প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৬০
সাইয়্যারা খান
ভোর সকালে মানুষ দিয়ে গরুর পাঁচ কেজি খাঁটি দুধ আনিয়েছে তৌসিফ। পৌষের বানানো লাচ্ছা সেমাই গুলো তখন পেপারে মুড়ে বক্সে ভরে তৈরী। তৌসিফ অবশ্য সাথে ফলমূলের একটা ঝুড়ি সহ ঘাটের টাটকা মাছ পাঠিয়েছে। পৌষের মুখের হাসি সরছে না। তৌসিফ ওর হাসির মাঝে বিশাল ফারাক খুঁজে পায়। কত পার্থক্য। আগেও তো হাসতো, এখনও হাসে। এই হাসিটা প্রাণবন্ত। বেশ শান্তি আনে বক্ষস্থলে। পৌষের মুখটা চলছে। হেসে হেসে কথা বলছে শ্রেয়ার সাথে। শ্রেয়া বেশ প্রশংসা করছে সেমাইয়ের। শুনে তো তৌসিফেরই খেতে মন টানছে কিন্তু খালি পেটে এত ভারী খাবার তৌসিফ খেতে পারে না। পৌষ ফোন রেখে তৌসিফের নাস্তা দিলো। মিনুকে ডেকে বললো খেয়ে নিতে। তৌসিফ জুসের গ্লাসে মুখ দিতেই পৌষ বললো,
“কে জানি এসেছিলো গতকাল। নাম মনে নেই। পরে আদিও খুঁজতে এলো আপনাকে।”
“বিচার আছে একটা৷”
“আপনি কেন বিচার করেন? আপনি তো চেয়ারম্যান না।”
তৌসিফ বাঁকা চোখে দেখে বউকে। জামাই নিয়ে তার দম্ভের শেষ নেই কিন্তু আড়ালে আবার বাঁশ দিতেও পিছপা হয় না। পৌষকে হাত ধরে তৌসিফ খেতে বসতে বলে। নিরুত্তাপ ভাবেই পৌষ বসে। তৌসিফ রুটি মুখে দিয়ে গিলে বললো,
“আজ বেরুব বুঝলে?”
“কেন? কার ম রা গাড়তে হবে?”
তৌসিফ চোখ বড় করে শাঁসালো। মুখের ভাষা সংযত করতে বললো। পৌষ দুই হাত একটু উঁচু করে বললো,
“চেষ্টা করি। হয় না।”
হাতাশার শ্বাস ফেলে তৌসিফ। এমন ঘাড়ত্যাড়া বউ তার কপালেই ছিলো। নিতান্তই তৌসিফ শান্তশিষ্ট একজন স্বামী যাকে তার বউ অ-স্বামী ডাকতেও পিছপা হয় না। রাগী হলে এই বউ ভর্তা করে ফেলতো তৌসিফ। একদম চটকে খেয়ে নিতো। তৌসিফ বুয়াকে ডাকতেই তাড়াক করে উঠে চলে গেলো পৌষ। ফিরে এলো জনাবের কফি নিয়ে। পাংশুটে মুখ করা তৌসিফকে দেখে বললো,
“থোতাটা এমন ভোতা করে রেখেছেন কেন? আরে বাবা, আচ্ছা আর বলব না। আর কারো ম রা আমি পৌষ গাড়ব না।”
“পৌষরাত!”
চাপা ধমকে নিজের নাম শুনে দাঁত বের করে হাসে পৌষ। তৌসিফ কফির কাপ হাতে নিয়ে শুধায়,
“পাসপোর্ট অফিসে যাব।”
“আমি যাব না।”
“সবকিছুতেই তোমার ত্যাড়ামো কেন থাকতে হবে?”
