Home ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৮০

ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৮০

ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৮০
প্রিয়স্মিতা তেহজীব রাই

কাটায় কাটায় রাত দুটো। ঘুম চোখে ঢুলুনি আসছে। প্রিয়তা অসহায় মুখ করে বসে আছে পড়ার টেবিলে, সামনে খান দশের বিজনেস ম্যাথমেটিকস, বিজনেস স্ট্যাটিসটিকস, প্রিন্সিপাল অফ ম্যানেজমেন্ট, প্রিন্সিপাল অফ একাউন্টিং, মাইক্রো ইকোনমিক্স, বিজনেস কমিউনিকেশনের মোটা মোটা বই। মাঝ রাতে এই এতো উচুঁ বইয়ের পাহাড় দেখে চোখ উল্টে আসছে প্রিয়তার।

বিরক্তিতে মাথা ধরে যাচ্ছে। কোথায় এখন জামাইয়ের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দুনিয়ায় আনার ব্যবস্থা করবে, তা না করে বাচ্চাদের বাবা বাচ্চাদের মাকে ঘাড় ধরে পড়তে বসিয়ে দিয়েছে। এটা কোনো কথা হলো? এখন তো বাচ্চাদের পড়া শুনা করার সময়, তাদের মা তো আর কম পড়েনি।
বিরক্তিতে দ্বিতীয়বারের মতো নাক মুখ কুঁচকালো প্রিয়তা। ফুস করে নিঃশ্বাস ছাড়লো। তার এক্সপ্রেশন দেখে মনে হচ্ছে কেউ হয়তো জোর করে তেতো খাইয়েছে।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

নিকটে দন্ডায়মান প্রণয়নের পানে চেয়ে মনে মনে কটমট করে উঠে প্রিয়তা,
“বেয়াদব লোকটা, আদর করার লোভ দেখিয়ে এনে জোর করে অত্যাচার করছে।”
“আমাকে গালি দেওয়া শেষ হলে তাড়াতাড়ি দেখ, কোথায় কোথায় তোর কী কী প্রবলেম আছে। আমি ধরার পরে যদি কোনো একটা ও না পারিস বিশ্বাস কর একটু ও আদর দেখবো নাহ্। তোকে পিঠিয়ে পিঠের চামড়া গুটিয়ে নেব।”

এক হাত টেবিলের ওপর রেখে অন্য হাতে ঘর্মাক্ত শার্টের বোতামগুলো খুলতে খুলতে বলল প্রণয়।
প্রিয়তা বিজনেস স্ট্যাটিসটিকসের বইয়ের দিকে তাকানো তো দূরের কথা, জামাইয়ের দিকেই তাকিয়ে কূল পায় না। এতো হট জামাই সামনে রেখে কী কেউ ওই বোরিং জিনিসে মন লাগাতে পারে! তাই প্রিয়তা ও পারেনি। সে তার মন প্রাণ দেহ সব লাগিয়ে দিয়েছে দেখায়।
পরনের শার্ট খুলে সোফায় ছুড়ে ফেলল প্রণয়। ধীর কদমে এগিয়ে গেল ওয়ারড্রবের দিকে।
প্রিয়তা মুখ হা করে তাকিয়ে আছে আকর্ষণীয় উন্মুক্ত পিঠে, কোন পুরুষের পৃষ্ঠদেশ যে এত আকর্ষণ ছড়াতে পারে, তার নিজের স্বামীকে না দেখলে হয়তো উপলব্ধি করতে পারত না প্রিয়তা। দেখতে দেখতে প্রিয়তার অনুভব হলো, সে দিন দিন দিন কেমন মাত্রাতিরিক্ত নির্লজ্জ হয়ে যাচ্ছে। যখন তখন হা করে তাকিয়ে থাকছে প্রণয় ভাইয়ের দিকে।
লজ্জায় গাল গরম হয়ে উঠল প্রিয়তার। আপনা আপনি দৃষ্টি নত হয়ে গেল। বেশিক্ষণ ওমন করে তাকিয়ে থাকতে পারল না।

চোখ বন্ধ করতেই মনে পড়ে গেল কাল রাতের দৃশ্য। না চাইতেও চোখের সামনে ভেসে উঠল প্রণয় ভাইয়ের সুঠাম পেশীবহুল নগ্ন শরীরটা।
তীব্র লজ্জায় নাকের ডগা লাল হতে শুরু করল প্রিয়তার। দুই হাতে মুখ ঢাকলো।
বারবার মনে পড়তে লাগল বিশেষ মুহূর্তে প্রণয় ভাইয়ের করা পাগলামি গুলো, সম্বোধনগুলো, তার আদর মাখানো কথা গুলো। যেন এখনো কানে বাজে। ঠোঁটের কোন চিকন হাসির রেখা ফুটে উঠলো প্রিয়তার।
তৎক্ষণাৎ ভেসে এলো থমথমে গম্ভীর কন্ঠ,

“বোকার মতো একা একা হাসছিস কেন?”
নিজের খেয়ালে ডুবে থাকায় ধরফড়িয়ে উঠলো প্রিয়তা। আতঙ্কিত চোখে তাকালো সামনে।
প্রণয়ের সিরিয়াস চোখ মুখ দেখে লজ্জা মিলিয়ে গেলো বাতাসে।
টি-শার্টের হাতা গুটিয়ে সামনের চেয়ার টেনে বসল প্রণয়।
প্রিয়তা আমতা আমতা করতে লাগল।
প্রণয় পাত্তা দিল না। বিজনেস ম্যাথমেটিকস-এর বইটা দেখিয়ে বলল,
“সব পারিস?”
প্রিয়তা দ্রুত মাথা ওপর-নিচ ঝাঁকিয়ে হ্যাঁ সূচক সম্মতি জানালো। মুখটা ছোট করে মিনমিনে গলায় বলল,
“এগুলো সব দুধ ভাত প্রণয় ভাই। আমি সব পারি। আবার কালকে এক সাথে পড়তে বসব। এখন চলুন ঘুমিয়ে পড়ি।”

প্রণয় ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে।
প্রিয়তা আবহাওয়া সঠিক বুঝতে পারল না। ভয় ভয় বসা থেকে উঠতে নিলেই—
“আর এক পা ও সামনে বাড়ালে পা কেটে পুকুর পাড়ে ঝুলিয়ে রাখবো।”
বজ্রকণ্ঠে ধমক খেয়ে প্রাণ পাখি ফুরুত হয়ে গেল প্রিয়তার। পুনরায় দপাস করে বসে পড়ল নিজ জায়গায়।
আবার ভেসে একই জলদ গম্ভীর কন্ঠ,
“তোর সেমিস্টার ফাইনাল কবে?”
প্রশ্ন শুনে আতঙ্কে ভয় পেতে ভুলে গেলো প্রিয়তা ঢোক গিলল মনে মনে। হেঁচকি উঠে গেলো। বিরবিরিয়ে বললো— প্রণয় ভাই ডেটটা ঠিক মনে রেখেছেন, ওটা মাথা নাকি ডাটা মেশিন। আব তো ত গ্যায়া প্রিয়তা।
ঢাকনা সরিয়ে পানির গ্লাস এগিয়ে দিল প্রণয়। হিমেল কন্ঠে প্রশ্ন করলো,

“আমি কিছু জানতে চেয়েছি।”
ভয়ে বুক ধুকপুক করছে প্রিয়তার বুক। তবুও বক্ষে হিমালয় সমান সাহস জোটালো। অবশেষে আমতা আমতা করে বলেই ফেলল মনের ভাবনাটা,
“না মানে এএখন তো বিয়ে হয়ে গেছে, প্রণয় ভাই। এখন আর পড়ে কী করব? এবার নানী এসে বলে গেছেন— মেয়ে মানুষের এত পড়ে কাজ নেই। বিয়ের পর শুধু সন্তান জন্মদানের দিকে আগ্রহী হওয়া উচিত।”
“আচ্ছা, আর কী বলেগেছেন নানি?”
কথা গুলো বলতে বুক ধুকধুক করছে প্রিয়তার। তবু ও নানীর নাম স্মরণ করে বলল,
“নানী আরো বলেছেন, এটাই নাকি উপযুক্ত বয়স।”
“কিসের?”

“বাবাচ্চা নেওয়ার। এখন বাচ্চা নিলে নাকি বাচ্চারা সুস্থ সবল পয়দা হবে।”
“আচ্ছা, তোর তাহলে বাচ্চা চাই?”
কৌতুক করে বললো প্রণয়।
প্রিয়তা দ্রুত দুই পাশে মাথা দোলালো।
“কী, তোর বাচ্চা চাই না?”
প্রিয়তা আবারো দুই পাশে মাথা দুলালো।
“হ্যাঁ নাকি না? তুই তো আমাকে কনফিউজড করে দিচ্ছিস।”
প্রিয়তা চোখে আতঙ্ক নিয়ে তাকালো প্রণয়ের দিকে।
প্রণয় একদম শান্ত।
প্রিয়তা জানে— নিস্তব্ধতা ঝড়ের পূর্বাভাস। আর এই বজ্জাত ব্যাটার কাছে পড়াশোনা নিয়ে বিরূপভাব প্রকাশ করা মানে যে শাঁড়ের সামনে লাল কাপড় ধরে রাখা। সেটাও প্রিয়তা ভালোই জানে। কিন্তু কী আর করার।
ফের সাহস জুটিয়ে বললো,

“নানী বলেছেন এখন সংসার করার সময়, ছেলে-মেয়ে মানুষ করার সময়। আমি যা পড়েছি, তাতে আমাদের বাচ্চাদের A for Apple আর B for Ball ঠিক শিখাতে পারব। আর আপনি তো আছেন তাদের বাবা। আপনার তো কতো ডিগ্রি।”
প্রিয়তা মুখের কথা সম্পন্ন করতে পারল না, তার পূর্বেই—
“আরেকটা বাজে কথা বললে তোকে তোর নানীর বাসায় বসিয়ে দিয়ে আসব। বাচ্চা কাচ্চার নাম যেনো তোকে আমি দ্বিতীয়বার মুখে আনতে না দেখি। আমি নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে কথা বলে রেখেছি। কাল তুই থার্ড সেমিস্টারের ফাইনাল দিতে যাবি। আমি নিজে তোকে নিয়ে যাবো। পড়াশোনা নিয়ে যদি হেলাফেলা হয়েছে, তাহলে আমার থেকে খারাপ কেউ হবে না।”
রাগে দুঃখে কান্না পেল প্রিয়তার। মনে মনে মুখ বাঁকিয়ে বললো— বালের পড়াশোনা।

“এত যে ফটর ফটর করছিস, তুই সব ম্যাথস পারিস?”
“হ্যাঁ হ্যাঁ, সব পারি। আমাকে কী আপনার নার্সারি লেভেলের স্টুডেন্ট মনে হয়? কানাডা থাকতে পুরো ইউনিভার্সিটিতে আমি টপার ছিলাম। পরপর দুটো সেমিস্টারে টপ করেছি। সেকি এমনি এমনি।”
“ঠিক আছে, দেখবো।”
প্রণয় ওর প্রত্যেকটা সাবজেক্টের প্রত্যেকটা চ্যাপ্টার থেকে ১০ মার্কের ১০টা করে সাজেশন মার্ক করে দিল। প্রত্যেকটা স্টারমার্ক কোশ্চেন নোটবুকে কপি করতে করতে বলল,
“এগুলোর প্রত্যেকটা একদম মুখস্ত করে যাবি। যেভাবে পারবি সেভাবে মুখস্থ করবি। একটাও যেনো বাদ না পড়ে।”
প্রিয়তা ভ্রু কুঁচকে শুধালো,

