Home প্রেমসন্ধিক্ষন প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৪৯

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৪৯

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৪৯
সাইদা মুন

সন্ধ্যা ঠিক সাতটা। তালহা মেহরীনকে নিয়ে সবে বাড়িতে ফিরেছে। বাইক রেখে দরজার দিকে এগোতেই মোবাইল আবার কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে চোখ পড়তেই দীর্ঘশ্বাস ফেলল, এই নিয়ে বাড়ি থেকে পঞ্চাশটারও বেশি মিসড কল এসেছে। মেহরীন ভীত চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। ভেতরে ভেতরে ভয় পাচ্ছে মেয়েটা।
তালহা গভীর নিঃশ্বাস ফেলল। দুই হাতে মেহরীনের গাল আলতো করে চেপে ধরে নিচু স্বরে বলল,
—মেহরীন, বি ব্রেভ, বি কনফিডেন্ট অ্যাবাউট হোয়াট ইউ আর সেয়িং। অনেকেই অনেক কথা দিয়ে তোমাকে আঘাত করবে, করতে চাইবে। কিন্তু তাই বলে, এসব থেকে বাঁচতে সত্য বলা বাদ দিবা না। নিজের কথা থেকে একচুলও সরা যাবে না। বুঝলে?
মেহরীন তালহার হাত শক্ত করে ধরে ছলছলে চোখে তাকাল,

—আপনি আমার পাশে থাকবেন তো? আপনি থাকলে আমি সব পারব, সব।
তালহা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল মেয়েটার চোখের দিকে। গালটা আরও একটু চেপে ধরে নিকাবের উপর দিয়েই কপালে গভীরভাবে ঠোঁট ছোঁয়াল। মেহরীন আবেশে চোখ বুজে নিল। কপালে ঠোঁট রেখেই ফিসফিস করে বলল,
—আই’ম অলওয়েজ উইথ ইউ, মাই গার্ল। ইউর তালহা উইল অলওয়েজ স্ট্যান্ড বাই ইউ।
মেহরীনের ঠোঁটের কোনে শান্ত একটুখানি হাসি ফুটে উঠল। তালহা তাকে ছেড়ে সামনে এগোল। পেছন পেছন মেহরীন ও নিজেকে শক্ত করে এগোল। কলিং বেল বাজতেই কিছুক্ষণের মধ্যে তাহিয়া দরজা খুলল। তালহাকে দেখেই তার চোখে অসহায় ছায়া নামল। বোনের দৃষ্টিতেই তালহা বুঝে গেল, মামারা সবাই এসে গেছে। এখন বড়সড় ঝড় উঠতে চলেছে। চোখের ইশারায় তাহিয়াকে মেহরীনের পাশে থাকতে বলেই সে আগে ভেতরে ঢুকল। তাহিয়াও মেহরীনকে নিয়ে ঢুকে পড়ল।
নানাকে দেখেই তালহা এগিয়ে গিয়ে সালাম দিল,

—আসসালামু আলাইকুম, নানাভাই।
নানা সালামের জবাব দিয়ে কড়া দৃষ্টিতে মেহরীনের দিকে তাকালেন,
—কোথায় গিয়েছিলে তোমরা?
তালহা একবার মেহরীনের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল,
—মেহরীনের কিছু কাগজপত্রের কাজে।
এই কথার সঙ্গে সঙ্গেই তাহসান উঠে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন ছুড়ে দিল,
—কিসের কাগজ?
তালহা ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। চোখ পিটপিট করে ঠান্ডা গলায় বলল,
—তোকে কৈফিয়ত দিতে হবে?
তারপর বাকিদের দিকে তাকিয়ে বলল,

