Unpredictable part 6
Jannatul firdaus mithila
“ আমি মরিনি! আমি মরবো না,আমার কোনো দোষ নেই। আমি ক্ষমা করবোনা। কাউকে ক্ষমা করবোনা। কোনোদিনও ক্ষমা করবোনা!”
ধীরে ধীরে প্যানিক হচ্ছে আয়রা।সারা দেহে তার ইতোমধ্যেই ঘাম ছুটে গিয়েছে। মেয়েটা কেমন নুইয়ে পড়ে কাঁপছে ক্ষনে ক্ষনে। কানদুটোতে তার এখনো বাজঁছে গোটাকতক পুরনো স্মৃতি। আয়রা কাঁপতে কাঁপতেই মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে। আলগোছে চোখদুটো বুঁজে নেয় মেয়েটা। বন্ধ চোখের কার্নিশ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে দুফোঁটা নোনাজল। জ্ঞান হারিয়ে অচেতন হয়ে পড়ে রইলো মেয়েটা!
“ আরু! আরু! কই হলো তোর?”
বন্ধ দরজার ওপাশটা কেমন নিশ্চুপ! স্নেহা এবার বিচলিত হলো। দরজার গায়ে বেশ কয়েকবার কড়া নাড়িয়ে ফের ডাকলো,
“ আরু! প্লিজ ওপেন দা ডোর!”
কে শোনে কার কথা! অচেতন মেয়েটা তো এখনো লুটিয়ে আছে মেঝেতে। স্নেহা আর সময় নষ্ট করলোনা। তৎক্ষনাৎ ছুটে গেলো লিভিং রুমের দিকে। আশেপাশে চিৎকার দিয়ে মিস এমিলিকে ডাকতে থাকে মেয়েটা।ওদিকে মিস এমিলি গিয়েছেন চার্চে। এমুহূর্তে মানুষটাকে আর পাবে কই সে? স্নেহার ওমন হাঁক ডাকে ওমেন্স হোস্টেলের এ সেকশনের সকল মেয়েরা এসে মুহুর্তেই জড়ো হলো লিভিং রুমে। লিটারেচার ডিপার্ট্মেন্টে পড়ুয়া শিক্ষার্থী ক্যাথেরিন চিন্তিত মুখে এগিয়ে আসে স্নেহার নিকট। বিচলিত মেয়েটার কাঁধে হাত রেখে জানতে চাইলো,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
“ কী হয়েছে স্নেহা? তুমি এভাবে মিসকে ডাকছো কেনো?”
স্নেহা এবার কেঁদেই ফেলল।এতক্ষণে লিভিং রুমে হন্তদন্ত পায়ে ছুটে এলো আরোহী। মেয়েটার সারা গা কেমন ভিজে নেয়ে একাকার!কাঁধ সমান ভেজা চুলগুলো থেকে এখনো চুইয়ে পড়ছে পানি। সে এসেই কেমন আতঙ্কিত গলায় জিজ্ঞেস করে ওঠে,
“ কী হয়েছে সিম্মু? তুই এভাবে কাঁদছিস কেনো? আর আরু কই? ও এখানে নেই কেনো?”
স্নেহা বহুকষ্টে মুখ খুলে।বলে,
“ আরু দরজা খুলছে না! এতোবার করে ডাকলাম তাও শুনছেনা। আরোহী… আবার এবার ভয় করছে! ও আবারও সুইসাইড কমিট করতে যায়নি তো?”
