Home প্রিয় মোনালিসা প্রিয় মোনালিসা পর্ব ২০

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ২০

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ২০
নীতি জাহিদ

সূর্য যখন মাথার উপর, বারোটা তখন ঘড়ির কাঁটায়। বাড়ির মেয়েরা গায়ে হলুদের ছোঁয়া দিয়েছে মায়াকে। হলদে শাড়িতে সেজেছে সবাই। বিয়ে বাড়িতে হৈ হৈ রৈরৈ রব। প্রায় অনেক বছর পর সানাই বাজছে বাড়িতে। ছেলে পক্ষ আগেই জানিয়েছে তারা আজই কাবিন করিয়ে নিবে। সরকারি চাকুরীজীবি ছেলে সেই সুবাধে ছুটি কম। আগামী মাসে অনুষ্ঠানের ডেইট ফিক্সড করা হবে। আজ বাড়ির সবাই প্রফুল্ল। নিজেদের আত্নীয়ের বাইরে তেমন কেউ নিমন্ত্রিত নয়। মায়ার বিয়ে নিয়ে আত্নীয়দের মাঝে হাজার রকমের কথা। এত দেরী করে বিয়ে হচ্ছে দেখে নাক ছিটকানোর ব্যাপার তো আছেই। এই বয়সে মোনার মত মেয়ে থাকতো সেখানে সবে মাত্র বিয়ের পিঁড়িতে বসছে। ব্যাপারটা অনেকের কাছেই ভালো ঠেকছে না। তাই আপাতত নিকট আত্নীয়রা এসেছে।

দুপুরের পর মায়াকে নিয়ে পার্লারে চলে এলো সালমা এবং মোনা। সন্ধ্যায় মায়ার কাবিন। মায়ার সাজ শেষ হওয়ার আগেই মায়া ছটফট করছে। সালমা মায়ার মতিগতি অনেকটাই উপলব্ধি করে নিয়েছে। মনসুরকে ফোনে জানালো গাড়ি না পাঠিয়ে নিজেই যেন আসে। মায়াকে একা ছাড়া যাবেনা। পালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। এমন কাজ করলে নাক কা/টা যাবে। বাসার খানিকটা কাছেই পার্লার। মিনিট ত্রিশেকের মধ্যেই হাজির মনসুর। সাজানো শেষ। মায়া মনসুরকে দেখেই উপলব্ধি করে নিয়েছে সালমার কারসাজি। চোখে মুখে ক্রোধের আভাস এনে চুপচাপ গাড়িতে চড়ে বসলো। মোনার সাজ বাকি। মোনার মনটা আজ বেশ খুশি। জামদানী শাড়িতে তৈরি লেহেঙ্গা বানিয়েছে নিজের জন্য। কমলা,হলুদ আর খয়েরীর কম্বিনেশনে গোলগাল একটা পুতুল লাগছে। সাজ এখনো শেষ হয়নি। এদিকে বাড়ি ভর্তি গেস্ট। সালমা থাকার কথা ভাবলেও মনসুর জানালো মিনহাজ বেরিয়েছে কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে। বাড়ি যাওয়ার পথে মোনাকে নিয়ে যাবে। আগে মায়াকে নিয়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ। বরপক্ষ যেকোনো সময় চলে আসবে। মনসুর ফোনে জানিয়ে দিলো মিনহাজকে যেন মোনাকে নিয়ে যায়।

মায়া ফোনের উপর ফোন করেই যাচ্ছে। অপর পাশ থেকে ফোন রিসিভ হচ্ছেনা। বান্ধবীকে জানিয়ে রেখেছিলো পার্লার থেকেই পালাবে। বিধি বাম। জোর করে বাসায় নিয়ে এলো ভাই-ভাবী। বিয়েটা হয়তো হয়েই যাবে। এমন সময় দরজা দিয়ে ঢুকতে দেখলো মহিয়সী সেই নারীকে। যাকে শ্রদ্ধা ভরে সকলে আপা ডাকে। আইরিন খান। ইমরান শরীফ খানের বড় বোন। আইরিনকে দেখে কিছুতেই মায়া নিজেকে সামলাতে পারলোনা। কেঁদে দিলো অঝোরে। এক পাশে দাঁড়িয়ে ছিলো সালমা এবং নুরজাহান বেগম। এত গুলো বছর দেখেছে মেয়েকে ধুকে ধুকে কষ্ট পেতে। ইমরান কিছুতেই রাজি হলো না মেয়েটাকে মেনে নিতে। অথচ তারা এক সন্তানের বাবার কাছেও মেয়েকে দিতে রাজি ছিলো। নুরজাহান বেগমের আফসোস, ছেলেটা তার হীরের টুকরো মেয়েটার মন বুঝলোনা।
বাবার সাথে মোনা চলে এসেছে। সাজে পরিপূর্ণ। চুলের খোঁপায় গাঁদা ফুল। হাতে হলুদ গাঁদার গাজরা। রাতের সাজে এই কমলা হলুদের মিশ্রণ যেন ফুটিয়ে তুলেছে মেয়েটাকে। বাড়ির মেয়েরা সবাই হলুদের সাথে অন্য রঙের মিশেলে পোশাক পরেছে। মিনহাজ তাড়ার মাঝে আছে। ভীষণ ব্যস্ত এবং চিন্তিত আজ। বোনের বিয়ের ঝামেলা, এর মাঝে ব্যক্তিগত কিছু ব্যাপার গত কিছুদিন যাবৎ অনেক কিছু নিয়ে দুশ্চিন্তা করছে। আজই শেষ করতে হবে সব। নাহলে যে দেরি হয়ে যাবে।
নয়ন রিক্তাকে নিয়ে এসেছে বেশ কিছুক্ষন। মোনা চাচীর রুমে ঢুকতেই সালমা পেছন দিক থেকে মোনাকে ধরে বললো,