“কারণ আমি জন্মের ত্যড়া।”
তৌসিফ কিছু বলবে কিন্তু তার আগেই পৌষ কপাল কুঁচকে তাকালো। ইশারায় ভ্রুঁ কুঁচকে তাকালো তৌসিফ। যেন জিজ্ঞেস করলো সমস্যা কি? পৌষ উত্তর দিলো না। চুপচাপ উঠে গেলো। বড় বড় পা বাড়িয়ে রুমে চলে এলো। কেমন টক টক ঢেকুর উঠছে। গ্যাস হলো নাকি? বাথরুমে ঢুখে চোখে, মুখে পানি দিতেই হঠাৎ শরীর ঘেমে উঠলো একদম। মিনিটের মধ্যেই শরীর ঝাঁকি দিয়ে ঠান্ডা লাগলো। পৌষ ভেজা মুখেই বিছানায় উঠে গেলো৷ এক গ্লাস পানি খেয়ে শুয়ে পরলো তারাতাড়ি। হঠাৎ করে তার মাথা ঘুরছে। চার হাত পা ছড়িয়ে হা করে শ্বাস নিলো পৌষ। গায়ে কাঁথা টানার শক্তি পাচ্ছে না৷ জ্বর আসছে কি? হতেও পারে। ওসবের ধার আবার পৌষ ধারে না। একটা নাপা গিলবে শুধু। ব্যাস ঝামেলা শেষ।
পলকের চিন্তার শেষ নেই। তুহিন আসছে। খুব তারাতাড়ি তার আগমন হচ্ছে তালুকদার বাড়ীতে। একদিকে যেমন খুশি লাগছে, অন্যদিকে তেমনই অস্থিরতা আর ভয়। পলক তো এতদিন ইচ্ছে মতো খেয়েছে। ওজন বেড়েছে। এখন এত অল্প সময়ে কমাবে কিভাবে? তুহিন তো ফুলা গাল পছন্দ করে না৷ জ লাইনটা কাট কাট চাই তার কিন্তু পলক স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে তার ডাবল চিন সামান্য বুঝা যাচ্ছে। রাগে, দুঃখে কান্না পেয়ে গেলো ওর। হাতের কাছে থাকা ফুলদানিটা আঁচড়ে ফেলতেই কলি দৌড়ে এলো ঘরে। পলকের বেহাল দশা দেখে কিছুটা আঁতকে উঠলো। পলক কলিকে দেখেই ডাকলো৷ কলি এগিয়ে আসতেই পলক জিজ্ঞেস করলো,
“দেখ তো আমাকে কেমন লাগছে?”
“সু..সুন্দর লাগছে মামি।”
“ভালো করে দেখ। মোটা লাগছে?”
“না তো। অতটাও না।”
“কতটা?”
“মোটা লাগছে না।”
“চিকন লাগছে? চোখ ধাধানো সুন্দর লাগছে?”
পলকের অস্বাভাবিক প্রশ্নে ঘাবড়ে যায় কলি। এসব নতুন না৷ পলক তুহিনের জন্য পা গল না বরং উন্মাদ। আসবে শোনার পর থেকে কেমন অদ্ভুত আচরণ করছে। মুখের মধ্যে একের পর এক ক্রিম লাগিয়ে যাচ্ছে। যাচ্ছেতাই অবস্থা করছে নিজের। কলির তো আজকাল মনে হয় নেশাখোর, গাঞ্জাখোর তুহিন মামা না বরং তার বউ পলক।
বিকেল নাগাদ এতদিন পর বাসায় তাহমিনার আগমন। এসেছে তৌসিফ আর পৌষকে দেখতে। পৌষ যত্ন-আত্তিতে কমতি রাখছে না। রাতের খাবার খায়িয়ে ছাড়বে। তাহমিনা জানিয়েছে শুধু চা নিবে। পৌষ চায়ের সাথে পিঠা বানাচ্ছে। গরম গরম পাটিসাপটা। তৌসিফ আর তাহমিনা কথা বলছে তখন। সকালে বের হয়েও বউয়ের চাপে দুপুর নাগাদ বাসায় ফিরেছে তৌসিফ। সে নাকি অসুস্থ, দুপুরে ঔষধ আছে। তৌসিফের অবশ্য নিজেরও সামান্য পিঠ ব্যথা অনুভব হচ্ছিলো। বউয়ের ঘ্যানঘ্যানে বাসায় এসে উপহার হয়েছে বটে। বেশ সেবা পেয়েছে সে। তাহমিনা ভাইয়ের মাথায় হাত রাখলো। তৌসিফ সামান্য হাসলো। বললো,
“ঠিক আছি আপা।”
“রেগে আছিস? কতদিন দেখতে এলাম না।”
“অসুস্থ ছিলে তুমি। জানি আমি।”
“এত খোঁজ রাখিস এখনও?”