ভড়কায় আরোহী। তৎক্ষনাৎ দু’ধারে মাথা নাড়িয়ে এলোমেলো কন্ঠে বলে,
“ না না! আরু ইজ আ স্ট্রং গার্ল।তুই.. ভুল ভাবছিস।”
মুখে এসব বললেও মনে হাজার খানেক সংশয় এসে ইতোমধ্যেই দানা বেঁধেছে আরোহীর।মেয়েটা কেমন ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকালো দোতলার দিকে। শুষ্ক ফাঁকা ঢোক গিলে অতঃপর হন্যে হয়ে ছুটলো আয়রার রুমের দিকে। বাকিরাও ছুটলো তার পিছু পিছু। আরোহী ছুটে এসে দাঁড়ালো আয়রার ঘরের বন্ধ দরজার সামনে। বেশ কয়েকবার দরজায় করাঘাত করেও যখন সাড়াশব্দ পেলোনা আয়রার, ঠিক তখনি চিন্তায় পড়লো মেয়েটা। সে তৎক্ষনাৎ ফের ছুটে গেলো নিচে।তারপর বাইরে এসে ওমেন্স হোস্টেলের গার্ডবয় মার্টিনের উদ্দেশ্যে চারিদিকে খোঁজ চালাতে থাকে মেয়েটা। কিন্তু মার্টিনেরও দেখা নেই আজ। এপর্যায়ে চোখ ফেটে কান্না বেরুবার যোগাড় মেয়েটার। তবুও সে বহুকষ্টে নিজেকে দমালো। অস্থির হয়ে এদিক ওদিক খোঁজ চালিয়ে যেইনা পেছনে ফিরলো ওমনি সে ধাক্কা খেলো কারো শক্তপোক্ত বুকের সঙ্গে! ঘটনার আকস্মিকতায় বেচারি তৎক্ষনাৎ পিছিয়ে গেলো দু-কদম। নাক বরাবর ব্যাথা পেয়েও সেই ব্যাথাকে একপ্রকার উপেক্ষা করে আরোহী দৃষ্টি ফেললো সম্মুখে সটান দাঁড়িয়ে থাকা মার্টিনের দিকে। মার্টিন কেমন ভ্রু কুঁচকে দাঁড়িয়ে আছে। বোঝাই যাচ্ছে, মশাই বড় বিরক্ত হয়েছেন! আরোহী মোটেও পাত্তা দিলোনা মার্টিনের ওমন দৃষ্টিকে। উল্টো সে তৎক্ষনাৎ অস্থির হয়ে বলতে লাগলো,
“ মার্টিন! প্লিজ হেল্প আস। আরু…”
এপর্যায়ে কুঁচকে রাখা ভ্রু-দ্বয় আরও খানিকটা কুঁচকে আসে মার্টিনের। সেও কেমন সন্দিহান গলায় জিজ্ঞেস করে ওঠে,
“ কী হয়েছে আরুর? কোথায় ও?”
“ তারাতাড়ি আসুন আমার সাথে। ও কোনো রেসপন্স করছেনা।সাধারণত ও এতোটা ইররেসপন্সেবল না। প্লিজ কাম ফাস্ট!”
কথাটা শুনতে দেরি, মার্টিনের ছুটতে দেরি নেই। বলিষ্ঠদেহী লোকটা কেমন হাওয়ার বেগে ছুটলো লেডিস হোস্টেলের দিকে! পেছন পেছন তার সাথে তাল মিলিয়ে ছুটছে আরোহী। যদিও খুব একটা নাগাল পাচ্ছেনা মেয়েটা,তবুও ছুটছে কোনোরকম।
“ আরু? আরু? আমায় শুনতে পাচ্ছো আরু?”
জবাব আসেনি ওপাশ থেকে। মার্টিন এবার নিজ উদ্যোগে দরজায় ধাক্কাতে লাগলেন। তবুও কাজ না হওয়ায় করে বসলেন আরেক কান্ড। দু’হাতে মেয়েগুলোকে সাইডে চাপিয়ে তিনি পিছিয়ে গেলেন দু-কদম। অতঃপর শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে লাথি বসালেন দরজার গায়ে। একটা,দুটো পরপর তিনটে লাথির চোটেই খুলে গেলো দরজাটা। দরজা খুলতেই হুড়মুড় করে ঘরে প্রবেশ করে বাকিরা। আরোহী এবং স্নেহা দৌড়ে চলে গেলো ভিতরে। আশেপাশে সর্তক দৃষ্টি ফেলে আয়রাকে কোথাও দেখতে না পেয়ে চিন্তায় পড়লো মেয়ে দুটো। মাথায় নানান চিন্তা যখন ঘুরপাক খাচ্ছে তখনি স্নেহা ছুটলো বিছানার ওপাশে। সেথায় যেতেই চিৎকার দিয়ে ওঠে মেয়েটা। মেঝেতে লুটিয়ে আছে অচেতন আয়রা। স্নেহার ওমন চিৎকারে মার্টিনসহ বাকিরাও ছুটে আসে এদিকে। মার্টিন ছুটে গিয়ে আয়রাকে ধরতে নিলেই পেছন থেকে এগিয়ে আসে বাঁধ সাধলো আরোহী। খপ করে চেপে ধরে মার্টিনের বাড়িয়ে দেয়া হাত। মার্টিন হতভম্ব! আরোহীর দিকে সন্দিগ্ধ চোখে তাকাতেই আরোহী কেমন গম্ভীর মুখে বলল,
“ ওর গায়ে টাচ করবেন না মার্টিন! কেননা আয়রা জ্ঞান হারালেও বোধ হারায় না! সো স্টে ব্যাক!”
