প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ২৯
Sadiya Jahan Simi
সময়টা ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে যেন শীত বেড়েই চলেছে। সূর্য উঠতে বেশ দেরি হয়। চারদিকে কুয়াশার চাদরে ঢাকা থাকে। শিশির বিন্দু গুলো টপটপ করে বৃষ্টির মতো ঝড়ে পড়ে। এই শীতের সকালেই আজ ঘুম থেকে উঠে পড়েছে আভিয়ান। ওয়াশ রুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এলো। ওয়াশরুম থেকে বের হয়েই আয়নার সামনে এসে দাঁড়াল আভিয়ান। মুখে জলের ঝাপটা দিয়ে নিজেকে একদম ঝরঝরে লাগছে । আজকের উজ্জ্বল সকালটা আলস্যে কাটানোর কোনো মানে হয় না। পেট কমাতে এখন যা করা লাগবে তাই করবে আভিয়ান।
সে আলমারি খুলে প্রথমেই বের করে নিল তার পছন্দের ডার্ক গ্রে কালারের একটি ড্রাই-ফিট টি-শার্ট। এই ফেব্রিকটা আভিয়ানে খুব প্রিয়। টি-শার্টটি গায়ে জড়াতেই তার সুঠাম শরীরে বেশ মানিয়ে গেল যেন। এরপর পরে নিল কালো রঙের একটি স্ট্রেচেবল ট্র্যাক প্যান্ট।
তারপর ড্রয়ার থেকে এক জোড়া সাদা সুতি মোজা বের করে পরল। এরপর রেক থেকে বের করে আনল নির্ভরযোগ্য রানিং শু-জোড়া। নিপুণ হাতে ফিতেগুলো শক্ত করে বেঁধে নিল সে।
ঘরের এক কোণে রাখা পানির বোতলটা ভরে ব্যাগে ঢোকাল সে। সবশেষে হাতের কব্জিতে আটকে নিল তার স্মার্টওয়াচটি, যা আজকের হাঁটার প্রতিটি ধাপ আর হার্টরেট গুনে রাখবে। ড্রেসিং টেবিলের ওপর থেকে হালকা সুগন্ধি স্প্রে করে নিয়ে সে দরজার দিকে পা বাড়াল। আজ যেন আধঘাট বেঁধেই নেমেছে বেশ। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমেই ডান দিকের একটি কক্ষে এসে পা যুগোল থামে। শক্ত হাতে দরজায় কড়াঘাত করে। তবে ওপাশ থেকে কোনোরকম রেসপন্স না পেয়ে যেন চেতে উঠলো আভিয়ান। পুনরায় শব্দ করে দরজায় টোকা দিয়ে চেঁচিয়ে বলল,
” এই রনি। উঠছিস না কেন! তোকে কাল রাতেও বলেছিলাম না, সকালে মর্নিং ওয়াকে যাবো।”
ভেতরে তখনো ল্যাপের নিচে ঘুমিয়ে আছে রনি। শীতকালে সহজেই ঘুম ভাঙ্গতে চায়না। পা থেকে মাথা পর্যন্ত কম্বল মুড়ি দিয়ে বেঘোরে ঘুমাচ্ছে রনি। হঠাৎ এতো জোরে দরজা ধাক্কানো এবং আভিয়ানের হুংকার শুনে মুহুর্তেই ঘুম ভেঙ্গে গেল। কোনোরকম উঠে বসলো বিছানায় হুড়মুড়িয়ে। চোখে ঘুমের রেশ। শান্ত হয়ে বসার মাঝেই পুনরায় আভিয়ানের হুংকার ভেসে এলো। রনি শুকনো ঢোক গিলে তড়িঘড়ি করে নেমে দাঁড়ালো। ব্যস্ত পায়ে গিয়ে দরজা খুলে দিতেই ভড়কে গেল। রনমূর্তি রুপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আভিয়ান।
” তোকে কাল কি বলেছিলাম?”
” কি বলেছিলেন মানে! ভাই,এখনো তো কাল আসেনি। আপনি কি বলছেন বুঝতে পারছি না ভাই।”
বেচারা রনি ঘুমের ঘোরে কি বলছে নিজেও বুঝতে পারছে না। রনির কথায় আভিয়ানের ভ্রু কুঁচকে যায়। সাত সকালে ঠাট্টা করছে।
” ফাজলামো করিস আমার সাথে! এক থাপ্পড়ে চাপার দাঁত ফেলে দিবো।”
এতোক্ষণে ঘুমে ঢুলছিল রনি। আভিয়ানের ধমকে মুহূর্তেই ঘুম পালাল চোখ থেকে। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
” ভাই এতো সকালে ডাকছেন কেন! কেউ হামলা করেছে?”
