Home বিষাদ ও বসন্ত বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৬৬

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৬৬

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৬৬
অলকানন্দা ঐন্দ্রি

আর দিন কয়েক পরেই হিয়ার জন্মদিন। দীপ্র কতকিছু প্ল্যান করেছিল এই জন্মদিন নিয়ে। অথচ..অথচ এই শেষ মুহূর্তে এসে সে জানতে পারল হিয়ার আকদ হয়ে গিয়েছে অন্যের সাথে। দীপ্র বোধহয় চোখ বুঝল। কথাটা বিশ্বাস হতে না চাইলেও কয়েক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়েই রইল। হিয়াকে তখন থেকে কল করে যাচ্ছে। অথচ কল তোলে নি। জানে কল তুললে তখন বলবে যে, ফোন হাতে ছিল না তাই কল রিসিভড করতে পারে নি। কিন্তু দীপ্র জানে, হিয়া ইচ্ছে করেই কল রিসিভড করছে না। এই দিনগুলোতে সে খুব করেই হিয়ার দূরত্ব টানার বিষয়টা খেয়াল করেছে। এবং কি কারণে তাও জানে। দীপ্রর সত্যি সত্যিই ভয় হলো। মেয়েটা জেদ, দূরত্ব টানতে সত্যি সত্যিই আকদ করে ফেলে নি তো? কিন্তু দীপ্রর আম্মু যে বলল সম্বন্ধটা ফেরত গিয়েছে। মিথ্যে বলল কি? দীপ্র বোধহয় কেমন এক যন্ত্রনা অনুভব করর। নিঃশ্বাস নিতেও বোধহয় কষ্ট হচ্ছিল ছেলেটার। দেরি করল না সে। সর্বপ্রথম ছুটে গেল নিজের মায়ের ঘরেই। বুকের ভেতর অস্থিরতা চেপে রেখেই মাকে প্রশ্ন করল,

“ আম্মু? তুমি,তুমি মিথ্যে বলেছো আমায়? তুমি যে বলেছিলে হিয়ার আম্মুর সাথে কথা বলেছিলর? মিথ্যে বলেছো? ”
দীপ্রর মা কপাল কুঁচকালেন বোধহয় ছেলের আকস্মিক প্রশ্ন শুনে। বললেন,
“ কিসের মিথ্যে? ”
“ হিয়ার রিসেন্ট সম্বন্ধ ফেরত গিয়েছিল আম্মু? নাকি সত্যি সত্যি বিয়ে ঠিক হয়েছে? ”
“ ওর আম্মু তো বলেছিল ঠিক হয়নি। ”
“ সত্যি বলছো? আরেকবার কল করো আম্মু। আরেকটাবার জিজ্ঞেস করো তো। ”
দীপ্রর আম্মু বোধহয় ছোটশ্বাস ফেললেন। রাত এগারোটা কি বারোটা। এত রাতে কল দিবে? তাও আবার গ্রামের মানুষ তাড়াতাড়িই ঘুমায়। হয়তো ঘুমিয়েও পড়েছে। ছেলেকে আশ্বস্ত করে বললেন,
“ হিয়ার বিয়ে ঠিক হলে আমি বসে থাকতাম নাকি? আমার ছেলের জন্য ঠিক করে রাখা মেয়েকে অন্য কাউকে দিতাম? ”
দীপ্র শুনল। ছোট্ট করে বলল,