এহেন কথার গভীরতা বুঝলোনা মার্টিন। শুধু চেয়ে রইল হতভম্বের ন্যায়। আরোহী তাকে সরিয়ে দিয়ে নিজে এগিয়ে আসে আয়রার নিকট।অতঃপর বাদবাকি মেয়েদের সাহায্যে মেয়েটাকে উঠিয়ে নিয়ে চললো হোস্টেলের প্রাইভেট হসপিটালে।
পিটপিট করে চোখদুটো মেলে তাকানোর আপ্রাণ চেষ্টায় তৎপর আয়রা। তবুও চোখদুটো কেমন ভার হয়ে আছে তার। প্রায় মিনিট পাঁচেক চললো তার ওমন চেষ্টা! কিয়তক্ষন বাদেই বহুকষ্টে চোখদুটোকে একপ্রকার টেনেহিঁচড়ে খুললো আয়রা। ঘোলাটে দৃষ্টি ফেলে সামনে তাকাতেই দেখে — ড. মেরিনা কেমন হাসিমুখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। আয়রা গম্ভীর মুখে আলতো হাসলো। গায়ে ভর দিয়ে উঠতে গিয়েও পড়ে গেলো শরীরের দূর্বলতায়।ড.মেরিনা তৎক্ষনাৎ এগিয়ে এসে আগলে ধরেন মেয়েটাকে।আলতো করে আয়রাকে বেডের সঙ্গে হেলান দিয়ে বসিয়ে দিলেন। কিয়তক্ষন বাদে বললেন,
“ এখন কেমন লাগছে তোমার?”
আয়রা ঘাড় ম্যাসাজ করছে একহাতে। মাথাটা কেমন ভো ভো করে ঘুরছে তার। সে খানিক গলা খাঁকারি দিয়ে বলে ওঠে,
“ আ’ম টোটালি ফাইন ডক্টর!”
মেরিনা স্মিত হাসলেন। আয়রার বেডের পাশে খানিক জায়গা করে নিজে থেকে বসলেন। আয়রার মুখপানে একদৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে পরমুহূর্তেই বললেন,
“ লাস্ট মান্থ থেকে এপর্যন্ত তোমার দুবার প্যানিক এটাক হয়েছে আয়রা! এন্ড দিস ইজ নট নরমাল। তুমি কী নিয়ে ওতো ভাবছো? চাইলে আমাকে একটু খুলে বলতে পারো।”
আয়রার মুখাবয়বে স্পষ্ট অনিহা। মেরিনা টের পেয়ে ফোঁস করে নিশ্বাস ফেললেন। হাত বাড়িয়ে মেয়েটার একহাত নিজের হাতের মুঠোয় চেপে ধরে বিজ্ঞদের সুরে বললেন,
“ তোমাকে খুব বেশি একটা না চিনলেও এই চার বছরে একটু-আধটু ঠিকই চিনেছি আয়রা।তুমি কিছু না কিছু নিয়ে ঠিকই ডিস্টার্ব তা আমি বেশ বুঝেছি। আমি আশা করি তুমি এটলিস্ট আমাকে খুলে বলবে সবটা! তোমার প্রেসারও ফল করছে বারবার। অথচ বছর খানেক আগেও তুমি বেশ সুস্থ ছিলে।তাহলে এ বছর হঠাৎ কী হলো তোমার?”
মনের কোণে জমে থাকা অব্যক্ত কথাগুলো টের পেয়ে যাওয়ায় ভেতর ভেতর কিছুটা অবাক হলেও বাইরে থেকে মুখাবয়বে একেবারেই শান্তভাব স্পষ্ট আয়রার।মেয়েটা কেমন গম্ভীর মুখে বসে আছে। হয়তো মনে মনে কথা সাজাচ্ছে বলার মত। মেরিনা মোটেও তাড়া দিলেন না মেয়েটাকে।সে নাহয় নিজ ইচ্ছেতেই বলুক সবটা। আয়রা সময় নিলো! ধীরে ধীরে বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেই খানিক টলতে লাগলো সে। ডক্টর তাকে আগলে ধরতে চাইলে হাত উচিয়ে বাঁধ সাধলো আয়রা। নিজে নিজেই উঠে পা রাখলো ঠান্ডা মেঝেতে। মুহুর্তেই তার গা-জুড়ে বয়ে গেলো এক ঠান্ডা শীতল স্রোত। আয়রা গম্ভীর মুখে উঠে দাঁড়ায়। ধীরে ধীরে পা ফেলে চলে যায় কাচঁ ফেলে রাখা স্বচ্ছ জানালার সামনে। বাইরের মেঘলা আকাশের পানে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে তাচ্ছিল্যের হাসি টানলো ঠোঁটের কোণে। পরক্ষণেই কেমন অদ্ভুত কন্ঠে বলতে লাগলো,
“ প্রতিটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার একটা না একটা আকস্মিক সূচনা থাকে ডক্টর! প্রথমে আমরা বুঝতে না পারলেও সময়ের সাথে সাথে ঠিকই বুঝে যাই সবটা।”
ডক্টর মেয়েটার এহেন প্রহেলিকাময় কথাবার্তা বুঝলেন না ঠিক। তারপরও ধৈর্য্য ধরে শুনতে লাগলেন মনোযোগ দিয়ে। আয়রা সময় নিয়ে ফের বলা শুরু করলো..