“কেনো?”
প্রণয় শান্ত চোখে চাইলো।
বিস্ময়ে চোখ বড় বড় হয়ে গেলো প্রিয়তার। চুয়াল ঝুলিয়ে বললো,
“কোশ্চেন কি এগুলোর ওপর থেকেই করবে?”
“হুম।”
সম্মতি শুনে চোখ দুটো আরো বড় বড় করে ফেলল প্রিয়তা। বিস্ময়ে হতবিহ্বল কন্ঠে বলল,
“প্রত্যেকটা চ্যাপ্টারে ৫০০ প্লাস কোশ্চেনের মধ্যে থেকে ১০টা আপনি কীভাবে আলাদা করলেন? আর এত নিশ্চিত কীভাবে যে এগুলোই আসবে?”
প্রণয় জবাব দিলো না। উল্টো ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করল,

“Weighted Average বের করতে পারিস?”
প্রিয়তা দ্রুত হ্যাঁ সূচক মাথা ঝাঁকালো। সে মানুষটাকে যত দেখে, ততই অবাক হয়।
বাঁকা হাসল প্রণয়। নোটবুকে কী যেন লিখে এগিয়ে দিল প্রিয়তার দিকে।
প্রিয়তা একদম চিল মুডে আছে। কারণ সে সত্যি সব পারে। ফুল কনফিডেন্সে খাতাটা নিল। তবে Weighted Average এর সব থেকে হার্ড ফর্মুলার অংকটা দেখে মাথা চক্কর দিয়ে উঠলো।
প্রশ্নটা এমন ছিল—
একটি কোম্পানিতে ৫ জন কর্মীর মাসিক বেতন যথাক্রমে:
১২,০০০, ১৫,০০০, ১৮,০০০, ২০,০০০, ২৫,০০০ টাকা।
তাদের মাসিক কাজের ঘণ্টা যথাক্রমে:
১০০, ১২০, ৮০, ৯০, ১১০ ঘণ্টা।
ডাক:
কর্মচারীদের কাজের ঘণ্টার ভিত্তিতে Weighted Average Salary কত?
সুশ্রী মুখে অমাবস্যা নামিয়ে তাকালো প্রিয়তা।
ভ্রু নাচিয়ে শুধালো প্রণয়,

“কি, সলভ কর।”
ফের ম্যাথ টা দেখে মস্তিষ্ক গুলিয়ে গেলো প্রিয়তার। নাক কুচকালো। সহসা মুখ ফসকে ফট করে বলে উঠল,
“এসব কি আমি চিনি না? আমার কাছে অঙ্ক মানে 143।”
“কিহ?”
ততমত খেয়ে গেল প্রিয়তা। দ্রুত দৃষ্টি নামিয়ে নিয়ে অঙ্ক সলভ করাতে মনোযোগ দিল।
মনে মনে হাসল প্রণয়।

ক্লান্তিতে শরীরটা ভেঙে চুরে আসছে তার। কলিজাটা শুকিয়ে যাচ্ছে তৃষ্ণায়। মন চাচ্ছে এই নরম শরীরের আদুরে পুতুলটাকে বুকে জড়িয়ে শান্তির একটা ঘুম দিতে। কিন্তু সেই কপাল কী আর তার আছে। দিনদিন পড়া চোর হয়ে যাচ্ছে মেয়েটা। সামনে তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ, কিন্তু সেসব নিয়ে যেন তার আর কোন আগ্রহ নেই। নিজে তাগিদে তো আর পড়তে বসবে না। তাই বাধ্য হয়ে তাকেই হাল ধরতে হলো।
প্রিয়তা ১০ মিনিট হা করে তাকিয়ে রইল খাতার দিকে। কিন্তু সাদা কাগজে একটা দাগও কাটতে পারল না। মুখ ভার করে তাকালো প্রণয়ের দিকে।
ব্যঙ্গ করে হাসলো প্রণয়,

“কি, পারলি না? এই না বললি তুই সব পারিস। ফাইনাল পরীক্ষায় এরকম দুটো আসবে। তখন কিভাবে অ্যানসার করবি তুই? এভাবেই কী হা করে পেজের দিকে তাকিয়ে থাকবি?”
প্রিয়তা মুখ লটকাল।
“এদিকে আয়।”
প্রিয়তা অবুঝ চোখে চাইল।
ফের ধমকে উঠল প্রণয়। দাঁত কটমট করে বললো,
“উল্টো দিকে বসে থাকলে কি বুঝতে পারবি কিছু?”
লাফিয়ে বসা থেকে দাঁড়িয়ে পড়ল প্রিয়তা।
প্রণয় হাতের ইশারায় ডাকল,

“এদিক আয়।”
প্রিয়তা ও লক্ষ্মী বাচ্চার মতো শুর শুর করে চলে গেল প্রণয়ের নিকট।
প্রণয় ওর হাত টেনে ধরে উরুর ওপর বসালো। কন্ঠ খাদে নামিয়ে ধীরে বলল,
“মনোযোগ দিয়ে দেখ। একবারের বেশি দুইবার বুঝাব না।”
প্রিয়তা ও একদম গভীর মনোযোগে তাকালো। প্রণয় পেন টা নিয়ে ফটাফট ম্যাথ সলভ করতে লাগল।
“দেখ, Salaries min (টাকা)।
মাসে এক একজন Employee-এর salaries যথাক্রমে: ১২,০০০, ১৫,০০০, ১৮,০০০, ২০,০০০, ২৫,০০০।
তাদের Hours worked (weight): ১০০, ১২০, ৮০, ৯০, ১১০।
তাহলে Formula—

Step 1: Salary × Hours for each employee—
১২,০০০ × ১০০ = ১,২০০,০০০
১৫,০০০ × ১২০ = ১,৮০০,০০০
১৮,০০০ × ৮০ = ১,৪৪০,০০০
২০,০০০ × ৯০ = ১,৮০০,০০০
২৫,০০০ × ১১০ = ২,৭৫০,০০০
Step 2: Sum of Salary × Hours—
১,২০০,০০০ + ১,৮০০,০০০ = ৩,০০০,০০০
৩,০০০,০০০ + ১,৪৪০,০০০ = ৪,৪৪০,০০০
৪,৪৪০,০০০ + ১,৮০০,০০০ = ৬,২৪০,০০০
৬,২৪০,০০০ + ২,৭৫০,০০০ = ৮,৯৯০,০০০
Total = ৮,৯৯০,০০০
Step 3: Sum of Hours।
Step 4: Weighted Average Salary।
Answer: Weighted Average Salary = ১৭,৯৮০ টাকা।

বুঝেছিস? না বুঝলে আবার রিপিট করব।”
প্রিয়তা মনোযোগ দিয়ে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দেখল অংকটা। অতঃপর উৎফুল্ল হয়ে বলল,
“হুহু বুঝেছি।”
“সত্যি বুঝেছিস? কোনো কনফিউশন নেই?”
“নাহ।”
“ওকে, তাহলে আরেকটা সলভ কর।”
বলে আরও একটা সেম ক্যাটাগরির কোশ্চেন খাতায় উঠিয়ে দিলো।
তবে এবার আর আটকাল না প্রিয়তা। চোখের পলকে পটাপট সলভ করে দিল অংকটা।
নিজের জান পাখির মস্তিষ্কের ধার দেখে খুশি হলো প্রণয়। নিজের মেধাকে ভালো কাজে ব্যবহার করার থেকে উত্তম আর কিছু হতে পারে না। পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে গালে চুমু দিলো প্রণয়। মোলায়াম কন্ঠে বললো,
“ভেরি গুড। এভাবে চললেই তো আর বকা শুনতে হয় না।”
প্রিয়তা ও হাসল।

আরও ঘণ্টা দুয়েক পড়ানোর পর প্রণয় লক্ষ্য করছে, প্রিয়তা আর চোখ খুলে রাখতে পারছে না।
দীর্ঘনিশ্বাস ফেলল প্রণয়। ওর সামনে থেকে বইটা নিয়ে বন্ধ করে দিল।
প্রিয়তা আর পারল না। মাথা এলিয়ে দিল প্রণয়ের বুকে।
প্রণয় বসা থেকে দাঁড়িয়ে আদুরে সত্তাটা কোলে তুলে নিলো। আস্তে করে শুইয়ে দিলো নরম বিছানায়।
টিশার্ট খুলে বালিশে মাথা দিয়ে শুলো প্রণয়। পাশ থেকে ছোট্ট শরীরটা টেনে তুলে নগ্ন বুকে মেশালো। চুলের কাটা খুলে উন্মুক্ত নেশালো চুলে মুখ ডুবাল প্রণয়।
লম্বা শ্বাস টেনে সারাদিনের বহুরূপী নিকৃষ্ট মানুষটাকে পায়ে পিষে একখানি খাঁটি মানুষ হলো।
নিজের সকল অস্পৃশ্যতা, অশুদ্ধতা, নিকৃষ্টতা, পাপ, গুনাহ, অপরাধবোধ— সব কিছু লুটিয়ে দিলো কোনো এক পবিত্র সত্তায়। এটাই যেনো তার শুদ্ধিকরণের শেষ উপায়।

পাপিষ্ঠের বুক পাঁজরে কী পবিত্রকে লেগে থাকা শুভা পায়? এটা প্রকৃতিবিরোদ্ধা। পাপের সাথে পবিত্রর মিলন কখনো সম্ভব হয়নি, আর হবে ও নাহ্। কিন্তু সে তো পাপিষ্ঠ হয়ে ভালোবাসেনি। কলুষিত মনে পবিত্র কে স্থান দেয়নি।
কোনো এক কালে সেও তো পবিত্র ছিলো। তার আসক্তি তাকে বাধ্য করেছে পাপিষ্ঠ হতে। কিন্তু পাপের ঘড়া বলে ও তো কিছু আছে। ১–২ টা বছর তো নয়। বিগত ৯ টা বছরে সে তার মনুষ্যত্বের অন্তিম বিন্দু টাও হারাতে বসেছে। কী পার্থক্য আছে তার আর নর পিশাচের মধ্যে?