“র ক্ত তো ফেলে দেওয়া যায় না আপা।”
“তুই চাচির মতো।”
“জানি।”
“তুহিন আসছে?”
খানিকটা ইতস্তত করে তাহমিনা। তৌসিফ বোনের হাত ধরে। বেশ স্বাভাবিক ভাবে জানায়,
“পাপ করেছিলে, প্রায়শ্চিত্ত করেছো। যথেষ্ট আপা। তুহিন আসছে।”
“ও আমাকে অনেক জ্বালিয়েছে।”
“কিছুটা স্বেচ্ছায় জ্বলেছো তুমি।”
“পিঠা চলে এসেছে। একদম গরম গরম।”
হাতে বড় একটা ট্রে। সেখানে বড় বড় পাটিসাপটা বানিয়ে এনেছে পৌষ। দেখতেই লোভনীয়। তাহমিনা বেশ সময় নিয়ে তাকিয়ে দেখলো অতঃপর চওড়া মুখে হেসে বললো,
“এতো মা-চাচীদের হাতের পিঠা পৌষ। এত বড় আর ভরা পাটিসাপটা খুব কম মানুষ বানায়।”
পৌষ হাসলো। সে তো এভাবেই বানায় কিন্তু খায় না। মন তো ছোট থেকে পিঠাপুলিতে আটকে যা নসিবে জুটতো না। তৌসিফ কথার ফাঁকে দুটো খেয়েছে। পৌষ চোখ জুড়িয়ে গেলো তা দেখে। লোকটার পেট এত লাগানো, কবে যে খায়িয়ে খায়িয়ে পৌষ ফুলাবে? উফ!
পা বাড়িয়ে যেতে যেতে পৌষ বললো,
“আদিদের বাসায় পাঠালাম, ঠিক আছে?”
তৌসিফ কথা বলে না। পৌষ মিনুকে দিয়ে পাঠায় দুই ফ্ল্যাটে। আজ সন্ধ্যাটা এখানেই কাটায় তাহমিনা। যাওয়ার কালে সেধে মায়ের জন্য পিঠা নিলো। পৌষ খানিক লজ্জা পায়। তার একদমই খেয়াল ছিলো না ওখানে পাঠাতে। তাহমিনা ওর গালে হাত দিয়ে দোয়া করে। বলে,
“আম্মা দেখলে খুব খুশি হবে বুঝলে পৌষ? এখনকার বুয়ারা কি আর পারে এমন পিঠা বানাতে?”
“আমি অনেক পিঠা বানাতে পারি আপা। আপনাকে পাঠাব বানিয়ে।”
তাহমিনা হাসে। বিদায় নেয় সেখান থেকে। পৌষ তৌসিফের কাছে গেলো সরাসরি। একটু কাছ ঘেঁষে বসলো। ফোনে কথোপকথনে পৌষ বুঝলো হেমন্তের সাথে কথা বলছে। চোখ দুটো সহসা বড় হয়ে গেলো ওর। ওপাশে পিহা চেঁচাচ্ছে। শ্রেয়ার লেবার পেইন উঠেছে। সমান তালে কাঁদছে ইনি, মিনি। পৌষ খলবলিয়ে উঠলো সহসা। দাঁত চেপে ফোন কেড়ে নিয়ে চেঁচামেচি শুরু করলো। দরদর করে ঘামছে হেমন্ত। পৌষ চেঁচিয়ে ডাকলো,
“হেমু ভাই! বাবু হয়েছে?”
“পেইন উঠেছে।”
“তুমি কই?”