“ এসবকিছুর সূচনা ছয়মাস আগে থেকে শুরু হয়েছে ডক্টর। মনে আছে আপনার? লাস্ট ছয়মাস আগে আমাদের ভার্সিটি থেকে আমাদের ২০ জন মেম্বার্সের ডেভিল গ্রুপ কানাডা গিয়েছিলাম প্রজেক্ট শোডাউনের জন্য! তখন তো আর জানতাম না এসব শুরু হবে…
৬মাস আগের ঘটনা
পিক পিক পিক….. শব্দ তুলে বেড সাইডের টেবিলের ওপর অবলীলায় বেজে চলেছে এলার্ম ঘড়িটি! জানান দিচ্ছে এবার উঠে পড়ার সময় হয়েছে! আরামের ঘুম নষ্ট হওয়ায় বিরক্তিতে মুখে “চ”- কারন্ত শব্দ করে বিছানার এপাশ থেকে ওপাশে ফিরে আয়রা।এলার্মের আওয়াজ পেলেই যেন শরীরে একগাদা আলস্য এসে ভর করে তার।বিরক্তি নিয়েই এলার্ম-ঘড়িটি কোনরকমে একহাত উঁচিয়ে বন্ধ করলো। পরক্ষনেই একটানে মুখের ওপর থেকে ব্ল্যানকেট সরিয়ে চোখগুলো পিটপিট করে এদিক-ওদিক একবার নজর ঘোরায় মেয়েটা।কিয়তক্ষন থম মেরে পড়ে রইলো বিছানাতেই। ঘুম ভাঙার পর নিজের সৎবিৎ ফিরে পেতে বরাবরই কয়েক মিনিট লেগে যায় তার।আজও তার ব্যাতিক্রম নয়! প্রায় মিনিটখানেক পর লম্বা একটা হামি টেনে গায়ের ওপর থেকে ভারি ব্ল্যানকেট সরিয়ে চোখ ডলতে ডলতে ওঠে বসে বিছানায়। দু’হাত উঁচিয়ে আড়মোড়া ভেঙে শরীরের সকল অঙ্গ-প্রতঙ্গকে জানান দেয় উঠে পড়ার। ঘাড় বাকিয়ে এলার্ম ঘড়িটির দিকে তাকায় আয়রা,–৭:১২ বাজে। এলার্ম দিয়েছিলো ৭:০৫ এর, তারমানে আজকেও ৭ মিনিট লেট! আয়রা ম্লান হাসে।এরম একটু-আধটু লেট করে ঘুম থেকে ওঠা যে তার রোজকার ঘটনা। আয়রা মৃদু হামি টেনে, নিজের খোলা বাদামী রঙা চুলগুলোকে হাত খোঁপা বাধতে বাধতে জানালার সামনে এসে দাড়ায়। দু’হাত দিয়ে সরিয়ে দেয় জানালার ওপরের সফেদ পর্দাগুলো। সাথে সাথে মুখের ওপর এসে আছড়ে পড়ে মৃদুমন্দ বাতাসের ঝাপটানি।আয়রা প্রতিবারের ন্যায় আজও চোখদুটো বন্ধ করে উপভোগ করে সময়টা! কিয়ৎকাল বাদে চোখ মেলে জানালার বাহিরে তাকায় সে।বাহিরে এখনো স্নোফল হচ্ছে! যতদূর চোখ যাচ্ছে,সবটাই যেন বরফের রাজ্যে আচ্ছাদিত।
কে বলবে এই জায়গাটা ম্যাসাচুসেটস এর ব্যস্ততম Somerville শহর! চারিদিকটা অবলোকন করে তা যে একেবারেই বোঝবার জো নেই! আয়রার মনে পড়ে যায় গতকাল রাতের কথা।গতরাত থেকেই এখানে মৃদুভাবে স্নোফল হচ্ছে।আয়রার আবার এই এক দূর্বলতা! একবার স্নোফল দেখলে লোভ সামলানো দায় তার! তাও যদি হয় রাতে,তাহলে তো কথাই নেই। একেবারে সোনায় সোহাগা! স্নোফল হতে দেখলে যত রাতই হোক না কেন, হাতে এক কাপ গরম ধোঁয়া ওঠা কফি আর সাথে তার প্রিয় উপন্যাসের বই নিয়ে বসে পড়ে উইনডোর সামনের কাউচের ওপর।