– মোনারে কি হইছে শুন, আইরিন আপা আসছে, উনারে ধরে ম*ড়া কান্না জুড়ায় দিছে।
মোনা মুখটাকে মলিন করে বলে,
– তুমি এমন করো কেন চাচী? হাইসো নাতো। ফুফি কষ্ট পাচ্ছে।
– কিসের কষ্ট। ও এটা বুঝে না, যে ওরে চায় না, তার জন্য কেনো কষ্ট পাবে? উলটা ইমরান ভাইয়ের মাথা খাইছে, ক্লাস এইট/নাইন থেকে।
সালমা আফসোস করে বলে,

– মোনা জানিস আমার বাচ্চাটাও এতবছরে বড় হয়ে যেত, যদি না মিসক্যারেজ হতো। মাইশা ভাবী সেদিন না আসলে আমিও ম*রেই যেতাম। রান্নাঘরে পানি ফেলে যা করে রেখেছিলো। কত বড় খারাপ হলে পানি ফেলে পরিষ্কার তো করেই নি, আমাকে সেই পানি মোছার জন্য ডেকেছিলো । অন্যদিকে সে বিকেলের নাস্তা করার হুকুম করেছিলো আমাকে। পানিতে পড়ে আমার অবস্থা কাহিল ছিলো, এতবার ডাকার পর ও আসেনি। মায়ার সেদিনের কাজের জন্য আমি আজ নিঃসন্তান। ওকে আমি মাফ করবো না। ওর সুখ আমার সহ্য হয় না।
মোনা চাচীকে জড়িয়ে ধরে বললো,
– পুরোনো কথা ঘাটাবে না তো। এই যে আমি তোমার মেয়ে, তুমি আমার মা। আর এসব কথা মনেও আনবেনা। চলো দেখি বিয়ে কতদূর।
সালমা হেসে বুকে টেনে নিলো। মেয়েরা মায়ার রুমে। রিক্তা এসে পাশে দাঁড়ালো। মোনাকে আদর করে দিলো। মোনা,নাহিয়ার সাথে ছুটাছুটি করছে। সালমা এবং রিক্তা গুসফুস করছে। অন্যদিকে অর্ধেক বরযাত্রী ড্রইং রুমে। মামুন সাহেব, মিজান সাহেব সামলাচ্ছে। মোনাকে দাদা কাছে ডেকে একজনের সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে,

– মোনা দাদু ভাই, এদিকে আসো তো?
– জ্বি দাদাভাই?
– এনাকে চেনো?
মোনা দু পাশে মাথা নেড়ে বললো,
– না চিনতে পারছিনা।
– ইনি ইমরানের বোন।
মোনা এক পলক তাকিয়ে দেখলো, এই নারী খুবই সুন্দর, আভিজাত্যপূর্ণ। কি গুছানো! সুশীলতা যেন তার মাঝে ছন্দ তুলেছে। যে কেউই মুগ্ধ চোখে দেখবে। পোশাক পরিচ্ছদ দেখে মোনা মুগ্ধ। কি সুন্দর করে গুছিয়ে কলাপাতা রঙা জামদানী পরেছে। মাথায় পরেছে কলাপাতা এবং সবুজের মিশেলে হিজাব, সেই সাথে গলায় মুক্তোর মালা উঁকি দিচ্ছে। হাতে দুটো বালা। মনে মনে মোনা মাশা আল্লাহ বলতে ভুললোনা। আইরিন তখন মিজান সাহেবের সাথে দেখা কর‍তে ড্রইং রুমে এসেছিলো। পারিবারিকভাবে মিজান সাহেব খান পরিবারের সাথে ঘনিষ্ঠ ছিলেন। ইমরানের বাবা শাহাদাত খানের পছনের মানুষ ছিলেন। তাই আইরিনরা এক নামে মিজান আংকেলকে শ্রদ্ধা করে।
মোনা সালাম দিয়ে বললো,