“বাড়ীতে।”
“মগা তুমি? হাসপাতালে নিয়ে এসো। আসছি আমি।”
ফোনটা রেখে পৌষ এক দৌড়ে ঘরে গিয়ে বোরকা জড়ালো গায়ে। তৌসিফ সামনেই দাঁড়িয়ে। পৌষ একদমে বলে উঠলো,
“আপনি অসুস্থ। বাসায় থাকুন। আমি হেমু ভাইয়ের কাছে যাচ্ছি।”
বউকে পাত্তা দিলো না তৌসিফ। নেকাবটা একটু টেনে ঠিক করে দিয়ে বললো,
“দুটো মিনিট দাঁড়াও।”
পৌষ অবশ্য দাঁড়ালো না। চঞ্চল পায়ে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে এলো। দোয়া দুরুদ পড়তে লাগলো মুখে মুখে। তৌসিফ চুল আঁচড়ে মুখে একটু মসচুরাইজার লাগিয়ে বেরিয়ে এলো। তার চকচকে মুখটা পৌষ দেখে নি নাহয় কুরুক্ষেত্র এখানেই একদফা হয়ে যেতো।
হাসপাতালের পরিস্থিতি উত্তপ্ত। জৈষ্ঠ্য আর চৈত্র র ক্ত দিতে প্রস্তুত। শ্রেয়ার সামান্য ব্লাড লাগতে পারে বলে ডাক্তার জানিয়েছে। হেমন্ত বারবার ঘাম মুছছে। বাড়ীর সকলে হাজির হাসপাতালে। করিডোর ভর্তি মানুষজন। তৌসিফের সাথেই তো চার পাঁচজন এসেছে। যখন যা লাগছে দৌড়ে করছে। পিহাকে নিজের সাথে জড়িয়ে ছিলো পৌষ। চোখ মুছিয়ে এগিয়ে এলো হেমন্তের কাছে। হেমন্তের দুই বাহুতে তার দুই ছোট্ট পুতুল। ভাইকে কাঁদতে নিষেধ করছে। গালে আদর করে দিচ্ছে। চাইলেও পৌষ সেটা করতে পারবে না। নিঃস্তব্ধ পায়ে এগিয়ে এসে পৌষ ডাকলো,
“হেমু ভাই?”
চোখ তুলে তাকালো হেমন্ত। পৌষ ভাইয়ের চোখে তাকিয়ে বললো,
“চিন্তা করো না হেমু ভাই। ভাবী সুস্থ থাকবেন৷ তুমি স্বামী, বাবা হবে। গিয়ে নফল পড়ে এসো। দৌড়ে যাও তো। এখানে কিছু লাগলে আমার উনি দেখবেন।”
“তোমাল উনি তে আপা?”
“ঐ যে সুন্দর দেখতে দামড়া ব্যাটাটা, ওটাই আমার উনি।”
হেমন্ত মৃদু হাসলো। উঠে গেলো নামাজে। তার অস্থির লাগছে। তৌসিফ আড় চোখে তাকিয়ে। সামান্য শুনেছে সে। দামড়া শব্দটা একদম কানে বিঁধেছে। পৌষ হাত বাড়িয়ে ডাকতেই এক দুই পা করে এগিয়ে আসে তৌসিফ। পৌষ নিজের পাশে থাকা সিটে হাত দিয়ে বললো,
“বসুন। এমনিতেই অসুস্থ।”
তৌসিফ বসলো। ইনি, মিনি কেন জানি একটু একটু এগিয়ে এলো। গা ঘেঁষলো। পৌষ চোখ দুটো ছোট ছোট করে বললো,
“কিরে? আমার জামাইয়ের দিকে দুবোনের এত নজর কেন? শালী আধি ঘাড় ওয়ালি হবি?”
“তোমাল উনি তো আমাল দুতাবাই।”
“ইশ রে, ভাই ডাক। শুধু ভাই।”
“দুতাবাই।”
প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৫৯
পৌষ চোখ গরম করে তাকালো৷ তৌসিফ বউয়ের কাজকর্ম দেখে বেশ বিস্মিত। এই দুধের দাঁত ওয়ালা শালীদের সাথে কিনা তার বউ তাকে দেখে জ্বলছে। এদিকে যদি জানে তরতাজা গার্লফ্রেন্ড নিয়ে তৌসিফ এদিক ওদিক হাঁটতো তাহলে নিশ্চিত গলা কে টে দিতো। ঢোক গিললো তৌসিফ। গার্লফ্রেন্ড সংখ্যা বলা যাবে না৷ একদমই না৷ বউ তাকে জিন্দা কবর দিবে তাহলে।”
শালী দুটোকে কোলে তুলে বসে রইলো তৌসিফ। একদম চুপচাপ। ইনি, মিনি আবার চালাক বটে। ফট করে গলা জড়িয়ে ধরলো তার। পৌষ ফুঁসছে, বেশ ফুঁসছে সে।