এত মানুষের হাহাকার, এত এত অভিশাপ— এগুলোতো আর বিফলে যাবে নাহ্। কাউকে কষ্ট দিয়ে কেউ কখনো সুখী হতে পারে নাহ্। আর সে যে কত মানুষকে কষ্ট দিয়েছে, তা হয়তো হাতে গুনে শেষ করা অসম্ভব।
তবু ও বাঁচতে চায় প্রণয়। মন থেকে বাঁচতে চায়। সে জানে, সে না মরা অব্দি এসব একদম বন্ধ হবে নাহ্। তবু ও বাঁচতে চায়। এই যে বাচ্চা মতো মেয়েটা তার বুকে ঘুমুচ্ছে— ওর জন্য বাঁচতে চায়।
হাতে পায়ে বড়ো হলে ও মানসিক বিকাশ যে নেই। মেয়েটার শরীরের বয়স বিশ হলে ও মনের বয়স পাঁচের বেশি নয়। বড্ড নির্ভরশীল তার উপর। না খাইয়েদিলে একবেলা ও পেট ভরে খায় নাহ্। বুকে না নিলে রাতে ঘুমায় নাহ্।
নিজের থেকে দূর করতে, শক্ত বানাতে, একা বাঁচতে শেখাতে কতটাই না কষ্ট দিয়েছে মেয়েটাকে। তবু ও যেই কী সেই।

সে যদি না থাকে, এই অবুঝ মেয়েটা কী পাগল হয়ে যাবে নাহ্? ওকে আদর করবে কে? এতো ভালোবাসা নিয়ে বুকে মেশাবে কে? আর ভাবতে পারে নাহ্ প্রণয়। শক্ত করে ঝাপটে ধরে বুকে। চোখ দুটো ভরে আসে।
উম পেয়ে ঘুমের ঘোরে প্রণয়ের গলায় মুখ গুঁজে দিল প্রিয়তা। সফেদ কমফোর্টার টেনে নিজেদের ঢেকে নিল প্রণয়।
বুকের মধ্যে বড়ো আরাম আরাম অনুভূত হচ্ছে। সুখ সুখ অনুভূতিতে অবশ হয়ে আসছে সর্বাঙ্গ। তিক্ত সকল ভাবনা ফেলে একটু খানি স্বস্তির নিশ্বাস বেরিয়ে এল প্রণয়ের বুক চিরে।
প্রিয়তমাকে অস্তিত্বে মিশিয়ে নিজেও ঘুমের দেশে পাড়ি জমালো প্রণয়।

ঘুমটা একটু গভীর হতেই কারো তুমুল শব্দের ডাকাডাকিতে কপাল কুচকে গেলো প্রণয়ের। নড়ে উঠল সামান্য।
“প্রণয় ভাই ও প্রণয় ভাই ও আমার জামাই, উঠো চলো। মিষ্টি বিলাতে হবে। শিকদার বাড়িতে নতুন সদস্যের আগমন ঘটেছে। আমাদের তিন জনের পরিবারের নতুন মেম্বার যোগ হয়েছে।”
প্রণয়ের পেটে চাপ দিয়ে ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে ডাকতে শুরু করল প্রিয়তা। উচ্ছ্বাস ঠিকরে বেরোচ্ছে গলায়।
ঘুম চোখে বিরক্ত হলো প্রণয়। হেঁচকা টানে প্রিয়তাকে শুইয়ে দিলো নিজের পাশে। টেনে হিঁচড়ে বালিশটা প্রিয়তার মাথার নিচে দিয়ে নিজে মাথাটা রাখল প্রিয়তার বুকে। আধো আধো ঘুম জড়ানো কণ্ঠে ধমকে বলল,
“চুপচাপ শুয়ে থাক, ঘুমাতে দে আমায়।”
কিন্তু সেসব আদুরে শাসনবাণী কানেই তুললো না প্রিয়তা। নিচে শুয়ে ছটফট করে উঠল। প্রণয়ের এলোমেলো চুল ধরে টেনে বলল,

“ঘুমাবেন মানে? ভোর পাঁচটা বাজে। কিছুক্ষণ আগেই আপনি নানা হয়েছেন। কই নাতি-নাতনিদের দেখতে যাবেন, কোলে নিয়ে দোয়া করবেন, আদর আহ্লাদ করবেন— তা না করে পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছেন! উঠুন উঠুন বলছি!”
ঘুমের ঘোরে প্রিয়তার কথার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝল না প্রণয়। আর না বোঝার চেষ্টা করলো। প্রিয়তার মাতাল করা শরীরের সুঘ্রাণ তার মস্তিষ্কের কোষে কোষে সুখ প্রবাহিত করছে। আরও গভীর ঘুমে তলিয়ে যাচ্ছে প্রণয়।
প্রিয়তা ফের ঝাঁকিয়ে বলল,

“উঠুন না ও প্রণয় ভাই!”
“চুপ কর বলছি। হাঁসের বাচ্চা, ঘুম ভাঙলে কঠিন শাস্তি দেবো তোকে!”
এসব মিছে ধমক গায়েই লাগলো নাহ্ প্রিয়তার। প্রণয়কে ঠেলে নিজের ওপর থেকে সরানোর চেষ্টায় মরিয়া হয়ে উঠলো। গোলাপি নাকের ডগা লাল হয়ে উঠছে ধীরে ধীরে। গাল ফুলিয়ে বলল,
“উঠুন, সরুন বলছি আমার ওপর থেকে! আল্লাহ, তুমি আছো তো দেখছো তো কিভাবে অত্যাচার করছে। একটা মানুষের এতো ওজন হয় কীভাবে? আমাকে ভর্তা মাখার মতো মেখে দিল!”
এবার ভীষণ বিরক্ত হলো প্রণয়। দুই হাত একত্রে বেডের সাথে চেপে ধরলো প্রিয়তাকে। সজোরে দাঁত বসিয়ে দিল জায়গা মতো।

“আহ্!”
মৃদু স্বরে আর্তনাদ করে উঠল প্রিয়তা।
চিৎকার শুনে ফের ধমকে উঠল প্রণয়,
“একদম চুপ!”
এতো জুড়ে কামড় দিয়ে আবার ধমকায়— জালিম একটা। এসব ধমক টমকে চুপ হয়ে যাওয়ার পাত্রী প্রিয়তা নয়। এখন আর সে ভয় পায় না।
প্রিয়তা ঝগড়া করার ভঙ্গিতে বলল,
“সত্যি কথা বলে শহীদ হতে হলে হবো। তাও শত্রু পক্ষের নিকট আত্মসমর্পণ করব না।”
“তাই?”
আসক্তির চরম শীর্ষে কণ্ঠটা অদ্ভুত নেশালো শুনালো প্রণয়ের।
প্রিয়তা তৎক্ষণাৎ হ্যাঁ সূচক মাথা ঝাঁকিয়ে বলল,

“হ্যাঁ, ১০০ বার বলব, হাজার বার বলবো। আপনার ওজন পাক্কা ৮০ কেজি। এক থেকে ১ গ্রামও কম হবে না। আমি কি ভয় পাই নাকি আপনাকে?”
“আচ্ছা, ভয় পাস না? সত্যি বলছিস?”
“হ্যাঁ, একশো ভাগ সত্যি।”
ঘাড়ে মুখ গুঁজে দিলো প্রণয়। বিগলিত ঠোঁটের স্পর্শ আঁকতে আঁকতে হাস্কে কন্ঠে বললো,
“আমার প্রোটিন দরকার জান। হাড্ডি গুড্ডি দুর্বল হয়ে যাচ্ছে দিন দিন।”
“তো প্রোটিন সেক খান। আমাকে গুঁড়ো গুঁড়ো করছেন কেনো?”
সোজা সাপটা উত্তর প্রিয়তার।
তবে রাগলো না প্রণয়। এই আহাম্মক মেয়ের উপর রাগ করে সকাল সকাল মুডের বারোটা বাজাতে চায় না।
আরো নরম গলায় বললো,

“উম, আমার খিদে পেয়েছে জান।”
“তাহলে খান।”
“অনুমতি দিচ্ছিস?”
“আপনি খাবেন, আমি অনুমতি দেওয়ার কে?”
ঠোঁট কামড়ে হাসলো প্রণয়।
বেডের সাথে কোমর চেপে ধরে বলল,
“ঠিক বলেছি। আমার জিনিসে আবার তোর কাছ থেকে অনুমতি নেবো কেনো, হুঁ? আর ইউ?”
আহম্মক বনে গেলো প্রিয়তা।
কথা বলে মোটেও সময় নষ্ট করল না প্রণয়। দ্রুত টি-শার্ট টেনে টেনে উপরে তুলে স্পর্শকাতর অঙ্গে মুখ ডুবিয়ে দিলো। গাঢ় কন্ঠে বলল,
“আই লাইক ফ্রেশ মিল্ক জান। হাই প্রোটিন বাই দ্যা ওয়ে। এখনো কি ভারি লাগছে? যদিও তুমি ৫ কেজি কমিয়ে বলেছিলে।”
সাপের মতো শরীর বাঁকিয়ে মুচড়ে উঠল প্রিয়তা। মুখ দিয়ে অস্ফুট শব্দ গোঙানি বেরিয়ে এল—
“আহ্… জান!”

প্রিয়তার সকল তেজ নিভে পানি হয়ে গেল। ব্রেন এর সকল সিস্টেম যেনো হ্যাক হয়ে গেলো মুহুর্তেই। চোখের পলকে ভুলে গেল সে এখানে কী বলতে এসেছিল, কী করতে এসেছিলো।
প্রণয় বেপরোয়া। তার থেকেও বেশি বেপরোয়া তার অবাধ্য ঠোঁট, যা মরিয়া হয়ে লেগেছে প্রিয়তার অন্তস্থ সকল নির্যাস শুষে নিতে।
প্রিয়তা অসহ্য সুখে ছটফট করে উঠল। দুই হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরল প্রণয়ের চুল।
“প্র… প্রণয় ভাই…”
“শশশ… ফাঁক ইউর ভাই। সারাদিন ভাই ভাই বলে মুখ ফেনা তুলিস— ইটস ওকে। বাট আদর করার সময় নো ভাইয়া। ওনলি ছাইয়া নাম ধরে ডাক ছেমরি। নাহলে তোর নরম শরীরের প্রতিটা ইঞ্চিকে বুঝিয়ে দেবো, আমি তো ভাই নয়— জামাই। এমনিতেই তোকে ছুঁয়ে ফেললে নিজেকে উন্মাদ মনে হয়।”
বলতে বলতে গভীরে যেতে ধরল প্রণয়।
মেদহীন ফর্সা উদরে সহসা মুখ ডুবালো। প্রিয়তার শরীর কাপছে তির তির করে। এই মৃদু কাঁপুনি প্রণয়ের নেশার মাত্রা বাড়াচ্ছে চড়চড় করে। সে প্রিয়তার অস্তিত্বের সাথে মিশে যেতে ধরলো নিবিড়ভাবে। ডুবে গেল আবেগী ভালোবাসায়।

ভালোবাসার তীব্রতায় গলা কাটা মুরগির মতো ছটফট করতে লাগল প্রিয়তা। গলা শুকিয়ে কাঠ হলো। ধারালো দাঁত নখ দ্বারা আঁচড়ে কামড়ে ধরল প্রণয়ের নগ্ন পিঠ। এতে আরও বেশি অ্যাগ্রেসিভ হয়ে উঠছে প্রণয়। সময়ের সাথে সাথে পাগল হয়ে যাচ্ছে যেন তার প্রিয় মাদকরের নেশায়।
আকুলতার শীর্ষে পৌঁছাতেই কোমল হয়ে গেল প্রণয়। প্রিয়তার মসৃণ ললাটে গভীর চুম্বন আঁকল।
কানের কাছে ঠোঁট নিয়ে ফিসফিসিয়ে জানতে বললো,
“তুই কোন ফ্লেভারের ড্রাগ জান?

