তুমি এসেছিলে বলে পর্ব ১০

তুমি এসেছিলে বলে পর্ব ১০
নাদিয়া আক্তার সিয়া

মেঘকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে আয়নার দিকে তাকিয়ে মেহতাব মুচকি হেসে বললো,
মেহতাব : এখন গেট আপ কমপ্লিট হয়েছে । (মেঘের ঘাড়ে মাথা রেখে)
মেঘ নিজের দিকে তাকিয়ে দেখলো সত্বি ওই গলার নেকলেস আর বেলী ফুলের মালা খোপায় দেওয়ার পর তাকে আগের চেয়েও বেশি সুন্দর লাগছে । মেহতাব মেঘের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো ,

মেহতাব : তোমার কি নেকলেস টা পছন্দ হয় নি ?
মেহতাবের কথার প্রতিউত্তরে মেঘ বললো ,
মেঘ : না অনেক সুন্দর । কিন্তু এতো দামি নেকলেস কি আমার মতো মেয়েকে মানায় ? আপনি আমার থেকেও ভালো জীবনসঙ্গী পেতে পারতেন। আমি এই সুখ ডিসার্ব করি না।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

মেহতাব : তোমাকে পৃথিবীর সবথেকে দামি নেকলেস এনে দিলেও সেটা তোমার থেকে তুচ্ছ । তুমি অনেক কিছু ডিসার্ব করো মেঘ । আমি তোমাকে আমার জীবন সঙ্গী পেয়ে নিজেকে অনেক ভাগ্যবান মনে করি । এই নিয়ে আর কোনো কথা যেনো ফিউচার এ না শুনি। আমি রেগে গেলে কিন্তু নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারি না। সো বুঝে শুনে কথা বলবে । ( রাগ দেখিয়ে বললো মেহতাব )

মেহতাবের কথা শুনে মেঘ মেহতাবের দিকে ফিরে তাকালো । কিছু বলতে যাবে তখনিই অরিন বেগম দরজা নক করে ডুকে পড়লেন । অরিন বেগম মেঘের দিকে তাকিয়ে বললেন ,
অরিন বেগম : বাহ ! আমার মেয়েটাকে তো বেশ লাগছে । কারো নজর না লাগে যেন । ( হাসি দিয়ে )
এই বলে মেঘের কপালে একটা চুমু দিলো। আর মেহতাবকে উদ্দেশ্য করে বললো,
অরিন বেগম : রেডি হোসনি কেন ? নিচে কতো গেস্ট এসেছে তাদের সাথে দেখা করতে হবে । আর তোর কিছু মেয়ে বন্ধু এসেছে যারা বিয়েতে আস্তে পারে নিই । তোদের খুজছে । রেডি হয়ে মেঘ মাকে নিয়ে আয় আমি ঐদিক সামলাচ্ছি । (তারাহুড়া দেখিয়ে)

মেহতাব : ঠিকাছে শান্ত হোও । আমার ফ্রেশ হয়ে রেডি হতে ৫ মিনিট লাগবে ।
অরিন বেগম : ঠিকাছে তুই রেডি হয়ে নে। আমি নিচে যাচ্ছি ।
এই বলে অরিন বেগম রুম থেকে চলে গেলেন ।
অরিন বেগম যাওয়ার সাথে সাথে মেহতাব মেঘের ঘাড়ে হাত রেখে বলে উঠে,
মেহতাব : Do you love me or not ? tell me honestly .
মেহতাবের এই কথার প্রতিউত্তরে মেঘ কি বলবে সে ভেবে পায় না। কারন সে নিজেই জানে না সে মেহতাব কে ভালোবাসে কি না ।

মেঘ কিছু বলতে যাবে তখনি অহনা রুম এ নক করে বলে উঠে ,
অহনা : আমি কি আসতে পারি ?
অহনার গলা শুনে মেঘ আর মেহতাব নিজেদের থেকে দূরে সরে যায় । মেহতাব লজ্জা পেয়ে ওয়াশরুম এ চলে যায় । আর মেঘ নিজেকে শান্ত করে বলে ,