– সোহান ভাইয়ার মা?
– হ্যাঁ।
আইরিন মোনাকে আদুরে গলায় বললো,
– ভালো আছো তুমি? অনেক শুনেছি তোমার নাম। মিনহাজ তো মেয়ে ছাড়া কিছুই বুঝে না। কি মিষ্টি দেখতে তুমি।
মোনা কথা বলতে বলতে হাসছে। লজ্জা পেয়ে গিয়েছে। সোহান দুষ্টুমি করতে ব্যস্ত নাহিয়ার সাথে। নাহিয়া সোহানের কাঁধের উপর উঠে চুল টানছে। ইশান আরো জোরে টানতে শিখিয়ে দিচ্ছে। ড্রইং রুম জুড়ে হাসি তামাশার খোরাক চলছে। আজ ইশান ও এসেছে। ইশান তো মোনাকে দেখে ছুটে এলো। মোনার দু হাত ধরে বলে উঠলো,
– ইউ আর লুকিং সো কিউট মাশাল্লাহ। একদম বারবি ডল।
মোনা লজ্জা পেয়ে গেলো। ইমরান বারবি ডল ডাকতো মাঝে মাঝে৷ ইশানের দুষ্টুমিতে মন খারাপ থেকে মনোযোগ হটালো। ইশানকে বললো,

– তোমাকেও পাঞ্জাবিতে খুব সুন্দর লাগছে।
ইশান মোনা একে অপরকে অনেক আগে থেকেই চেনে। অত ঘনিষ্ঠ ভাবে কথা না হলেও বিভিন্ন জায়গায়, বিভিন্ন সময়ে দেখা হয়েছে দুজনের।দুজনের মাঝে বাড়ির আয়োজন নিয়ে কথা হচ্ছিলো।
হঠাৎ মিনহাজের আগের রুমের দরজা খুলে গেলো। ধড়ফড় করে মিনহাজ বেরিয়ে এলো সাথে ছিলো নয়ন। সোফায় বসে বাবা,চাচা এবং আইরিনকে আড়ালে ডেকে নিয়ে কি যেনো আলোচনা করছে। নয়ন বেরিয়ে গেলো বাসা থেকে।
সবাইকে এক জোট করে মায়ার বিয়ে পড়ানোর জন্য অনুরোধ করলো। মনসুর কাজী নিয়ে চলে এসেছে। মায়াকে নিয়ে আসা হলো। বাড়ির মেয়েরাও সবাই দাঁড়িয়ে আছে। মায়ার কান্না থামছেই না। কবুল বলাতে অনেক কষ্ট করতে হচ্ছে। শেষমেশ কবুল বলেছে দুই ভাই এবং বাবার প্রচেষ্টায়। মিনহাজ জোরে দম ফেলে পাশে বসলো। নুরজাহান বেগম মেয়েকে জড়িয়ে ধরলো। যাক মেয়ের আজ গতি হলো। মোনা ঘাড় ঘুরিয়ে সালমার দিকে ফিরতেই দেখে সালমা হাসছে, সাথে যোগ দিয়েছে রিক্তা। ভ্রু কুচকে মামী, চাচীকে ইশারা দিলো এমন না করতে। সালমা মুখ লুকালো শাড়ির আঁচলে। মিটমিট হাসি, থামাতে পারছেনা। রিক্তা মুখ ঘোরালো হাসি আড়াল করতে।
– আম্মা মায়াকে নিয়ে ভেতরে যান। সালমা,রিক্তা সবার খাবারের ব্যবস্থা করো। আমরা এখানে কিছু গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় বসবো।
মহিলারা সবাই ভেতরে চলে গেলেও আইরিন আছে এই সমাবেশে। মামুন সাহেব, মিজান সাহেব এবং আইরিন বেশ চিন্তিত। প্রশ্ন করলো,

– মিনহাজ তুই কি নিশ্চিত? যা করবি ভেবে কর।
– আমি আমার জায়গায় অটুট আপা।
মাঝে মাঝে কিছু সিদ্ধান্ত অমূলক মনে হলেও ভালোর জন্য নিতে হয়। ধরে নিন এতেই আমার মঙ্গল।
খাবারের পর্ব শেষ হলো। কিছুক্ষন পর কলিং বেল বেজে উঠলো। মনসুর দরজা খুলতেই হন্তদন্ত করে ভেতরে ঢুকলো নয়ন এবং আরো একজন। বিস্মিত সকলে। কিভাবে ইতালী থেকে এসেছে নিজেও জানে না। পুরোটা সময় দুশ্চিন্তা, মানসিক যন্ত্রণায় ছিলো। মিনহাজ মানুষটাকে দেখেই বুকে জড়িয়ে নিলো। কথা বলতে না দিয়ে টেনে নিজের রুমে নিয়ে গেলো। মায়ার শ্বশুর বাড়ির লোকজন বার বার জানতে চাচ্ছে কোনো সমস্যা হয়েছে কিনা? মনসুর, নয়ন বুঝাচ্ছে সব ঠিক আছে। ইশান বাবাকে দেখে খুশিতে লাফিয়ে উঠবে এর আগেই মিনহাজ নিয়ে গেলো। ছেলেটাও উত্তেজিত, কি হলো এখানে? হয়তো গুরুত্বপূর্ণ কিছু। মিনিট দশেকের মাঝে ফিরে এলো মিনহাজ এবং ইমরান। দুশ্চিন্তাগ্রস্থ ইমরান। সাদা শার্ট পরনে, ইন করা। হাতা গুটানো। মাথার চুলগুলো অবিন্যস্ত, এলোমেলো অনেকটা। কপালে ভাঁজ পড়েছে।
ইমরানকে বের হতে দেখে ছুটে গিয়ে ইশান জড়িয়ে ধরলো। ছেলেকে বুকে চেপে ধরে আছে। ছেলের মুখ আদরে চুমুতে ভরিয়ে দিলো। ইশান বাবার সুন্দর অবিন্যস্ত চুলে হাত চালিয়ে ঠিক করে বললো,