—এভাবে তাকিয়ে আছো কেন? মেহরীনকে নিয়ে বাইরে গেলে কারও কোনো আপত্তি আছে?
গম্ভীর কণ্ঠের সামনে কেউ কোনো জবাব দিতে পারল না। তাহসান শুধু আগুনভরা চোখে তাকিয়ে আছে। তালহা সে দৃষ্টিকে তোয়াক্কা না করেই সিঙ্গেল সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে বসে পড়ল। বিল্লাল সাহেব শান্ত স্বরে বললেন,
—কারো কোনো সমস্যা নেই। সবাই শুধু মেহরীনের অপেক্ষায় ছিল।
মেহরীন নিকাব খুলে সবার মাঝে সোফায় বসে আছে। বোরকা এখনো গায়ে, মাথার হিজাবটাও খোলার সুযোগ পায়নি। এক পাশে তাহিয়া, অন্য পাশে তালহার বড় মামি বসে আছে। চারদিক থেকে প্রশ্ন আসছে, উত্তর দিতে দিতে মেয়েটা হাঁপিয়ে উঠেছে। সেদিন তিতলি বেগমকে যা যা বলতে হয়েছে। আজও তাই আবার রিপিট করতে হচ্ছে। সালেহা বেগম মেয়েকে বুকে জড়িয়ে বসে আছেন। তিতলি বেগম কাঁদছেন। মেহরীন আসার পর থেকেই চোখের পানি আরও বেড়েছে থামছেই না যেন। সালেহা বেগম কাঁপা কণ্ঠে বারবার জিজ্ঞেস করছেন,

—তুই.. তুই সত্যিই আমার তামান্নার মেয়ে?
মেহরীন ভয়ে ভয়ে প্রতিবার মাথা নাড়ল। তুহিন সাহেব, অর্থাৎ তালহার ছোট মামা। রেগে উঠলেন,
—বললেই হলো? প্রমাণ ছাড়াই বিশ্বাস করব? প্রমাণ কী?
বিল্লাল সাহেব শান্ত কন্ঠে বললেন,
—মেহরীন যা বলল প্রায় সব উত্তরই তো আপনাদের কথার সঙ্গে মিলেছে। তাহলে আর…
তুহিন সাহেব উত্তেজনায় গলা চড়িয়ে উঠলেন,

—মুখে বললেই প্রমাণ হয়ে গেল? কোনো ছবি আছে? কোনো কাগজ আছে?
ঘরের বাতাস আবার ভারী হয়ে উঠল, সত্যের সঙ্গে সন্দেহের লড়াই শুরু হয়ে গেছে একমুহূর্তে।
তাকে এত উত্তেজিত হতে দেখে মেহরীন ভয়ে আরও মিয়িয়ে গেল। বারবার তালহার দিকে তাকাচ্ছে, যেন সে এখন একটু আশ্রয় চাইছে তার কাছেই। তালহা চোখ দিয়ে প্রতিবার শান্ত থাকতে ইশারা করল। সেই প্রথম থেকেই সে তার ছোট মামাকে লক্ষ্য করছিল। এবার আর চুপ থাকতে পারল না। গম্ভীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে উঠল,
—মামা, তোমাকে একটু বেশি উত্তেজিত মনে হচ্ছে না?
দেখে মনে হলো, তুহিন সাহেব কিছুটা থতমত খেলেন। তবে সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে সামলে বললেন,
—তো হবো না? আমার বোনকে খুঁজে পাই না সতেরো বছর হয়ে যাচ্ছে। হুট করে একটা মেয়ে এসে বলবে, আমার বোনের মেয়ে?
তালহা প্রতিউত্তরে বলে দিল,

—সে নিজে এসে বলেনি, তাকে আমি এনেছি এই বাড়িতে।
—সে যাই হোক, কোনো সম্পর্ক থাকলে প্রথমেই বলত।
তার কথায় এবার সালমা বেগমও সায় দিয়ে উঠলেন,
—কথাটা আমারও। যদি সম্পর্ক থাকেই, তবে এতদিন পর কেন বলল? সে তো সিলেটেও গিয়েছে আমাদের সাথে।
তালহার চোয়াল শক্ত হয়ে আসছে। কেন জানি মেহরীনের বিরুদ্ধে বলা একটা কথাও সে সহ্য করতে পারছে না। তবু নিজেকে সংযত রেখে বলল,
—মেহরীন তো বলেছেই, সে তার নানাবাড়ির কাউকেই চেনে না, যোগাযোগ ছিল না কোনো কালেই, কাউকে চোখের দেখাও দেখেনি। তো কিভাবে বলত?
মেহরীনের হয়ে উত্তর দেওয়াটা পছন্দ হলোনা অনেকের। তার মধ্যে রিতুও একজন। রিতু মাঝখান থেকে বলে উঠল,

