প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৫৯
নওরিন কবির তিশা
ভাদ্রের শেষ আর আশ্বিনের শুরু—শরতের এই মাহেন্দ্রক্ষণে আকাশ যেন আজ ধোয়া তুলোর মতো সাদা মেঘের ভেলায় সেজেছে। খুলনার ভৈরব নদের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা সেই বিশাল কমিউনিটি সেন্টারটি আজ যেন কোনো রাজকীয় প্রাসাদের রূপ নিয়েছে। চারদিকে কাশফুলের দোলা আর শিউলি ফুলের মিষ্টি ঘ্রাণে ম ম করছে চারপাশ।
আজকের দিনটা যেন অন্য দিনগুলোর চেয়ে একটু বেশিই সুন্দর, একটু বেশিই মায়াবী।তিহু-নীলের পরিণয়ের পূর্ববর্তী হলুদিয়া আয়োজন আজ।তবে এই আয়োজনে নেই কোনো কৃত্রিম আধুনিকতার ছোঁয়া। নীল–তিহুর ইচ্ছাতেই পুরো বিয়ের তোড়জোড় করা হয়েছে নব্বই দশকের সেই চিরায়ত বাঙালিয়ানা রীতিতে। ঝকঝকে নিয়ন আলোর বদলে ব্যবহার করা হয়েছে সারি সারি টুনি লাইট।
কৃত্রিম ফুলের পরিবর্তে সতেজ ফুলের গন্ধ আর সৌন্দর্যে আবৃত অঙ্গন।সেই সময়ের সেই আভিজাত্য যেন প্রতিটি কোণায় ফুটে উঠেছে।
ঘড়ির কাঁটায় সকাল ১১ টা ছুঁই ছুঁই। হলুদের আয়োজনে মুখরিত ও কমিউনিটি প্রাঙ্গণ। পুরো প্রাঙ্গণ জুড়ে হলুদের ছোঁয়া। গাঁদা ফুলের মালায় ছেয়ে গেছে চারপাশ, আর মাটির সরা-কুলা দিয়ে সাজানো হয়েছে প্রবেশপথ।প্রবীণেরা হলুদ বাড়ছেন আর নবকুড়ি গুলো সেগুলো মাখাচ্ছে একে অপরের গন্ডদেশ বরাবর। দূরে তৈরিকৃত পুষ্পাসনে বসে আছে আয়োজন এর প্রধান উপলক্ষ। এমপি ওয়াহাজ খান নীলের অর্ধাঙ্গিনী নুরাইন ওয়াহাজ খান।
কৃত্রিম সাজসজ্জাহীন তাকে মনে হচ্ছে যেন প্রাচীন কাব্যের মলাট থেকে উঠে আসা কোনো এক মায়াবিনী যে বর্তমানের আসীন হয়েছেন। তার পরনে কোনো জমকালো পোশাক নেই বরং আছে নব্বই দশকের সেই চিরচেনা আভিজাত্যে ঘেরা সরু লাল পাড়ের একটি বাসন্তী রঙের সুতি শাড়ি। সেই শাড়ি পরার ধরনেও রয়েছে বাঙালিয়ানার ছোঁয়া। নিপুণভাবে কুঁচি করা শাড়ির আঁচলটা তার বাম কাঁধে পিন করা, যা তার ছিপছিপে গড়নকে আরও মোহনীয় করে তুলেছে।
তিহুর রূপ আজ কোনো প্রসাধন সামগ্রীর ওপর নির্ভর করেনি। তার কপালে জ্বলজ্বল করছে ছোট্ট একটি কালো টিপ,আর দু’চোখে লেপে দেওয়া হয়েছে ঘন কালো কাজল। কাজলরাঙা সেই চোখ দুটিতে আজ রাজ্যের লজ্জা আর সুখের লুকোচুরি। তার দীর্ঘ কেশরাশি পিঠের ওপর খোলা নেই, বরং পরম যত্নে একটি বেণী করা হয়েছে। সেই বেণীর ভাঁজে ভাঁজে গেঁথে দেওয়া হয়েছে তাজা শিউলি আর বেলী ফুলের মালা।