গরম ধোঁয়া ওঠা কফিতে একটু একটু করে মনের সুখে সিপ নিয়ে বাহিরের স্নোফল দেখতে থাকে আর মাঝে মধ্যে উপন্যাসে ডুব দেয় মেয়েটা।আহ! কি এক নৈসর্গিক মুহুর্ত সেটা! এই ছোট্ট জিবনটায় এই ছোটো ছোটো মুহূর্তগুলোই যেন তার কাছে বড্ড বিশেষ। গতরাতের স্নোফল দেখতে দেখতে ঘুমাতে বেশ রাত হয় তার। তাইতো ঘুম থেকে ওঠবার পর শরীরটা কেমন ম্যাজম্যাজ করছে এখন।এই মুহুর্তে তার মনটা সদ্যোগে চাইছে আরেকবার নাক টেনে ঘুম দিতে কিন্তু মস্তিষ্ক যেন এর কঠোর বিরোধিতা চালাচ্ছে। বারেবারে মনে করিয়ে দিচ্ছে, — আরু ডোন্ট ফরগেট আজকে তোর প্রজেক্ট শোডাউন! ইউ হেভ টু কিপ দিস ইন ইউর মাইন্ড।
আয়রার যখন নিজের ধ্যানে মগ্ন, ঠিক তখনি পায়ের কাছে কারো আদুরে স্পর্শে ধ্যান ভাঙে মেয়েটার।আয়রা ঘাড় ঝুকিয়ে নিচে তাকায়, দেখে তার প্রিয় পার্সিয়ান ক্যাটটি কী সুন্দর লেজ নাড়ছে তাকে দেখে।আয়রা মুচকি হাসলো।তৎক্ষনাৎ মৃদু ঝুঁকে কোলে তুলে নিলো তার প্রিয় স্নোয়িকে। স্নোয়িও কেমন আয়রার ছোয়া পেয়ে ম্যাওওও — শব্দ তুলে ডাকতে থাকে।
আয়রা আলতো করে নাক ঘষে স্নোয়ির গায়ে। আদুরে কন্ঠে বলে,
“ কি মি: স্নোয়ি! আপনি আজ আমায় ডাকলেন না যে? রোজ তো সকাল সকাল আমার গালে নিজের গাল ঘষে দেন। কই আজকেতো ডাকলেন না।রাগ করেছেন নাকি?”
স্নোয়ি কি বুঝলো কে জানে! সে আবারও ডাকলো, “ম্যাওওও”
আয়রা এবার মুচকি হাসলো। স্নোয়িকে কোলে নিয়েই বেরিয়ে পড়ে রুম থেকে। সরু করিডর দিয়ে হেটে ডানপাশে লাগোয়া সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে পড়ে মেয়েটা।তারপর চলে যায় কিচেনের দিকে। সেখান থেকে স্নোয়ির জন্য খাবার বের করে স্নোয়ির সামনে দেয়।স্নোয়িও কেমন খাবার পেয়ে লেজ নাড়িয়ে চুকচুক শব্দ তুলে খেতে শুরু করে। আয়রা কিছুক্ষণ স্নোয়ির মাথায় আদুরে হাত বুলিয়ে দিলো। এমন সময় কিচেনে আগমন ঘটে মিস এমিলির। মধ্যবয়স্ক মার্কিন নারীটি এই ওমেন্স হোস্টেলের কেয়ারটেকার। অতন্ত ভালো মনের মানুষ তিনি।একজন বিদেশিনী হওয়া স্বত্বেও আয়রাসহ বাদবাকি মেয়েদের নিজ সন্তানের মতো আদর করেন,খেয়াল রাখেন। অন্যদিকে আয়রা এবং তার বাকি বন্ধুরাও তাকে ভিষণ শ্রদ্ধা করে,ভালোও বাসে বটে। মিস এমিলি আয়রাকে দেখে চমৎকার হাসলেন।পেছন থেকে মৃদু গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন,
“ ক্ষুধা লেগেছে না-কি তোমার বাচ্চার?”
আয়রা চকিত দৃষ্টি ফেললো পেছনে। সময় নিয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে আলতো হেসে বললো,
“ হ্যা!”