“ তুমি একবার কল করো না। আমি শিওর হতে চাই আম্মু। হিয়া খুব শান্ত গলাতেই বলেছে কথাটা। নিশ্চয় মজা অথবা মিথ্যে বলেনি। ”
“ বলেছে কি? ”
“ ওর নাকি আকদ হয়ে গেছে আম্মু। তুমি ভাবতে পারছো কথাটা সত্যি হলে কি হবে? আমি ওকে এতকাল চেয়ে এসেছি আম্মু। ওর জন্য আমার কত অনুভূতি… ”
এই পর্যায়ে দীপ্রর গলাটা খুবই আহত শোনাল। দীপ্রর মা চাইল। হু, জানে সে কথাটা সত্যি হলে কি হবে। নিজের চোখেই তো দেখেছে নিজের ছেলের পাগলামো গুলো। ভার্সিটিতে এডমিশন টেস্ট দিয়ে ভার্সিটিতে পড়ার ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও হিয়ার জন্য কোচিং এ ভর্তি হয়েছিল। অথচ দীপ্রর স্বপ্ন ছিল বরাবরই বাইরের দেশে পড়বে। সে দীপ্রই কোচিংয়ে ভর্তি হয়ে শুধু শুধু আসা যাওয়া করত। পড়ালেখা করতে যেত নাকি? যেত না। যাওয়ার উদ্দেশ্য ছিল শুধু হিয়া। যে দীপ্রর স্বাস্থ্য ছিল বেশ । ওজনও ছিল স্বাভাবিকের তুলনায় ঢের বেশি সে দীপ্রই নিজের এই দিকটার কারণে হিয়াকে না হারানোর জন্য নিয়ম মেনে খাওয়া দাওয়া শুরু করল। জিম করল। ওজন কমাল। ভুলে গেছেন তিনি? মা হয়ে ছেলেকে বুঝবেন না এমন বোকাও তিনি নন। ছোটশ্বাস ফেললেন তিনি। বললেন,

“ ও হয়তো মজা করেছে আব্বু। দেখবি কিচ্ছু হয়নি। তুই বা এত মজা করতে গিয়েছিস কেন? কষ্ট পায়নি মেয়েটা? ”
“ শুধু দেখতে চেয়েছিলাম আমাকে হারাতে ওর ভয় হয় কিনা। ভেবেছিলাম ও আমাকে হারাতে না পেরে সত্যিই বলে দিবে যে ও আমায় ভালোবাসে আম্মু। অথচ দেখো, ও এতোটাই শক্ত ধাঁচের মেয়ে যে কষ্ট পেল, কাঁদল তবুও আমাকে জানায়নি ও আমাকে ভালোবাসে। ওর চোখে আমাকে হারানোর যন্ত্রণা থাকলেও মুখে ছিল হাসি। আমি যদি ওর না ও হই, দেখবে ও তবুও আমাকে বলবে না। কেন বলে না আম্মু? জানো আম্মু? হিয়া প্রেম ভালোবাসা বিশ্বাস করে না। আমি চেয়েছিলাম,ওর আর আমার সম্পর্কটায় বন্ধুত্বের পরের ধাপই স্বামী স্ত্রী হোক। তাই তো ভেবে রেখেছিলাম এতসব কিছু। ওর জন্মদিনের দিনই আমি ওকে এতবছরের সমস্ত অনুভূতির কথা জানাতাম আম্মু। একটা হালাল বন্ধনে আবদ্ধ হতো ওর আমার সম্পর্কটা। কিন্তু… ”
দীপ্রর মা ছেলের মাথায় হাত বুলালেন। বললেন,
” ধুর। ওসব হিয়া মজা করেছের। তুই বিশ্বাস করিস কি করে? ”
“ হিয়া মিথ্যা বলে না আম্মু। খুব কমই বলে। ”

দীপ্রর মা অবশেষে না পেরেই হিয়ার আম্মুকে কল দিল। এর আগেও বহুবার কথায় কথায় উনি হিয়াকে দীপ্রর জন্য চেয়েছেন। বোনেদের কথাবার্তায় হয়তো মজা হিসেবেই নিয়েছেন সেসব। তবে দীপ্র আসার আগের দিনই উনি পাকাপোক্ত ভাবে হিয়ার হাতটা দীপ্রর জন্য চেয়েছিলেন। জানিয়েছিলেন মেয়েটাকে তার ঘরে নিয়ে আসবে কিন্তু হিয়াকে যাতে না জানায়। তাই তার দৃঢ় বিশ্বাসই হিয়ার আকদ হবে না। তাই প্রথমেই বলল,
“ হিয়া আর দীপ্রর বিষয়টা নিয়ে ভাবতে চাইছিলাম। তুই কি বলিস? দুইজনের একটা কিছু করা উচিত না?”
ওপাশ থেকে উত্তর এল,
“ হিয়ার আব্বুও তো বলছিল। এত সম্বন্ধ আসছে যে নাও করা যায় না। এর থেকে ছোট করে আকদ করে রাখলেও ভালো না? ”