গলায় নেই কোনো হীরে-জহরত,তার বদলে সেথায় শোভা পাচ্ছে গাঁদা আর রজনীগন্ধার তৈরি সতেজ ফুলের গয়না। কানেও ফুলের তৈরি বড় বড় ঝুমকো দুল, যা প্রতিটি নড়াচড়ায় তার চিবুক ছুঁয়ে যাচ্ছে। হাতের কবজি ভর্তি রেশমি লাল আর হলুদ রঙের চুড়ি—যাদের টুংটাং শব্দে নিস্তব্ধতাও যেন সুর খুঁজে পাচ্ছে।
রোদের এক চিলতে আভা যখন তিহুর হলুদ মাখা মুখখানিতে এসে পড়ছে, তখন তাকে ঠিক যেন ভাদ্রের তপ্ত দুপুরে এক পশলা বৃষ্টির মতো স্নিগ্ধ দেখাচ্ছে। আত্মীয়রা এক পলক তাকিয়েই যেন চোখ সরাতে পারছে না।তিহুর প্রতিটি অঙ্গভঙ্গিতে আজ মিশে আছে এক অদ্ভুত সারল্য, যা আজকের এই যান্ত্রিক যুগে খুঁজে পাওয়া ভার। তাই তার থেকে দৃষ্টি ফেরানোটাও দুষ্কর উপস্থিত সকলের পক্ষে।
হঠাৎ মাহা,নাহা,ফারিন তাদের এতক্ষণ যাবৎ পরিকল্পিত দুষ্টুমিটার সূচনা করল। তাদের সাথে যুক্ত হল শিশির আর আনায়াও। কাল একটা বিশেষ কারণে আনায়া না আসতে পারলেও আজকে ঠিকই উপস্থিত সে। সবাই মিলে হলুদের বাটি থেকে মুঠো ভর্তি হলুদ তুলল।
অতঃপর পরনের শাড়িটা হাতের সাহায্যে সামান্য উঁচিয়ে ছুট্টে গেল তিহুর কাছাকাছি। প্রত্যেকটা হাতের ছোঁয়ায় হলুদ হয়ে উঠল তিহুর লাবণ্যময়ী মুখশ্রী।তিহুর মুখে হলুদ ছুঁয়েই তার প্রাণ সখী মাহা গান ধরল সুরেলা কন্ঠে,,
🎶 এলো যে এলো খুশির লগন…..
এলো যে এলো খুশির লগন…..
আসবে সে তাই লাজে রাঙা মন…..
আসবে সে তাই লাজে রাঙা মন…..
মেতেছে আনন্দে আজ প্রাণ যে…..🎶
পাশ থেকেই সবগুলো একযোগে গেয়ে উঠলো,,
🎶 বরণডালা সাজা উলু দে শাঁখ বাজা….
কণ্যে হবে আজ শিমুন্দিনী….
ফুলেরই মালায়…
কাজলে আলতায়….
কন্যে আমাদের গৌরবিনী..🎶
শিল-পাটায় হলুদ বাঁটা থামিয়ে প্রবীণরা আড়চোখে চাইলেন পুষ্পাসনের দিকে। সবার মুখে এক চিলতে তৃপ্তির হাসি—ঠিক এভাবেই তো নব্বইয়ের দশকের বিয়েগুলোতে প্রাণের স্পন্দন খুঁজে পাওয়া যেত। প্রবীণদের সেই অভিজ্ঞ হাতের হলুদ বাটার গতি যেন কিছুটা মন্থর হয়ে এল এই আনন্দের জোয়ারে।
রাফা, সারা, আর পিহু—বাড়ির এই চঞ্চল কিশোরী বাহিনী এতক্ষণ শুধু দেখছিল, কিন্তু গানের সুর কানে যেতেই তারা আর স্থির থাকতে পারল না। পিহু গিয়ে মাহার হাত ধরল, যোগ হলো সারা আর রাফাও। তাদের এই প্রাণবন্ত কলকাকলিতে যেন বিয়ের আসরে নতুন প্রাণের সঞ্চার হলো।
মাহা, নাহা আর ফারিন একে অপরের দিকে চোখ টিপলো। আনায়া আর শিশিরও তৈরি। তারা পাঁচজন মিলে একযোগে গিয়ে তিহুর দুই হাত ধরল। তিহু কিছুটা হকচকিয়ে গেল, লাজুক কণ্ঠে বলল,,
—’আরে কি করছিস তোরা!