– দ্যাটস লাইক মাই পারফেক্ট, হ্যান্ডসাম পাপা।
ইমরান মলিন হাসলো। সোফায় বসলো ইশানকে নিয়ে। মিনহাজ সকলকে বললো,
– আমি সবাইকে আরো কিছুক্ষন থাকার অনুরোধ করছি। একটা বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে, এই আসরে এখন দ্বিতীয় বিয়ে হবে।
চমকে উঠলো সকলে। কার বিয়ে? ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলো। ইমরান বললো,
– অপেক্ষা করো, আমি ইশানের সাথে কথা বলি।
মিনহাজ ইমরানের কথা কেড়ে নিয়ে ইশানকে প্রশ্ন করলো,
– ইশান, প্রিন্স। আংকেল একটা অনুরোধ করি রাখবে? তোমার পাপার জন্য?
ইশান সোজা হয়ে বসলো। মাথা নেড়ে বললো,
– জ্বি আংকেল।
মিনহাজ খুব জোরে দম নিলো। ছোট ছেলেটাকে এভাবে সবার সামনে এমন একটা প্রশ্ন করতে বেশ বিব্রত বোধ করছে। তবুও করতে হবে। করেই ফেললো,
– তোমার পাপা তো একা, আমরা চাইছি পাপার আরেকটা বিয়ে দিতে? তুমি কি আপত্তি করবে?
ইশান বাবার মুখের দিকে তাকালো। ইমরান ছেলের দিকে তাকিয়ে আছে। লজ্জা পেয়ে গেলো। এভাবে বাড়ির সবার সামনে এমন একটা প্রশ্ন! সরাসরি না বলতে পারছেনা মিনহাজ সামনে। উঠে দাঁড়ালো। মিনহাজকে উদ্দেশ্য করে বললো,

– মিনহাজ ভাই, পাঁচ মিনিট সময় লাগবে। ইশানের সাথে পারসোনালি কথা বলতে চাচ্ছি।
মিনহাজের মনের মাঝে কু ডাকছে। ভীতসন্ত্রস্ত সে। যদি ইশান রাজি না হয়! ইশান মিনিট কয়েক সময় নিয়ে বললো,
– দরকার নেই পাপা। আমার মা যদি মোনালিসা হয় তবে আপত্তি নেই। আমি চাই আমার এবং পাপার জীবনে আনন্দ আসুক।
চমকে উঠলো আসরের সকলে। ইমরান ছেলেকে দেখছে। কত বড় হয়েছে ছেলে! পাপার ভালো ভাবছে। ইশানের মুখে খুশির জৌলুশ। মিনহাজের মুখে বিস্তর হাসি। চিন্তিত চোখে ইমরান ছেলেকে দেখছে। নিজের ভেতর হাঁসফাঁস লাগছে। কি আশ্চর্যজনক কথা! এভাবে হুটহাট বিয়ে হয় নাকি। ইমরানের মনে হচ্ছে ছেলের সামনে মাথা হেট হয়ে গেলো। ছেলে কিভাবে মোনালিসাকে চেনে!
মনসুরকে নির্দেশ দিলো সালমাকে যেন বলে মোনাকে নিয়ে আসতে। মনসুর বাক্য হারিয়ে স্তব্ধ। ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। মিনহাজ দেরি না করে নিজেই গেলো। মহিলাদের মাঝখান মোনাকে নিয়ে এলো। পিছু নিলো রিক্তা। সালমাকে বললো বাকিদের যেন নিয়ে আসে। মোনার মাথায় লেহেঙ্গার ওড়না দিয়ে ঘোমটা টেনে ইমরানের পাশে বসালো। মোনা বাবাকে প্রশ্ন করছে,

– বাবা কি করছো?
মিনহাজ প্রতুত্তরে মেয়ের সামনে হাঁটু গেড়ে বললো,
– আম্মা আজকের পর বাবা আর কখনো কিছু চাইবো না। তোমার ইমরান সাহেবের সাথে আজ তোমার বিয়ে। আপত্তি করোনা। তোমাকে বাবা জমিদার এনে দিব কথা দিয়েছিলাম। এই নাও তোমার জমিদার।
শিউরে উঠলো মোনা। এত মানুষের মাঝে নিজেকে পুরোপুরি এলোমেলো নিঃসঙ্গ লাগছে। মনে হলো মাথার উপর বাজ পড়েছে। বুক ফেটে কান্না আসছে। বাবা এত বড় সিদ্ধান্ত কি করে নিলো? হঠাৎ পাশে তাকিয়ে দেখে মোনার দিকে তাকিয়ে পাশেই বসে আছে ইমরান সাহেব স্বয়ং। রোবটের মত, গম্ভীর মুখ, শক্তপোক্ত চোয়াল। কি করে এলো এখানে? কখন এলো? কিছুক্ষন আগেও তো ছিলো না। বাবা কি করে রাজি হলো? বিয়েটা কেনো হবে? ইমরান সাহেব তো তাকে পছন্দই করেনা। দু চোখ দিয়ে অঝোরে ঝরছে অশ্রু। চার বছর পর মানুষটাকে দেখছে। বুকের ভেতর উথাল-পাতাল ঝড়। কান্নারা দলা পাকিয়েছে। এত ভালোবাসার মানুষটাকে পেতে যাচ্ছে,তবে কেনো খুশী হতে পারছেনা! ইচ্ছে করছে চিৎকার দিয়ে বলি, আমি বিয়ে করবোনা। জেদকে প্রাধান্য দিয়ে বাবাকে বলেই ফেললো আস্তে করে,