” তুই আমার হাতে মার না খাওয়া অব্দি ভালো হবি না বুঝেছি। এই বেয়াদব তোকে না বলেছিলাম সকালে মর্নিং ওয়াকে যাবো। তাহলে এখনো রেডি হসনি কেন?”
মুহূর্তেই মনে পড়ে গেল গতকালের কথা। বেচারা কেনো বলতে গেল, পেট বাড়ার কথা? নিজের দোষে এখন বিপদে পড়েছে। শীতকালে কম্বলের নিচে নাক টেনে ঘুয়াবে। তা না, আরেকজন এসেছে এতো সকালে মর্নিং ওয়াকে যেতে। বিড়বিড় করে বলল,
” কেনো বলতে গেলাম এই কথা? মন চাচ্ছে নিজের মাথায় নিজেই দুটো বাড়ি মারি। হায় আল্লাহ! এতো সকালে মজার ঘুম ছেড়ে বাইরে যেতে হবে।আআআ।”
” কি বিড়বিড় করছিস! লেইট হয়ে গিয়েছে অলরেডি।”
রনি মুখটা বাংলার পাঁচের মতো করে নিল। আমতা আমতা করে বলল,
” ভাই আগামীকাল গেলে হয় না? না মানে..
” এই কাল ,কাল না। আরো কাল আছে। এই কালে নিয়ে যাবে সেই কালের কাছে।”
আভিয়ানের কথায় ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল রনি। সাতসকালে কি বলছে এসব। পরমুহূর্তেই হাত তালি দিয়ে বলল,
” ও মায়া মায়া গো। ভাই কবিতা মিলছে। আপনার সুনাম করার জন্য আজ ক্ষমা করে দিন। এতো সকালে শীতের মাঝে বের হতে ইচ্ছে করছে না।”
” পাঁচ মিনিট দিলাম। তারমধ্যে রেডি হয়ে ড্রয়িং রুমে আয়। নয়তো তোর ক্রিম মাখার খবর পুরো ইউনিয়নে ছড়িয়ে দেবো।”
এ দফায় চুপ করে গেল রনি। পুরো ইউনিয়নে ছড়িয়ে দিলে তখন তো কোনো মেয়ে বিয়ে করতে চাইবে না। ওয়াশরুমে যেতে যেতে বলল,
” না থাক। পরে আবার মেয়েরা ক্রিম সুন্দরা বলবে।”
” কি করছিস?”
উদ্যানের ডাকে পেছনে ফিরে রাফসা। গতকাল রাতের কথা মনে পড়ে যায় হঠাৎ। রাফসা মনে মনে হাসলো। কি পাগলামি করেছিল রাতে। ভাবলেই হাসি পাচ্ছে। আগের উদ্যান এবং গতকাল রাতের উদ্যানের মধ্যে আকাশ পাতাল তফাৎ ছিল। চেনাই যায়নি লোকটাকে। কতক্ষন যে বুকের মাঝে চেপে জড়িয়ে ধরে রেখেছিল তার ইয়াত্তা নেই।
” খানি কেন রাতে? না খেয়ে ঘুমিয়েছিস।”
এইবার উদ্যানের কন্ঠস্বর কেমন ভারী শোনালো। রাতে রাফসা বেশ কঠোর ছিল। কোনোরকম শান্ত করতে পারেনি উদ্যান এতো কিছু বলেও। পরে রোহান খাবার খেতে ডাকলে এলে উদ্যান জেদ ধরেই খেতে যায়নি। রাফসা নিজেও চুপচাপ বেরিয়ে গিয়েছিল রুম থেকে। প্রায় আধঘন্টা পর হাতে খাবার নিয়ে গেলে ও উদ্যান খায়নি। উল্টো ধমকে উঠেছিল। রাফসা ও আর কিছু না বলেই হনহন করে রুম ছাড়ে।
” আমার ইচ্ছে হয়েছে তাই খাইনি। আপনার এতো মাথাব্যথা কেন?”