কিন্তু কে শোনে কার কথা! মাহা হাসতে হাসতে বলল,,
—-‘ডোন্ট শাই সুইটহার্ট।
তারা চারজন মিলে প্রায় জোর করেই তিহুকে সেই পুষ্পাসন থেকে টেনে নামাল আসরের মাঝখানে। তিহুর রেশমি চুড়ির রিনঝিন শব্দ আর তার পায়ে পরা আলতার রাঙা আভা যেন মাটির মেঝেকেও রঙিন করে তুলছে।সবাই গোল হয়ে ঘিরে দাঁড়াল তাকে। মাঝখানে তিহু, ঠিক যেন এক গুচ্ছ র”ক্তরাঙা গোলাপের মাঝে একটি স্নিগ্ধ শিউলি। মাহার গানের রেশ ধরে এবার তিহুর পালা। তিহু শুরুতে একটু ইতস্তত করলেও, চারপাশের এই অকৃত্রিম ভালোবাসা আর নিজের মনের কোণে জমে থাকা নীলকে পাওয়ার সুখানুভূতি তাকে সাহস দিল। সে তার কাজলরাঙা চোখ জোড়া এক পলক বন্ধ করে গভীর শ্বাস নিল,পরক্ষণেই সে গাইতে শুরু করল এক অদ্ভুত মায়াবী সুরে,,,
🎶 দুরু দুরু বুক কাঁপে কেন আজ….
ভয় লাজে মরি….
জাদুর কাঠি ছুঁইয়ে দিল….
যেন এক পরি….
নিজেরই কাছে নিজেই আজ তাই অচেনা যে আমি….
যেন বদলে গেছি এক পলকে…..🎶
হলুদের অনুষ্ঠানে কনের এমন গান হয়তো বড্ড অপরিচিত উপস্থিত লোকজনের সম্মুখে। তারা মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় চেয়ে আছে কনের দিকে। সকলে বেশ ভালোই অনুভব করছে প্রিয় মানুষটার সাথে যদি কেউ পূর্ণতা পায় তাহলে তার আনন্দ ঠিক কতখানি হয়।
কমিউনিটি সেন্টারের অন্য প্রান্তটিও আজ সেজেছে এক ভিন্ন আভিজাত্যে। তিহুর দিকটা যেমন স্নিগ্ধ আর মায়াবী, নীলের দিকটা তেমনি পৌরুষদীপ্ত আর উৎসবমুখর। বিশাল হলঘরের মাঝখানে বাঁশ আর শীতল পাটি দিয়ে আভিজাত্যের ছোঁয়ায় তৈরি করা হয়েছে একটি মাচা, যার চারপাশ ঘিরে ঝুলছে কাঁচা আমপাতা আর গাঁদা ফুলের ঘন মালা। মাঝখানে রাখা একটি কাঠের কারুকার্যখচিত পিঁড়ি, যেখানে আজকের অনুষ্ঠানের মধ্যমণি—ওয়াহাজ খান নীল আসীন।
নীলের পরনে আজ কোনো দামী ডিজাইনার পাঞ্জাবি নেই। সে পরেছে তসরের সিল্কের একটি ঘিয়ে রঙের আদ্দির পাঞ্জাবি, যার গলায় আর হাতায় সূক্ষ্ম সুতোর কাজ। পাঞ্জাবির বোতামগুলো খোলা, যা তার চওড়া কাঁধ আর ব্যক্তিত্বে এক ধরনের শিথিল আভিজাত্য এনে দিয়েছে। তার সুঠাম দেহ আর ফর্সা গায়ের রঙে সেই ঘিয়ে রঙটি যেন এক অন্যরকম দ্যুতি ছড়াচ্ছে।