– বাবা আমি বিয়ে করবোনা।
মিনহাজ মেয়ের দু হাত ধরে ধরে মেঝেতে বসে পড়লো। অতর্কিত সিদ্ধান্তে মেয়ে ঘাবড়ে গিয়েছে স্পষ্ট। ইমরান মিনহাজের দিকে তাকিয়ে আছে। মোনার নাকোচ তার কানে এসেছে। উঠে দাঁড়াবে, এমন সময় মিনহাজ হাত ধরে বসিয়ে বললো,
– বস এখানে, কোথায় যাচ্ছিস?
কিছু বলবে এর আগেই মিনহাজ বললো,
– আমি বলব সব। মুখ দিয়ে ‘না’ বের করবি না ইমরান।
মিনহাজের চোখের দিকে তাকিয়ে না করতেই পারলো না। পুনরায় বসে পড়লো সোফায়।
অন্যদিকে নুরজাহান বেগম পেছন থেকে বললো,
– পাগল হলি তুই? যার সাথে তুই…
থামিয়ে দিলো মিনহাজ। মায়ার নাম নিলে মায়ার ও সংসার হবে না। সামনে মায়ার নতুন বর। কিছুটা রেগে মিনহাজ বললো,
– আম্মা, মোনা আমার সন্তান। আমার সন্তানের জীবনের সিদ্ধান্ত শুধুই আমি নিব। অন্য কেউ নয়।
মিনহাজের একহাত মোনার হাত ধরেছে। অন্যহাত ইমরানের। মনে হচ্ছে এরা পালিয়ে যাবে। তাই ধরে রাখা বাঞ্চনীয়। মোনার দিকে ফিরে নমনীয় গলায় বললো,

– বাবা সারাজীবন আপনার জন্য একা ছিলাম। আজ বাবার কথা শুনবেন না? আমি জানি আপনি ইমরান সাহেবকে পছন্দ করেন। যত সংকোচ, অভিমান, অভিযোগ বিয়ের পরেই মিটিয়ে নিবেন? বয়সকে আমি বাঁধা মানছিনা। আমার কাছে বয়স শুধুই সংখ্যা। কখন কে দুনিয়া ছেড়ে চলে যাবে তার কোনো বাঁধা ধরা নিয়ম যে নেই মা। আমিও তো চলে যেতে পারি। আপনার মা ও নেই। আমার আগে আপনার মা চলে গেলো একা ফেলে। বয়স তো বেশি আমার ছিলো। দূর্ঘটনা কখন কার সাথে ঘটে বলা যায় না। রাজি হয়ে যান।
মোনা নিশ্চুপ। ইমরান ও আজ নিশব্দ। মিনহাজ মুখ বন্ধ করিয়ে দিয়েছে, বন্ধ কামরায়। মনে হচ্ছে মাথাটা ছিঁড়ে যাচ্ছে যন্ত্রনায়। কে কাকে চায়? বা না চায়? কি চায়?সব কিছুর উর্ধ্বে একটাই কথা ঘুরছে মোনালিসা বিয়ে করতে চাইছেনা।
বাবার আকুতিভরা স্বর ফেরাতে পারেনি মেয়েটা।মোনার নিরবতাকে মৌন সম্মতি ধরে বিয়ে পড়ানো শুরু করলো কাজী। কিভাবে যেন বাবার হাতটা মাথায় পড়ার সাথে সাথে তিন কবুল বলে ফেললো মেয়েটা। সই করে দিলো নিজেকে অন্যের নামে। মিনহাজ মেয়েকে বুকে আগলে ধরেছে। ইশান ইমরানকে হেসে বললো,