এমিলি আর কিছু বললেন না। চপল পায়ে হেঁটে গেলেন কাউন্টারের অন্যপাশে।সেখান থেকে কিচেন এপ্রনটা গায়ে জড়িয়ে চলে এলেন রান্না চাপাতে।চপিং বোর্ডে ছুড়ি তাক করেই বেখেয়ালি বশত আয়রাকে জিজ্ঞেস করে বসলেন,
“আরু!কি খাবে আজ?”
আরু থমকায়! তৎক্ষনাৎ কোন প্রতিত্তোর না করে স্নোয়িকে আলগোছে কোলে তুলে নিয়ে পা বাড়ালো ড্রয়িংরুমের দিকে।সেখানে এসে বড় সোফায় গা এলিয়ে বসে পড়ে আলগোছে। অতপর কোমল গলায় স্বর উঁচিয়ে বলে,
“ কেন প্রতিবার এই একই প্রশ্ন করো মিম্মি?”
মিস এমিলির কর্মরত চলতি হাতদুটো সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেলো। বুকটায় কেমন অদ্ভুতভাবে মোচড়ানো অনুভব হচ্ছে তার। কাঁপা কাপাঁ হাতে নাইফটা চপিং বোর্ডের ওপর রেখে একপ্রকার ছুটে আসেন আয়রার নিকট। এসে দেখেন, সোফায় মাথা এলিয়ে মেয়েটা কেমন চোখ বন্ধ করে বসে আছে। এমিলি খানিক ঢোক গিললেন।ভুলবশত আবারও এই একই কথা কীভাবে বলে বসলেন তিনি কে জানে! তিনি ধীরে ধীরে আলতো করে হাত ছুয়ে দিলেন আয়রার ললাটে।ঠিক তক্ষুনি আয়রা খপ করে ধরে নেয় এমিলির হাত। চোখ বন্ধ রেখেই ধরে আসা কন্ঠে বলে ওঠে,
“ কেন এই কথাটা বারবার আমায় মনে করিয়ে দাও মিম্মি? কোন প্রসঙ্গে মনে করাও?”
মিস এমিলি আয়রার এহেন কন্ঠে কেঁপে ওঠেন যেন। ছলছল চোখে তার দিকে তাকিয়ে বললেন,
“ অতীতকে মনে রেখে এখনো কেন কষ্ট পাচ্ছো আরু? ভুলে গেলে চলে না?”
আয়রা নিশ্চুপ! এই একটা প্রশ্নের জবাবে এসেই বারবার থমকে যায় মেয়েটা। সকলের ভাষ্যমতে সে নাকি বুদ্ধিমতি, কিন্তু তবুও কেন তার কাছে এই একটা বিষয়ে তেমন কোনো উওর থাকে না? কেন সে সবসময় বিষয়টাকে এড়িয়ে চলে, এটা আজও অজানা তার কাছে। আয়রা সময় নিয়ে চোখ মেলে। চোখ উঠিয়ে মিস এমিলির পানে তাকাতেই আতকেঁ ওঠেন এমিলি।মেয়েটা কী কাঁদতে চাইছে? জোর করে আটকাচ্ছে নিজেকে? তিনি কিছু বলতেই যাবেন তার আগেই আয়রা স্নোয়িকে কোল থেকে নামিয়ে সটান দাঁড়ায়। এমিলিকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে গটগট পায়ে সেখান থেকে চলে যায় নিজ রুমের উদ্দেশ্যে।ওদিকে মিস:এমিলি একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন আয়রার চলে যাওয়ার দিকে।হয়তো ভাবছেন তিনি — একটা মানুষ ঠিক কতোটা প্রখর যন্ত্রণা সহ্য করলে তার নরম রুপ ছেড়ে পাথরে পরিনত হয়!
আয়রা দ্রুতকদমে নিজের রুমে এসে দরজা লাগিয়ে দিলো। দরজার গায়ে পিঠ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থেকে, দুহাত বুকে চেপে জোরে জোরে নিশ্বাস ফেলতে থাকে মেয়েটা।আহা! বুকটায় তার আবারও শুরু হলো সেই চিরচেনা যন্ত্রণা! সবটা পেছনে ফেলে এসেও আজও কেনো স্মৃতির কাটাঁরা পিছু ছাড়ছে না তার কে জানে! বেশকিছুক্ষণ ঘনঘন নিশ্বাস ফেলে বুকের ওপর থেকে হাত সরায় আয়রা। ধীর পায়ে এগিয়ে যায় জানালার কাছে। নরম গদির উইন্ডো কাউচের ওপর বসে দুচোখ বন্ধ করে নেয় সে। নিমিষেই বন্ধ চোখের পাতায় ভেসে ওঠে অতীতের বিষাক্ত কিছু স্মৃতি। মুহুর্তেই চোখদুটো কেমন জ্বলতে লাগলো তার! নিজেকে বহু আগেই কথা দেওয়া স্বত্তেও আজ কী আবার যেচে পড়ে কাঁদবে নাকি সে?আয়রা শ্লেষাত্মক হাসলো।আপনমনে বিড়বিড়িয়ে বললো,
“ অশ্রু আপন,মানুষ পর — বলেছে বহু প্রবাদ!