নীল সাধারণত গম্ভীর স্বভাবের হলেও আজ তার মুখে লেগে আছে এক চিলতে প্রশান্তির হাসি। তার বন্ধু আর অনুসারীদের ভিড়ে ঘরটি সরগরম। নীলের ভাইদের দল মিলে তাকে ঘিরে ধরেছে। তাদের পরনেও পাঞ্জাবি তবে রঙে রয়েছে ভিন্নতা।
হঠাৎ করেই নীলের ডান হাত ধরে টান দিল রাওফিন। নীল ভ্রু কুঁচকে হাসল,,
—’কী শুরু করলি তোরা? আমাকে তো শান্তিতে বসতে দিবি!
রাওফিন হাসতে হাসতে বলল,,
—’আজকের দিনে আপনার শান্তি নেই ভাইয়া! আজ শুধু হলুদ আর হুল্লোড়।
নীলের কপালে আর গালে যখন বয়োজ্যেষ্ঠরা পরম মমতায় হলুদের ছোঁয়া দিয়ে যাচ্ছেন, ঠিক তখনই বন্ধুদের দল শুরু করল তাদের হুল্লোড়। নব্বই দশকের সেই বিখ্যাত গানগুলো স্পিকারে বাজছে জোর শব্দে। নীলকে জোর করে টেনে দাঁড় করানো হলো। আজ কেউ আর সেই ভয়াল নেতাকে ভয় পাচ্ছে না, কেননা নেতা সাহেবের চোখে মুখে এক অন্যরকম তৃপ্তি। প্রিয় অর্কিড কে আপন করে পাচ্ছে যে।
সময়টা গোধূলি লগ্ন. আকাশটা কমলাভ। আসন্ন শীতের এক অন্যরকম আবহাওয়া। ঝিরিঝিরি বাতাসে দেহে তোলে শিহরণ। পুরো কমিউনিটি সেন্টার আবৃত হলুদ আর সবুজ পর্দায়। নব্বই দশকের ন্যায় হলুদ সন্ধ্যার আয়োজনের সজ্জিত সেটি। সন্ধ্যার টিমটিমে আলোর মাঝেই কমিউনিটি সেন্টারের ঝুল বারান্দা দিয়ে হাতে অজস্র সাজসজ্জার ডালা নিয়ে এগোচ্ছিল মাহা।
হলুদ সন্ধ্যা আয়োজন নীল আর তিহুর পরিবার একসঙ্গে করায় দুই পরিবারের লোকজনই এক জায়গাতেই উপস্থিত থাকবে।
ঝিরঝিরে বাতাসে বারান্দার লম্বা পর্দাগুলো পতপত করে উড়ছে। হঠাৎ একটি বিশাল পর্দার আড়াল থেকে অতর্কিতে কেউ সামনে এসে দাঁড়াতেই মাহা থমকে গেল। হাতের ডালাটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল, কিন্তু শক্ত দুই জোড়া হাত আলতো করে মাহার হাত আর ডালা দুটোকেই সামলে নিল।
মাহা চমকে চোখ তুলে তাকাল। সামনেই দাঁড়িয়ে রাওফিন। তসরের পাঞ্জাবিতে তাকে আজ অন্যরকম এক আভিজাত্যে ঘিরে রেখেছে। মাহা বুক ভরে শ্বাস নিয়ে রাগান্বিত স্বরে বলল,,
— ‘পাগল নাকি তুমি? এভাবে কেউ ভয় দেখায়? হাত থেকে ডালাটা পড়ে গেলে কী হতো বলো তো?