– পাপা নাও ইউর টার্ন, প্লিজ সে কবুল।
ইমরান নির্বিকার। ছেলের চোখে মুখে উচ্ছ্বাস, মিনহাজের আকুলতা। নয়নের অনুরোধ। বড় আপার চোখ বুজে সাঁয় দেয়া এবং মিজান আংকেলের সম্মতিতে দম আটকে বলে ফেললো তিন কবুল। এই প্রথম মনে হলো হাত কাঁপছে। এত এত ডিল সাইন করেছে বড় কোম্পানিদের সাথে, জীবনের উত্থান পতনে কলমের আগায় ছিলো টানা হাতের কারসিভ লেটারে সইটা অথচ আজ হাত কাঁপছে। ইমরান পকেট থেকে টিস্যু বের করে ঘেমে যাওয়া হাত মুছে নিলো। ড্রইং রুমে বসে থাকা সবাই দেখছে তার নার্ভাসনেস। পুনরায় হাতে কলম নিতেই ইশান এসে বাবার হাত ধরে খুব সুন্দর মিষ্টি হাসি দিলো। ইমরান খানিকটা হাসলো ছেলের মুখে হাসি দেখে। নিজেকে শক্ত করে সই করে দিলো। ইশান বাবার হাত ধরা ছিলো। নয়ন এই মুহুর্তটা ক্যাপচার করলো। কলমটা পাশে রেখে মাথা নুইয়ে চোখ বন্ধ করলো। কি করলো এই মুহুর্তে! ভেতরটা কেমন করছে বুঝতে পারছেনা আজ! সকলে মোনাজাত ধরে দোয়া করছে।

সালমা আর রিক্তা দুজনই কেঁদে দিলো। দুজন দুপাশ থেকে এসে মোনাকে জড়িয়ে ধরলো। সালমা, রিক্তার কাছে মোনার ব্যাপারে অনেক কিছুই শুনেছে কিন্তু সাহস করে মেয়ে যেন লজ্জা না পায় তাই জিজ্ঞেস করেনি। আজ মনে হলো কিছু মানুষ ছাড়া বাকিদের খুশি উপছে পড়ছে।
মায়া ছুটে এলো। ততক্ষনে বিয়ে শেষ। প্রশ্ন করলো,
– কি হচ্ছে এখানে? মুনিয়া বসে আছে কেনো? এমন বউ এর মতো ঘোমটা কেনো ওর মাথায়?
ইমরান ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই মায়া ভ্রু কুচকে প্রশ্ন করলো,
– ইমরান ভাই আপনি কখন এসেছেন?
সালমা মোক্ষম সময়ের অপেক্ষায় ছিলো। ষোল বছরের রাগ আজ রগড়াবে। হালকা হেসে বললো,
– মায়া ইমরান ভাই না, আজ থেকে উনি এই বাড়ির নাত জামাই। আমাদের মোনার স্বামী।
মায়ার মাথায় যেন ঘুরে গেলো। নুরজাহান বেগম মেয়েকে ধরলেন। আইরিনের চোখেমুখে খুশীর ঝলক। সোহান হাসছে। ইশান ও খুশি। মিনহাজ ঝামেলার পূর্বাভাস পেয়ে বললো,
– ইমরান মোনাকে নিয়ে যা। আমি কন্যা বিদায় করতে চাই। অনুষ্ঠান কিছুদিন পরে কর। কম জাঁকঝমকপূর্ন অনুষ্ঠানে বরকত বেশি।
আইরিনকে উদ্দেশ্যে করে বললো,

– আইরিন আপা কাজ টা তো সেরে ফেললাম। আপনি কি খুশি?
আইরিন মোনার কাছে গিয়ে ওর ভেজা মুখ আঁজলে তুলে কপালে আদর দিয়ে বললো,
– আমাদের বাড়িতে রাজা আছে, রানীর বড্ড অভাব ছিলো। এমন একটা পরীর মত রানী পাঠানোর জন্য বিনিময়ে তোর কি লাগবে বল? সব হাজির করবো।
– আমার মেয়েটাকে ভালো রাখবেন,যত্নে রাখবেন।
মিনহাজ সকলের সামনে থেকে রুমে চলে গেলো। মোনা উঠে দাঁড়ালো। মাথার ঘোমটা ফেলে, লেহেঙ্গা ধরে ছুটলো বাবার পিছু। পেছনে কি হচ্ছে দেখার সময় নেই। এদিকে মায়া জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। বাবার রুমে ঢুকে দরজা আটকে বাবার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লো। মিনহাজ কাঁদছে। মোনা কান্নার ধকলে কথা বলতে পারছেনা। কেনো বাবা এমন কাজ করলো? মেয়ের মাথায় আদুরে চুমু দিয়ে বললো,
– আম্মারে কষ্ট দিয়েছি অনেক আপনাকে, মাফ করে দিয়েন।
– বাবা কেনো করেছো এসব। আমি কি তোমার কাছে ভালো ছিলাম না? কেনো ওই পাষাণ মানুষটার সাথে বিয়ে দিলে?
মিনহাজ হাসছে। নয়ন আগেই জানিয়েছে মোনার অভিমান আছে ইমরানের উপর। মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিয়ে বললো,