উদ্যান এগিয়ে এসে রাফসার পেছনে দাঁড়ায়। বুকে হাত গুঁজে বলল,
” আমি খাইনি সেজন্যই তো খাসনি। এটা বললে কি মুখে ফোসকা পড়বে!”
উদ্যানের কথায় রাফসা অবাক হয়ে পেছনে ফিরে।
” আপনার কেনো মনে হলো, আমি রেজিস্ট্রি করা জামাইয়ের জন্য না খেয়েই থাকবো! অ্যাই শুনেন বড় ভাই, আমার ইচ্ছে হয়েছিল তাই খাইনি। আপনার জন্য কেন খাবো না!”
” দিব এক থাপ্পর বেয়াদব। রেজিস্ট্রি করা জামাই, বড় ভাই এইসব কি কথা! বেয়াদবি করিস স্বামীর সাথে। জাহান্নামী মহিলা।”
রাফসা কটমট করে তাকালো। যেন এক্ষুনি কিছু একটা করে ফেলবে। দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিসিয়ে বলল,
” বেশি করলে এক্ষুনি তুলে ছাদ থেকে ফেলে দিব।”
রাফসার কথায় মুখ বাঁকিয়ে হাসলো উদ্যান। খানিকটা রাফসার সামনে ঝুঁকে বলল,
” তুমি আমায় তুলতে পারবে জান! খুব অবাক হলাম শুনে।”
রাফসা নাক মুখ কুঁচকে বলল, ”অ্যাই বড় ভাই অ্যাই দূরে যান। আর শুনুন আমার তুমি ওয়ালার ঘরে তুমি ওয়ালা এভাবে কাছে আসবেন না বলে দিলাম। নয়তো আমি কিন্তু মাথা ফাটিয়ে দেবো।”
রাফসার কথায় উদ্যানের ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা হাসিটা প্রশস্ত হয়। চাপদাড়ির মাঝখানে হালকা গোলাপি রঙের অধরে ফকফকা হাসিটা যেন বুকে গিয়ে লাগলো রাফসার। এই লোকটাকে কখনো হাসতে দেখেনি আগে। সবসময় গাম্ভীর্য বজায় রাখতে পছন্দ করতো। মাঝে মধ্যে দেখা যেত মুচকি হাসি। কিন্তু রাফসার সাথে কখনো হেসে কথা বলেনি। রাফসার অন্তত মনে পড়ছে না এমন কিছু। ইশ্ প্রেমে পড়ার পর কত করে চাইতো লোকটা ওর সাথে একটু হেসে কথা বলুক। কিন্তু কখনো সেটা হয়নি। উদ্যান সবসময় রাফসাকে এড়িয়ে চলতো। মাঝেমধ্যে টুকটাক কথা বলতো তাও পড়াশোনা ব্যতীত অন্যকিছু নয়। কত করে চাইতো লোকটা একান্তই ওর হোক, ওর সাথে হেসে একটু কথা বলুক। আজ সেই দিনটা এসেছে। ওর সামনে দাঁড়ানো লোকটা ওর একান্তই, ওর আইনিভাবে সম্পূর্ণ হওয়া স্বামী। রাফসাকে এভাবে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে বিচলিত হলো না উদ্যান।
” তুই চাইলে কোথাও বসে দেখতে পারিস।”
উদ্যানের কথায় রাফসার ধ্যান ভাঙল। বিরক্ত চোখে তাকিয়ে বলল,
” আপনি তো এমন ছিলেন না। এখন এতো অসভ্য হচ্ছেন কেন?”
রাফসার কথায় উদ্যানের কপালে কয়েক স্তর ভাঁজ পড়ল। আগের সাথে এখনের সময় মেলালে হবে! দুই আঙ্গুল দিয়ে রাফসার কপালে টোকা দিয়ে বলল,
” আগে তো কাজিন ছিলাম। এখন আর সেই সম্পর্ক নেই। নাও আ’ম ইউর হাজবেন্ড।”
” হ্যাঁ চাচাতো স্বামী।”
আজকের ওয়েদার বেশ ভারী। রোদ নেই। সকালে ছিল হাকলা তবে তা এখন পুরোপুরি মেঘের আড়ালে ঢাকা পড়েছে। রাফসা কিছু দরকারি জিনিস কিনতে বেরিয়েছে। ফোন করে সাবিকুন সায়মা কে বলেছে বের হতে। কসমেটিকস এর দোকানেই তিনজনের দেখা হয়। দরকারি জিনিস নিয়ে পাশের একটি রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসে। সায়মার মুখ ভার। কথা বলছে না নিরবতা ভেঙ্গে রাফসাই বলল,
” সাতারুল কোথায়? বিশ তারিখ ফ্লাইট ছিল, চলে গেছে!”