তোর পরতে পরতে এতো নেশা কেন জান? বিশ্বাস কর, পৃথিবীর সব থেকে দামী ড্রাগস টাও আমাকে এতো স্ট্রং নেশা দিতে পারেনি, এতো সুখ দিতে পারেনি। অথচ এতোটুকু মেয়ে তুই। তোর নেশা আমাকে পাগল বানিয়ে দেয়। তোর কোমলতা আমাকে বাঁচতে শিখায়। তোকে সারাজীবনের জন্য বুকের ভেতর পুরে ফেলতে ইচ্ছে করে, সারাক্ষণ নিজের সাথে রাখতে ইচ্ছে করে— যাতে বাকি জীবনের আর এক সেকেন্ডও তোর থেকে দূরে থাকতে না হয়।”
হালকা দম নিলো প্রণয়। প্রিয়তার কানের লতিতে গাঢ় চুমু দিয়ে ফের নেশালো কণ্ঠে বলল,
“জন্মলগ্ন থেকে পাগল বানিয়েছিস আমায়, উন্মাদ বানিয়েছিস। আচ্ছা, তোকে নিজের মধ্যে লুকিয়ে ফেলার কি কোনো উপায় নেই? মানে তোকে শুধু আমি দেখবো আর কেউ দেখবে নাহ্। এই হৃৎপিণ্ড যতক্ষণ সচল থাকবে, ততক্ষণ তোর নিঃশ্বাস পড়বে।

ভাবছিস স্বার্থপরের মতো কথা বলছি? কী করবো বল, বড্ড ভয় পাই আমি। ভয় পাই তোর পবিত্রতাকে।
তবে সব কিছুর বিরুদ্ধে গিয়ে ও আমার পাপিষ্ঠ পাঁজরে তোকে আগলে রাখতে চাই। তুই থাকবি তো জান? এখন তুই বিহনে নিঃশ্বাস নেওয়াটাই যেনো আমার নিকট মৃত্যুসম।
আমি যে তোর মাঝে বড্ড আসক্ত জান। আমার আসক্তির শেষ সীমানা তুই। তোর চোখে আমি আসক্ত, তোর ঠোঁটে আমি আসক্ত, তোর চুলে আমি আসক্ত, তোর কোমলতায় আমি আসক্ত। তোর শরীরের ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে আমার তীব্র আসক্তি। ঠোঁট ডুবালেই মনে হয় নেশার সমুদ্র। মন চায় শুধু আদর করি।”
প্রণয়ের সকল আদর মাখানো বাক্য চুপ করে শুনেছে প্রিয়তা। অনুভূতির শীর্ষে পুরুষ যে কী কী বলে, স্বাভাবিক হওয়ার পর হয়তো তারা নিজেরাও মনে করতে পারবে না।

প্রিয়তার হাসি পায়। ব্যথা হয় সর্বাঙ্গে। চোখের কার্নিশ বেয়ে ঝরে যায় নিরব অশ্রু। তবুও দাঁতে দাঁত চেপে ভালোবাসা মিশ্রিত যন্ত্রণাটুকু গিলে নেয় বিনাবাক্যে। প্রণয়কে জড়িয়ে ধরে শক্ত করে।
এই মানুষটা তার। পুরোটাই তার। এই মানুষটার মনের সব ভালোবাসাও তার— একান্তই তার। এসব ভাবলেই পুলকিত হয় প্রিয়তা। সুখের আবেশে ভরে উঠে বুক।
“ওই জান।”
আকুল কণ্ঠস্বর প্রণয়ের।
“হুম।”
“অনেক ভালোবাসি তোকে। তোকে যতোটা ভালোবেসেছি, তার পয়েন্ট জিরো পার্সেন্ট ও কোনোদিন নিজেকে ভালোবাসিনি।

কখনো ভুল বুঝে ছেড়ে যাস না আমায়। যদি কোনোদিন জানতে পারিস আমি খুব খারাপ, খুব নিকৃষ্ট একজন— যাকে ভালোবাসা তো দূর, করুণা ও দান করা যায় নাহ্— তাহলে ছুড়ে ফেলিস নাহ্। মনে রাখিস, তোর শাস্তি দেওয়ার পূর্ণ অধিকার আছে।
তুই তোর পছন্দ মতো নিজে দাঁড়িয়ে থেকে যা মন চায় শাস্তি দিস। কিন্তু কখনো ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিস নাহ্। এক মুহূর্তের জন্য ও এই পাগলটাকে ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবিস না। তোর ভালোবাসার সুখ থেকে বঞ্চিত করার কথা ভাবিস না। তাহলে এতো যন্ত্রণা পাবো, যার নিকট দুনিয়ার আইন কানুন ধূলিকণার সমতুল্য।
তুই আমাকে সুখের মৃত্যু দিস জান। আমার বুকে মাথা রেখে হেসে হেসে আমার প্রাণটা চেয়ে নিস। তোকে দেখব বলেই তো এই জীবনে বেঁচে থাকা। আমি খুশি খুশি আমার প্রাণটা বের করে তোকে দিয়ে দেবো। তোকে অনেক অনেক ভালোবাসি পাখি, খুব খুব ভালোবাসি।”
অজানা কারণে প্রিয়তা চোখের কোনে পানি জমা হলো। বুকের উপর মনে হলো কেউ হিমায় চাপিয়ে দিয়েছে। কেনো জানি কষ্ট হলো ভীষণ।

প্রণয়ের চুলের ভাঁজে আঙুল ডুবিয়ে দিলো প্রিয়তা। আস্তে আস্তে চুল টেনে দিতে দিতে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“জানি না আপনি কিসের কথা বলছেন। তবে এই পৃথিবীর সবার ঊর্ধ্বে আমি শুধু আমার প্রণয় ভাইকেই চিনি।
সে পৃথিবীর যে অন্যায়ই করুক, আমার নিকট সে সর্বদা নির্দোষ, নিষ্পাপ, পবিত্র।
আপনার কারণে যদি দুনিয়াতে ধ্বংসও নেমে আসে, তবুও আপনাকে আমার বুকে লুকাব। কাউকে খুঁজে পেতে দেবো না আপনাকে। আপনাকে কবুল প্রণয় ভাই— আপনার ভালোবাসা কবুল, আপনার গুনাহ কবুল, আপনার ন্যায়-অন্যায় সকল কর্ম কবুল। আমার আদালতে আজীবন আপনি নিরপরাধ মাসুম থাকবেন। কেবল আমার প্রণয় ভাই হয়ে বাঁচবেন।”

“জান!”
ক্লান্তিতে প্রিয়তার বুকে মাথা এলিয়ে দিল প্রণয়।
বুক চিরে বেরিয়ে এল তীব্র এক সুখের নিঃশ্বাস। চোখ বুজে এল প্রশান্তিতে। একটু ঝুঁকে প্রশস্ত চওড়া কপালে শব্দ করে চুমু আঁকল প্রিয়তা। ছোট ছোট হাতে ধীরে ধীরে পিঠে হাত বুলাতে লাগল। চোখের কোণে পানি চিকচিক করে উঠল প্রণয়ের।

লাজুক মুখে ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে আছে প্রিয়তা। পরনে লাল টকটকে জামদানি শাড়ি। উন্মুক্ত কেশগুচ্ছ বেয়ে টুপ টাপ গড়িয়ে পড়ছে সচ্ছ পানি।
আলতো স্পর্শে ঘাড়ের চুল সরিয়ে গাঢ় চুমু আঁকল প্রণয়। নিটোল ফর্সা চামড়ায় পুরোনো ক্ষতের পাশাপাশি আরও বেশ কিছু নতুন ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে। সময় নিয়ে সব কটি দাগে চুমু খেল প্রণয়। লজ্জায় দুই গাল লাল হয়ে উঠল প্রিয়তার।
হঠাৎ গলায় ঠান্ডা কিছুর স্পর্শ পেল সে। আচমকা আয়নার দিকে চোখ পড়তেই থমকাল প্রিয়তা। ধবধবে ফর্সা গলায় চকচক করছে চিকন একটা স্বর্ণের চেইন।
ফের লজ্জায় রক্তিম হয়ে উঠল প্রিয়তা।
ভালোবাসাময় গভীর কণ্ঠ কানে এল—
“আমি থাকি বা না থাকি, এটা কখনো নিজের থেকে আলাদা করবি না জান। জানবি আমি যেখানেই থাকি সবসময় তোর সাথেই আছি।”

কণ্ঠে হয়তো কিছু একটা ছিল প্রণয়ের। প্রিয়তার বুক করে উঠল। তবে প্রশ্ন করার সুযোগ দিল না প্রণয়। টেনে তুলে নিজের কোলে বসাল।
ভারী পল্লব বিশিষ্ট চোখের পাপড়িতে আলতো ঠোঁট ছুঁইয়ে শুধালো,
“কোন তান্ত্রিক দিয়ে জাদু করালি আমায় জান? আগে কাছে না পেলে তবুও কিছুটা সময় নিজেকে সামলে নিতাম। কিন্তু এখন তোকে ছেড়ে এক পা নড়লেই দম আটকে আসে। আঁচলে বেঁধে ফেললি তো আমায়। মন তো চায় সারাদিন কোলে বসিয়ে রাখি। তোকে যদি আমার কলিজার ভেতর গেঁথে রাখতে পারতাম রে জান, তবে হয়তো এই দাউদাউ করা বুকটা খানিক শান্ত হতো।”

প্রিয়তা অবুঝ চোখে তাকাল। প্রণয়ের গাঢ় বাদামি চোখ দুটো নীরবে বলে যাচ্ছে অজস্র কথা, কিন্তু বরাবরের মতোই ওই চোখের ভাষা পড়তে অক্ষম প্রিয়তা।
প্রণয়ের বুকে হাত দিয়ে টের পেল তার অস্থির হৃদস্পন্দন। কিসের এতো দুশ্চিন্তা— বুঝে পেল না প্রিয়তা। প্রশ্ন করেও লাভ নেই, তাই নীরবে বুকে মাথা এলিয়ে দিল।
প্রিয়তার ভেজা চুলে ভিজে উঠছে প্রণয়ের সফেদ শার্ট। প্রিয়তার ভেজা চুলে নাক-মুখ ডুবিয়ে প্রাণভরে শ্বাস টানল প্রণয়। হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানি আরও বাড়ল যেন।

প্রণয় টের পাচ্ছে এই মেয়ের প্রতি তার আসক্তির মাত্রা সীমা ছাড়িয়ে বাড়ছে। বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে সবকিছু, আর এর কারণও স্পষ্ট তার নিকট। অন্যায় তো তারই ছিলো— বছরের পর বছর নিজেকে দমিয়ে রাখলেও হালাল তকমা পাওয়া মাত্রই যেনো সব ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে পড়লো এক সাথে। নিজেকে সে চেয়েও আর আটকাতে পারলো নাহ্। পুরুষ মানুষের এতো অধৈর্য হলে চলে, কিন্তু লোভী মনটা পাপ করে ফেলেছে।
চুপচাপ থাকতে থাকতে হঠাৎ কিছু মনে পড়তেই লাফিয়ে উঠল প্রিয়তা।
ভাবনায় বেঘাত পড়াতে বিরক্ত হলো প্রণয়। কোমর চেপে আকড়ে ধরলো নিজের সাথে। নির্ঘাত বাদরামি পেয়েছে আবার। ঠিক তাই হলো। প্রণয়ের ধারণা সঠিক প্রমাণ করে দিয়ে প্রিয়তা বলে উঠল,

“আয় হায়! আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম। চলুন চলুন!”
ভ্রু কুঁচকাল প্রণয়।
“কোথায়?”
তড়াক করে কোল থেকে উঠে পড়ল প্রিয়তা। প্রণয়ের হাত ধরে টেনে বলল,
“চলুন চলুন, গেলেই দেখতে পাবেন।”
“আচ্ছা যাব, এদিকে আয় আগে চুলটা শুকিয়ে দিই।”
প্রিয়তা জেদ নিয়ে বলল,
“পরে দিয়েন, এখন চলুন!”
পরাজিত সৈনিকের ন্যায় হার মেনে নিলো প্রণয়। প্রিয়তা চোখ-মুখে ছলকে উঠলো খুশির ঝিলিক।
“শুন আমার কথা।”
“কোনো কথা নয়, চলুন বলছি।”