সকল পরিস্থিতিতে আমার একমাত্র সঙ্গী হবার জন্য
আপনাকে ধন্যবাদ!” (মিথি)
“স্নেহা! ওপেন দা ডোর! আর কতক্ষণ লেট করবি বলতো?”
দরজার ওপাশ থেকে কোনো আওয়াজ ভেসে আসছে না। এতেই যেন এপাশে দাড়িয়ে থাকা আরোহীর মেজাজ সপ্ত আসমানে পৌঁছে গিয়েছে। সে একাধারে স্নেহার ঘরের দরজায় করাঘাত করে যাচ্ছে, অথচ থামাথামির নামই নিচ্ছে না। প্রায় মিনিট দশেক পর স্নেহা কেমন চোখ ডলতে ডলতে দরজা খুললো।চোখ পিটপিট করে দরজার সম্মুখে তাকাতেই, আরোহীর রণমুর্তি রূপ দেখে সঙ্গে সঙ্গে সকল ঘুম ছুটে যায় মেয়েটার।সে কেমন শুষ্ক ঢোক গিলে দরজা ছেড়ে একপা-দুপা পেছাতে পেছাতে বললো,
“ ইয়ে মানে, তুই কখন এলি? আর এখানে এভাবে…. ”
স্নেহার কথা শেষ হবার আগেই আরোহী সবেগে ঘরে ঢুকে স্নেহার কান টেনে ধরে। স্নেহা তৎক্ষনাৎ চেচিয়ে উঠে। এতে অবশ্য বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই আরোহীর। সে কেমন দাত কটমট করে বললো,
“ এই তোকে কতবার বলেছি, রাত জেগে প্রেম করিস ভালো কথা কিন্তু সকালে অন্তত ফোনটা চার্জে লাগিয়ে রাখবি।প্রতিটাদিন তোর ফোন সুইচড অফ থাকে আর দরজায় টোকা দিলে এক ঘন্টার আগে খুলিসই না। কেন রে! আমি কী তোর চাকর? এতো কেন ঠ্যাকা থাকবে রোজ রোজ আমার! মনে রাখিস কাল থেকে আর আমি তোকে ডাকতে আসবো না।এবার থেকে নিজের ভালো নিজে বুঝে নিলে নিবি নাহলে বাদ। ”
আরোহী এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে থামলো। পরক্ষনে স্নেহার কান ছেড়ে দিয়ে অন্যদিকে মুখ ফুলিয়ে দাঁড়ায়।স্নেহা আলতো করে নিজের লাল হয়ে যাওয়া কানটা খানিক ডলে নিয়ে,পরমুহূর্তেই সাত-পাঁচ না ভেবে চট করে আরোহীকে জড়িয়ে ধরলো পাশ থেকে । বোনের মত অভিমানী বান্ধবীর রাগ ভাঙানোর জন্য টেনে টেনে বললো,
“ আ’ম সো সো সরি সোনা! আর কক্ষনো এমনটা করবো না।আই প্রমিস ”
বলেই গলায় চিমটি কাটার ভঙ্গিতে হাত রাখলো স্নেহা।আরোহী মেয়েটার এহেন কান্ডে মিহি হাসলো।চোখের চিকন ফ্রেমের চশমাটা হাত দিয়ে খানিক ঠিক করে বললো,
“ এরকম কতবার প্রমিস করলি বলতো? আদৌও কী একবারও রেখেছিস কথাটা? ”
স্নেহা ডানে-বায়ে ঘাড় নাড়াতে গিয়েও থম মেরে যায়।চোখদুটো ছোট ছোট করে জিজ্ঞেস করে,
“সামহাউ তুই কি আমায় অপমান করছিস? ”
আরোহী ব্যাঙ্গাত্মক হাসলো।কৌতুকের স্বরে ফিসফিসিয়ে বললো,
“মান থাকলে না অপমান করতাম!”