—তো তাকে বলতে দাও ভাইয়া, তুমি কেন সব প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছ?
তালহা রেগে তাকাল,
—আজব! মেয়েটাকে এতগুলো মানুষ একসঙ্গে প্রশ্ন করলে সে ভয় পাবে না? তার বয়সটাই বা কত? সে কি ম্যাচিউরলি সব সামলাতে পারবে? তার হয়ে তো কাউকে কথা বলতেই হবে।
রিতু দুহাত বুকে গুঁজে ঠেস মেরে বলল,
—যে বিয়ের আসর থেকে একা পালিয়ে আসতে পারে। সে আবার ভয় পায়?
মেহরীনের বুকটা ধক করে উঠল। টিপটিপ শব্দ হচ্ছে বুকের ভেতর। বিপদের দোয়া পড়ছে বারবার, যেন এসব থেকে তাড়াতাড়ি বের হতে পারে। নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করছে প্রাণপনে। তালহা সঙ্গে সঙ্গে গরম চোখে তাকাল ধমকে উঠল,

—রিতু, বুঝে শুনে কথা বল।
রিতু সঙ্গে সঙ্গে বিরক্তিতে বলল,
—আজব ভাইয়া, মেহরীনকে কেউ কিছু বলতে গেলেই তুমি তেঁতে ওঠছো। ওর বিষয় তুমি নিজের করে নিচ্ছ, যেন কেউ তোমাকে কিছু বলছে। দেখে মনে হয় তুমি মেহরীনের প্রতি অবসেসড।
তালহা সোজাসাপটা উত্তর দিল,
—ইয়েস, আই অ্যাম অবসেসড উইথ হার। তোর কোনো প্রবলেম?
সকলেই অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। তালহার এত রিয়েক্ট করা তাদের কাছেও অদ্ভুত লাগছে। মেহরীন ফট করে মাথা তুলে তাকাল তালহার দিকে। তালহার চোখে চোখ পড়তেই মাথা এদিক সেদিক নাড়িয়ে না করল বার কয়েক। সাথে এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল চোখ বেয়ে। তার জন্য আজ এই পরিবারে এত ঝামেলা বাধছে। সে চাইছে না আর কোনো নতুন ঝামেলা বাধুক। এদিকে ফারাহ হতবাক হয়ে একবার মেহরীনকে দেখছে, তো একবার তালহাকে। তার বুক ধরফর করছে অজানা ভয়ে। যা সে ধারণা করেছিল, তা কি সত্য হতে যাচ্ছে?
তালহাকে রেগে যেতে দেখে বিল্লাল সাহেব টেনে বসালেন। পরিস্থিতি সামলাতে কড়া চোখে তাকালেন রিতুর দিকে,

—রিতু, তোকে না বললাম বড়দের কথার মাঝে ঢুকবি না।
পরপর সকলের উদ্দেশ্যে বললেন,
—আর প্লিজ সবাই শান্ত হয়ে বসুন। শান্ত ভাবেও কথা বলা যায়। এত উত্তেজনার কিছু তো দেখছি না। এখানে সবাই আমরা আমরা, বাহিরের কেউ নেই।
তুহিন সাহেবকে তালহার নানা চুপ করতে বলতেই তিনি না চাইতেও চুপ হলেন। বড় মামা আরিফ আহমেদ এবার নরম স্বরে জিজ্ঞেস করলেন,
—তোমার সাথে তোমার মায়ের কোনো ছবি নেই মা?
মেহরীন মাথা নেড়ে বলল,
—না, আমার জন্মের দশ দিনের মাথায় আম্মা মারা গেছেন।
সালেহা বেগম আঁচল চেপে কাঁদছেন,

—এতদিন তো ভাবতাম মেয়েটা যেখানেই আছে সেখানে ভালোই আছে। এখন এসব কী শোনাচ্ছিস আমাকে। ও আল্লাহ, এতদিন মেয়ে হারানোর যন্ত্রণা ভোগ করালে, এখন শেষ বয়সে এসে মেয়ের মৃত্যুর যন্ত্রণাও দিলে?
তানিয়া বেগম উনাকে সামলাচ্ছেন সাথে সালমা বেগমও। আরিফ সাহেব তপ্ত শ্বাস ফেলে বললেন,
—আর তোমার আব্বুর কী হয়েছিল?
মেহরীন মাথা নিচু করে ধরা গলায় বলল,