“ হু হু। আমিও এটাই চাইছিলাম। তোরা একমত শুনে খুশি হলাম। ”
অতঃডর আরো কিয়ৎক্ষণ কথা হলো তাদের দুইজনের। দীপ্র শুধু শুনল। তার মানে হিয়া তাকে মিথ্যে বলল? কত বড় বেয়াদব এই মেয়ে! অথচ দীপ্রর নিঃশ্বাস অব্দি বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। দীপ্র পা বাড়িয়েই বিড়বিড় করল,
“ হিয়ার বাচ্চা হিয়া! তোকে কেউ চুরি করে নিয়েছে তাই না? ওয়েট! চুরিটা আমিই করব। ”
এর পর পরই হিয়াকে আরো একবার কল দিল। কল তুলেনি হিয়া। দীপ্র ছোটশ্বাস ফেলল শুধু। না পেরে শেষে হিয়ার সে হলুদ শাড়ি পরা ছবিটাই বার কয়ো দেখে বুকে চেপে ধরল। বিড়বিড় করে বলল,
“ কৈশোরের অনুভূতি বুকে চেপে আর কতকাল নিরব থাকব? এবার আমার হয়ে যা। ”

মিথি মিষ্টিকে কোলে করে এনেছে একটু আগেই। অথচ মেয়েটা তখনও জেগে আছে। বাইরে তখনও ঝুম বৃষ্টি। চারপাশে শীতল হাওয়া। মিথির ঘুম পাচ্ছে। চোখের দৃষ্টি ক্ষীন হয়ে এসেছে যেন। হিমেল তখন মিষ্টিকে কোলে নিয়ে সে বৃষ্টিটাই দেখাচ্ছে জানালার ধারে বসে। বারকয়েক তাকাল মিথির দিকেও। ঘুমে ঝিমাচ্ছে, অথচ ঘুমাচ্ছে না। হিমেল তাকাল আবারও। অতঃপর মিথিকে উদ্দেশ্য করেই বলল,
“ ঘুম না গিয়ে তাকিয়ে আছিস কেন মিথি? ”
মিথি চাইল। উত্তর করল,
“ মিষ্টি? ”
“ মিষ্টিকে ঘুম পাড়িয়ে দিব আমি। তুই ঘুমা।”
মিথি তবুও ঘুমাল না। ঐভাবেই বসে থাকল খাটের কিনারায়। হিমেল ছোটশ্বাস ফেলে। এক পর্যায়ে মিষ্টির দিকে চেয়ে বলল,

“ আম্মু? ঘুমাবে না? নাকি বৃষ্টি দেখবে?”
মিষ্টি বেশ আয়েশ করেই উত্তর দিল,
“ বৃততি.. ”
হিমেল হাসল। আরেকটু সময় ওভাবেই বসে থাকতে থাকতে দেখল মিথি খাটের সাথে থাকা দেওয়ালে হেলান দিয়েছে। চোখ ততক্ষনে বুঝে এসেছে। ঝিমাতে ঝিমাতে মাথাটা প্রায় পড়ে যাচ্ছে তখনই উঠে গিয়ে আলতো করে ধরল হিমেল।মিথি প্রায় তখনই চোখ মেলে চাইল। ঘুমে প্রায় লাল হয়ে আছে। অথচ তবুও ঘুমাবে না। হিমেল ছোটশ্বাস ফেলে বলল,
“ ঘুমা। মিষ্টিও ঘুমাবে। ”
মিথি ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে বলল,
“ ঘুমাবে? ”
“ হ্যাঁ। ”