প্রণয়ের বাহু চেপে ধরে টানতে টানতে নিচতলায় নিয়ে গেলো প্রিয়তা। অনুশ্রী বেগম রান্নাঘরেই ছিলেন।
বড়ো ছেলেকে সুখী দেখে মাতৃমন তৃপ্তিতে ভরে উঠল উনার। সোফায় বসে জুস খাচ্ছিল প্রিয়স্মিতা। এসব দেখে যেনো গায় আগুন ধরে গেলো। রাগে শক্ত করে চেপে ধরে রইলো কাঁচের গ্লাস। সে যতই চায় এদের দূরে দূরে রাখতে, ততই আরো বেশি কাছে চলে আসে এরা। এমন চললে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া মুশকিল হয়ে যাবে ভবিষ্যতে।

প্রিয়তা প্রণয়কে টানতে টানতে নিয়ে দাঁড় করালো স্টোর রুমের সামনে।
বন্ধ রুমটার দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচালো প্রণয়। যার অর্থ— এখানে কী?
প্রিয়তা চোখে হাসল। বাম হাতের তালু দিয়ে কাঠের দরজায় আলতো চাপ দিতেই হালকা খট খট শব্দে দরজাটা খুলে গেল আপনাআপনি।
প্রণয় কৌতূহল নিয়ে সামনে তাকাতেই অবাক হয়ে গেল। অজান্তেই ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চিলতে মনমুগ্ধকর হাসি।
ছোট ছোট সাদা-কালো কয়েকটা নবজাতক বিড়ালছানাকে শুইয়ে দুগ্ধ পান করাচ্ছে কোকো। মাতৃস্নেহে একটু পরপর চোখ-মুখ চেটে দিচ্ছে ছানাগুলোর।
প্রণয়ের হাত ধরে নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল প্রিয়তা। প্রণয়ের বড়ো কম্বল দুই ভাঁজ করে কোকো আর ছানাদের নিচে দিয়েছে সে।

প্রণয়ের বাহু জড়িয়ে ধরে উতফুল্ল কন্ঠে বললো,
“আপনার চার চারটে নাতি নাতনি হয়েছে। দেখুন কতো সুন্দর সুন্দর, একদম আপনার মতো দেখতে। নয়ন ভরে দেখুন— আপনার নাতি নাতনীদের আপনার মেয়ে মা হয়ে গেছে।”
প্রিয়তার যুক্তি শুনে বেককেল বনে গেল প্রণয়। বিড়াল ছানা নাকি তার মতো দেখতে— কোনো দিক দিয়ে বুদ্ধি কী এই মেয়ের হাঁটুতে থাকে!
প্রণয় এক ভ্রু উঠিয়ে সুধালো,
“এগুলো আমার নাতি নাতনি?”
তৎক্ষণাৎ সম্মতি জানাল প্রিয়তা। মাথা দুলিয়ে বলল,

“অবশ্যই। শুধু আপনার কেন, আমাদের নাতি নাতনি। আপনি নানা আর আমি নানি।”
পাগলিটার বোকামি দেখে ঠোঁট চেপে হাসল প্রণয়। প্রিয়তার কোমর জড়িয়ে ধরে থুতনিতে নাক ঘষে দিয়ে বলল,
“তা এগুলো তোকে কীভাবে নানি ডাকবে? মেউ মেউ বলে?”
রেগে গেল প্রিয়তা। প্রণয়ের বুকে কিল ঘুষি দিয়ে নাক ফুলিয়ে বলল,
“আমার নাতি নাতনিদের নিয়ে একদম উল্টাপাল্টা মশকরা করবেন না বলে দিলাম।”
হেসে ফেললো প্রণয়। প্রিয়তার নাক টেনে দিয়ে বললো,
“আচ্ছা নানি, এবার এদের নানাকেও একটু ভালোবাসুন, একটু আদর সোহাগ করুন। দেখুন, মেরে ধরে কী অবস্থা করেছেন— অনেক ব্যথা দিয়েছেন।”

সচকিত হলো প্রিয়তা। প্রণয়ের হাত-মুখ দেখতে দেখতে উত্তেজিত কণ্ঠে সুধালো,
“সত্যি? কোথায় ব্যথা পেয়েছেন?”
প্রিয়তার হাতটা তুলে বুকের বাঁ পাশে চেপে ধরল প্রণয়। ব্যথাতুর শব্দ করে বলল,
“এখানে, দেখো— অনেক ব্যথা পেয়েছি।”
প্রিয়তা সত্যি সত্যি দেখার চেষ্টা করল।
প্রণয় হাতটা তুলে বুকে চেপে ধরে বলল,
“ওভাবে তো খুঁজে পাবে না জান। বুকে মাথা রেখে শোনো, কান পেতে শোনো।”
প্রিয়তা বুকে মাথা রাখতেই শক্ত করে নিজের সাথে মিশিয়ে নিল প্রণয়।

“পাপ্পা!”
করো আধো আধো কন্ঠে লাফিয়ে দূরে সরে গেলো প্রিয়তা। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে চোখ গুল গুল করে তাকিয়ে আছে অভিরাজ।
হাসলো প্রণয়। এগিয়ে গিয়ে কোলে তুলে নিলো অভিরাজকে। বিড়াল ছানা দেখে সকাল থেকে চক্কর কাটছে অভিরাজ।
প্রণয় নরম গালে আলতো চুমু খেতে বললো,
“কী নেবে পাপ্পা?”
অভিরাজ হাত তুলে বিড়াল ছানাগুলোর দিকে দেখালো।
প্রণয় বুঝিয়ে বললো,

“ওগুলো তো খুব ছোট পাপ্পা। যদি খামচি দেয়, তোমার পাছুতে ১১টা ইনজেকশন লাগবে।”
বড়ো আব্বুর কথা শুনে ভয়ে চোখ বড় বড় করে ফেললো অভিরাজ।
ফিক করে হেসে দিলো প্রিয়তা।
চোখ গরম করে তাকালো প্রণয়।
অভিরাজ ফের বললো,
“তাহলে ওগুলো পঁচা। ওগুলো আমার সাথে খেলবে নাহ্। লোচোগুল্লা ও আসে নাহ্। আমাকে একটা বোন এনে দাও পাপ্পা, আমি খেলবো।”
আবদার শুনে মুখটা শুকিয়ে গেলো প্রণয়ের। তবুও মিষ্টি হেসে বললো,
“বোন না থাকুক, ছোট একটা ভাই তো আছে তোমার। আর খুব শীঘ্রই হয়তো বোনও আসবে।”
“সত্যি?”
“তিন সত্যি।”
“চলো, গুড বয়।”

“নান্টু ঘটকের কথা শুইনা অল্প বয়সে করলাম বিয়া…”
মুরুব্বীরা কইলো, সবাই নো টেনশন নো চিন্তা—পাইছ জীবনে দারুন একটা পোলা।
পোলা তো নয়, সে যে আগুনের গুলা রে। পোলা তো নয়, একখান আগুনের গোলা।
চোখ-মুখ কুঁচকে গ্লাসে চুমুক দিচ্ছে আর মনের দুঃখে গান গাচ্ছে ইনায়া।
ওর এসব অদ্ভুত গান শুনে যেতে নিয়ে ও থেমে গেল প্রিয়তা। ভ্রু কুঁচকে তাকাল রান্নাঘরের দিকে।
সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে হাঁক ছেড়ে বলল,
“সকাল সকাল ছ্যাকা খেয়ে বাপ্পারাজ হয়ে গেছিস নাকি? এমন ধেড়ে গলায় চ্যাচাচ্ছিস কেন?”
ইনায়া ঢং করল কান্নার ভঙ্গি ধরে। বলল,

“এ এ এ… এখন তোর তো আমার গলা ধেড়ে লাগবেই। তোর ভাই একটা নিষ্ঠুর। তুই আর কত ভালো হবি?”
বিরক্তিতে মুখ তেতো হলো প্রিয়তার। সিঁড়ি থেকে নেমে এগিয়ে গেল ইনায়ার নিকট।
চোখ-মুখ খিঁচে আরেক ঢোক গিলল ইনায়া।
প্রিয়তা ওর কাণ্ডকারখানা দেখে ভ্রু জোড়া কুঁচকে নিল। চোখ সরু করে সন্দিহান কণ্ঠে সুধালো,
“সকাল সকাল গাঁজা খেয়েছিস নাকি লেবু পানি গিলছিস যে?”
ইনয়া কপাল চাপড়ে বললো,
“আমার আপন স্বামী আজকা দুঃখ লাগে। আমার আপন স্বামী আমার আপনা আমারে কয় ভুটকি। এই দুঃখে আমি লেবুর রস খাই।”
ড্রামাবাজ!
ইনায়া কপালে হাত রেখে বলল,

“হ্যাঁ আমার কপাল! এতদিন জামাই বলত নাটক করি, এখন বান্ধবী বলে। আর হবে নাই বা কেন, একই গোয়ালের গোরু।”
“কিছু বললি?”
ইনায়া ঝগড়া করার ফুল মোডে। সে ঝগড়া করতে গিয়েও থেমে গেল। প্রিয়তার পানে চোখ পড়তেই ৩৬০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে মনোযোগ ঘুরে গেল অন্য দিকে।
ইনায়ার দুষ্টু দুষ্টু চাউনি দেখে ভড়কে গেল প্রিয়তা।
ভ্রু নাচিয়ে সুধালো,
“কী?”
ইনায়া ঠোঁট চেপে হাসল। পেছন থেকে ঊষা প্রিয়তার শাড়ির আঁচল টেনে ঘোমটা দিয়ে বলল,
“শরম বড় ভাবি। আমাদের শ্বশুর, ভাসুর, দেবররা সবাই এখানেই আছেন।”
প্রিয়তা অবাক কণ্ঠে বলল,

“মানে?”
ইনায়া দুষ্টু হেসে বলল,
“তো আবার কী বান্ধবী? একটু তো শরম করো। তোমার ভেজা চুল বেয়ে টপ টপ করে পানি পড়ছে। তোমার হাতে খামচির দাগ, গলায় খামচির দাগ, কইতে শরম লাগে তবু ও বলি—বুকে আঁচড়ের দাগ, কামড়ের দাগ—এগুলো কি উনাদের দেখাবে? গুরুজন না?”
চোখ বড় বড় হয়ে গেল প্রিয়তার। ড্রয়িং রুমের পানে উঁকি দিয়ে দেখল সবাই বসে আছে।
“ওদিকে না, এদিকে দেখো,” বলে পেছনে দেখতে ইশারা করল ঊষা।
পেছনে তাকাতেই টাস্কি খেলো প্রিয়তা। অনুশ্রী বেগম, তনুশ্রী বেগম, অনন্যা বেগম, অর্থি বেগম রান্না করতে করতে নিজেদের মধ্যে টুকটাক কথাবার্তা বলছেন। তাদের ভাবখানা এমন যেন খুব সিরিয়াস, কিন্তু তাদের ঠোঁটের কোণের মুচকি হাসিটা স্পষ্ট দৃশ্যমান।