মেঘ : হ্যাঁ। আসতে পারো আপু । অনুমতি নেওয়ার কি আছে ।
এই শুনে অহনা রুম এ প্রবেশ করে । সে মেঘকে দেখে মাথায় হাত রেখে বলে ,
অহনা : আমি খুব খুশি যে তোরা দুজন নিজেদের বিবাহিত জীবন গুছিয়ে নিতে শিখেছিস । আমার সেই পুচকে বোনটা কতো বড় হয়ে গেছে । নিজে সব কিছুর সাথে মানিয়ে নিতে শিখেছে । মেহতাবের মতো জীবন সঙ্গী পাওয়া ভাগ্যের ব্যপার । তুই খুব ভাগ্যবতী ।

এই বলে অহনা মেঘকে জড়িয়ে ধরে । মেঘও অহনা কে জড়িয়ে ধরে কান্না করে দেয় ।
অহনা : কান্না করছিস কেনো পাগলী। চল নিচে যাই। মা- বাবা , অন্নি , তন্নি এসেছে দেখা করবি না।
অহনা মেঘের চোখের পানি মুছে দেয় আর দুজনে নিচে চলে যায় ।
নিচে অনেক গেস্ট এসেছে। আর হুল্লোড় পার্টি মেহতাব আর মেঘের জন্য প্লান আটছে ।
মিথিলা : কি বোরিং লাগছে । মেঘ ভাবী আর মেহতাব ভাইয়া কখন আসবে ? ( সোফায় বসে গালে হাত দিয়ে )
রৌফ : গালে হাত দিস না জামাই তাড়াতাড়ি মরবো ।

রৌফের কথা শুনে সৌরভ রাগ করে আর বলে উঠে ,
সৌরভ : ওর জামাই সম্পর্কে কটু কথা বললে খারাপ হয়ে যাবে কিন্তু রৌফের বাচ্চা ।
সৌরভের কথা শুনে সবাই সৌরভের দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকায় । আর সৌম বলে উঠে ,
সৌম : ভাইয়া এটা তো মিথিলার ফিউচার হাসব্যেন্ড কে বলা হইছে তোমার গায়ে লাগতাছে কেন? ( মুচকি হেসে ) সিমরান : ডাল মে কুচ কালা হ্যা। ( মুচকি হেসে )

সৌরভ মিথিলার দিকে তাকায় মিথিলা যে সৌরোভের কথায় রেগে আছে তা বোঝা যাচ্ছে।
সৌরভ আমতা আমতা করে বললো ,
সৌরভ : এইখানে মেয়েদের মধ্যে সবার বড় মিথিলা আর ছেলেদের মধ্যে ধরতে গেলে আমি। আর সামির তো ভালো করে বুঝিয়ে বলতে পারে এইসব বিষয় । সামির দোস্ত বুঝিয়ে দেতো সব কয়টার চোখে আঙ্গুল দিয়ে। ( ভাব নিয়ে )

সামির সবার দিকে তাকায় সবার দৃষ্টি এখন তার দিকে। সেই একমাত্র জানে যে মিথিলা আর সৌরভ দুজন দুজনকে নিজের থেকেও অনেক ভালোবাসে দুজন দুজনের প্রাণ । সে একবার মিথিলা আর সৌরভকে পার্কে হাটতে দেখেছে হাত ধরে । তাকে সৌরভ আর মিথিলা অনেক করে বুঝিয়েছে বারণ করেছে কাউকে যেন না বলে তাদের সম্পর্কের কথা । সেও কাউকে বলে নিই ।

এইসব কথা সামির মনে করছিলো তখনি রৌফের ডাকে তার হুশ ফেরে।
রৌফ : ওই গাধা কি হইলো ?
সামির : না কিছু হয়নি আসলে বেপার টা বেশ জটিল । তো মেইন টপিক এ আসা যাক সবাই মনোযোগ দিয়ে শুনবা , ( গলা ঝেরে )
আমরা জানি , সৌরভ সবার বড় আর মিথিলা ও সবার বড় ।
শাম্মি : হুম তো ?