কথাটা শেষে আরোহীকে আর পায় কে।সে তো একছুটে দৌড়িঁয়ে পালালো সেখান থেকে। এদিকে স্নেহা স্তব্ধ হয়ে দাড়িয়ে রইলো কিয়ৎকাল। যে-ই না কথাটা সম্পূর্ণ বোধগম্য হলো ওমনি সেও পিছুপিছু দৌড় লাগালো আরোহীর। পেছন থেকে আরোহীকে সর্তক করে জানান দিয়ে বলল,
“ আরোহি জাস্ট একবার হাতে পাই তোরে,বিশ্বাস কর একেবারে কাঁচা চিবিয়ে খাবো। ”
ওদিকে আরোহীও কম যায় না। পুরো দোতলা বাড়িটিতে দৌড় দিতে দিতে স্নেহার উদ্দেশ্যে বললো,
“ কেন রে! ধ্রুব ভাইয়ের মাথাটা চিবিয়েও কি শান্তি হয়না তোর? যে এখন আমাকেও চিবুতে হবে! ”
আরোহীর কথায় আরেকধাপ চটলো স্নেহা। এই মুহূর্তে রাগের চোটে আরোহীকে উত্তম -মাধ্যম দিতে ইচ্ছে করছে তার কিন্তু মেয়েটাকে হাতে পেলে তো! আরোহীর সাথে দৌড়িয়ে কোনদিনই বা ওকে হাতের নাগাল পেয়েছে ও, যে আজ পাবে?
কিছুক্ষণ একনাগাড়ে দৌড়িয়ে হাঁপিয়ে ওঠে স্নেহা।ওদিকে আরোহী দৌড়াতে গিয়ে বেখেয়ালিবশত সিড়িতে হোচঁট খেলো। যেই না সিড়ি থেকে উল্টে পড়বে ওমনি একজোড়া হাত তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে আঁকড়ে ধরে। আরোহী পড়ে যাওয়ার ভয়ে চোখদুটো তৎক্ষনাৎ কুচকে বন্ধ করে নেয়। তবে মিনিট খানেক পেরুনোর পর নিজেকে ওমন হাওয়াতে ভাসতে দেখে তখনি চোখদুটো মেলে সোজা হয়ে দাড়াঁয় সে। চোখের সামনে দেখতে পায় আয়রার গম্ভীর মুখখানা। কেমন ভ্রুকুটি করে তাকিয়ে আছে তার দিকে । আরোহী কিছু বলতে যাবে তার আগেই শোনা গেলো আয়রার গম্ভীর কন্ঠ,
“ হোয়াটস রং উইথ ইউ গায়েস! এভাবে বাচ্চাদের মতো দৌড়াঁচ্ছিস কেন একে অপরের পিছনে? এই মুহুর্তে আমি তোকে না ধরলে,ভাবতে পারছিস কি হতে পারতো?”
আরোহী মুচকি হাসে। আয়রার ফর্সা মসৃণ গালদুটো মৃদু টেনে জবাব দেয়,
“আমার আরু থাকতে আমার কিছু হতেই পারে না!”
আয়রা তক্ষুনি আরোহীর হাতদুটো সরিয়ে দেয়। ধীর স্বরে বলে,
“ সবসময় আমি থাকবো না আরোহি! প্লিজ টেক কেয়ার অফ ইউরসেলফ। ”
আরোহী মৃদু হেসে মাথা ঝাকায়। এই সুযোগে পেছন থেকে স্নেহা এসে ধূম করে আরোহীর পিঠে হালকা ঘুষি দিয়ে বসে! তৎক্ষনাৎ ব্যাথায় চোখ-মুখ কুচকে ফেলে আরোহী।হাত দিয়ে পিঠ ঘষতে ঘষতে দাত কটমট করে বললো,
“স্নেহা দিস ইজ নট ফেয়ার! সময়ের অপব্যবহার করলি তুই।”
স্নেহা কেমন মাছি তাড়াবার ন্যায় হাত নাড়িয়ে ভ্রুক্ষেপহীন হয়ে বললো,
Unpredictable part 5
“হু কেয়ারস হানি!”
“ তোকে রে…”
দু’জনের এহেন কথা কাটাকাটির মাঝপথে হুট করে কানে আসে আয়রার গম্ভীর স্বর,
“ স্টপ গায়েস। আর কত ঝগড়া করবি? এভাবে করতে থাকলে তো আজকে তো আর রওনাই করতে পারবো না। অলরেডি ৮:০০ বাজে।নাউ উই হেভ অনলি টু আ’রস। রিয়াদ, আয়ানও আসলো বলে।তারাতাড়ি নিচে চল ব্রেকফাস্ট সারতে হবে।”
আয়রার কথায় বাকী দুজন পরপর মাথা ঝাকায়। অতঃপর পা বাড়ায় নিচে যাওয়ার উদ্দেশ্যে।