রাওফিন মাহার হাতের ওপর থেকে নিজের হাত না সরিয়েই একটু ঝুঁকে এল। চোখে দুষ্টুমির হাসি মেখে ফিসফিস করে বলল,,
— ‘ডালা পড়লে ডালা তোলা যেত মাহা, কিন্তু আমার হার্টবিট যে তোমার জন্য থেমে গিয়েছিল, সেটাকে কে ঠিক করতো?
মাহা চোখ পাকিয়ে বলল,,
— ‘নাটক একদম কম করবে রাওফিন। ছাড়ো আমায়, ভেতরে অনেক কাজ বাকি।
রাওফিন ছাড়ল না, বরং আরও একটু কাছে এগিয়ে এল। মাহার কানের কাছে মুখ নিয়ে নরম গলায় বলল,,
— ‘আজকের এই শরতের সন্ধ্যায় তোমাকে ঠিক ওই নীলকণ্ঠী অপ্সরার মতো লাগছে। আচ্ছা বাসন্তী রঙটা কি তোমার জন্যই তৈরি হয়েছিল?
মাহার গাল দুটো মুহূর্তেই লজ্জায় লাল হয়ে গেল। সে চট করে এদিক-ওদিক তাকিয়ে রাওফিনের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে এক পা পিছিয়ে গেল। পরক্ষণেই মলিন হেসে বলল,,
—–‘আমি কিন্তু কালো জনাব, তাই সবসময় প্রশংসা করো না। ডাইজেস্টেশন বলেও তো একটা ব্যাপার আছে নাকি। সব কথা হজম হয় না, কিছু কথা বড্ড গায়ে লাগে…
তাকে কথা শেষ করতে না দিয়েই তার হাত ধরে নিজের দিকে টান মারলো রাওফিন, বক্ষদেশ বরাবর এনে তার গাঢ় লাল রঞ্জকে আবৃত ওষ্টাধরে তর্জনী তর্জনী ঠেকিয়ে সতর্ক সূচক ‘উসসস..’ শব্দ উচ্চারণ করে বলল,,
—–‘লিসেন টু মি লাভ লাইন রঙের খেলায় পৃথিবীর মোহ থাকতে পারে, কিন্তু ভালোবাসার কোনো নির্দিষ্ট বর্ণ হয় না। তামাটে হোক কিংবা শ্বেত শুভ্র—হৃদয় যদি কারোর মলাটে একবার নাম লিখে ফেলে, তবে তার থেকে সুন্দর আর কিছুই হয় না।
—–‘কিন্তু পৃথিবীতে তো সবাই সৌন্দর্যের পূজারী জনাব।
—–‘তাই নাকি?
—-‘হ্যাঁ।
—–‘সাদা যদি এতই সুন্দর হয় তাহলে কাফনের কাপড় দেখলে ভয় পাও কেন? আর কারো যদি এতটাই খারাপ হয় তাহলে চুল সাদা হলে রং করো কেন তাতে?
রাওফিনের অকাট্য যুক্তির মুখে মাহা যেন মুহূর্তেই বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। তার ডাগর চোখের পলক থমকে গেছে রাওফিনের গভীর চোখের মায়ায়। এই একটা প্রশ্ন যেন মাহার মনের সব হীনম্মন্যতাকে এক লহমায় ধুয়ে মুছে সাফ করে দিল।
সে মন্ত্রমুগ্ধের মতো চেয়ে রইল রাওফিনের দিকে। চারপাশের টুনি লাইটের টিমটিমে আলো রাওফিনের তীক্ষ্ণ নাসিকা আর ফর্সা চিবুকে এক মায়াবী ছায়া ফেলেছে। মাহার মনে হলো, এই মানুষটির সামনে দাঁড়ালে নিজের গায়ের রঙ নয়, বরং নিজের অস্তিত্বকেই খুব দামী মনে হয়। বাতাসের ঝাপটায় বারান্দার পর্দাটা একবার তাদের দুজনের মাঝখানে আড়াল তৈরি করল, আবার পরক্ষণেই সরিয়ে দিল।
মাহা আলতো করে রাওফিনের হাত থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিল ঠিকই, কিন্তু এবার তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে তৃপ্তির হাসি। সে ডালার ফুলগুলো একটু ঠিকঠাক করে নিল। রাওফিনের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,,
—’সব উত্তর কি আজকেই দিয়ে শেষ করে ফেলবে? বাজি হারার জন্যও তো কিছু বাকি রাখা দরকার, জনাব!