সাবিকুন বলল, ” না যায়নি। আশরাফুল বলল, আন্টি নাটি কান্নাকাটি করেছে অনেক। সাতারুলকে দেয়নি যেতে।”
” এই বেয়াদব টা বাংলাদেশ ছেড়ে গেলেই ভালো হতো। কত বড় হারামিটা করেছে। বন্ধু সেজে পেছনে ছুড়ি মেরেছে।” ফুঁসতে ফুঁসতে কথাগুলো বলল সায়মা। রাফসা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
” দেখ এমন করিস না। রিলেশন করা খারাপ নয়।”
” তারমানে ভালো বলছিস! শোন সাদু, আমি এতোটা হায়পার হতাম না কখনো। আমার বোনকে বাড়ি থেকে বের করে আনবে। বিয়ে করবে পালিয়ে। তোর কাছে এসব কম মনে হয়! তবুও এসব দেখে আমি এতো মাথা ঘামায়নি। ভেবেছিলাম বুঝিয়ে বলব। কিন্তু ও সব অস্বীকার করল। আবার আমার ফ্যামিলি তে জানাজানি হয়ে গিয়েছে। আব্বু ডিরেক্ট বলেছে আমি নাকি লাগিয়েছি ওদের দুজনকে। সব জেনে প্রশ্রয় দিয়েছি। বল, সে জায়গায় কি করে ঠিক থাকব আমি!”
রাফসা একহাতে সায়মার হাত আঁকড়ে ধরে বলল, ” সব ঠিকঠাক করে নে বোন। আমার ভালো লাগছে না এমন। আমাদের বন্ধুত্ব টা শেষ হয়ে যাচ্ছে। দেখ সব ভুলে হয়ে গিয়েছে। ঠান্ডা মাথায় সামলে নে।”
রাফসা থেকে হাত সরিয়ে নিল সায়মা। কঠোরভাবে বলল,
” কখনোই না। ওর সাথে বন্ধুত্ব রাখার কোনো মানেই হয়না।”
সাবিকুন অসহায় হয়ে বলল, ” তোদের দুইজনের ঝামেলা হয়েছে। আমি আর সাদিয়া কি করেছি? আমাদের কেনো সাতারুল ব্লক করেছে!”
” সেটা আমি জানি না। তোদের বন্ধু তোরাই জিজ্ঞেস করিস। আমি উঠলাম। বাসায় কাজ আছে। আল্লাহ হাফেজ।”
সবার বিদায় নিয়ে রাফসা বেরিয়ে পড়ল। রিকশা করে বাড়ি ফিরবে আজ। কিন্তু বিধিবাম আজ জনমানবহীন যেন রাস্তাঘাট। আনমনে হাঁটতে হাঁটতে হুঁট করেই যেন কারো সাথে ধাক্কা খেয়ে গেল। হাতে থাকা প্যাকেট গুলোর স্থান হলো রাস্তায়। রাফসা হতভম্ব হয়ে তাকাল। বেশ অদ্ভুত দেখতে লোকটা।
কালো ল্যাদার জ্যাকেট শরীরে।কলার ছাপিয়ে মাস্ক আর চশমার মাঝখানের ওই সামান্য অংশে ধরা দিচ্ছিল তার চোখের কারুকাজ। যদিওবা চোখে রোদচশমা। চোখের কোণে জমে থাকা সূক্ষ্ম ভাঁজগুলো বলছিল, লোকটা অনেক অভিজ্ঞ। সেই দৃষ্টিতে শিকারি বাজের মতো এক ধরণের ক্ষিপ্রতা। রোদচশমার আড়ালে সেই চোখজোড়া যেন এই শহরের প্রতিটি ধূলিকণা মেপে নিচ্ছে, যেন কোনো এক মহাপ্রলয়ের অপেক্ষায় সে এই ছদ্মবেশে দাঁড়িয়ে আছে। সম্পূর্ণ কালো কাপড়ে আচ্ছাদিত লোকটা। রাফসা বেশ অবাক হলো এমন পোশাকে দেখে। কেমন যেন একটা খটকা লাগলো। লোকটা নিচু হয়ে প্যাকেট গুলো তুলে দিল। রাফসা পানে তাকিয়ে সেটা বাড়িয়ে দিয়ে কন্ঠ খাদে নামিয়ে বেশ ঠান্ডা স্বরে বলল,
” আপনার জিনিস গুলো ধরুন মিস। আর বাড়ি ফিরে যান। রাস্তা ঘাট তেমন সুবিধার নয়।”
রাফসা চমকে উঠলো এক মুহূর্তে। এতো ভয়ানক স্বর কখনো শুনেছে বলে মনে হয়না। কেমন ভারী কন্ঠস্বর। শরীরে হিম হয়ে গেল যেন। রাফসা কাঁপা কাঁপা হাতে ব্যাংকগুলো হাতে নিল। ঠোঁট নেড়ে বলল,
” কে আপনি?”