—আম্মার মৃত্যু আব্বা মেনে নিতে পারেনি। শুনেছিলাম আম্মা যাওয়ার পর আমার দিকে ফিরেও তাকায়নি উনি। সারাক্ষণ বাইরে বাইরে থাকত, বাড়িতে রাত ছাড়া আসতই না। পাগলের মতো ঘুরে বেড়াত এদিক-সেদিক। নাওয়া-খাওয়া সব ছেড়ে দিয়েছিলেন। এভাবেই দুই মাসের মাথায় একদিন আব্বার এক্সিডেন্ট হয়ে জায়গায় মারা যান। বড় রাস্তা পার হওয়ার সময় নাকি একটা পিকআপ সজোরে ধাক্কা মেরে চলে গিয়েছিল।
পরিবেশ একদম নীরব। শুধু তিতলি বেগম আর সালেহা বেগমের ফোঁপানোর শব্দ হচ্ছে। সকলেই অসহায় চোখে তাকিয়ে আছে মেহরীনের দিকে। মেয়েটার কী পোড়া কপাল, না পেল মায়ের ভালোবাসা, না বাবার ভালোবাসা। তালহার বড় মামি তাকে নিজের বুকে জড়িয়ে নিলেন। ভীষণ মায়া লাগছে তার জন্য। আরিফ আহমেদ কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,

—বুঝলাম তোমার বাবা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিল, তাই জানায়নি। কিন্তু তোমার পরিবারের বাকিরা? কেউ কেন আমাদের মৃত্যুসংবাদটা দেয়নি?
মেহরীন উনার দিকে তাকাল,
—দাদি দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। আপনাদের কার নাম্বারে যেন কলও করিয়েছিল উনি। কিন্তু আম্মার পরিচয় দিতেই কল কেটে দিয়েছিল। তারপর বহুবার চেষ্টা করেও সেই নাম্বার আর খোলা পায়নি। এছাড়া আর কোনো রাস্তা ছিল না দাদির কাছে।
সকলেই অবাক। তালহার নানা-মামারা একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করছেন। তারা তো কোনো কলই পায়নি। তাহলে কাকে কল করল?

—আমরা তো কোনো কলই পাইনি। উল্টো এই সতেরোটা বছর ধরে কত খোঁজার চেষ্টা চালাচ্ছি, একটা খবরও মেলেনি। কাকে কল করেছিল? সেই নাম্বার আছে তোমার কাছে?
বড় ভাইকে এবার তুহিন সাহেব থামিয়ে বললেন,
—নাম্বার দিয়ে কী হবে? এই মেয়ের কথা যে সত্য, তা প্রমাণ করতে বল আগে।
তালহা তাকে থামিয়ে বলল,
—বড় মামা, খোঁজখবর নিচ্ছিলটা কে?
উনি চশমা ঠিক করে বললেন,
—তুহিন খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করছিল। আমি আর আব্বা ব্যবসার কাজে কামে ব্যস্ত থাকায় ওর উপরই দায়িত্ব দিয়েছিলাম। তাছাড়াও তার চট্টগ্রামে পরিচিত মানুষ ছিল।
তালহা এবার তুহিন সাহেবের দিকে কড়া চোখে তাকাল,

—মামা, সতেরো বছরেও খোঁজ পাওনি?
তিনি একটু হকচকিয়ে উঠলেন,
—খোঁজ তো নিয়েছিই। পুরো চট্টগ্রাম তছনছ করে খোঁজ নিয়েছি। নিজেও গিয়েছি, তবে পাইনি খোঁজে। কেউ যদি নিজ থেকে হারায়, তাকে কি খোঁজে পাওয়া সম্ভব বল? কোনো যোগাযোগ নেই, কিছু নেই।
উনার কথা শুনে তালহা সন্দিহান চোখে সকলের দিকে চেয়ে বলে উঠল,
—কিন্তু মেহরীনের দাদি বলেছিল খালামণি বিয়ের পর অনেক চেষ্টা করেছে তোমাদের সাথে যোগাযোগ করার। কিন্তু কোনোরকমেই নাকি করতে পারেনি। তোমরা কেউ একজনও কি একটা কলও পাওনি?
সকলেই মাথা নেড়ে না করলেন। তালহা ভেবে বলল,
—ইন্টারেস্টিং ব্যাপার। যেহেতু খালামণি যোগাযোগের চেষ্টা করেছে, তাহলে নিশ্চয় কারো না কারো মোবাইলে অন্তত কল তো দিয়েছেই।
তুহিন আহমেদ রেগে উঠলেন,
—এগুলো তো মিথ্যা কথাও হতে পারে। প্রমাণ কী যে মেহরীনই তামান্নার মেয়ে?
তালহা শান্ত হতে ইশারায় করে বলল,