তাদের হাসি লুকাতে দেখে লজ্জায় কান গরম হয়ে উঠল প্রিয়তার। মন চাইল মাটি ফাঁক করে ভেতরে ঢুকে পড়তে।
ইনায়া ওর অবস্থা দেখে ঠোঁট চেপে হাসল। গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
“সকাল সকাল ভালোবাসা নিচ্ছ, নাও ভালো কথা। কিন্তু মনে রেখো বন্ধবি—পুরুষ মানুষের ভালোবাসা বড় ভয়ংকর। যে পেয়েছে সে নিঃসন্দেহে গর্ভবতী। দেখো আমাকে, এখন তোমার পালা।”
তীব্র লজ্জায় হাঁসফাঁস করে উঠল প্রিয়তা। বোধ করল কাউকে আর মুখ দেখানোর পরিস্থিতিতে নেই সে।
ইনায়া আরও কিছু বলতে চাইল, তবে সেসব শোনার অপেক্ষা করল না প্রিয়তা। ছুটে রান্নাঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
ঊষা ও ইনায়া হেসে উঠল ধীরে।

ছুটার তালে মাথা থেকে ঘোমটা পড়ে গেছে প্রিয়তার। প্রতিটি পদক্ষেপ দুলে উঠছে শিক্ত ঘন কেশরাশি।
লজ্জার থেকে পালাতে মরিয়া প্রিয়তা দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে উঠতে নিয়ে কুঁচিতে পা পেঁচিয়ে হোঁচট খেল।
আতঙ্কে রক্ত হিম হয়ে গেল প্রিয়তার। ভয়ে চোখ খিঁচে বন্ধ করে নিল।
মুখ থুবড়ে পড়ে নিলেই বোধ করলো কেউ তার হাতটা টেনে ধরেছে পরম যত্নে। সেই মানুষটা অজস্র মায়া নিয়ে অপলক চেয়ে রইল সেই সুশ্রী ভয়ার্ত মুখখানার পানে।
কলিজায় পানি হলো প্রিয়তার।
ঢোক গিলে চোখ পিটপিট করে তাকাল।

বাঁ হাতের কবজি টেনে ধরে নিষ্পলক চোখে তার দিকে চেয়ে আছে শুদ্ধ। মুখ-চোখের এলোমেলো অবস্থা, শরীরের অবস্থা বিধ্বস্থ। খুব কাছ থেকে অ্যালকোহলের তীব্র গন্ধ আসছে।
ফের অস্বস্তিতে পড়ল প্রিয়তা। দৃষ্টি নত হয়ে এল আপনাআপনি। নিচু কণ্ঠে আস্তে করে বলল,
“হাতটা ছাড়ুন।”
“আমি ছাড়লে কি তুমি ভালো থাকবে প্রিয়া?”
কণ্ঠটা আবেগী শোনাল শুদ্ধর।
প্রিয়তা দৃষ্টি মেলাতে পারল না। অন্যত্র তাকিয়ে বলল,
“আমি অনেক ভালো আছি।”
ম্লান হাসল শুদ্ধ। প্রিয়তার মাথা থেকে পা পর্যন্ত চোখ বুলিয়ে ব্যথাতুর কণ্ঠে বলল,
“হুম হুম, তুমি যে ভালো আছো তা তো আমি দেখতেই পাচ্ছি। শুনো প্রিয়া, সব সময় ভালো থাকবে। এভাবেই হাসবে, কেমন।”

শুদ্ধর চোখ দুটো টকটকে লাল। মুখ দিয়ে ছুটে আসছে তীব্র অ্যালকোহলের গন্ধে মস্তিষ্ক গুলিয়ে আসে। প্রিয়তা অবাক হলো।
কন্ঠে হতাশার সুর টেনে বললো,
“আপনি ড্রিঙ্ক করেছেন?”
সুদর্শন মুখটা প্রাণনাশী ব্যথায় নীল হয়ে গেল শুদ্ধর। কোমল হাতের মুঠোতে একটুখানি ঠোঁট চেপে ধরার অধম্য ইচ্ছা জাগল বুকের ভেতর, তবে নিষিদ্ধ ইচ্ছাটা পায়ের নিচে পিষে ফেলল শুদ্ধ।
অসহায় কণ্ঠে বাচ্চাদের মতো অভিযোগ করল,

“কী করবে জেনে? পারবে আমার কষ্ট কমিয়ে দিতে? পারবে আমার জ্বালা জুড়িয়ে দিতে? না তো! এতো করে বললাম তুমি ছাড়া অসহায় আমি মরে যাবো, কিন্তু তুমি তোমার ভালোবাসাটাই দেখলে প্রিয়া।”
হাত ছাড়িয়ে দূরত্ব নিয়ে দাঁড়াল প্রিয়তা। তার চোখ-মুখে অস্বস্তি। আড়ষ্ট কণ্ঠে বলল,
“আপনার মুখে এসব কথা মানায় না শুদ্ধ ভাই। আপনার সব কষ্টে প্রলেপ দেওয়ার জন্য আপনার স্ত্রী আছে।”
শুদ্ধ এক পা কাছে এগিয়ে এল। অসহনীয় কণ্ঠে বলল,
“আছে তো। জটিল রহস্যময়ী এক নারী। একদম তোমার মতো নয়।”
“তোমার মতো কোমল নাহ্, তোমার মতো সরল নাহ্। ওকে দেখলে যান্ত্রিক অনুভূতি হয়।”
“দেখতে তো আমার মতই।”
“কিন্তু তুমি তো নও।”

“আপনি ড্রাঙ্ক শুদ্ধ ভাই, আপনার হুঁশ নেই।”
“হ্যাঁ, আমি মাতাল। আমার হুঁশ নেই। অনেক অনেক নেশা করেছি আমি। নেশা আমার রক্তে মিশে আছে। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমি ড্রিঙ্ক করে নিজের চেতনা হারাইনি। এই নেশা আমার মদ খেয়ে হয়নি।”
কথা বলতে বলতে লাল লাল চোখ দুটো উষ্ণ তরলে ভরে উঠল শুদ্ধর।
ফের ভাঙা গলায় বলল,
“জানো প্রথম কবে আমার চেতনা হারিয়েছি? কবে আমি আমার মধ্যে নিজেকে নয়, বরং অন্য কারও অস্তিত্ব অনুভব করেছি?”
প্রিয়তা চোখ তুলে তাকাল।

“শোনো তবে, প্রিয়তমা। আমি নিজেকে হারিয়েছি আজ থেকে ১৮ বছর আগে—যখন আমি লাল ফ্রক পরা ছোট্ট একটা পুতুলকে দৌড়ে এসে আমার সামনে মুখ থুবড়ে পড়তে দেখেছিলাম। চোটে গিয়ে কোলে তুলে নিয়েছিলাম। বোধ করি সেই খনেই আমি আমার অস্তিত্ব খুঁইয়েছি। পুতুলটা আমার খুব পছন্দ হয়ে গেছিলো জানো প্রিয়তা?”
“সেদিন সেমুহূর্তেই ঠিক করে নিয়েছিলাম—এই পুতুলটা আমার চাই। যে কোনো মূল্যে হোক, ওকে আমার লাগবেই।”
“এর পর থেকে যত দিন যায় ওই পুতুলটার প্রতি আমার মায়া বাড়তে থাকে। মায়া বললে ভুল হবে—ভয়াবহ মাত্রার অবসেশন বাড়তে থাকে। সময়ের সাথে সাথে ওই পুতুলটা আরও বেশি সুন্দর হয়ে ওঠতে থাকে।”
“খুব ভালো লাগত ওকে দেখলে। কোলে নিতে মন চাইত, আদর করতে মন চাইত। ওর লাল গালে আদর আঁকতে মন চাইতো। কিন্তু পারতাম না জানো—আমায় ছুঁতেই দিত না। এমন কি কচাকাচিও যেতে দিতো না। খুব রাগ হতো তখন।”

“সবাই কোলে নিয়ে ওর লাল লাল গালে টুপুস টা টাপুস ইচ্ছেমতো চুমু খেতে। কিন্তু আমি পারতাম না। ছোটবেলায় কত ঝগড়া করেছি ওই পুতুলের জন্য। ওই পুতুল ছাড়া আমার আর কিছুই ভালো লাগত না। কিছুতেই মন বসাতে পারতাম নাহ্।”
“সময়ের প্রবাহে একটা সময় অনুভব করলাম—আমি ওই পুতুলটার প্রতি শুধু অবসেসড, অ্যাডিক্টেড হয়ে গেছি। ও এক মুহূর্ত চোখের আড়াল হলে ও নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হতো, দম বন্ধ লাগতো।”
“কিন্তু আমি যতই ভালোবাসি না কেন, ওই পুতুলের মালিকানা আমার ছিলো নাহ্। প্রথম থেকেই তার অধিকার ছিল অন্যকারো।”

“একটা সময় আমাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়। খুব কষ্ট হচ্ছিল সেদিন, যেদিন আমার পুতুলকে ছাড়া আমার আর কোনো উপায় ছিলো না। ওইদিন মনে হচ্ছিল কেউ হয়তো আমার কলিজাটা চিরে রেখে দিচ্ছে এদেশেই।”
“বিদেশের মাটিতে মৃত্যুসম দিন কাটত আমার। সারা দিন রাত ছটফটিয়ে মরতাম শুধু একবার দেখার তৃষ্ণায়। কিন্তু ভাগ্য আমার কোনোদিনও সাদ দেয়নি।”
“এর পর দাঁতে দাঁত পিষে ধৈর্য ধারণ করলাম। বিদেশের মাটি আকড়ে পড়ে রইলাম এই আশায় যে আমাকে আমার পুতুলের যোগ্য হতে হবে।”
“নিজের মনকে বুঝ দিলাম—যোগ্য হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে আমি আমার পুতুলকে আমার করে নেব। সেদিন আর কেউ আটকাতে পারবে না আমায়।”

“এরপর কেটে গেল দীর্ঘ্য ১০টা বছর।”
বলে থামল শুদ্ধ। রক্তিম দুই চোখ উপচে পড়ছে নোনা জল।
“১৭ বছরের সেই ছেলেটা ২৭ বছরের যুবক হয়ে ফিরে এল শুধু মাত্র নিজের পুতুলের আশায়।”
“কিন্তু এসে দেখল—আগে কেবল অন্য একজন পুতুলের কাছাকাছি যেতে বাধা দিত, কিন্তু এখন আর পুতুল নিজেই তার কাছে আসতে চায় না।”
“সব দুঃখ সহ্য হলে ও এই দুঃখ কিছুতেই সহ্য হচ্ছিল না প্রাণে।”
“বাড়ি সবার পায়ে ধরে বলেছিলাম পুতুলটাকে আমায় দিয়ে দিতে। আমি খুব যত্ন করে রাখব।”
“কিন্তু তারা কেউ সেদিন আমার কোনো কথা শুনেনি।”
“ওই অবুঝ ছোট্ট পুতুলটাকে নিয়ে তারা মেতে উঠেছিল নোংরা ষড়যন্ত্রে। তারা ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল তাকে ব্যাবহার করে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধিতে।”

“আমার মতো আরও কোনো একজনের ভালোবাসার সুযোগ লুটছিল তারা। কোণঠাসা করে দিয়েছিল একদম।”
“কিন্তু তাতে আমার কী? আমি তো সেই পুতুলের নেশায় উন্মাদ ছিলাম।”
“কিন্তু ওই পুতুলটা আর আমার কাছে আসত না। সে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল অন্য কারো ভালোবাসায়। তার চোখে আমি পড়তামই না।”
“বড় কষ্ট হতো জানো। অসহায়ত্বে একা একা কাঁদতাম, যখন দেখতাম আমার ভালোবাসার পাখিটা অন্য কাউকে এত ভালোবাসছে।”