বলেই মাহা চট করে ঘুরে ভেতরের দিকে হাঁটা দিল। কিন্তু তার দ্রুতপায়ে চলার ভঙ্গিতে আর হাতের চুড়ির শব্দে রাওফিন স্পষ্ট বুঝতে পারল,মেয়েটা ভেতরে ভেতরে কতটা টালমাটাল। রাওফিন বারান্দার রেলিংয়ে হেলান দিয়ে মাহার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। শরতের এই উদাস হাওয়া আর মাহার শাড়ির বাসন্তী রঙ যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।
পেছন থেকে কেউ একজন ডাক দিতেই রাওফিন নিজেকে সামলে নিল। মুচকি হেসে বিড়বিড় করে বলল,,
——‘রঙ দিয়ে নয় মাহা, তোমাকে আমি তোমার ওই অভিমানী মন দিয়েই জিতে নেব।
সন্ধ্যার পরিবেশটা মায়াবী। যেন কোনো স্বপ্নপুরী। নব্বই দশকের ন্যায় মোমবাতির নিয়ন আলোয় এ যেন এক মায়াবী কুহক। ভেতরে গুচ্ছে গুচ্ছে তাজা ফুলের সুবাস ম’ম করছে। দৃষ্টিনন্দন পরিবেশ সেই সঙ্গে দৃষ্টি কাড়ে উপস্থিত সকলের পোশাক আশাক। সকলের সেজেছে নব্বই দশকের সাজে। রমনীদের প্রত্যেকের শাড়ি পরার ধরনে সেই নব্বই দশকের সিগনেচার স্টাইল—সরু কুঁচি করা আঁচলটা পিন দিয়ে কাঁধে আঁটসাঁট করে আটকানো। আধুনিক স্লিভলেস ব্লাউজের বালাই নেই; সবার পরনেই কনুই পর্যন্ত লম্বা হাতার ব্লাউজ, যার বর্ডারে সামান্য সুতোর কাজ।
প্রত্যেকের কেশবিন্যাসে পরম যত্নে করা হয়েছে বড় গোল খোপা। আর সেই খোপাকে গোল করে ঘিরে রাখা হয়েছে তাজা বেলী ফুলের মালায়। কেউ বা আবার কানের পাশে গুঁজে রেখেছে একটি বড় লাল গোলাপ। আর বাড়ির পুরুষ গুলোর পরনে একরঙা পাঞ্জাবি। নবকুড়ি গুলো কাঁধে আড়াআড়িভাবে রাখা পাতলা দোপাট্টা।
উপস্থিত নীল-তিহুর পরিবারের সকলের এসেছে মাহা রিশাদের পরিবারও। সেই সাথে নীলের মামা বাড়ির সকলে। সৌভিক,কুহেলিকা,জুনাইয়া,ফারিসা,ফাহাদ, জুনায়েদ,সামির সকলে।সম্মুখের পুষ্পাসনে বসে আছে নীল তিহু।তাদের মাঝে গাধা শিউলির মিশ্রণে তৈরি একটি বিশাল পর্দা দিয়ে বিভাজন করা হয়েছে। তবে সেই পর্দার ফাঁক গলিয়ে নীল বারংবার দেখছে প্রিয়তমাকে নিয়ন আলোয় সকলের অগোচরে।
হঠাৎ নিয়ন আলোয় তিহুর সম্মুখে হাজির হলো রাফা,নীরা,নাহা আর নিহিত,ফারিসা,ফাহাদ,সামির, জুনায়েদ একযোগে তারা গেয়ে উঠল,,
🎶 বধু সেজে থেকো গো লক্ষী ভাবি…
তুমি হলে ভাই আর প্রাণেরই চাবি….🎶
তাদের গানে মিটি মিটি হাসছে উপস্থিত সকলে। হঠাৎ-ই মেয়েগুলোকে এক সাইডে সরিয়ে দিয়ে নিহিত,সামির, জুনায়েদ, ফাহাদ তিহুর উদ্দেশ্যে গিয়ে উঠলো,,
🎶 গুলুগুলু ভাবিজান..