—কুল মামা, কুল। প্রমাণ আমি আনাচ্ছি। মেহরীনের স্কুলের হেডম্যাডামের সাথে কাল কথা হয়েছে। উনার স্কুলেরই স্টুডেন্ট ছিলেন মেহরীনের বাবা। উনি নিজ দায়িত্বে মেহরীনের বাবার সব ডিটেইলস আমাকে দিবেন। আমি সেসব হাতে পেলেই হবে। তারপর যা প্রমাণ হওয়ার হবে।
সকলেই সম্মতি দিলেন তার কথায়। তালহা ফের বলল,
—তাছাড়া ছবি দেখলেই তো মনে হয় চিনবে সবাই? চেহারা মনে আছে তো উনার? ছোট মামার তো আরও বেশি মনে থাকার কথা…
বলেই আড়চোখে তাকাল তার দিকে। তিনি চোখ মেলাল না এদিক সেদিক তাকাল। কিছু বলতে নিবে তার আগেই তালহা যোগ বলল,

—মানে বড় মামা, ছোট মামার তো মনে থাকার কথা তাই না?
তুহিন সাহেব সঙ্গে সঙ্গে বললেন,
—হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে আছে। আমি আর ভাই-ই তো দেখা করেছিলাম। খোঁজখবর নিয়েছিলাম।
তালহা এবার কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
—খোঁজখবর নিয়েছিলে? কেমন খোঁজখবর নিলে যে ছেলের বাড়ি কোথায় সেটাই জানো না?
আরিফ আহমেদ ছোট ভাইয়ের দিকে তাকালেন। তিনি দায়িত্ব তাকেই দিয়েছিল। তুহিন আহমেদ বললেন,
—ছেলের এক ঘনিষ্ঠ কলিগের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। সেই তার বিষয়ে বলল। অত্যন্ত গরিব পরিবারের ছেলে। সে কথা শুনেই আর আগাইনি। আদরের বোন গরিব ঘরে গিয়ে যদি কষ্ট করে, সেই ভেবে। তাছাড়াও সিলেট থেকে চট্টগ্রামের দূরত্বও বেশ। এত দূরত্ব শুনেই আরও পিছপা হয়েছিলাম।

—ওহ, আচ্ছা। বোনের কষ্ট হবে দেখে বোনকে কষ্ট দিয়েই তার কষ্ট ভোলাবে ভেবেছিলে?
সকলেই চুপ। কি বলবেন? তালহা ভুল কিছু তো বলেনি। আরিফ আহমেদ অস্বস্তিতে চশমা ঠিক করলেন,
—জানতাম না বোন আমার ওই ছেলের জন্য এত পাগল ছিল। আব্বা আর আমরা ভেবেছিলাম, হয়তো ভালো ছেলে দেখে বিয়ে দিয়ে দিলে সেই ছেলেকে ভুলে যাবে। কিন্তু ঘটনা যে হিতে বিপরীত হবে, কে জানত?
তালহা মনোযোগ দিয়ে শুনে প্রশ্ন করল,
—আচ্ছা খালামণি পালানোর সময় কেউ-ই দেখেনি?
—নাহ।
তালহা মাথা ঝাকিয়ে বলল,
—উঁহু, কেউ না কেউ তো সাহায্য করেছেই। নয়তো এত সহজ ছিল না তখন বাড়ি ছেড়ে পালানো।
তালহার নানা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