মাস্কের ওপাড়ে যেন হাসি ফুটে উঠল লোকটার। রোদচশমার আড়ালে ঢাকা চোখজোড়া বোঝার বড় দায়। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। দুই হাত পকেটে ঢুকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
” আন, আন ক্রেভিয়ান।”
তারপর আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালো না। রাফসাকে পাশ কাটিয়ে যেতে যেতে গুনগুনিয়ে গেয়ে উঠলো।
আলতো ছোঁয়ায় চোখের চাওয়ায়
পাওয়া না পাওয়ার কি যে নেশা
সে স্মৃতিটাই আজও হাতড়ায়
হারিয়ে ফেলা ভালোবাসা।
রাফসা স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। কেমন যেন হালকা চেনা লাগল ভয়েস।
আজকের ফরাজী বাড়িটা বেশ জমজমাট। আর এক সপ্তাহ পরেই মিমের বিয়ে। কেনাকাটা শুরু করবে আগামীকাল থেকে। আজ বাড়িতে মিমের শ্বশুর বাড়ি থেকে কয়েকজন আসবে। সাথে রাফসার ফুফুর ফ্যামিলির সবাই। বিকেল থেকে বেশ তোড়জোড় শুরু হলো রান্না বান্নার। ভাগ্নির হবু শ্বশুর বাড়ি থেকে মেহমান আসবেন। কোনোরকম কমতি রাখতে চাইছে না বাড়ির তিন বউ।
ড্রয়িং রুমে রিশান পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে। ঊষা সোফার কাভার গুলো টেনে টুনে ঠিক করছে। রিশানের সামনে এসে বললি,
” সোফা থেকে উঠো।”
” কেন?”
” দেখছো না কাজ করছি?”
রিশান ভ্রু কুঁচকে বলল, ” তুই দেখছিস না আমি বসে আছি?”
” ভালো লাগছে না আমার।”
” আমার ও । একটা বিয়ে করতে পারলে ভালো লাগতো।”
ঊষা চোখ ছোট ছোট করে করে বলল,
” তারমানে একটা করার পর আরেকটা করবে!”
রিশান ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। মেয়ে মানুষ বুঝে কম চিল্লায় বেশি।
” না, বারবার করব বিয়ে। কিন্তু বউ তুই থাকবি প্রতিবার।”
ঊষা মুখ বাকালো। রিশান তা দেখে থমথমে গলায় বলল,
” তোরা দুই ভাই বোন আমাদের দুই ভাই বোনকে যা নাচিয়েছিস। শুদে আসলে সব শোধ করব। শুধু সময়ের অপেক্ষা বেইব। আমার বোন তো অলরেডি তোর ভাইকে বাদড় নাচ নাচাচ্ছে।”
উদ্যান বাড়ি ফিরে আজ কিছু টা তাড়াতাড়ি। সন্ধ্যার আযান পড়েনি এখনো। বাড়ির ভিন্ন পরিবেশ দেখে অবাক হলো। ড্রয়িং রুম বেশ সাজানো গোছানো। চারদিকে খাবারের গন্ধে মৌ মৌ করছে। উদ্যান ক্লান্ত হয়ে সোফায় গিয়ে বসল। জায়িন কে দেখে বলল,
”বাড়িতে আজ এতো আয়োজন কিসের?”
জায়িন অবাক হয়ে বলল, ”ওমা তুমি জানো না!”
