আমার হারানো অতীত, সুন্দর কিছু মুহুর্তের মৃত্যু, ইশানের নিরানন্দ শৈশব।
– আমি কি কিছু বলেছি?
ইমরান যেন নিজের মাঝেই নেই। দম আটকে আসছে ওর। রবিনকে মাঝ রাস্তায় গাড়ি থামাতে বললো। বেরিয়ে বোতলের পানিটুকু ঢেলে মুখ ধুয়ে নিলো। এক ঢোক পানি গিলে মোনার দিকে চোখ যেতেই লক্ষ্য করলো মেয়েটা নেতিয়ে পড়েছে। পরপর দুবার দৃষ্টি গেলো ফোলা পেটটার দিকে যেখানে নিজের আরেকটা অস্তিত্ব। সহসা ইমরানের মনে হলো তার মনটা আচানক ভালো হয়ে গেলো। সব ধরনের উদ্বেগ, উচাটন যেন নিমিষেই অন্ধকারে মিলিয়ে গেলো। বোতলের সবটুকু পানিয়ে মুখ ভিজিয়ে গাড়িতে উঠে বসলো। ভেজা মুখে চেয়ে মোনা ওড়না এগিয়ে দিলো। মুচকি হেসে ওড়না দিয়ে মুখ মুছে নিলো। ডোর লাগিয়ে ডান পাশে বসে থাকা তরুণী স্ত্রীকে নিজের সাথে মিশিয়ে কানের কাছে ফিসফিস করে বললো,
– পৃথিবীতে না এসেই ইমরান তনয়া বাবার মনটা ভালো করে দিলো। তোমরা মা-মেয়ে কি ম্যাজিক জানো?
বাম হাত মোনার পেটের উপর রাখলো যতনে। ইমরানের আচরণের আকস্মিক পরিবর্তনে মোনা বেশ চমকে উঠলো। ইমরানের হাতের উপর নিজের হাত রেখে বললো,
– মন ভালো হয়ে গেলো?
উপর নিচ পরপর মাথা নেড়ে বললো,
– হতে বাধ্য। তোমার ভেতরে বাস বলে ভেবোনা শুধু তুমি অনুভব করো। হতেই পারে নাড়ির টান তোমার সাথে। রক্ত আমার, জিন আমার, আত্মাও আমার। তুচ্ছ কারণে মন খারাপ করে তোমার মাঝে বেড়ে উঠা রাজকন্যা এবং ইমরানের রানীকে কষ্ট দেয়ার কি অধিকার আছে এই সামান্য জীবের।
– আপনি সামান্য?
প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৫৪
– নিখুঁত মানুষ অসামান্য, আমি খুঁতে ভরা। সামান্য বললে ভুল হবে তুচ্ছ আমি। তবে ধরনীতে আমার মেয়ে জন্ম নিলে পরিপূর্ণ হবো ইনশা আল্লাহ । মেয়ে চেয়েছিলাম রবের কাছে। এত তাড়াতাড়ি স্বপ্ন সত্যি হতে যাচ্ছে ভাবতে পারিনি।
মোনা হেসে বললো,
– নিশ্চয়ই আল্লাহ সবচেয়ে উত্তম পরিকল্পনাকারী।
— সূরা আনফাল: ৩০