আমরা তোমার দেওরা কালাচান…
ওহ..গুলুগুলু ভাবিজান..
আমরা তোমার দেওরা কালাচান…
তোমারে না দেখলে ভাবি….
বাঁচে না পরান….🎶
এদিকে মেয়েগুলো কোমরে হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে ছেলেদের এমন কাণ্ডে। মাহা,পিহু,রাফা,সারাকে নিয়ে পাশে সরে এসেছে। যেহেতু তারা সম্পর্কে নীলের শালী তাই অন্য ছক কষছে। ছেলেগুলো সরে যেতেই তারা নীলকে ঘিরে ধরে গেয়ে উঠলো,,
🎶 দুলাভাই দুলাভাই…
ও আমাদের দুলাভাই….
দুলাভাই দুলাভাই…
ও আমাদের দুলাভাই….
চলেন না সিনেমা দেখিতে আজি যাই…
সিনেমার নাম নাকি তোমাকে চাই…🎶
তাদের এমন কাণ্ডে হেসে কুটি কুটি সকলে। সশব্দে হেসে উঠেছে কেউ কেউ। বেচারা নীল পরেছে বিরম্বনায়। তাদের সকলকে সরিয়ে নাসরিন হক কিছুটা রাগী কন্ঠে বললেন,,
—-‘বাদর গুলো সর। আমাদের সাধের জামাইটাকে কি করে জ্বালাচ্ছে!
তারা মুখ ভেংচি কেটে সরে আসলো। হাসি আড্ডায় অতিবাহিত হতে লাগলো মুহূর্তগুলো।হঠাৎ সবাইকে অবাক করে দিয়ে ওয়ালিদ খান মির্জা সূচনার হাত ধরে টেনে উঠিয়ে গেয়ে উঠলেন,,
…..🎶 বলো না কিউঁ ইয়ে চাঁদ সিতারে
(বলো না, কেন এই চাঁদ আর তারাগুলোকে)
লাগতে হ্যায় ইউঁ মুখড়ে সে তুমহারে…
(তোমার মুখের মতোই মনে হয়?)
ঝুকে বদন পে হাওয়ায়েঁ হ্যায় মেহকি…
(এই নুয়ে পড়া শরীরে মাতাল হাওয়ার সুবাস)
রাত ভি হ্যায় কুছ বেহকি বেহকি…
(রাতটাও আজ কেন জানি বড্ড দিশেহারা)🎶
ওয়ালিদ খানের এমন কান্ডে ইতিমধ্যে বাকরুদ্ধ সকলে। মির্জা সূচনা বিস্ফোরিত নয়নে চেয়ে আছেন। মুখ চেপে হাসছেন প্রবীণরা। এদিকে তাদের এমন কাণ্ডে রাওফিন মাহার পাশ ঘেঁষে এসে দাঁড়িয়ে বলল,,
—-‘চলো না লাভলাইন। আমরাও একটা ডান্স করি। দেখো মামু মামিমা কেমন দারুন একটা পারফর্মেন্স করলো। চলো না আমরাও যাই!