—আমাদের পরিবারের কেউ সাহায্য করেনি। করার সাহস ও ছিল না। বাইরের কেউ করলেও করেছিল হয়তো। আচ্ছা, যা যাওয়ার গেছে, সেসব ভেবে লাভ নেই। মেয়ে হারিয়েছি। এখন যদি মেহরীন সত্যিই আমার নাতনি হয়ে থাকে, তাকে আমি সর্বোচ্ছ সম্মান দিয়ে গ্রহণ করব। কোনো কিছুর ত্রুটি রাখব না।
বলতে বলতেই তাঁর চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল দু’ফোঁটা জল। সঙ্গে সঙ্গে মুছে নিলেন, শক্তপোক্ত মানুষ তিনি, সহজে কারও সামনে ভাঙেন না। তবে আজ নিজেকে সামলাতে পারলেন না। সকলে আশায় থাকল তালহার। সে মেহরীনের বাবার খোঁজ আনার পর সবাই শিওর হবে। যদিও মন থেকে সবাই মেনে নিয়েছে মেহরীনই তামান্না বেগমের মেয়ে।
সবার কথাবার্তার মাঝখানেই হঠাৎ কলিং বেল বেজে উঠল। মুহূর্তেই, আর কেউ ওঠার আগেই তাহসান দ্রুত উঠে গেল। তার এই অস্বাভাবিক তাড়াহুড়ো দেখে সবাই একসঙ্গে সেদিকে তাকাল। সবার চোখে কৌতূহল, কে এমন এসেছে যে তাহসান এত ব্যস্ত হয়ে পড়ল? দরজা খুলতেই ঢুকল সাদা পাঞ্জাবি-পায়জামা আর টুপি পরা মাঝবয়সি এক লোক। দেখে লাগছে কোনো হুজুর হবেন। হাতে কালো একটি ব্যাগ, সঙ্গে ছোট্ট একটি ছেলেও আছে। তাহসানকে দেখে লোকটি বলল,

—আপনিই তো কল করেছিলেন?
তাহসান মাথা নেড়ে শান্ত গলায় বলল,
—হ্যাঁ, আমিই। ভেতরে আসুন।
লোকটাকে নিয়ে ভেতরে ঢুকতেই সবাই প্রশ্নভরা চোখে তাকাল। কেউই উনাকে আগে কখনো দেখেনি। লোকটি সবার দিকে তাকিয়ে সালাম দিলে সবাই একসঙ্গে ওয়ালাইকুমুস সালাম জানাল। একটি সোফা খালি করে বসানো হলো উনাকে। তিনি বসতেই সবার দৃষ্টি গিয়ে ঠেকল তাহসানের দিকে।
সবার চোখের প্রশ্ন অনুমান করে তাহসান গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

—উনি কাজি সাহেব।
শব্দটা যেন মুহূর্তেই ঘরে বিস্ফোরণ ঘটাল। কাজি? এখানে কাজি কেন? কি কাজ কাজির? নানা প্রশ্নের ভিড় জমতেই আরিফ আহমেদ উঠে দাঁড়ালেন। চিন্তিত কন্ঠে বললেন,
—কাজি কেন?
তাহসান সোজাসাপটা উত্তর দিল,
—আমার বিয়ে।
হঠাৎ চারদিকে নিস্তব্ধতা নেমে এলো। একেকজন অবাক চোখে তাকিয়ে আছে। যেন কেউ বিশ্বাসই করতে পারছে না তাহসান যা বলল। তার মা দ্রুত উঠে এসে কাঁপা কণ্ঠে বললেন,
—আব্বু, কীসব বলছিস তুই? তোর বিয়ে মানে? মাথা ঠিক আছে তো?
—আম্মু, আমার বিয়ে মানে আমার বিয়েই।
তিনি চমকে উঠলেন,

—কার সঙ্গে?
তাহসান ধীরে চোখ ফেরাল মেহরীনের দিকে। ঠোঁটের কোণে শান্ত একফোঁটা হাসি খেলিয়ে বলল,
—মেহরীনের সঙ্গে।
চারদিক ফের স্তব্ধ। মেহরীন বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে। কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। তাহসানের কথাগুলো যেন মাথার ওপর দিয়ে ঝড়ের মতো বয়ে যাচ্ছে। তালহা সঙ্গে সঙ্গে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে, মুখ থেকে বেরিয়ে এল একটাই শব্দ,
—হোয়াট?
তাহসান পকেটে হাত গুঁজে, তালহার চোখে চোখ রেখে ঠাণ্ডা গলায় বলল,

—ইয়েস। আমি মেহরীনকে বিয়ে করতে চাই। আজ, এই মুহূর্তে।
বিল্লাল সাহেব আর আফতাব সাহেব একে অপরের দিকে তাকালেন। দুজনের চোখেই স্পষ্ট, সামনে যে বড়সড় ঝামেলা অপেক্ষা করছে, তার গন্ধ তারা আগেই পেয়ে গেছেন। আরিফ সাহেব ছেলেকে টেনে একটু পাশে এনে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
—কি বলছিস তাহসান?
তাহসান চোখ নামিয়ে ধীর গলায় উত্তর দিল,
—আব্বু, আমার মেহরীনকে পছন্দ আর তাকেই বিয়ে করতে চাই, এই মুহূর্তেই।
আরিফ সাহেবের কণ্ঠ কঠিন হয়ে উঠল,
—বিয়ে কি ছেলেখেলা নাকি? বলা নেই, কওয়া নেই, হুট করে এমন সিদ্ধান্ত!
তাহসান বাবার চোখে চোখ রাখল,