“পাবে না জেনেও ভালোবাসছে। পাপ জেনেও ভালোবাসছে। নিষিদ্ধ জেনেও ভালোবাসছে।”
“অতটুকু মেয়ের ভালোবাসার ধার দেখে আমি গুটিয়ে গিয়েছিলাম।”
“প্রণয় তো তখন হেরে গিয়েও জিতে গিয়েছিল। কিন্তু এসবে কি আমার ভালোবাসা থেমে থাকবে?”
“ওটা তো দিন দিন বেড়েই যাচ্ছিল।”
“এই ভালোবাসা পাওয়ার তীব্রতা আমায় স্বার্থপর বানিয়ে তুলেছিল।”
“তারপর একদিন আমারও দিন এল।”
“পুতুলটা যার জিম্মায় ছিল, সে সব দিক থেকেই আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গিয়েছিল শত্রুদের জালে।”
“বাধ্য হয়ে বলেছিল—তার পুতুলটা আমায় দিয়ে দেবে।”
“সেদিন কত খুশি হয়েছিলাম জানো না তুমি।”
“সে তার কথা রেখেছিল।”

“সঠিক সময় তার পুতুলটা আমায় দিয়ে দিতে চেয়েছিল।”
“কিন্তু সেই পুতুলটা আমার বুকের খাঁচায় থাকতে চাইল না।”
“সে বেছে নিল তার পুরনো নীড়।”
“খুব ভালোবাসি তো, কীভাবে কষ্ট দিতাম বলো?”
“তাই নিজেকে নিঃস্ব করে তাকে পূর্ণ হতে দিয়েছি।”
“সে এখন আমার চোখের সামনে অন্যের স্ত্রী হয়ে ঘুরে বেড়ায়।”
“অন্যের গভীর স্পর্শের নিশান গায়ে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়।”
“বোকা মেয়েটা আন্দাজও করতে পারে না—তার অবুঝপনা কতটা রক্তক্ষরণ ঘটায় আমার ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ে।”
“জানো, মরে যেতে মন চায় তখন—এখন যেমন তোমার অবস্থা দেখে মন চাচ্ছে।”
“কিন্তু মরে যেতেও ভয় হয়।”

“এখন তো তবু চোখের সামনে দেখতে পাই।”
“মরে গেলে তো ওটুকু স্বস্তিও আমার তকদিরে জুটবে না।”
প্রিয়তা স্তব্ধ, বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
কথাগুলো যে তাকে মিন করে বলা—তা বুঝতে কিঞ্চিৎ মাত্রও কষ্ট হয়নি তার।
এই মানুষটা তাকে এত ভালোবেসেছে, অথচ সে কোনোদিন দেখেইনি। দেখলেও হয়তো কোনো লাভ হতো না।
প্রিয়তা চোখ নামিয়ে নিল। অজান্তেই চোখের কোণ বেয়ে দুফোটা অশ্রু ঝরল।
এজন্য নয় যে সে কেন এই মানুষটাকে ভালোবাসতে পারল না, বরং এজন্য যে একটা মানুষ কেবল তাকে ভালোবেসে বছরের পর বছর কষ্ট পাচ্ছে।
কিন্তু এখানে তো তার কিছুই করার নেই।

প্রিয়তা বলার জন্য শব্দ খুঁজে পেল না। কেবল চোখ বন্ধ করে মহান রবের নিকট প্রার্থনা করল—
“হে মাবুদ, যা কখনো হওয়ার নয় তা নিয়ে কাউকে আর কষ্ট দিও না। তার কলিজায় সুখ শান্তির বর্ষণ করো মাবুদ। তোমার রহমত নসিব করো। যা কখনো তার হবে না, তার জন্য মনে আর মায়া দিও না।”
“আমার জন্য সুখের কামনা করছ নীল নয়না?”
“করো না, লাভ নেই। আমার সমস্ত সুখ আল্লাহ অন্য কারো নামে লিখে দিয়েছেন।”
প্রিয়তা অসহায় চোখে তাকাল। নরম মনটা ব্যথিত হচ্ছে অজানা অপরাধ বোধে।
বিয়েতে ‘না’ বলার জন্য পূর্বে অপরাধ বোধ হতো, কিন্তু—

“ওভাবে তাকিয়ো না নীল নয়না। আমার জন্য বাঁচা মুশকিল হয়ে যাবে। নিঃশ্বাস নেওয়া ও মুশকিল হয়ে যাবে।”
প্রিয়তা চোখ নামিয়ে এলোমেলো দৃষ্টি ফেলল।
এই লোকটা তাকে দেখে যে দুর্বল—এটা বুঝতে পারে প্রিয়তা।
তাই তো প্রয়োজন ব্যতীত সামনে পড়তে চায় না।
কাউকে ইচ্ছে করে কষ্ট দেওয়ার মানসিকতা নেই তার।
আর যাই হোক, ভালোবাসার মানুষকে অন্যের সাথে দেখার যন্ত্রণাটা যে কতটা ভয়াবহ—তা প্রিয়তার থেকে ভালো আর কে জানে?
প্রিয়তা কথা ঘোরাতে হালকা কেশে আস্তে করে বলল,

“ওগুলো পুরনো কথা। ওসব মনে ধরে বসে থাকলে কি জীবন চলবে?”
“অসুখ আমার, অসুস্থ আমি।”
“এটা আপনার মনোরোগ।”
“না হৃদয় হরণী, এটা আমার হৃদরোগ।”
“আপনি পাগলামি করছেন শুদ্ধ ভাই। আমি কোনোদিনও আপনার হব না।”
“জানি তো। এভাবে বলে ব্যথা দেওয়ার কী আছে?”
কণ্ঠটা বোধহয় কাঁপল শুদ্ধর।
প্রিয়তা আর কিছুই বলতে পারল না।
ভিতর থেকে অযাচিত দীর্ঘনিশ্বাস বেরিয়ে এল।
লোকটাকে ভালোবাসে তাকে, অথচ বিয়ে করে নিয়েছে তার বোন—বিষয়টা অদ্ভুত না।
প্রিয়তা ধরে নিল, হয়তোবা শুদ্ধ প্রিয়তা ভেবেই প্রিয়স্মিতাকে বিয়ে করেছে।
এটা ভাবনায় আসতেই আরও বেশি অপরাধ বোধে কুকড়ে গেল প্রিয়তা।
শুদ্ধর পাশ কাটিয়ে যেতে নিলেই ধরা গলায় ডেকে উঠল শুদ্ধ—

“জান আমার, শোনো।”
আপনাআপনি পা থেমে গেল প্রিয়তার।
অনুভূতির সম্মান করতে জানে সে, তাই রাগ করল না।
পেছনে ঘুরে ধীরে বলল,
“আমি বিবাহিত শুদ্ধ ভাই। কারো স্ত্রী।”
প্রকাশ্যে ভেঙে পড়ল শুদ্ধ।
প্রিয়তাকে অন্তত একবার বুকে জড়িয়ে ধরার অধম্য ইচ্ছা হলো।
কিন্তু নিজের সর্বোচ্চ ইচ্ছাকে এবারও পদতলে পিষ্ট করল শুদ্ধ। সে যে পরপুরুষ।
প্রিয়তার সম্মুখে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল শুদ্ধ।
চোখ থেকে দুফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল প্রিয়তার ফর্সা পায়ে।
বিস্মিত হলো প্রিয়তা।

পুরুষ হওয়ার দরুন প্রাণ খুলে বিলাপ ও করতে পারছে না। সকল আর্তনাদ এসে দলা পাকিয়ে যাচ্ছে গলায়। ভেতরের কান্নাগুলো পুরুষ সত্তা যেনো দমিয়ে রাখতে চায়।
প্রিয়তা কিছু বলার পূর্বেই ব্যাকুল কণ্ঠে শুদ্ধ বলে উঠল—
“বেঁচে থাকতে তোমার কণ্ঠে আমার বহুল কাঙ্ক্ষিত ‘ভালোবাসি’ শব্দটা শুনতে পাব না জানি।”
“কিন্তু জান আমার, আমার শেষ ইচ্ছাটা পূরণ করবে তো।”
“আমি মরে গেলে চক্ষু লজ্জা বিসর্জন দিয়ে অন্তত একবার আমায় জড়িয়ে ধরবে তো।”
“চিৎকার করে না হলেও একবার অন্তত কানে কানে বলবে তো—‘ভালোবাসি’।”
“লোকে বলে মৃত মানুষ নাকি সব শুনতে পায়, বুঝতেও পারে।”
“আমি শেষ যাত্রায় মিথ্যে হলেও তোমার একটু ভালোবাসা চাই নীল নয়না।”
“একজন মৃত ব্যক্তির শেষ ইচ্ছা ধরে নিয়ো।”
“মন রাখার জন্য হলেও বলো।”
চোখে পানি চলে এল প্রিয়তার। এক মুহূর্ত আর ওখানে দাঁড়াতে পারল না।
এসব জটিল পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে অভ্যস্ত নয় সে, তাই স্থান ত্যাগ করাই শ্রেয় মনে করল।

ঘন কুয়াশার আস্তরণ মিলিয়ে ঝলমলে রোদ উঠেছে। সকাল প্রায় ১০টা।
ড্রয়িংয়ে দাঁড়িয়ে বউয়ের অপেক্ষা করতে করতে বিরক্ত হলো প্রণয়। হাত ঘড়িতে সময় দেখে নিয়ে হাঁক ছাড়ল,
“জান, আর কতক্ষণ লাগবে? আমি উপরে আসলে কিন্তু তোর খবর করে ছাড়ব।”
“আসছিইইইই, আর ২ মিনিট,” চেঁচিয়ে জবাব দিল প্রিয়তা।
ভারি দীর্ঘনিশ্বাস বেরিয়ে এল প্রণয়ের। পাশে তাকাতেই দেখল রাজ মিটিমিটি হাসছে।
ভ্রু কুঁচকে এলো প্রণয়ের।

“কী এমন কেবলার মতো দাঁত বেরকরে হাসছিস কেন?”
রাজ কিছু বলার জন্য মুখ হাঁ করে ও আবার বন্ধ করে নিল। ছোট ভাইদের সাথে বাদরামি ইটস ওকে, কিন্তু বড় ভাইয়ের সাথে নো নো নো—সেফটি মাস্ট।
“কী ভাবছিস?”
মাথা চুলকালো রাজ। হাসি চেপে মুখ সিরিয়াস করে বলল,
“মহিলাদের সাজতে একটু বেশি সময় লাগে দাদান, ইটস ইউনিভার্সাল প্রবলেম।”
মুখে কিছু না বললেও মনে মনে প্রণয়ও সহমত জানাল।
“এই যে শুনছেন, এদিকে আসুন তো,” পূর্ণতার ডাকে চলে গেল রাজ।
এতক্ষণ সোফায় বসে বসে সবই দেখছিল প্রিয়স্মিতা। রাজ যেতেই ধীর পায়ে এগিয়ে গেল প্রণয়ের নিকট। প্রণয় যেন দেখেও দেখল না।
হাসল প্রিয়স্মিতা। ঠোঁট বাকিয়ে বলল,