সিয়াম : কথা শেষ করতে দে সামির নার্ভাস হইতাছে দেখতাছোস না । ( হাসি দিয়ে )
সামির : চুপ থাক কইতে দে । সো ওরা বড় হওয়ার কারনে একজনের অপমান অন্যজন সয্য করতে পারে না । সুতরাং সৌরভের কথাটা গায় লাগছে ।
সামির এর কথা শেষ হওয়ার পর এই নিয়ে কেউ কথা বাড়ায় না । সবাই সোফায় বসে গল্প করতে লাগল । তখনি মেঘ আর অহনা নিচে নেমে এলো।
তা দেখে শাম্মি বললো ,

শাম্মি : আচ্ছা একটা কথা আমার মাথায় ঘুরপাক খাইতাছে । আসলে ঐদিন যে মেহতাব ভাইয়া বললো যে সে লন্ডন চলে যাবে। সেটা কি সত্বি ?
সিয়াম : বোইন আর কইছ না । তোর ভাই তো মেঘের প্রেমে হাবুডুবু খাইতাছে ।
সৌরভ : হুম । এতদিনে মেঘের প্রেমে তো পড়ছে কিন্তু বলতে পারতাছে না বা স্বীকার করতাছে না । ও চায় যে মেঘ আগে বলুক বা মেহতাব হয়ত জানে না মেঘ ওর জন্য সেম ফিল করে কিনা । ইগোর বেপার আর কি ।
সিমরান : হুম বুঝলাম । তো আমাদের তাদের হেল্প করা উচিত তাই না ।

রৌফ : একটা কথা বলি সিমরান রাগ করিছ না। আসলে তুই কি তোর সিম রিচার্জ করছোস । যে তোর মাথা কাজ করতাছে ।
রৌফের কথা পাশের কিছু ছেলেও শুনতে পায়। আর তারা না চাইতেও ফিক করে হেসে দেয় । এই দেখে সিমরানের অনেক রাগ হয় । কিন্তু প্রকাশ করে না গেস্টরা আছে বলে । কিন্তু প্রতিউত্তরে সিমরান বলে ,

সিমরান : হুম তোমার বিকাশ থেকে রিচার্জ করছি। ওই যে তোমার ডেইলি নিউ গার্লেফ্রন্ডদের প্রতিসপ্তাহে বলো , ” আমাকে কিছু সেন্ড মানি করবা জানু আসলে আজ না আমাদের বাসার সাবান , সেম্পু শেষ হয়ে গেছে আমি যদি সাবান , সেম্পু দিয়ে গোসল না করি তাহলে তো আমার গায়ের থেকে চুলের থেকে গন্ধ আসবে আর সবাই বলবে রিতার বয়ফ্রেন্ড এর গায়ে গন্ধ তোমার কি ভালো লাগবে “। এভাবেই তো টাকা গুলো নেও আর আমি রিচার্জ করি।
সিমরানের কথাগুলো অনেক জোরে বলাতে সবাই এখন ওদের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে । অহনা আর মেঘেও ওদের দিকে আসছিলো ওদেরও কানে যায় । রৌফ ভীষণ লজ্জা পায় তাই সে টয়লেটের কথা বলে এক দৌরে উপরে চলে যায় । অহনা আর মেঘ কে দেখে সবাই টপিক চেঞ্জ করে বলে ,

সিমরান : ওয়াও মাই ডিয়ার ভাবীরা তোমাদের অনেক সুন্দর লাগছে ।
শাম্মি : হুম অনেক । আসো তোমাদের স্টেজ এ বসিয়ে দিই।
শাম্মি , সিমরান আর মিথিলা মেঘ আর অহনা কে স্টেজ এ বসিয়ে নিজেরা পাশে বসে পরে । তখনি আহতাব আর মেহতাব সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসে । মেহতাব আর আহতাব সেম ডিজাইন এর পাঞ্জাবি পড়েছে। আহতাবের গায়ের রঙ অতো ফর্সা না হলেও দেখতে সুন্দর আর মেহতাব কে প্রথম দেখায় যে কেউ প্রেমে পরে যাবে । তো আহতাব আর মেহতাব নিচে নামতে থাকে ।