—আমার বিয়ের বয়স হয়েছে, আব্বু। বউ পালার সামর্থ্যও আমার আছে। তাহলে আমি বিয়ে করতে প্রবলেম কি?
আরিফ সাহেব গভীর নিঃশ্বাস ফেলে বললেন,
—তোমাকে বিয়ে করতে না করেছে কে? অবশ্যই করবে। কিন্তু এভাবে হুট করে কেমনে কি? না মেয়ের সম্পর্কে জানা আছে, মা-বাবাকে বাদ দিয়ে বিয়ে করবে নাকি?
তাহসান তাড়াতাড়ি বলল,
—আরে আব্বু, তোমরা আছো বলেই তো কাজি এনেছি। আজই বিয়ে করব, তোমাদের সাক্ষী রেখেই। পরবর্তীতে অনুষ্ঠান করব। আর মেহরীন অনেক ভালো মেয়ে। ফুফুকে জিজ্ঞেস করো, উনি তো এতদিন ধরে দেখছেন। কোনো সমস্যা নেই।
আরিফ সাহেব ধীরে বললেন,

—তা সমস্যা নেই, কিন্তু..
কথা শেষ হওয়ার আগেই তাহসান বলল,
—সমস্যা যখন নেই, তাহলে বিয়ে করাই যায়।
তালহার চোয়াল শক্ত করে দাঁড়িয়ে শুনছে তাদের কথা। হাত আস্তে আস্তে মুঠো হয়ে এসেছে। দাঁত পিষে সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—ইম্পসিবল।
তাহসান তার দিকে ফিরল। তার রাগী চেহারা দেখে বাঁকা হাসল। সামনে এগিয়ে এসে বলল,
—ইটস হান্ড্রেড পার্সেন্ট পসিবল।
এই কথা বলে সে মেহরীনের দিকে এগোতে চাইলে তালহা সামনে এসে দাঁড়াল। পাশ কাটিয়ে যেতে চাইলে তালহা সজোরে ধাক্কা দিল তার বুকে। তাহসান কয়েক কদম পিছিয়ে গেলেও কোনোভাবে নিজেকে সামলে নিল।
তালহা হিসহিসিয়ে বলল,

—আই সেইড, ইট ইজ ইম্পসিবল।
পরক্ষণেই তাহসানও তেড়ে এসে পাল্টা ধাক্কা মারল। তালহা পড়ে যেতে নিলে পেছন থেকে বিল্লাল সাহেব ফেললেন। ঘরে হইচই পড়ে গেল মুহুর্তে। সবাই উঠে দাঁড়িয়েছে, কেউ কিছু বুঝে উঠতে পারছে না, তাদের আচরণ দেখে হতবাক। তাহসান রাগে চিৎকার করে উঠল,
—আমি বলেছি পসিবল মানে পসিবল। তুই ইম্পসিবল বলার কে? আমি আজই মেহরীনকে বিয়ে করব। এতে কারো কোনো সমস্যা নেই তো তোর সমস্যা কিসের?
তালহা রাগে দু’কদম এগিয়ে এল। কপালের শিরাগুলো ফুলে উঠেছে, চোখে জমেছে আগুন,

—আমার সমস্যা।
তাহসান গর্জে উঠল,
—তোর কী সমস্যা?
—তুই মেহরীনকে বিয়ে করতে পারবি না।
তাহসানের কণ্ঠ আরও চড়া হয়ে উঠল,
—কেন পারব না?
তালহা দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
—আমি বলেছি তাই।
এই কথায় তাহসান তেড়ে এসে চেঁচিয়ে উঠল,

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৪৮

—তুই বলার কে? সবসময় নিজেকে এত ইম্পর্ট্যান্ট ভাবিস কেন? মেহরীনের ব্যাপারে তোর এত নাক গলানোর অধিকার কে দিয়েছে?
তালহা একচুলও না নড়ে চোখে চোখ রেখে ঠান্ডা কণ্ঠে বলল,
—অধিকার দিতে হয়নি। আমার অধিকার আমি নিজেই করে নিয়েছি….

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৫০