মাহা কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,,—‘তারা করেছেন কারণ তারা ম্যারিড। তুমি আমি ম্যারিড?
রাওফিন বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে বলল,,—‘এখানে বিয়ের কি সম্পর্ক?
—-‘বিয়েই সব!
‘আরে আসো তো!’—-বলেই রাওফিন একটানে মাহাকে সকলের সামনে নিয়ে আসলো। মাহা বিস্ফোরিত নয়নে চেয়ে দ্রুত সেখান থেকে প্রস্থান করতে যেতেই রাওফিন তার ওড়নার আঁচল টেনে গেয়ে উঠল,,
🎶আভি তো ইয়ে প্যাহেলি মাঞ্জিল হ্যায়
(এটা তো কেবল প্রথম ধাপ)
তুম তো আভি সে ঘাবরা গায়ে
(তুমি তো এখনই ঘাবড়ে গেলে!)
মেরা কেয়া হোগা….
(আমার কি হবে?)
সোচো তো জারা…
(একটু ভেবে দেখো তো…)🎶
সকলেই অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে মাহা রাওফিনের দিকে। বিশেষত মাহার বাবা-মা। মাহা সকলের দৃষ্টি এড়িয়ে ফের পূর্বের অবস্থানে ফিরে এলো। রাওফিন মিটিমিটি হাসলেও মাহা কটমট দৃষ্টিতে চেয়ে আছে তার দিকে। এদিকে পর্দার কোনো এক ছিদ্র গলিয়ে নীল হাত রাখলো তিহুর হাতে। বিদ্যুৎস্পৃষ্টের ন্যায় কেঁপে উঠল তিহু। বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকালো পাশে। নীলের ঠোঁটে তৃপ্তির হাসি। আল-গোছে সে চেপে ধরল তিহুর কোমল হাতখানা।তিহু হাত ছাড়িয়ে নিতে যেতেই নীল আরও শক্ত করে ধরল হাতখানা।
নওশাদ হক আর ওয়ালিদ খানের বন্ধুত্ব সম্পর্কও সব সময়ই চুলোচুলি মার্কা বলা যায়। ওয়ালিদ খান কিছু করেছেন আর নওশাদ খান সেটা করবে না হতেই পারে না। সেজন্যই ওয়ালিদ খানের পারফর্মেন্সের পর থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছেন নওশাদ হক। তাই মাহা রাওফিন যেতেই তৈয়্যিবা জামানকে নিয়ে তিনি উপস্থিত হলেন সকলের সম্মুখে।
সহধর্মিনীকে নিয়ে গেয়ে উঠলেন,,
প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৫৮
🎶দেখা এক খোয়াব তো ইয়ে সিলসিলে হুয়ে….
(একটি স্বপ্ন দেখেছিলাম, তারপর থেকেই এই সবকিছুর শুরু হলো)
দূর তক নিগাহোঁ মে হ্যায় গুল খিলে হুয়ে….
(দৃষ্টির সীমানা পর্যন্ত কেবল ফুল আর ফুল ফুটে আছে)🎶
তবে এবার আরেকটু মাধুর্য মেশালেন তৈয়্যিবা জামান, স্বামীর সঙ্গে সঙ্গে তিনিও গাইলেন,,
🎶ইয়ে গিলা হ্যায় আপকি নিগাহোঁ সে….
(তোমার চোখের প্রতি আমার এই একটাই অভিযোগ)
ফুল ভি হো দরমিয়াঁ তো ফাসলে হুয়ে….🎶
(মাঝখানে যদি একটা ফুলও থাকে, তবে সেটাও যেন আমাদের মাঝে এক বিশাল দূরত্ব তৈরি করে)
বাবা মাকে আছে এমন খুনসুটিতে দেখে মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় তাকালো তিহু। পরতে পরতে অনুভব করলেও সঠিক মানবকে জীবনে গ্রহণ করার সফলতা।