এইটুকু বলেই মিষ্টির মুখের দিকে তাকাল। বুঝিয়ে বলার ভঙ্গিতে বলল,
“ ঘুমাবে না মিষ্টি? আরো জেগে থাকবে? হিমের তো বড্ড ঘুম পেয়েছে। ঘুমাই হুহ? ”
মিষ্টি বোধহয় এবারে রাজি হলো। মাথা নাড়িয়ে হিমেলকে আরেকটু ঝাপটে জড়িয়ে ধরল। হিমেল হাসে। অতঃপর বিছানার ঠিক অপরপাশ টাতেই নিজে শুঁয়ে মাঝখানে মিষ্টিকে রাখল। ঘাড় অব্দি বড় হওয়া চুলগুলোকে হাতের আঙ্গুলে বুলিয়ে দিতে দিতে চুমু খেল কপালে। বলল,
“ মিষ্টি তার মায়ের থেকেও লক্ষী। যা বলি তা শুনে। ”
মিথি চাইল। কি বুঝাল? সে লক্ষী না তা? ফের পরমুহূর্তেই কানে এল,
“ ওভাবেই বসে থাকবি নাকি হুতুম পেঁচার মতো? ঘুমাবি না? নাকি বসে বসেই ঘুমাবি তুই? ”
কন্ঠটা কিছুটা দৃঢ়,গম্ভীর। মিথি ছোটছোটে চোখে চাইল। পরমুহূর্তে শ্বাস ফেলে এলিয়ে দিল শরীরটা। চোখে এল সুন্দর একটা মুহূর্ত। মিষ্টি কি সুন্দর হিমেলকে জড়িয়ে ধরে বুকের মধ্যে লেপ্টে আছে। মাঝেমাঝে ফ্যালফ্যাল করে ঘুমোঘুমো চোখে চাইছে হিমেলের মুখটার দিকেও। যেন কি শান্ত একটা বাচ্চা ও। আর হিমেল সে শান্ত বাচ্চাটাকেই বশে এনে মাথায় হাত বুলাচ্ছে। একহাতে মুখের ভর দিয়ে কাঁত হয়ে শুঁয়ে অপর হাতে বড্ড আদুরে ভাবে বুলিয়ে দিয়েছে চুলে৷ মিথি শুধ চেয়েই দেখল। আর মনে মনে আওড়াল, “ কি সুন্দর! ”

আয়মান ফিজার বিয়েতে মিথি হিয়ারা বরপক্ষ হিসেবেই এসেছে বলা চলে। মানে বরদের সাথেই এসেছে বরের বাড়ি থেকে। অপরদিকে দীপ্রর এসেছে ফিজার ইনভাইটেশনে। তারমানে মেয়েপক্ষই। এসেই তখন থেকে হিয়ার অপেক্ষা করছিল। অবশেষে দেখাও মিলল। কালো রংয়ের একটা শাড়ি পরেছে। যাতে ব্ল্যাক স্টোনের চকচকে ভাবটা দূর থেকেই বুঝা যাচ্ছে। মুখে রেখে অল্প সাধারণ সাজসজ্জা। দীপ্র চেয়ে দূর থেকেই দেখল। অতঃপর অনেকটা সময় পর হিয়া যখন অন্যপাশটায় একা একা গিয়ে বসল তখনই এগোল। পাশে বসেই সর্বপ্রথম গলা ঝেড়ে বলল,

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৬৫

“ না জানিয়ে আকদ করে ফেলেছিস, অথচ দুলাভাই এর সাথে পরিচয় করালি না? প্লিজ নাম্বার দে। একটু বলি যে অন্যের বিয়েতে কেমন সেজেছিস। ”
হিয়া মুহূর্তেই চাইল। দীপ্র আবারও বাঁকা হেসে বলল,
“ দুলাভাই খুব ভালো তাই না হিয়া? সত্যিই খুব ভালো। দুলাভাই এর মতো মানুষই হয় না। চমৎকার! ”

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৬৭