– কয়দিন থাকবো আমি? তোমার জন্য তো কাউকে লাগবে তাই না। আমার মেয়ে যাকে ভালোবাসে তাকে আমি পৃথিবী খুঁজে হাজির করেছি। বলেছিলাম ছোট থাকতে; মোনার বাবা, তার কাছে বেস্ট বাবা। মোনার চোখের ভাষা বাবা বুঝে, জান। হোক ইমরান ডিভোর্সড। থাকুক না হয় অভিমান। তাতে কি? আমার মোনা ভালো থাকবে। সংসার ভরিয়ে তুলবে আনন্দে। পারবে না?
বাবার বুকে আজ শান্ত মোনা। নিরুত্তর। মন মানছেনা আগাতে। যেই ইমরান তাকে এত অপমান করেছিলো সেই ইমরানকে মেনে নিতেও তো সময় লাগবে। ইমরানকে নিশ্চিত বাবা বাধ্য করেছে। নতুবা মানুষটা অপমান, অপদস্ত ছাড়া কিছুই পারেনা। মনে মনে এক পশলা রাগ তৈরি হলো।
মায়াকে নিয়ে ব্যস্ত সবাই। সবার এক কথা মোনার সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনা মায়া মেনে নিতে পারেনি। মেয়ের মত মানুষ করেছে মোনাকে। তাই জ্ঞান হারিয়েছে। অথচ এই বাড়ির কিছু মানুষ জানে সেই রহস্য। মায়ার স্বামীকে আজ এই বাড়িতেই থাকতে বলা হচ্ছে। সবাই বললো এখন স্ত্রীর পাশে থাকা অনেক প্রয়োজন। তাই শাহজাহান ও আর আপত্তি করলো না। মানুষটা ভদ্র, সাদামাটা। দেখতে খারাপ না। দুজনকে মানিয়েছে। এদিকে এই বাড়ির নাত জামাই সকলকে ছেড়ে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গত কাল রাত থেকে শরীরের উপর কি পরিমান ধকল গিয়েছে তা হয়তো ভাষায় প্রকাশের মত নয়, তবে মনের ধকলটা সব ধকলকে টেক্কা দিয়েছে। কি থেকে কি হয়ে গেলো? গতকাল অবধি এড়িয়ে চলা মেয়েটা তার স্ত্রী। মিনহাজ ভাইয়ের অনুপস্থিতি। তার মেয়ের দায়িত্ব সব মিলিয়ে দম আটকে আসছে।
কাঁধে নয়নের হাত। চিন্তিত গলায় ইমরান বললো,

– আমি ভাবতে পারছিনা, মিনহাজ ভাই আমাদের মাঝে থাকবেনা। এতদিন লুকালো কেনো এসব?
নয়ন আকাশের দিকে তাকিয়ে বললো,
– মোনাকে সামলাবি কি করে? ভাইয়ের ফ্লাইট আগামী কাল। উনার চোখে মুখে বাঁচার আকাঙ্ক্ষা। এমন একটা সময় জানলাম বাঁচার উপায় ক্ষীণ।
– আমাকে এত বিশ্বাস করলো কি করে? কি করে সামলাবো সব?
– খুশী হস নি তুই?
– কি করা উচিৎ আমার? মোনালিসা কিন্তু এখনো জানে আই হেট হার।
– সময় নেয়, ওকেও সময় দেয়। সব ঠিক হবে ইনশাআল্লাহ।
– মিনহাজ ভাই থাইল্যান্ড যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো কখন?

– গত পরশু জানিয়েছে আমাকে। আমাকে জানিয়েই তোকে জানিয়েছে। কিভাবে যে এই কটা দিন পার করেছি বুঝাতে পারবোনা তোকে। একটা মিথ্যা হাসি লাগিয়ে রেখেছিলাম মুখে। ভেতর থেকে চাপা কষ্ট বেরিয়ে আসতে চায় অথচ প্রকাশ করতে পারছি না। আমার সন্দেহ হচ্ছে ভাই আগেই টের পেয়েছে। বায়োপসি করিয়েছিলো। কিন্তু খবরটা নিয়ে নিশ্চিত ছিলাম না আমি। যখন জানতে পেরেছে, দেরি হয়ে গিয়েছে। মোনাকে কিচ্ছু জানানো যাবে না। সব সামলে নিতে হবে। ড্রইং রুমে চল। এখনো পরিস্থিতি উত্তাল।
ড্রইং রুমে আসতেই দেখতে পেলো বাবা মেয়ে রুম থেকে বের হয়েছে। এতক্ষণে ইমরান লক্ষ্য করলো মোনার মুখ। ভেজা মুখ। সাজের দিকে তাকিয়ে চোখ ঘুরিয়ে নিলো। সেই জামদানীর তৈরি পোশাক পরনে। আজ কমলা জামদানীতে খয়েরী রঙা কাজ। এতদিন চকলেট খেয়ে সবার মাথা নষ্ট করেছে, এখন চকলেট কালার পরে মাথা নষ্ট করছে। কাটা কাটা ছিপছিপে গড়নের রূপবতী এই মেয়ে, উজ্জ্বল শ্যামবর্ণা। আগাগোড়া সব হলদে গাঁদায় মোড়ানো। নিজেরই নজর লেগে যাবে। চোখ ঘুরিয়ে নিলো। মনে হলো যেন তাকিয়ে থাকাটাও আজ অন্যায়ের। অথচ আজ থেকে সে সম্পূর্ণ বৈধ ভাবেই তাকাতেই পারবে। সেই অধিকার পেয়ে গিয়েছে। ছোট্ট একটা হামিং বার্ড। সে নাকি ইমরানের বউ! এই মেয়ের জন্য হৃদপিন্ডের সিস্টেম ফেইল করেছিলো ইমরান শরীফের কেউ আদৌ বিশ্বাস করবে! মিনহাজ মেয়েকে ইমরান এবং আইরিনের হাতে তুলে দিলো। ডুকরে কেঁদে ইমরানকে বললো,