নিচে নামার পরেই একটা মেয়ে শর্ট ড্রেস পড়া দেখতে বেশ সুন্দরী মেহতাবের কাছে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে । সিমরান , শাম্মি আর মিথিলা মেঘের রিয়েকশন দেখতে তার দিকে তাকায়। মেঘ প্রকাশ না করলেও সে যে মেয়েটার উপর ভীষণ রেগে আছে আর কাছে পেলে তাকে কাচা চিবিয়ে খেতো তা ঠিকি বুঝতে পারে তারা। তাই তারা মেঘকে বলে ,

সিমরান : ভাবী ওই মেয়েটা মেহতাব ভাইয়ার ফুপাতো বোন । তার নাম টিনা । সেও লন্ডন এ পড়াশোনা করেছে ।
শাম্মি : ভাবী জানো ওই মেয়েটা না ভাইয়ার সাথে কাঁঠালের আঠার মতো চিপকে থাকে । I think she like mehtab vaiya .

এতক্ষণ মেঘ সবগুলো কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছিলো । সে যতই শান্ত স্বভাবের মেয়ে হোক না কেনো । নিজের স্বামিকে অন্য মেয়ে এসে হুট করে জড়িয়ে ধরবে এটা কোনো স্ত্রীই সয্য করবে না । মিথিলার ডাকে মেঘের হুশ ফিরলো,

মিথিলা : ভাবী অতো ভেবো না ওই মেয়েটাকে মেহতাব ভাইয়া পাত্তাও দেয় না । আর বাকি রইলো টিনার কথা কাঁঠালের আঠা কেও তেল দিয়ে সরানো যায় ওর মলম আমাদের কাছে আছে । Don’t worry .( এই বলে মিথিলা মেঘ কে জড়িয়ে ধরে )

মেঘ : চিন্তা করো না তোমার ভাইয়ার উপর আমার ভরসা বিশ্বাস দুটোই আছে । সেই ভরসা এতো ঠুনকো নয় । আমি কিছু মনে করি নি । ( স্নিগ্ধকর হাসি দিয়ে )
তারপর সিমরান, শাম্মি, মিথিলা সেখান থেকে মেহতাবের কাছে চলে গেলো ।
তখনি অন্নি আর তন্নি এসে দুজনকে দুদিক থেকে জড়িয়ে ধরে । মেঘ আর অহনা দুজনকে দেখে খুব খুশি হয় । অন্নি বলে উঠে ,

অন্নি : আমাদের তো ভুলেই গেছো এতো সুন্দর জামাই পেয়ে । ( অভিমান করে )
অহনা আর মেঘ অন্নির এমন আচরণে হেসে দেয়।
তন্নি : হাসছো কেন ? তোমরা এই বাড়িতে আসার পর একটা ফোন ও দেও নি। শুধু বাবা- মা কে ফোন দিয়ে বলেছো ওরা খেয়েছে ঘুমিয়েছে কিনা। আমাদের সাথে একটুও কথা বলো নি।
মেঘ : ঠিকাছে বাবা এই জন্য এতো অভিমান ।

তুমি এসেছিলে বলে পর্ব ৯

এই বলে মেঘ দুজনকে জড়িয়ে ধরলো । তখনি ইমরান সাহেব আর মৌমিতা বেগম এসে তাদের পাশে বসলো । ইমরান সাহেব কে দেখে অহনা আর মেঘ দুজনিই জড়িয়ে ধরলো । তা দেখে মৌমিতা বেগম বলে উঠলো,
মৌমিতা : বাবা কে পেয়ে আমাকে তো ভুলেই গেছিস তোরা । ( কিছুক্ষণ পর আবার বলে উঠে )
মৌমিতা বেগম : আর একটা কথা ছিলো আমায় ক্ষমা করে দিবি মেঘ । আমি জানি আমার পাপের ক্ষমা হয় না । কিন্তু বিশ্বাস কর আমি তোকে কোনো সময় খারাপ চোখে দেখি নি। আমি ভাবতাম তোর জন্য তোর মা মারা গেছে। তোর মাকে আমি নিজের বোনের মতো দেখেছি । কিন্তু আমি বুঝতে পেরেছি এতে তোর কোনো দোষ নেই। আমায় একটিবারের জন্য মাফ করে দে । ( মেঘকে জড়িয়ে ধরে )

তুমি এসেছিলে বলে পর্ব ১১