”কি হয়েছে সেটা বল।”
জায়িন গদগদে হয়ে বলল, ”শুনেছি রাফসাকে দেখতে আসবে। তাই জন্যই এতো আয়োজন।”
উদ্যান সবেই চোখটা বন্ধ করেছিল। জায়িনের কথায় তড়িৎ গতিতে চোখ জোড়া মেলল। অবাক হয়ে বলল,
” হোয়াট!”
জায়িন মাথা চুলকে বলল, ” আমি সারাদিন বাইরে ছিলাম। একটু আগেই ফিরেছি। রোহান ভাইয়া বলল,রাফসাকে দেখতে আসবে।”
উদ্যান বিরক্তিকর শ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ালো। আর এক মুহূর্তও নষ্ট করেনি। গটগট পায়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেল। এইদিকে জায়িন বোকার মতো তাকিয়ে রইল।
উদ্যান সোজা নিজের ঘরে না গিয়ে রাফসার ঘরে আসে। কিছু না ভেবেই ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। রাফসা বিছানায় আড়াআড়ি করে শুয়ে ছিল। মাথাটা বিছানার বাইরে ঝুঁলে আছে। হাতে ফোন। দরজা বন্ধ করার আওয়াজ শুনে তড়িঘড়ি করে উঠে বসল। উদ্যান কে দেখে পাশ থেকে ওড়না তুলে ভালো করে শরীর ঢেকে বলল,
” সমস্যা কি! দরজা বন্ধ করেছেন কেন?”
উদ্যান শুনলো তবে কিছু বলল না। এক পা এক পা করে এগিয়ে এলো রাফসার দিকে। কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলল,
” শুনলাম আপনাকে নাকি দেখতে আসবে?”
রাফসা অবাক হয়ে তাকালো। কি বলছে এই লোক,সব মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে।
” কি মেডাম কথা বলছেন না কেন?”
রাফসা আড়মোড়া হয়ে বসল। ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বলল,
” তো কি হয়েছে!”
” কি হয়েছে মানে! আপনার স্বামী আছে, সেটা কি পানির সাথে গুলে খেয়েছেন?”
রাফসা ভ্রু কুঁচকে তাকালো। মুখ বাঁকিয়ে বললো, ” আমার স্বামীর পথ ক্লিয়ার করে দিচ্ছি। সে আরেকটা বিয়ে করতে পারবে। আমি ও আরেকটা বিয়ে করব। বাচ্চা কাচ্ছা নিয়ে সুন্দর একটা সংসার সাজাবো। আমাকে হারিয়ে ফেললে তার কিছুই হবে না।”
উদ্যান শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ক্লান্ত শরীরটা নিয়ে ধপ করে বসে পড়ল বেডে। হুট করেই দুই হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রাফসাকে। আবেগ জড়ানো গলায় বলল,
” তোমার অভাবে আমার ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে স্থান হোক, তবুও আমার তুমি ব্যতীত অন্য কেউ অর্ধাঙ্গিনী না হোক।
তোমার অভাবে আমার জীবন এলোমেলো হয়ে যাক, তবুও আমার এই জীবন গুছিয়ে দেওয়ার জন্য তুমি ব্যতীত অন্য কেউ না আসুক।
তোমার অভাবে আমার মৃত্যু হোক, তারপরও তুমি ব্যতীত আমার এই জীবনে অন্য কেউ না আসুক।
আমার সব সুখ তোমার হোক, তারপরও কোনো দুঃখ তোমায় স্পর্শ না করুক।
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ২৮
তুমি আমার সেই ভালোবাসা,যার জন্য আমি সব ধ্বংস করতে পারি। তুমি আমার সেই ভালোবাসা, যাকে ঘিরে আমার প্রতিটা সেকেন্ড আবর্তিত হয়।
তোমাকে পেয়ে আমার ধ্বংস মঞ্জুর হোক
সবশেষে তোমার কোলে মাথা রেখে আমার মরণ হোক।”
উদ্যানের কথায় রাফসা স্তব্ধ হয়ে গেল। শান্ত হয়ে পড়ে রইলো উদ্যানের বুকে। বুঝতে পারছে লোকটার বুক কাঁপছে। কোনো কিছু হারিয়ে ফেলার ভয়।

পর্বগুলো অনেক সুন্দর বাকি পর্বগুলো আশা করছি খুব তাড়াতাড়ি।
তাড়াতাড়ি পর্বগুলো দিলে ভালো হতো।