– আমার সব তোর হাতে তুলে দিলাম।
ইমরান মিনহাজকে বুকে জড়িয়ে ধরলো। চোখ জোড়া রক্তিম। অশ্রু আটকানোর জোর প্রচেষ্টা। নিজেকে সামলে মিনহাজ চোখ মুছে মোনাকে বললো,
– আম্মা, আজ যাও সবার সাথে। বাবা কাল গিয়ে দেখা করবো। আগামীকাল বিজনেসের কাজে একটু থাইল্যান্ড যাবো।
– আমি যাবোনা। আমাকে তুমি সাথে নিয়ে চলো। আমার তো পাসপোর্ট আছে।
মিনহাজ জিহবায় কামড় দিয়ে মেয়েকে বলে,
– ছিঃ শ্বশুরবাড়িতে যেতে হবে। থাইল্যান্ড যাবে তো, তুমি- আমি একসাথেই যাবো। বাবা ঘুরে আসি এরপর তোমাকে নিয়ে যাবো। এবার একটা বিজনেস ফেয়ারে যাবো। অনেক কাজ। বেশ কিছুদিন থাকতে হবে। সাথে ছোট দাদা যাবে। চিন্তা করোনা।
বাড়ি থেকেই বের করা যাচ্ছে না মোনাকে। কাঁদছে। অবশেষে মিনহাজ বললো,
– চলো বাবাও যাবো।
সাথে মনসুর এবং নয়নকে নিয়ে রওয়ানা হলো ইমরানের রাজ্যে। নুরজাহান বেগম ছেলেকে আড়ালে নিয়ে বললো,

– কাজটা ঠিক করোস নাই, মায়া কষ্ট পাইছে। এত স্বার্থপর হইলি কেমনে?
– তুমি মা হয়ে ভাবছো তোমার মেয়ের কথা। আমি বাবা- মা দুজন হয়ে ভেবেছি আমার মেয়ের কথা। তোমার মেয়েকে যেখানে বিয়ে দিয়েছি ভালো জায়গা, জামাই ভালো। আমার মেয়েকে দিয়েছি এক সন্তানের বাবার কাছে। স্বার্থপর হইলাম কেমনে। আগে তোমার মেয়ের গতি করছি এরপর আমার মেয়ের। নিজের সন্তানের ক্ষেত্রে তুমিও স্বার্থপর আম্মা। মায়ার কাছে মোনা যত্নে ছিলো, আমি মায়ার প্রতি কৃতজ্ঞ। তোমার মায়া সবার আদর ভালোবাসা পাইছে। বাপ, মা, ভাই- বোন সব ছিলো। আমার মোনা বঞ্চিত। মা হা*রাইছে, কোনদিন বাপ ও হা*রাবে ঠিক নেই। ওর ভাগের সুখটুকু ওরে পাইতে দাও। আর ওর সুখ ইমরান আমি জানি। ইমরান যদি মায়াকে পছন্দ করতো আপত্তি করতাম না। ইমরান তো মায়াকে পছন্দই করেনা।
– ইমরান তো মোনারেও পছন্দ করেনা মুখ দেখে বুঝলাম।

– মুখ দেখে কি সব বুঝা যায়? ইমরান বিয়েতে রাজি হয়েছে এটাই কি বড় কথা নয়? স্বেচ্ছায় বিয়ে করেছে। মায়ার জন্য কি রাজি হয়েছিলো? কয়বার আমরা যেচে প্রস্তাব দিয়েছিলাম। প্রতি বার নাকোচ
করেছে।
ছেলের দিকে অপলক তাকিয়ে আছে। কথা বাড়ায়নি। মা হয়ে ভেবেছে। দাদী হয়ে ভাবেনি। রিজিক এমন একটা ব্যাপার যার জন্য যা আছে সে তাই পাবে। ইমরান মোনার রিজিকের অংশ। দীর্ঘশ্বাস ফেলে নুরজাহান বেগম মেয়ের কাছে চলে গেলেন।
মিনহাজ ইমরানকে বলেছিলো মোনার সম্পর্কে বয়স ছাড়া একটা খারাপ এবং অপছন্দের দোষ বের করতে। ইমরান জানিয়েছিলো,

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ১৯

– মোনালিসা জীবনসঙ্গী হিসেবে বেশ চমৎকার হবে। আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান ভাববো। কিন্তু সবকিছুর উর্ধ্বে থাকে জেনারেশন গ্যাপ। গোটা একটা জেনারেশন গ্যাপ।
মিনহাজ প্রতিউত্তরে বলেছিলো,
– আমার মোনা নিজেকে তোর জেনারেশনে নিয়ে যাবে ইমরান, আর তোকে ওর জেনারেশনে নিয়ে আসবে। বাজি। হয়তো তা দেখার জন্য আমি বেঁচে থাকবোনা। তখন ঠিক মনে পড়বে আমার কথা।
মিনহাজের নিজের অনুপস্থিতির জানান দেয়াটা যেন ইমরানের ভেতরটা নাড়িয়ে তুললো।

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ২১