“আমার বোনকে বোকা বানানো খুব সোজা তাই না, মিস্টার ASR? একদম বোকা সোকা ভোলা ভালা অবলা একটা মেয়ে।”
প্রণয় আবারো পাত্তা দিল না।
প্রিয়স্মিতাও ওই নীরব অপমানটা গায়ে মাখল না। বাঁকা হেসে মনে মনে বলল,
“জীবনের শেষ দিনটা ভালো মতো বেঁচে নিন, মিস্টার অপরাধী।”
প্রণয় ফিরে তাকাল প্রিয়স্মিতার পানে। ওর এক্সপ্রেশন দেখে মনে মনে হেসে বলল,
“হারামিতে আমার থেকে কোনো অংশে কম যাও না। আই ইম্প্রেসড। যাক এই বংশে কেউ তো আছে আমার মতো।”
ধূর্ত প্রিয়স্মিতা কথার মানে ঠিকই বুঝল। রহস্যময় কণ্ঠে বলল,
“সেম ডিএনএ, কিন্তু আফসোস আমি অপরাধী পছন্দ করি না। ক্রাইম দেখলে হাত নিশপিশ করে ক্রিমিনালকে শাস্তি দেওয়ার জন্য।”
নীরব হাসল প্রণয়।
অদ্ভুত কণ্ঠে বলল,

“এই জন্যই তুমি এই বংশের সবার থেকে ডিফারেন্ট। আমি দোয়া করি তুমি অনেক বড় হও। তুমি আমায় শত্রু মনে করলেও আমি তোমায় শত্রু মনে করি না। কারণ তুমি অনেক ছোট, ওই স্ট্যান্ডার্ডেই পড়ো না। তুমি আমার বোন আর তুমি একটা ভালো কাজের উদ্যোগ নিয়েছো। আমি যেমনি হই, ভালো কর্মে আমি আমার ভাই বোনদেরকে সর্বদাই অ্যাপ্রিশিয়েট করি। তুমি যে দায়িত্ব পেয়েছ, নিষ্ঠার সাথে তা পালন করো—সেই দোয়াই করি। এই মিশনটা যদি সাকসেস করতে পারো, তাহলে তোমার বড় দাদানের কাছ থেকে একটা উপহার তুমি নিশ্চয়ই পাবে।”
অমন নির্ভীক চোখ দুটো দেখে মুখ বন্ধ হয়ে গেল প্রিয়স্মিতার। অবাক হতেও যেন ভুলে গেল।
প্রণয় আর কিছুই বলল না। সামনে তাকিয়ে পুনরায় প্রিয়তার উদ্দেশ্যে হাঁক ছাড়ল।
উঁচু গলায় ডেকে বলল,

“যদি ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে না নামিস, আমি উপরে আসবো।”
বলতে বলতে আপনাআপনি মুখ বন্ধ হয়ে গেল প্রণয়ের। আকস্মিক গভীর চোখ দুটো স্থির হয়ে গেল যেন।
প্রিয়তা চঞ্চল ভঙ্গিতে সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসছে। ল্যাভেন্ডার রঙের ফুল স্লিভ জর্জেট থ্রিপিসে হুরপরী লাগছে। এক এক করে শরীর ধাপে পা রাখার সাথে সাথে দুলে উঠছে হাঁটু ছাড়ানো উন্মুক্ত খোলা চুল।
প্রিয়তা ব্যস্ত হাতে সামনের অবাধ্য চুলগুলো কানের পিঠে গুঁজে বলল,
“উফ, আসছি আসছি। এত তাড়া দিলে কি চলে? আমি ঠিকমতো লিপস্টিকও পরতে পারলাম না।”
প্রিয়তা এক দৌড়ে চলে এল প্রণয়ের নিকট।
প্রণয়ের দৃষ্টিতে ভারি মুগ্ধতা, তবে সেটা লক্ষ্য করল না প্রিয়তা। অভ্যাসবশত কাঁধের ব্যাগটা খুলে প্রণয়ের হাতে দিয়ে দিল।
ঠোঁট চেপে মুচকি হাসল প্রণয়। ব্যাগটা নিয়ে নিজের কাঁধে ঝুলাল।
প্রিয়তার হাবভাব দেখে খটকা লাগল প্রিয়স্মিতার। ভ্রু উঁচিয়ে জানতে চাইল,

“এত সেজে কোথায় যাচ্ছিস?”
ঝরঝরে হেসে প্রিয়স্মিতাকে জড়িয়ে ধরল প্রিয়তা। উৎফুল্ল কণ্ঠে বলল,
“পরীক্ষা দিতে যাচ্ছি আপু।”
নিশ্চিন্ত হলো প্রিয়স্মিতা। গালে হাত রেখে আদুরে কণ্ঠে বলল,
“ভালো মতো মনে করে করে দিস। তাড়াহুড়ো করিস না।”
“আচ্ছা আপু।”
প্রিয়তার আঙুলের ভাঁজে আঙুল গুঁজে দিল প্রণয়। সন্তর্পণে চেপে ধরল কোমল হাতের মুষ্টি।
“চল, দেরি হচ্ছে তো।”
“হুম, চলুন।”
ওরা যেতে ধরলেই পেছন থেকে ডেকে উঠলেন অনন্যা বেগম। ওনার দুই হাতে দুটো দুধের গ্লাস।

“প্রিয়, দাঁড়া। দুধ না খেয়ে পরীক্ষা দিতে যাচ্ছিস কেন?”
ভর্তি দুধের গ্লাসটা দেখেই মুখ কুঁচকে নিল প্রিয়তা। অসহায় চোখে তাকাল প্রণয়ের পানে।
তবে প্রণয় আরও এক ধাপ এগিয়ে অনন্যা বেগমকে বলল,
“সেজো আম্মু, গ্লাসটা আমাকে দাও।”
অনন্যা বেগম নিশ্চিন্ত হলেন। এক গ্লাস প্রণয়ের হাতে দিয়ে অন্য গ্লাস দিলেন প্রিয়স্মিতাকে। প্রিয়স্মিতার আবার এত নখরা নেই, তার দুধ খেতে ভালোই লাগে।
প্রিয়তার নাকের কাছে গ্লাস ধরল প্রণয়। কঠিন কণ্ঠে বলল,
“হু হা হ্যাঁ না—কিচ্ছু শুনব না। চুপচাপ হাঁ কর।”
প্রিয়তার কাঁদো কাঁদো ভাব। মুখ লটকে করুণ কণ্ঠে বলল,
“বিশ্বাস করুন প্রণয় ভাই, বড় বিশ্রী স্বাদ আর কী মারাত্মক গন্ধ!”
ঘোর বিরোধিতা জানাল প্রণয়। শান্ত গলায় ধীরে ধীরে বলল,
“একদম বদনাম করবি না। হাই প্রোটিন।”
মুখ কুঁচকালো প্রিয়তা। গ্লাসটা ঠেলে দূরে সরিয়ে বলল,

“দুধ এত ভালো লাগলে আপনি নিজে খেয়ে নিন। ওই প্রোটিন আমার লাগবে না।”
চোখের দৃষ্টি সরু হলো প্রণয়ের। ঠোঁট কামড়ে হাসল। কানের কাছে ঠোঁট নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
“সকালেই তো খেলাম, ওটা বেস্ট ছিল। আই ডোন্ট লাইক কাউ মিল্ক।”
জবাব শুনে বিষম খেলো প্রিয়তা। চোখ বড় করে তাকাল প্রণয়ের দিকে। মনে মনে নির্লজ্জ বলতে ভুলল না।
আর বেশি বাক্য ব্যয় না করে বাঁ হাতে প্রিয়তার নাক টিপে ধরল প্রণয়। জোর জবরদস্তি খাইয়ে দিল পুরো গ্লাস।
পকেট থেকে রুমাল বের করে ঠোঁট মুছতে মুছতে বলল,

“ভালোয় ভালোয় লক্ষ্মী মেয়েটার মতো খেয়ে নিলে এসব করতে হতো না।”
অভিমানে মুখ বাঁকালো প্রিয়তা।
অনন্যা বেগম মুচকি হেসে চলে গেলেন। পরপর বেরিয়ে গেল প্রণয়-প্রিয়তা। কেবল নির্বোধের মতো এক জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল প্রিয়স্মিতা। সে যত দিন যাচ্ছে শুধু অবাক হচ্ছে।
সে লক্ষ্য করেছে প্রিয়তার সাথে থাকা কালীন আবরার সিকদার প্রণয়ের মধ্যে পাপের আভাস পাওয়া যায় না। এমনকি ওই মুহূর্তটাতে তাকে দেখলেই মনেই হয় না সে কোনো ভুল করতে পারে। অথচ!
আরও বেশি অবাক লাগে তখন, যখন অমন একজন অপরাধীকে তার বোনের প্রতি সর্বসমর্পিত হতে দেখা যায়।
প্রিয়স্মিতা আর কিছু বুঝুক আর না বুঝুক, এতটুকু নিশ্চয়ই বুঝেছে যে আবরার সিকদার প্রণয় এই পৃথিবীতে কাউকে ভালোবাসুক আর না বাসুক, তার বোনকে কলিজার ভেতর ভরে রাখে।
এমনকি তার বোন এত বড় মাপের অপরাধীর একমাত্র দুর্বলতাও বটে।
প্রকৃত পক্ষে আবরার সিকদার প্রণয়ের সাম্রাজ্যের সব থেকে ফাটল।

তবে এসকল ব্যক্তি সম্পর্কের ঊর্ধ্বে দেশ ও জনগণ, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা। তবে এটুকুও পরিষ্কার বুঝেছে প্রিয়স্মিতা যে আবরার সিকদার প্রণয় নিজেই চায় যে তাকে ধরা হোক, তাকে প্রতিরোধ করা হোক। সে চাইলেই এসব কিছু বন্ধ করে দিতে পারত, কিন্তু সে এমন করছে না।
সোফায় বসে পড়ল প্রিয়স্মিতা। তার মাথা গুলিয়ে যাচ্ছে। অমন একজন অপরাধী সে কেনই বা যেচে পড়ে ধরা দিতে চাইবে? যেখানে জানে একবার ধরা পড়লে নিশ্চিত মৃত্যু। সে চিরদিনের জন্য হারাবে তার ভালোবাসা, তার দুর্বলতা।
এত যখন ভালোবাসে, তখন কেন দীর্ঘ জীবনের সমাপ্তি চাচ্ছে? আসলে কী চায় ASR?

হাজার হাজার প্রশ্ন, কিন্তু কোনো সঠিক উত্তর নেই প্রিয়স্মিতার ঝুলিতে। কেমন গোলকধাঁধা লাগে সব কিছু।
বোনের মুখটা দেখলে প্রচণ্ড মায়া হয়, আবার যখন মনে পড়ে নিজের বোনের সুখের জন্য হাজার হাজার মা বোনকে সে নরকে ঠেলে দিচ্ছে, তখন নিজের প্রতি ঘৃণা আসে। সে অনেক বার চেয়েছে পেনড্রাইভসহ সকল প্রমাণ সরকারের হাতে তুলে দিতে, কিন্তু প্রতিবারই বোনের নিষ্পাপ মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠছে।
আবার আরেকটা বিষয়ও বড় গোলমেলে—যে ASR সম্বন্ধে এত বছর কেউ এক চুলেরও প্রমাণ জোগাড় করতে পারেনি, সেখানে সে এত সহজে কীভাবে সব কিছু হাতে পেয়ে গেল? এত এত প্রশ্নের একটাই উত্তর প্রিয়স্মিতার মনে উঁকি দিল, যা বড় ভয়ানক।

ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৭৯

তার মানে সরকার নয়, আবরার সিকদার প্রণয় নিজেই নিজের ধ্বংস চায়। যে বিশাল পাপের সাম্রাজ্য সে গড়েছে, সে নিজেই সেই সাম্রাজ্যের পতন চায়। সর্বোপরি আবরার সিকদার প্রণয় মৃত্যুকে কবুল করে নিয়েছে। এখন শুধু প্রিয়স্মিতার অপেক্ষা।

ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৮০ (২)